logo
সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  এনাম রাজু   ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

আমাদের প্রিয় নজরুল

আমাদের প্রিয় নজরুল
'ওরে শিশু, ঘরে তোর এলো সওগাত

আলো পানে তুলে ধর ননী-মাখা হাত।

নিয়ে আয় কচি মুখে আধো আধো বোল,

তুলতুলে গালে ভরা টুলটুলে টোল...।'

ছোট্ট বন্ধুরা নিশ্চয়ই ইসলামিক গজলটি তোমাদের জানা। যাদের জানা নেই তারা মনে মনে হয়তো তোমাদের প্রিয় লেখকদের নাম ভাবছো। হঁ্যা, আমাদের প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা। কবি কাজী নজরুল ইসলাম সর্বদা অন্তরে শিশুমনকে লালন করত। তাই তো সারাক্ষণ ছোটাছুটি করে সময় কাটাতো। কোনো জায়গায় স্থায়ীভাবে থাকতে পারত না। পাখির মতো উড়ে উড়ে বেড়াত। এখন এখানে তো একটু বাদেই অন্য কোথাও। এই কারণেই ছোট্টবেলাতে স্কুল থেকে পালিয়েছিল। তার চঞ্চল মনের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার লেখায়ও- থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে/দেখব এবার জগৎটাকে/ কেমন করে ঘুরছে মানুষ/যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।

একই সঙ্গে এই লেখাটি তোমাদের উৎসাহ দেবে নিজেদের পাখির মতো উড়ে উড়ে পৃথিবীর রূপ, নানাবিধ পরিবর্তনের খেলা দেখতে।

ছোট্টবেলায় তার নাম ছিল দুখু মিয়া। কে জানত আমাদের প্রিয় কবির নামের মতো তার জীবনেও দুঃখের পাথর চেপে বসবে। মাত্র আট বছর বয়সে পিতাকে হারিয়ে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। কখনো মসজিদের ইমামতি কখনো মক্তবের শিক্ষকতা। দশম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে প্রথম মহাযুদ্ধে অংশগ্রহণ, লেটো গানের দলে গান গাওয়া সেই সঙ্গে গান লেখাও। রুটির দোকানেও কাজ করতে হয়েছে শুধু পরিবারের খরচ চালাতে। এতটুকু বয়সেও নানান কষ্ট-যন্ত্রণার মধ্যেও নিজেকে তৈরি করেছে অসীম সাহসী ও ধৈর্য্যের প্রতীক হিসেবে। যা তোমাদের জেনে রাখা ভালো।

নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও সাহিত্যকে ভালোবেসে লিখেছেন একের পর এক সার্থক কবিতা, গল্প, গানসহ সাহিত্যের সব আসরেই। যা তাকে সম্মানিত করে রেখেছে দুনিয়াময়। ছোট্ট বন্ধুরা কাজী নজরুল ইসলাম শিখিয়ে গেছেন কীভাবে ধৈর্য ধরতে হয়, কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হয় জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে। তোমাদের শিশুদের উৎসাহ দিতে তিনি একের পর এক ছড়া, কবিতা, গান রচনা করেছেন। তোমাদের জন্য লেখা দুখু মিয়ার বিখ্যাত কবিতার নাম 'খুকি ও কাঠবেড়ালি'। এ কবিতাটি নিয়েও মজার ঘটনা আছে। আর সে ঘটনাও তোমাদের মতো ছোট্ট একটি মেয়েকে নিয়ে।

১৯২১ সালে একবার কুমিলস্নায় বেড়াতে এসেছিলেন নজরুল। তিনি উঠেছিলেন ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত নামে এক ভদ্রলোকের বাড়িতে। তার ফুটফুটে সুন্দর একটি ছোট মেয়ে ছিল, নাম- অঞ্জলি।

