logo
বৃহস্পতিবার ১৭ অক্টোবর, ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬

  রুমানা নাওয়ার   ০৫ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০  

পুজোর স্মৃতি

মিতালীদের বাড়ি

মিতালীদের বাড়ি
র্পুজো এলেই প্রতি পুজোয় আমাদের সব বন্ধুকে মিতালীদের বাড়িতে যাওয়া চাই। আমি এনি, এলিচ, শেলী, আরজু, রাশেদা, এনতাজ সাত-আটজনের একটা গ্রম্নপ মিলে হইহই করে হাজির হতাম মিতালীদের বাড়িতে। চাঁনপুরের পাল পাড়ার সে বাড়িটা ঘিরে আমাদের কত মধুর স্মৃতি। হেঁটে হেঁটে চলে যেতাম দু-তিন কিলোমিটার পথ। কোনো ক্লান্তি ছিল না সে হাঁটায়। বড় রাস্তা ধরে দল বেঁধে হাঁটতাম। আমার বাড়ি ছিল শৈলকূপায়, দূরে সবার থেকে। বাকি সবার মোটামুটি কাছে। নারায়ণ হাট চাঁদপুরের সংযোগ রাস্তায় দাঁড়াতাম সবাই একসঙ্গে হওয়ার জন্য। তারপর হাতে হাত রেখে শিকল তুলে হাঁটা। সকালের মিঠে রোদটাকে সঙ্গে নিয়ে ছুটতাম সবাই। কাঁচা রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে উড়িয়ে হাঁটার মজা আলাদা। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ারাও হাঁটতো এঁকেবেঁকে।

রাস্তার দুপাশের গাছগুলো নিবিড় মমতায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অপূর্ব ছায়াশীতল পরিবেশ সৃষ্টি করত। পাইট্টাছড়ির ছোট পুলটায় গা ছমছম করা পরিবেশ উপভোগ করতাম। পুলের নিচ দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট নদীটা দেখতাম পুল থেকে ঝুঁকে। কাকচক্ষু জলে নিজের ছায়া দেখতাম। চিৎকার করতাম। প্রতিধ্বনি হতো সে চিৎকার দ্বিগুণ হয়ে। কি এক বুনো পাতার গন্ধ পেতাম ওখানটায়। শুঁকতাম নাক টেনে টেনে।

মিতালির বাড়ি যাওয়ার মাঝ রাস্তায় একটা বিশাল লোহার পুল ছিল। ওটাতে উঠলেই সবাই পা দিয়ে জোরে জোরে আওয়াজ করলে ঝনঝন শব্দে পুরো এলাকা সরগরম হতো।

কোরানো নারকেলের সঙ্গে মিঠার পুর মিশ্রিত করে বানানো হতো নারকেলের পুর। আগের দিনের পানিতে রাখা পান্তাভাতের সঙ্গে নারকেলের পুর কলা দিয়ে পরিবেশন করা হতো আমাদের সামনে। তরতাজা পান্তার সঙ্গে নারকেল গুড়ের মিঠাই আর কলাতে কি সুস্বাদ হয়ে উঠত- যে খায়নি সে কি করে বুঝবে?

মিতালীর বড় দাদা বড় জেঠুর ছেলে ছিল আমাদের সবার প্রিয় বুলবুল স্যার আর রুবি বৌদি। ছোটবেলায় মা হারা হওয়ার পর মিতালী আর মিতালীর বোন শিউলি দিদিকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখতেন। তাদের দুসন্তান গৌতম আর গোপার মতো। আমাদের মূলত খাওয়াটা জমতো বুলবুল স্যার রুবি ম্যামের ঘরে। পাটি বিছিয়ে খেতে দিত সবাইকে। পিতলের থালায় পরিবেশন করা হতো পান্তা ভাত। পুরুষ্ট কলা, গুড় মিশানো নারকেলে সাবাড় করে দিতাম পুরো গামলা। স্কুলে খুব কড়া শাসন করলেও এখানে বাড়িতে এলে ভিন্নরূপ দুজনের। পরম মমতায় স্নেহে আমাদের কাছে টানতেন। মনে হতো মিতালীর মায়ের আদরটাও বৌদি বিলোতেন আমাদের মধ্যে। বুলবুল স্যার ছিলেন ইংরেজি অংকের দাপুটে টিচার। বৌদিও অংকে পারদর্শী। বুলবুল স্যার পান খেতেন সুগন্ধি জর্দায়। পুরো ক্লাসটা ম-ম করত ঘ্রাণে। এত সুন্দর করে পান খেতেন কখনো পিক ঠোঁটের কিনারায় আসতে দেখিনি। লুঙ্গিটা হাত দিয়ে কুঁচিয়ে এত নিপাট করে ধরতেন দারুণ লাগতো স্যারকে। আমরা পুঁচকে ছাত্রছাত্রীরা ভালোবাসতাম ভয়ও পেতাম স্যারকে।

মিতালী ক্লাসের সবার চেয়ে ছোটখাটো। খুবই আদুরে, মিষ্টি একটা মুখ। কথা বলার আগে হাসতো খিলখিল করে। স্কুল ড্রেসে প্রজাপতির মতো লাগত ওকে। মা না থাকায় আমরা সব বন্ধুরা ওকে একটু বেশিই মায়া করতাম।

মিতালীদের একই বাড়িতে আরেক সহপাঠী ছিল আমাদের শেলী দে। ওদের ঘরেও যেতাম খেতে। শেলীর সঙ্গে খুব বেশি বন্ধুত্ব না থাকলেও আপ্যায়ন খাতিরটা কম করত না আমাদের। নয়-দশ বছরের ছোট ছোট মেয়েগুলো এবাড়ি ওবাড়ি দাপিয়ে বেড়াতাম। মনিন্দ্র বাবুদের বাড়ির সামনে বিশাল মন্দিরে পুজোর আয়োজন দেখতাম চোখ কপালে তুলে। থরে থরে সাজানো থাকত পূজার সব উপকরণ, প্রসাদ।

শেষে যেতাম সহপাঠী কোহিনূর আর সাত্তারের বাড়ি।

দুজনই ক্লাসে ছিল বয়োজ্যেষ্ঠ। ভাব-বন্ধুত্বও বেশি ছিল দুজনের। চাঁনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের পিছনটায় ছিল ওদের বাড়ি। আগে কোহিনূর পরে সাত্তারের বাড়ি। কোহিনূর বন্ধে কোথায় জানি বেড়াতে গেছে, পাইনি। আর সাত্তার দোকানের কাজে বাবাকে সাহায্য করতে দোকানে তখন।

হাটবারগুলোতে সাত্তার ক্লাস করত না। দোকানে রুটি বানাত। চা বিক্রি করত। লুঙ্গি পরেই স্কুলে আসত। মাঝেমধ্যে কোনো উপলক্ষে রং চলে যাওয়া একটা ফুলপ্যান্ট পরত। এত দরিদ্রতার মধ্যে থেকেও কোনো দিন সেকেন্ড হয়নি কোনো পরীক্ষায়। শার্ট ছিল একটা কি দুটো। কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়েই স্কুলে আসত সে। বয়সে বড় হওয়ায় ক্লাসের সবাই মানতো ওকে। একটা নেতৃত্বের ভাব নিয়ে চলত সব সময়। আড়ালে-আবডালে ওর দরিদ্রতা নিয়ে কথা বললে সামনে সবার বন্ধু ছিল সাত্তার।

বেলা ফুরিয়ে এলে যার যার গন্তব্যে পৌঁছে যেতাম নিরাপদে। পথে পথে কত খুনসুটি দুরন্তপনা আমাদের। মন খারাপ লাগলেও বুঝতে দিতাম না কেউ কাউকে। কারণ বয়সটায় যে মন খারাপের না। বয়সটায়ই তো প্রজাপতির পাখনা ধরার, ফড়িং ধরার, ছায়ার সঙ্গে খেলার ফসল তোলা দিন শেষে মাঠে মাঠে কানামাছি, বউচি খেলার। ঘাসপাতার ঘর বানিয়ে রান্নাবাটি খেলার। একটা সুখ স্মৃতি বুকের পাড়ে ঘুমোতে দিয়ে বাড়ি ফিরতাম আমরা। আবার মিতালীদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য আর একটা পুজোর অপেক্ষায় থাকতাম আমর্রা।পুজো এলেই প্রতি পুজোয় আমাদের সব বন্ধুকে মিতালীদের বাড়িতে যাওয়া চাই। আমি এনি, এলিচ, শেলী, আরজু, রাশেদা, এনতাজ সাত-আটজনের একটা গ্রম্নপ মিলে হইহই করে হাজির হতাম মিতালীদের বাড়িতে। চাঁনপুরের পাল পাড়ার সে বাড়িটা ঘিরে আমাদের কত মধুর স্মৃতি। হেঁটে হেঁটে চলে যেতাম দু-তিন কিলোমিটার পথ। কোনো ক্লান্তি ছিল না সে হাঁটায়। বড় রাস্তা ধরে দল বেঁধে হাঁটতাম। আমার বাড়ি ছিল শৈলকূপায়, দূরে সবার থেকে। বাকি সবার মোটামুটি কাছে। নারায়ণ হাট চাঁদপুরের সংযোগ রাস্তায় দাঁড়াতাম সবাই একসঙ্গে হওয়ার জন্য। তারপর হাতে হাত রেখে শিকল তুলে হাঁটা। সকালের মিঠে রোদটাকে সঙ্গে নিয়ে ছুটতাম সবাই। কাঁচা রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে উড়িয়ে হাঁটার মজা আলাদা। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ারাও হাঁটতো এঁকেবেঁকে।

রাস্তার দুপাশের গাছগুলো নিবিড় মমতায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অপূর্ব ছায়াশীতল পরিবেশ সৃষ্টি করত। পাইট্টাছড়ির ছোট পুলটায় গা ছমছম করা পরিবেশ উপভোগ করতাম। পুলের নিচ দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট নদীটা দেখতাম পুল থেকে ঝুঁকে। কাকচক্ষু জলে নিজের ছায়া দেখতাম। চিৎকার করতাম। প্রতিধ্বনি হতো সে চিৎকার দ্বিগুণ হয়ে। কি এক বুনো পাতার গন্ধ পেতাম ওখানটায়। শুঁকতাম নাক টেনে টেনে।

মিতালির বাড়ি যাওয়ার মাঝ রাস্তায় একটা বিশাল লোহার পুল ছিল। ওটাতে উঠলেই সবাই পা দিয়ে জোরে জোরে আওয়াজ করলে ঝনঝন শব্দে পুরো এলাকা সরগরম হতো।

কোরানো নারকেলের সঙ্গে মিঠার পুর মিশ্রিত করে বানানো হতো নারকেলের পুর। আগের দিনের পানিতে রাখা পান্তাভাতের সঙ্গে নারকেলের পুর কলা দিয়ে পরিবেশন করা হতো আমাদের সামনে। তরতাজা পান্তার সঙ্গে নারকেল গুড়ের মিঠাই আর কলাতে কি সুস্বাদ হয়ে উঠত- যে খায়নি সে কি করে বুঝবে?

মিতালীর বড় দাদা বড় জেঠুর ছেলে ছিল আমাদের সবার প্রিয় বুলবুল স্যার আর রুবি বৌদি। ছোটবেলায় মা হারা হওয়ার পর মিতালী আর মিতালীর বোন শিউলি দিদিকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখতেন। তাদের দুসন্তান গৌতম আর গোপার মতো। আমাদের মূলত খাওয়াটা জমতো বুলবুল স্যার রুবি ম্যামের ঘরে। পাটি বিছিয়ে খেতে দিত সবাইকে। পিতলের থালায় পরিবেশন করা হতো পান্তা ভাত। পুরুষ্ট কলা, গুড় মিশানো নারকেলে সাবাড় করে দিতাম পুরো গামলা। স্কুলে খুব কড়া শাসন করলেও এখানে বাড়িতে এলে ভিন্নরূপ দুজনের। পরম মমতায় স্নেহে আমাদের কাছে টানতেন। মনে হতো মিতালীর মায়ের আদরটাও বৌদি বিলোতেন আমাদের মধ্যে। বুলবুল স্যার ছিলেন ইংরেজি অংকের দাপুটে টিচার। বৌদিও অংকে পারদর্শী। বুলবুল স্যার পান খেতেন সুগন্ধি জর্দায়। পুরো ক্লাসটা ম-ম করত ঘ্রাণে। এত সুন্দর করে পান খেতেন কখনো পিক ঠোঁটের কিনারায় আসতে দেখিনি। লুঙ্গিটা হাত দিয়ে কুঁচিয়ে এত নিপাট করে ধরতেন দারুণ লাগতো স্যারকে। আমরা পুঁচকে ছাত্রছাত্রীরা ভালোবাসতাম ভয়ও পেতাম স্যারকে।

মিতালী ক্লাসের সবার চেয়ে ছোটখাটো। খুবই আদুরে, মিষ্টি একটা মুখ। কথা বলার আগে হাসতো খিলখিল করে। স্কুল ড্রেসে প্রজাপতির মতো লাগত ওকে। মা না থাকায় আমরা সব বন্ধুরা ওকে একটু বেশিই মায়া করতাম।

মিতালীদের একই বাড়িতে আরেক সহপাঠী ছিল আমাদের শেলী দে। ওদের ঘরেও যেতাম খেতে। শেলীর সঙ্গে খুব বেশি বন্ধুত্ব না থাকলেও আপ্যায়ন খাতিরটা কম করত না আমাদের। নয়-দশ বছরের ছোট ছোট মেয়েগুলো এবাড়ি ওবাড়ি দাপিয়ে বেড়াতাম। মনিন্দ্র বাবুদের বাড়ির সামনে বিশাল মন্দিরে পুজোর আয়োজন দেখতাম চোখ কপালে তুলে। থরে থরে সাজানো থাকত পূজার সব উপকরণ, প্রসাদ।

শেষে যেতাম সহপাঠী কোহিনূর আর সাত্তারের বাড়ি।

দুজনই ক্লাসে ছিল বয়োজ্যেষ্ঠ। ভাব-বন্ধুত্বও বেশি ছিল দুজনের। চাঁনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের পিছনটায় ছিল ওদের বাড়ি। আগে কোহিনূর পরে সাত্তারের বাড়ি। কোহিনূর বন্ধে কোথায় জানি বেড়াতে গেছে, পাইনি। আর সাত্তার দোকানের কাজে বাবাকে সাহায্য করতে দোকানে তখন।

হাটবারগুলোতে সাত্তার ক্লাস করত না। দোকানে রুটি বানাত। চা বিক্রি করত। লুঙ্গি পরেই স্কুলে আসত। মাঝেমধ্যে কোনো উপলক্ষে রং চলে যাওয়া একটা ফুলপ্যান্ট পরত। এত দরিদ্রতার মধ্যে থেকেও কোনো দিন সেকেন্ড হয়নি কোনো পরীক্ষায়। শার্ট ছিল একটা কি দুটো। কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়েই স্কুলে আসত সে। বয়সে বড় হওয়ায় ক্লাসের সবাই মানতো ওকে। একটা নেতৃত্বের ভাব নিয়ে চলত সব সময়। আড়ালে-আবডালে ওর দরিদ্রতা নিয়ে কথা বললে সামনে সবার বন্ধু ছিল সাত্তার।

বেলা ফুরিয়ে এলে যার যার গন্তব্যে পৌঁছে যেতাম নিরাপদে। পথে পথে কত খুনসুটি দুরন্তপনা আমাদের। মন খারাপ লাগলেও বুঝতে দিতাম না কেউ কাউকে। কারণ বয়সটায় যে মন খারাপের না। বয়সটায়ই তো প্রজাপতির পাখনা ধরার, ফড়িং ধরার, ছায়ার সঙ্গে খেলার ফসল তোলা দিন শেষে মাঠে মাঠে কানামাছি, বউচি খেলার। ঘাসপাতার ঘর বানিয়ে রান্নাবাটি খেলার। একটা সুখ স্মৃতি বুকের পাড়ে ঘুমোতে দিয়ে বাড়ি ফিরতাম আমরা। আবার মিতালীদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য আর একটা পুজোর অপেক্ষায় থাকতাম আমরা।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে