logo
রোববার ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬

  প্রিন্স আশরাফ   ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০  

জন্মদিনের উপহার

জন্মদিনের উপহার
সোহম লনে গম্ভীর ভঙ্গিতে হাঁটছে। মাঝেমধ্যে লনে পড়ে থাকা একটা-দুইটা গাছের পাতা তুলে কুড়িয়ে প্যান্টের পকেটে ভরে। মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মায়ের গলা ভেসে আসে, সোহম, সোহম। সোহম কোনো দিকেই তাকায় না। তার চোখ গাছের পড়ে যাওয়া পাতায় আবিষ্ট।

নয় বছরের সোহম কিছুটা অটিস্টিক। তার মনোযোগের সমস্যা আছে। মাঝেমধ্যে একেবারে কথা বন্ধ করে দেয়। বিকালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে মা অ্যাপয়ন্টমেন্ট করেছেন। সোহমের বিদেশ প্রবাসী বাবা এ ব্যাপারে মাকে জোর দিয়ে বলেছেন।

মা সোহমকে ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে এসেছেন। সোহম গম্ভীর মুখে বসে আছে। ডাক্তার সোহমের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। লাভ হয় না। ডাক্তার কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। গম্ভীর স্বরে বললেন, আপনার ছেলের মনোযোগের ঘাটতি আছে।

মা চিন্তিত। অটিস্টিকের কথা আগে শুনেছেন। তবে সোহমের ব্যাপারটা ঠিক কোন ক্যাটাগরিতে পড়ে বুঝতে পারছেন না। এই ডাক্তার অটিস্টিক বিশেষজ্ঞ। এর মতামত জানা জরুরি। 'ও কি অটিস্টিক?'

ডাক্তার নিজেও বিভ্রান্ত। 'না'। ওকে ঠিক অটিস্টিক শিশুর কাতারে ফেলা যাবে না। তবে অটিজমের কিছুটা ব্যাপারস্যাপার ওর মধ্যে রয়ে গেছে। খুব কম গ্রেডে।

আপনার কথা ঠিক বুঝলাম না।

ওর যেটা ঘটেছে মেডিকেলের ভাষায় তাকে বলে এডিডি। অ্যাটেনশন ডিফিসিয়েন্সি ডিজঅর্ডার। মনোযোগের ঘাটতি।

মনোযোগের সমস্যা কিন্তু অন্যরকম মনে হয়। যখন কোনো কিছুর দিকে মনোযোগ দেয় তখন হাজার ডাকলেও শোনে না। কথা তো খুব কম বলে, মাঝেমধ্যে কথা একেবারেই বন্ধ করে দেয়।

ডাক্তার চিন্তিতভাবে ভ্রম্ন কুঁচকালেন। 'হুম, বুঝতে পেরেছি। ওষুধপত্রে খুব একটা কাজ হবে না।' তিনি একটু সময় নিলেন। 'এ ক্ষেত্রে সমাধান একটা আছে।'

'কি?'

ওর সমবয়সী কাউকে যদি ওর সঙ্গে ম্যাক্সিমাম টাইম রাখা যায় তাহলে হয়তো কাজ হতে পারে। সমবয়সীদের দেখলে তখন হয়তো ওর ভেতরেও তার মতো হওয়ার প্রবণতা গড়ে উঠতে পারে।

'স্কুলে ওর সমবয়সীদের সঙ্গে থাকে। সেখানেও কিন্তু ও চুপচাপ।' মা জানালেন।

ডাক্তার উপসংহার টানলেন। 'সেজন্যই বাসায়ও ওর সমবয়সী কোনো ছেলেকে ওর সঙ্গী করতে পারলে আউটপুটটা কি আসে দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া যেত।'

মা চিন্তায় পড়েন। সোহমের সমবয়সী সঙ্গী কোথায় পাবেন। ফোনে প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে আলাপ করেন। স্বামী কোনো সমাধান দিতে পারে না।

কি বুয়া তোমার সন্ধানে কোনো ছোট ছেলেটেলে আছে নাকি? সোহমের সঙ্গে একটু খেলবে, সময় কাটাবে। তার জন্য টাকা পাবে।

বুয়া ঘর মুছতে মুছতে জানালো। 'জে খালাম্মা। রাখতে দিবার পারে। হেগোর টেহাপয়সার খুব টানাটানি।

আজেবাজে বস্তির কোনো ছেলেকে আমি কিন্তু রাখব না। খিস্তিখেউড় গালাগালি শিখবে। সেই ছেলে কি স্কুলে যায়?