সেদিন নজরুল বারান্দায় বসে আছেন। চোখ পড়ল অঞ্জলির ওপর। তিনি দেখলেন, একটা পেয়ারা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে চোখ-ঠোঁট উল্টিয়ে, হাত-পা নেড়ে অঞ্জলি যেন কার সঙ্গে অবিরাম কথা বলছে।

নজরুল ভাবলেন, নিশ্চয়ই কেউ পেয়ারাগাছে উঠেছে। তার কাছে কাকুতি-মিনতি করে অঞ্জলি পেয়ারা চাইছে, কিন্তু গাছের ওপর যে, সে পেয়ারা দিচ্ছে না। নজরুল তো ছোটদের খুব ভালোবাসতেন, আদরও করতেন। তিনি ভাবলেন, অঞ্জলির হয়ে পেয়ারা চাইবেন। সে দিলে দেবে, না দিলে নিজেই পেয়ারা পেড়ে দেবেন। মজার ব্যাপার হলো, কাছে গিয়ে কবি নজরুল গাছের ওপর কাউকেই দেখতে পেলেন না। তবে অঞ্জলি কথা বলছিল কার সঙ্গে?

তখন অঞ্জলিকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কার কথা বলছো খুকি?

অঞ্জলি বলল, কাকাবাবু! ওই দেখো দুষ্টু কাঠবেড়ালি। রোজ রোজ দুষ্টুটা পেয়ারা খায়। আমাকে একটাও দেয় না। কাঠবেড়ালির সঙ্গে অঞ্জলির এই মান-অভিমানের ঘটনাটি নজরুলকে এতটাই চমৎকৃত করল যে, এ ঘটনাটির ওপর লিখলেন একটি দারুণ কবিতা। 'খুকি ও কাঠবেড়ালি' নামের সেই কবিতার শুরুটা ছিল এমন-

কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি!

পেয়ারা তুমি খাও?

গুড়-মুড়ি খাও! দুধ-ভাত খাও?

বাতাবি লেবু লাউ?

বেড়াল বাচ্চা? কুকুরছানা তাও?

কাজী নজরুল ইসলামের আরেকটি শিশুতোষ বিখ্যাত কবিতার নাম 'লিচু চোর'। এ কবিতাটি লেখার পেছনেও সুন্দর একটি ঘটনা আছে। ছোটদের ভালোবাসতেন বলেই যে কবি নজরুল 'লিচু চোর' কবিতাটি লিখেছিলেন, সে কথা যদিও জোর দিয়ে বলা যায়। তবে শিশুসুলভ মনকে লালন করতেন বলেই শিশুদের নিয়ে এমন সুন্দর সুন্দর লেখা লিখতে পেরেছেন। একদিন নজরুলের সঙ্গে আলী আকবর নামে এক ভদ্রলোকের পরিচয় হয়। ছোটদের জন্য পাঠ্যবই লিখতেন তিনি। এই আলী আকবর সাহেব একদিন নজরুল ইসলামকে একটি পান্ডুলিপি দেখিয়ে মতামত চাইলেন। পুরো পান্ডুলিপিটি পড়ে নজরুল বললেন, এই ছড়াগুলো ছোটদের উপযোগী হয়নি। এগুলো বদলাতে হবে। যদি বলেন তো আমিও একটা কবিতা লিখে দিতে পারি। সঙ্গে সঙ্গে তিনি অনুরোধ করলেন নজরুলকে একটি কবিতা লিখে দেয়ার জন্য। তখন তিনি এই কবিতাটি লিখে দিলেন- বাবুদের তালপুকুরে/ হাবুদের ডালকুকুরে/ সেকি ব্যস করলো তাড়া/ বলি, থাম-একটু দাঁড়া।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (১৮৯৯ সালের ২৫ মে) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মাতার নাম জায়েদা খাতুন। ১৯৭২ সালে কবির জন্মদিনে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবিকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। কবির বাকি জীবন বাংলাদেশেই কাটে। ১৯৭৬ সালে নজরুলকে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেন এবং কবিকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া হয়। এই মহান কবি ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট মৃতু্যবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাকে কবর দেয়া হয়।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে