logo
বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬

  টিএম তাহিসনা এনাম তৃষা   ২২ জুন ২০১৯, ০০:০০  

রন্টুর ক্যামেরা

রন্টুর ক্যামেরা
র ন্টুর ছোটমামা শিহাব এসেছে আমেরিকা থেকে প্রায় পাঁচ বছর পর। তাই রন্টুদের বাড়িতে আনন্দের সীমা নেই। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিণী নাহার বেগম ভেবেই কূল পাচ্ছেন না ভাইকে কীভাবে আদর-আপ্যায়ন করবেন। রন্টুর বাবা পলাশ সাহেব তার শ্যালকের জন্য সাধ্যের মধ্যে সবটুকু করার আয়োজন করেছেন।

ছোটমামা আসায় সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে রন্টু আর তার বড় বোন মিমি। রন্টু স্থানীয় সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ক্লাস সিক্সে পড়ে। আর মিমি পড়ে ক্লাস নাইনে। সারাক্ষণ দুই ভাইবোন ছায়ার মতো ছোটমামার পিছনে লেগে আছে। ছোটমামার নেশা-পেশা দুটোই ফটোগ্রাফি। এই ফটোগ্রাফির জন্য তিনি সারা বছর এ দেশে-ও দেশে ঘুরে বেড়ান। ছোটমামাও ভাগ্নে আর ভাগ্নিকে সেসব গল্প শোনান।

রন্টুর সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে মামার ক্যামেরাটা। সুযোগ পেলেই সে মামার ক্যামেরাটাকে গলায় ঝুলিয়ে ছবি তোলে। অনেকদিন ধরেই তার খুব শখ যে তার নিজের একটা ক্যামেরা হবে। ক্যামেরাটাকে গলায় ঝুলিয়ে রাখবে রন্টু। আর প্রকৃতির ছবি তুলবে। কিন্তু রন্টু নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আর তাই আরও অনেক ইচ্ছার সঙ্গে তার এই ইচ্ছাটাও কার্ণিশে তোলা থাকে।

ধীরে ধীরে ছোটমামার যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসে। বাড়ির সবার মন খারাপ। ছোটমামা আবার কবে আসবে তা কেউ জানে না, ছোটমামাও জানে না। যাওয়ার আগে অবাক করা একটা কান্ড করে মামা। রন্টুর জন্মদিন উপলক্ষে নিজের ক্যামেরাটা রন্টুকে উপহার দেন ছোটমামা। রন্টুর হাতে ক্যামেরাটা দিয়ে বললেন, 'আজ থেকে এটা তোর হলো রে রন্টু। ক্যামেরাটার ঠিকঠাক যত্ন নিস। আর খুব করে ছবি তুলবি। পরের বার এসে আমি সব ছবি দেখবো কিন্তু।'

ক্যামেরাটা হাতে পেয়ে রন্টু অবাক হয়ে যায়। তাহলে কি তার এতদিনের স্বপ্ন সত্যি হলো! সত্যিই কি ক্যামেরাটা এখন থেকে রন্টুর নিজের! রন্টুর অবস্থা দেখে বাবা না হেসে পারেন না। রন্টুকে বলেন, 'এটা সত্যিই এখন থেকে তোর ক্যামেরা রন্টু।'

ছোটমামার কথা মতো ক্যামেরাটা যত্নে রাখে রন্টু। আর সবখানেই ছবি তোলার জন্য ক্যামেরাটা সে সঙ্গে নিয়ে যায়। ছবি তোলার হাত রন্টুর নেহাত মন্দ না। বয়সের তুলনায় বেশ ভালো ছবি তোলে রন্টু। সবাই তার তোলা ছবির খুব প্রশংসা করে। এই তো সেবার অ্যানুয়াল স্পোর্টস ডে-তে ড্রিল স্যার নিজে রন্টুকে সব ছবি তোলার দ্বায়িত্ব দিলেন। ছবিগুলোর প্রিন্ট পাওয়ার পর খোদ হেড স্যার অব্দি রন্টুর খুব প্রশংসা করলেন। শুধু মিমি ঠোঁট উলটে বলল, 'কি ছবি তুলিস এসব বল তো? একদম বাজে। তুই আসলে ছবিই তুলতে জানিস না। ছোটমামা শুধু শুধু তোকে ক্যামেরাটা দিয়ে গেছে।'

মিমির কথা গায়ে মাখে না রন্টু। মিমি সবসময়ই রন্টুর দোষ ধরে বেড়ায়। ছবি তুলতে ভীষণ ভালো লাগে রন্টুর। প্রায় সময়ই গলায় ক্যামেরাটা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ে রন্টু ছবি তোলার জন্য- তারপর নিজের হাতখরচ আর টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে সে ছবিগুলো প্রিন্ট করায়। রন্টু মনে মনে স্বপ্ন দেখে একদিন সেও খুব নামকরা এক ফটোগ্রাফার হবে। দেশ-বিদেশে ঘুরে ঘুরে ছবি তুলে বেড়াবে।

এদিকে রন্টুদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা দিনে দিনে আরও খারাপ হয়। রন্টুর বাবা পলাশ সাহেবের ব্যবসায় খুব মন্দা দেখা দেয়। বাজারে ধীরে ধীরে অনেক দেনা জমা পড়ে তার। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা। আত্মীয়-স্বজনরাও আর ধার-কর্জ দিতে চায় না। নাহার বেগমের টুকটাক গয়না বিক্রি করে কোনোমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সংসারটা।

দেখতে দেখতে মিমির ম্যাট্রিক পরীক্ষা এগিয়ে আসে। মিমি খুব ভালো ছাত্রী। পরীক্ষার প্রস্তুতিও খুব ভালো। কিন্তু গোল বাঁধে ফর্ম ফিলাপের টাকা নিয়ে। পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপ করতে যে অনেক টাকার দরকার। এত টাকা এখন রন্টুর বাবার হাতে নেই। পলাশ সাহেব অনেক চেষ্টা করেও টাকা জোগাড় করতে পারলেন না। আত্মীয়-স্বজনরাও তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আর শিহাবমামার সঙ্গেও কোনোভাবেই যোগাযোগ করা সম্ভবও হলো না।

মিমির ফর্ম ফিলাপের টাকা জমা দেয়ার কালকেই শেষ দিন। কিন্তু টাকার জোগাড় হলো না। নাহার বেগম আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদছেন মিমির কথা ভেবে। পলাশ সাহেবেরও বুক চিরে বারবার দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসছে। মিমি দরজা বন্ধ করে কাঁদছে। সারাটা রাত যেন এই পরিবারটির দুঃখ, কষ্ট আর দীর্ঘশ্বাসে আরও বেশি অন্ধকার আর দীর্ঘতর হলো।

পরেরদিন সকালবেলা। রন্টুকে ঘুম থেকে ডাকতে গিয়ে নাহার বেগম খেয়াল করলেন রন্টু ঘরে নেই। সারা বাড়িতে ছেলেকে খুঁজলেন তিনি। কিন্তু রন্টু কোথাও নেই। রন্টু তো না বলে কখনো কোথাও যায় না! ছেলের চিন্তায় বুক কেঁপে ওঠে মায়ের, রন্টুর বাবা আর মিমিকে ডাকেন নাহার বেগম। সবাই মিলে খুঁজতে থাকে রন্টুকে। মিমি আর পলাশ সাহেব মিলে রন্টুকে খুঁজতে বের হয়।?

রন্টুকে কোথাও না পেয়ে বাড়ি ফিরে আসে রন্টুর বাবা আর মিমি। রন্টুর মায়ের কান্নাকাটিতে তখন বসার ঘরে অনেক লোকের সমাগম। এমন সময় ঘরে ঢোকে রন্টু। তাকে অনেক ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মনে হচ্ছে। এত লোক দেখে শুকনো মুখে রন্টু মিমিকে প্রশ্ন করে, 'কি হয়েছে রে আপু বাসায় এত লোক কেন?'

মিমি কোনো উত্তর না দিয়েই রন্টুর গালে ঠাস করে একটা চড় মারে। ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে ওঠে রন্টু। পলাশ সাহেবও এসে রন্টুর আরেক গালে চড় বসায়। নাহার বেগম এসে জড়িয়ে ধরে ছেলেকে। রন্টুর মায়াভরা চোখে তখন কষ্টের নোনাজল। নাহার বেগম ছেলেকে জিজ্ঞেস করে, 'কাউকে কিচ্ছু না বলে কোথায় চলে গিয়েছিলি বাবা? তোর বাবা আর মিমি সারা পাড়া খুঁজেও তোকে না পেয়ে চলে এসেছে।'

নিজের চোখের পানি সামলে নেয় রন্টু। মায়ের বাহুডোর থেকে মুক্ত হয়ে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকায়। সেখান থেকে বের করে আনে কড়কড়ে আড়াই হাজার টাকা। মিমির হাতে টাকাগুলো দিয়ে বলে, 'আপু, এই নে তোর ফর্ম ফিলাপের টাকাটা আমি নিয়ে এসেছি।'

রন্টুর হাতে এতগুলো টাকা দেখে অবাক হয় সবাই। রন্টুর বাবা জিজ্ঞেস করে, 'তুই এতগুলো টাকা কোথায় পেলি রন্টু?'

হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের জল মোছে রন্টু। ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, 'আমি জানি আজকে মিমি আপুর পরীক্ষার টাকা জমা দেয়ার শেষ দিন। তাই আমি শহরে গিয়েছিলাম একটা স্টুডিওতে। সেখানে আমার ক্যামেরাটা বিক্রি করে দিয়েছি।'

রন্টুর কথাটা শুনে অবাক হয়ে যায় সবাই। ভাইকে জড়িয়ে ধরে মিমি বলে, 'ক্যামেরাটা যে তোর খুব প্রিয় ছিল রে রন্টু?'

'তাতে কি আপু? ওটা তো আর তোর থেকে বেশি প্রিয় ছিল না। তাই না? এখন তাড়াতাড়ি কর ফর্ম ফিলাপের সময় শেষ হলো বলে।'

মিমি আর দেরি করল না। নিজের ঘর থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ছোট্ট ভাইয়ের দেয়া টাকাগুলো নিয়ে চলে গেল পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপ করতে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে