logo
  • Tue, 25 Sep, 2018

  সঞ্জয় কর   ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০  

ইচ্ছা পরীর কিচ্ছা

ইচ্ছা পরীর কিচ্ছা
নন্দ ঘরে ঢুকতেই ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠল। অমাবস্যার অন্ধকার দূর হয়ে যেন পূণির্মার চঁাদ উদিত হলো। কয়েক দিনের মধ্যেই পরিবারে বিদ্যমান কলহ বিবাদের অবসান হয়ে শান্তির সুবাতাস বহিতে শুরু করল, কিন্তু কে এই নন্দ? কি তার পরিচয়? আজ এক সপ্তাহ হয় ছেলেটি বাসায় আশ্রয় নিয়েছে, এখন পযর্ন্ত সে তার পরিচয় দিতে পারছে না। মনে মনে ভাবেন বিনোদ বাবু। বিনোদ বাবু সন্দেহপ্রবণ কিন্তু খুব দয়ালু মানুষ। নন্দকে আশ্রয় দিলেও বিনোদ বাবু তাকে নজরবন্দি করে রেখেছেন। গতকাল বটতলার ভট মহাশয় এসেছিলেন তিনি বললেন ‘এই সমস্ত ছেলেরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে, পরিবারের সকলের আপন হয়ে ওঠে এবং পেটের ভিতরের কথা বের করে আনে। আশ্রিত ছেলেটি নিশ্চয় কোনো ডাকাত দলের সদস্য হবে। ঘরে কেমন টাকা-পয়সা, সোনা-দানা আছে তা ডাকাত সদার্রকে জানাবে এবং পরিকল্পনা মতো কোনো এক গভীর রাতে ডাকাতদের দরজা খুলে দেবে।’ ভট মহাশয়ের কথায় সন্দেহের পাল্লাটি আরও ভারী হয় বিনোদ বাবুর। বিনোদ বাবু ছাড়া পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের ধারণা এই নিষ্পাপ চেহারার ছেলেটি নিশ্চয় কোনো ভালো পরিবারের সন্তান। বিনোদ বাবুর সবচেয়ে ছোট ছেলে বলয়। বলয়কে সবাই ছোট খোকা বলে ডাকে। ছোট খোকার সঙ্গে ইতোমধ্যেই নন্দর প্রচÐ ভাব হয়েছে। ছোট খোকা খুব ডানপিঠে। সারাদিন টই টই করে ঘুরে বেড়ায়। নিয়মিত স্কুলে যায় না। পড়াশোনায় খুব অমনোযোগী। নন্দর সংস্পশের্ ছোট খোকাও যেন আলোকিত পথের সন্ধান পেল।

গভীর রাত। কুয়াশার চাদরে মোড়া চতুদির্ক। প্রচÐ শীত উপেক্ষা করে গায়ে চাদর মুড়ি দিয়ে টয়লেট থেকে ফিরে, নন্দর কক্ষের দিকে অগ্রসর হন বিনোদ বাবু। কক্ষের চৌকাটে পা রেখেই থমকে দঁাড়ান তিনি। নন্দ বিছানায় নেই! তাহলে কি ভট মহাশয়ের কথাই ঠিক! মনে মনে ভাবেন বিনোদ বাবু এবং পঁাচ-ছয় হাত লম্বা এক টুকরো রড হাতে নিয়ে বারান্দায় বের হলেন তিনি। ফুল বাগানে ফিসফিস শব্দ শুনে সেদিকে দৃষ্টি দেন বিনোদ বাবু। দেখেন নন্দ বাগানে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। নিশ্চয় ডাকাত সদাের্রর সঙ্গে কথা বলছে নন্দ, এই ভেবে ডাকাত, ডাকাত বলে চিৎকার শুরু করেন তিনি। বাড়ির সবাই জেগে উঠলেন এবং বারান্দায় বের হয়ে এলেন। সবার সঙ্গে নন্দও ঘর থেকে বের হয়ে এলো। নন্দকে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন বিনোদ বাবু। দুই ঠেঁাটের গেট অতিক্রম করে যেন কথা বের হচ্ছিল না তার। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই বাগানের দিকে তাকালেন। কিন্তু বাগানে কাউকে দেখা গেল না। বিনোদ বাবুর স্ত্রী সারিকা রানী হাতে ধরে বিনোদ বাবুকে ঘরে নিয়ে গেলেন। সবাই ভাবলেন বিনোদ বাবুর প্রেসার বেড়ে গেছে তাই আবোল-তাবোল বলছেন। বিনোদ বাবু কোনো কথা না বলে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন।

গ্রামে যে কয়জন ধনাঢ্য ব্যক্তি আছেন, বিনোদ বাবু তাদের একজন। মাত্র কয়েক মাস হয় তিনতলা দালান বানিয়েছেন তিনি। চারদিকে সীমানা প্রাচীর ঘেরা বিশাল বড় বাড়ি বিনোদ বাবুর। বাড়ির সামনে ফুলের বাগান। বাগানে বিভিন্ন প্রজাতির সুগন্ধি ফুলের গাছ ও রকমারি পাতাবাহার। বাগানের ডান পাশে পুকুর ঘাট। পুকুর ঘাট এবং ফুল বাগানের মাঝ বরাবর সরু পাকা রাস্তা। রাস্তাটি সংযুক্ত হয়েছে বাড়ির প্রধান গেটের সঙ্গে। রাস্তার দুই-পাশে সারিবদ্ধ অসংখ্য সুপারিগাছ। বাড়ির পিছনে ফলের বাগান। বাগানে সারা বছরই কোনো না কোনো গাছে ঝুলে থাকে মৌসুমি ফল।

রাতে ভালো ঘুম হয়নি বিনোদ বাবুর। চোখ দুটি টকটকে লাল। দঁাত ব্রাশ করতে করতে পুকুর ঘাটের দিকে অগ্রসর হন তিনি। কাক ডাকা ভোর। আবছা অন্ধকারকে তাড়িয়ে দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে আলো। হঠাৎ বাড়ির সীমানা প্রাচীরের দিকে নজর পড়ে বিনোদ বাবুর। সীমানা প্রাচীরের চারদিকে বড় বড় করে লেখা ‘ইচ্ছা + অধ্যবসায় = সাফল্য’। শুধু সীমানা প্রাচীর নয় দালানের দেয়ালগুলোতেও একই লেখা। নিশ্চয় এটা তার শত্রæপক্ষের কাজ, মনে মনে ভাবেন বিনোদ বাবু। সকালের নাশতা সেরে মেম্বার সাহেবের বাড়ির দিকে যান তিনি। আশ্চযের্র বিষয় যার কাছে বিচার প্রাথীর্ হবেন সেই মেম্বার সাহেবের বাড়ির অবস্থাও একই। আরও অনেক লোকজন একই বিষয়ে বিচার প্রাথীর্ হয়ে মেম্বারের বাড়িতে জটলা সৃষ্টি করেছেন। শুধু ঘরবাড়ি নয় গ্রামের স্কুল, মাদ্রাসার দেয়ালগুলোতেও সেই একই লেখা। মেম্বার সাহেব বলেন, ‘মাত্র এক রাতে সারা গ্রামের দেয়াল লিখন নিশ্চয় কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের কাজ। পঞ্চায়েতের মাসিক সভায় বিষয়টি আলোচনা করা হবে।’

দুপুরবেলা নাওয়া-খাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে আছেন বিনোদ বাবু। বিনোদ বাবুর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে সারিকা রানী বলেন ‘নন্দর কাছে একটি পাথর আছে। পাথরটির অনেক আশ্চযর্ ক্ষমতা রয়েছে। আমার একদিন প্রচÐ মাথাব্যথা হয়েছিল। নন্দ সেই পাথরটি আমার মাথায় ছঁুইয়ে দিতেই মাথাব্যথা সেরে গেল। আমার ধারণা আমাদের ছোট খোকার আকস্মিক পরিবতের্ন এই পাথরটির ভ‚মিকা রয়েছে। আমি পাথরটি সম্পকের্ জানতে চাইলে নন্দ বিষয়টি এড়িয়ে যায়।’ বিনোদ বাবু বলেন, ‘সারিকা তুমি নন্দকে মাতৃ¯েœহে আগলে রেখেছ। এ ছাড়া নন্দও তোমাকে ভীষণ পছন্দ করে। একমাত্র তুমিই চেষ্টা করলে পাথর রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারবে।’

সারিকা রানীর পীড়াপীড়িতে একদিন পাথর রহস্যের কথা বলতে বাধ্য হয় নন্দ। সে বলে ‘এই গ্রামের উত্তর দিকে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আমি আসছিলাম। হঠাৎ পায়ের কাছে একটি সুন্দর কঁাচের বোতল দেখতে পেলাম। অদৃশ্য কেউ একজন আমাকে বোতলের ছিপি খুলতে বলে। আমি ছিপি খুলি। সঙ্গে সঙ্গে বোতলের ভিতর থেকে বের হয়ে আসেন এক সুন্দরী নারী। তিনি তার পরিচয় দেন। তিনি ইচ্ছা পরী। তিনি শিশু-কিশোরদের খুব পছন্দ করেন। শিশু-কিশোরদের মনে শুভ ইচ্ছা জাগ্রত করে তাদের সাফল্যের চ‚ড়ান্ত শিখরে পেঁৗছানোর পথ দেখাতে গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। কিন্তু শয়তান ও শয়তানের অনুসারীরা তার ভালো কাজে বাধা সৃষ্টি করে এবং এক শয়তান তান্ত্রিক তাকে বোতলে বন্দি করে এই জঙ্গলে ফেলে যায়। ইচ্ছাপরী আমাকে একটি দায়িত্ব দেন। দায়িত্বটা হলো ‘ইচ্ছা + অধ্যবসায় = সাফল্য’ এই বাতাির্ট যেন সব শিশু-কিশোরের মধ্যে আমি পেঁৗছে দিই। তিনি আরও বলেন শুভ ইচ্ছা বুকে লালন করে অধ্যবসায় করলে মহান সৃষ্টিকতার্ও শিশু-কিশোরদের সহায় হবেন এবং তারা সাফল্য লাভ করে ভবিষ্যতের আলোকিত জীবনের প্রদীপ জ্বালাতে সক্ষম হবে। ইচ্ছাপরী আমাকে সাবধান করে দেন। তার বোতল বন্দির কাহিনী যেন আমি কাউকে না বলি। এই ইচ্ছাপরীই আমাকে আশ্চযর্ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পাথর উপহার দেন’। সারিকা রানী বলেন-

- তাহলে তুমিই কি দেয়াল লিখনের সঙ্গে জড়িত?

- হ্যঁা।

- একরাতে এত্ত দেয়াল লিখন সম্ভব হলো কীভাবে?

- সবই ইচ্ছাপরীর সহায়তায় হয়েছে।

সেদিন গভীর রাতে ইচ্ছাপরী নন্দর সঙ্গে দেখা করতে আসে বিনোদ বাবুর ফুলবাগানে। খুব রাগান্বিত হয়ে ইচ্ছাপরী নন্দকে বলে, ‘তুমি আমার কথা রাখলে না নন্দ। আমার বোতল বন্দির কাহিনী তুমি সারিকা রানীকে জানিয়ে দিলে। যারা আমার কথা রাখে না আমি তাদের কঠিন শাস্তি দিই। কিন্তু তুমি আমাকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেছ। তাই তোমাকে শাস্তি দেব না বরং তোমাকে একটি পুরস্কারই দেব। তুমি একটি দুঘর্টনায় স্মৃতি হারিয়ে বিনোদ বাবুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলে। তোমার নাম নন্দ নয়, জুনাব আলী। আমিই তোমার নাম দিয়েছিলাম নন্দ। এখন আমি তোমার স্মৃতি ফিরিয়ে দেব।

ইচ্ছাপরী জুনাব আলীর কাছ থেকে অলৌকিক পাথরটা ফেরত নেন এবং তার মাথায় হাত বুলিয়ে স্মৃতি ফিরিয়ে দেন। জুনাব আলীর আব্বু আম্মুর কথা খুব বেশি মনে পড়ে। নিজ বাড়িতে যাওয়ার জন্য উতলা হয়ে ওঠে সে। ইচ্ছাপরী জুনাব আলীকে বাড়িতে পেঁৗছে দেন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

উপরে