জে খালাম্মা। খুব ব্রেন। ফার্স্ট হয়।

মা বললেন, 'শুধু ছেলে স্কুলে গেলেই হবে না। ভালো ফ্যামিলির ছেলে না হলে সোহম খারাপ ম্যানার শিখবে। বাবা মাকেও শিক্ষিত সভ্যভব্য হতে হবে।'

হেই পোলার মায় নেই। বাবায় শিক্ষিত। স্কুলমাস্টারি করে।

বুয়ার পরিচিত দরিদ্র কিন্তু শিক্ষিত পরিবারের সোহমের সমবয়সী সজীব কিছু অর্থের বিনিময়ে সোহমের সঙ্গী হয়। সোহমও সজীবকে পেয়ে আস্তে আস্তে সহজ হয়। দুজনের মধ্যে সহজ বন্ধুত্ব হয়। সজীবকে ছাড়া সোহমের এক মুহূর্তও চলে না। সোহম নিজের খেলনা সজীবকে দান করে। সজীব বাড়ি নিয়ে এলে তার শিক্ষক বাবা মনে করে চুরি করে এনেছে। খেলনা আর সজীবকে নিয়ে সোহমের বাড়িতে আসে। সোহমের মা সজীবের বাবার সততায় মুগ্ধ হয়। সজীবের ছোটবোন সোনালীকে খেলনাটা উপহার দেয়।

লনে সজীব ও সোহম গ্রাম্য ঢিল ছোড়াছুড়ি খেলছিল।

সজীব বলল, 'তোমার হাতের টিপ এত খারাপ যে গুলতি গাছে মারলে মাটিতে লাগবে।'

সোহম অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, 'টিপ কি? গুলতি কাকে বলে? আমাকে একটা গুলতি এনে দেবে?'

তুমি গুলতি দেখনি কখনো?

না। কিরকম জিনিস সেটা?

ইংরেজি ওয়াই অক্ষরের মতো কাঠের জিনিস। তার দুপাশে দুটো রাবার বাঁধা। তার মাঝখানে চামড়া। ও তুমি বুঝবে না। লুকিয়ে নিয়ে আসতে হবে। বাবা জানতে পারলে আস্ত রাখবে না।

সোহম হেসে বলল, 'আমার আম্মু কিছু বলবে না। আম্মু আমার কোনো কিছুতে না করেন না।'

আমার বাবা করে। সারাক্ষণ আমার পিছনে লেগে থাকে। কোনো কিছু শান্তিমতো করতে দেয় না। তবে এখন তোমার সঙ্গে থাকাটাই শুধু শান্তিমতো করতে দিচ্ছে।

তুমি আমাকে গুলতি এনে দেবে তো? তাহলে আমি তোমাকে পিএসপি খেলতে দেব।

সজীব অবাক হয়। সেটা আবার কি?

'ও গড! পিএসপি কি তুমি চেন না? খেলনি কখনো? পেস্ন স্টেশন। কম্পিউটারের মতো। তাতে শুধু গেমস খেলা যায়। আমি এক্ষুনি নিয়ে এসে দেখাচ্ছি তোমাকে।' সোহম সজীবকে পিএসপি খেলা শেখায়।

ধীরে ধীরে সোহম স্বাভাবিক হয়ে উঠতে থাকে। ডাক্তারের ফলোআপে তাই বলে। বিদেশ প্রবাসী বাবা এই খবরে খুব উৎফুলস্ন। ফোনে বাবা জানান, 'এই বছরই দেশে ফিরব। ফিরে সোহমের জন্মদিন খুব ধুমধামের সঙ্গে পালন করব।'

সোহম জন্মদিনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে থাকে। সেই পরিকল্পনার সঙ্গী হয় সজীব। আর রাতে বাসায় ফিরে সজীব সেই অনাগত জন্মদিনের গল্প করে ছোটবোন সোনালীকে। দুই ভাইবোন জন্মদিনের রঙিন কল্পনায় ভাসে।

সোহমের বাবা আসেন বিদেশ থেকে। গুলশানের পার্টি সেন্টারে জন্মদিন করবেন বলে হাঁকডাক করেন। নামিদামি লোকদের দাওয়াত করেন। বড়লোকের ইংরেজি বলা বাচ্চারা থাকবে জন্মদিনের পার্টিতে। মা ইতস্তত করে বললেন, 'সজীবদেরও বলতে হবে। ওকে ছাড়া সোহম স্বাভাবিক থাকে না।' বাবা রাজি হন না। সজীবের মতো ফকিরনির পোলা তার ছেলের বন্ধু এটা অন্য ভিআইপি অতিথিরা জানতে পারলে তাদের স্ট্যাটাস থাকবে না। ওর চেয়ে কিছু টাকা দিয়ে দিলে ওর বাপ-বোনকে নিয়ে হোটেল থেকে খেয়ে আসবে।

এদিকে সোহমের পীড়াপীড়িতে সজীব নিজেও জন্মদিনের প্রস্তুতি নিতে থাকে। বোনকেও বলে। ছোট্ট বোন ওর সবচেয়ে ভালো শার্টপ্যান্ট গুছিয়ে রাখে। দোকান থেকে ইস্ত্রি করে আনে। কত কি পরিকল্পনা করে দুই ভাইবোন মিলে। কেমন কি হবে জল্পনাকল্পনার শেষ নেই।

জন্মদিনের দিন সন্ধ্যার আগে আগে দুই ভাইবোন সাধ্যমতো সুন্দর ড্রেস পরে সোহমদের বাড়িতে আসে। বাসায় ওরা কেউ নেই। সবাই পার্টি সেন্টারে জন্মদিনের পার্টিতে গেছে। বাসায় কাজের বুয়া একা। কাজের বুয়া ওদের দুজনকে দেখে অবাক হয়। সে নিজেও জানে না পার্টি সেন্টার কোথায়। অভিমানে লজ্জায় সজীবের চোখ ভিজে ওঠে। তাই দেখে সোনালীও কেঁদে ফেলে। কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে আসে ওরা। আকাশে তারা হওয়া মায়ের কথা মনে পড়ে ওদের।

রাতে অভিমানে না খেয়েই শুয়ে পড়ে সজীব। দরিদ্র বাবা সাধ্যিসাধনা করেও অভিমান ভাঙাতে পারে না।

পার্টি সেন্টারে জন্মদিনের পার্টিতে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করে সবাই। সব বাচ্চারা পার্টি সেন্টারের পেস্নজোনে হুটোপুটি হৈহুলেস্নাড় খেলায় মত্ত থাকলেও পার্টির মধ্যমণি সোহম কেমন যেন নির্জীব। কোনো কথা বলে না। এক জায়গায় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। একটা রঙিন বেলুন ধরিয়ে দিলে সেটাই হাতে ধরে থাকে। নাড়াচাড়া করে না। ব্যাপারটা মা খেয়াল করেন। আদুরে স্বরে জিজ্ঞেস করেন, 'কি হয়েছে বাবা? এমন করছ কেন?'

সোহম কথা বলে না। অতিথিদের সঙ্গে আড্ডারত বাবাকে ডেকে এনে মা আড়ালে নিয়ে বললেন, 'বার্থডেতে এসে সোহম যেন কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে। ওর পছন্দের সুপারম্যান কেকের দিকেও চাইছে না।'

বাবা প্রথমে ব্যাপারটায় পাত্তা দেন না। কিন্তু পার্টিতে কেককাটার মুহূর্তে সজীব যখন জম্বির মতো দাঁড়িয়ে থাকে তখন মা-ই সোহমের ব্যাপারটা বুঝতে পারে।

মাঝরাতে সজীবদের ছোট্ট বাসায় গাড়ি নিয়ে সোহমরা আসে। জন্মদিনের কেক, খাবার, খেলনা, বেলুন নিয়ে এসেছে ওরা।

মাঝ রাতে সজীবদের ছোট্টবাসাটাতেই যেন জন্মদিনের উৎসব শুরু হয়ে যায়...
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে