logo
বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬

  প্রিন্স আশরাফ   ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

ছুটির দিনে

হা সনাবানুর আজ ব্যস্ততার শেষ নেই। কোমরে ব্যথা ও হাঁটুতে বাত নিয়ে এই শরীরে তিনি দৌড়ঝাঁপ করছেন। তাই দেখে সবসময়ের সাথী মিনু খালা একগাল হেসে বলল, 'চাচিমাকে দেখে মনে হচ্ছে শরীরে কোনো ব্যথা-টেতা কিছু নেই। নাতি-পুতিরা আসবে তাই ব্যথা গায়েব।'

হাসনাবানু উঠোনের রোদে শুকোতে দেয়া ডালের বড়ির তদারকি করতে করতে বললেন, 'সেই ছোটবেলায় এসেছিল দাদুবাড়িতে। তারপরে তো আর আসেনি। এতদিন পরে আসছে। খাতির-যত্নের কমতি হলে কি হবে দাদু ভাইদের!'

'তা তুমি তো ঢাকায় গিয়ে নাতি-পুতিদের সঙ্গে থাকতে পারো? তাহলে আর এত পরান পোড়ে না।'

'তাহলে তোদের দেখবে কে? এই বেড়বাড়ি, এই এতসব, তোর চাচার কবর ফেলে কোথাও গিয়ে কি আমার মন ঠিকবে রে! এই কি করছিস, অত বড় বড় বড়ি দিসনে। শুকোতে সময় লাগবে। ওরা তো কাল আসবে। যাতে ভেজে খাওয়াতে পারি। শোন, বড়ি দেয়া হয়ে গেলে সবুরকে দিয়ে নারকেলগুলো ভেঙে কুরিয়ে রাখিস। ওরা এলে নারকেলি পিঠে করব সঙ্গে নাড়ু। শহরে থেকে তো আর এসব জিনিস খেতে পায় না। তুই এদিক দেখ। আমি পুকুরের দিকটা থেকে ঘুরে আসি। শজিনা ডাঁটাগুলো পেড়ে রাখতে হবে।'

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন বাড়িতে দক্ষযজ্ঞ কান্ড শুরু হয়ে গেল। সবুর বেড়বাড়িতে ঘুরে ঘুরে কোথায় মাটির নিচে মেটে আলু পাওয়া যায় খুঁজতে লেগে গেছে। পুকুরে জাল ফেলে মাছ তোলা হচ্ছে। কাল এসেই যাতে পুকুরের মাছ দিয়ে গরম ভাত খেতে পারে। ওরা এলেও আবার ওদের সামনে পুকুরে জাল ফেলা হবে। তখন খাবে টাটকা মাছ। পাশের বাড়িতে ঢেঁকিতে চাল কুটতে গেছে কাজের মেয়েটা। ওরা এলে রাতে পিঠে হবে। গ্রামের বাড়ি হলেও ইলেকট্রিসিটি আছে, ছেলে ফ্রিজ কিনে দিয়েছে। জিনিসপত্র রেডি করে ফ্রিজে তুলে রাখবে কিছু। আর কিছু জিনিস ওরা কাল এলে তখন টাটকা খেতে পারবে। শহরে ফার্মের মুরগি খেয়ে বড় হয়, গ্রামের দেশি মুরগি ওদের সামনেই জবাই হবে।

শহুরে অভিজাত ফ্ল্যাটে মানুষ ওরা। গাড়ি চড়ে স্কুলে যায়। এখানে একটু কষ্ট হলেও দাদুবাড়ির খোলামেলা পরিবেশে সে কষ্টটুকু নিশ্চয় জুড়িয়ে যাবে। হাসনা বানু কাজের লোক দিয়ে ঘরদোরগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করেন। সিলিংফ্যানগুলো মুছিয়ে নেন, বাথরুমগুলো চকচকে তকতকে করে তোলেন। টিউবওয়েলটা যাতে আবার না বিগড়োয় সেসব দেখেশুনে নেন। কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে ওঠা মিনু খালা হেসে বলে, 'ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে তোমার নাতি-পুতিরা আসছে না তো, রাজা-বাদশারা আসছে।'

হাসনাবানু হেসে বলেন, 'ওরা তো আমার কাছে রাজা-বাদশাই রে! শোন, আচারগুলো সব বের করে রোদে দিয়েছিস তো।'

'জে চাচিমা। দিয়েছে। জলপাই, আম, তেঁতুল, কতরকম আচারই না তুমি করেছো চাচিমা। তা তোমার নাতি-পুতিরা আচার-টাচার খায় তো?'

'খাবে না কেন? এত মজা করে বানিয়েছি। শহরে হয়তো পায় না তাই খায় না।'

সারাটা দিন এত কাজের মধ্যে কখন যে সন্ধ্যা নেমে গেল খেয়ালই হয়নি হাসনাবানুর। সন্ধ্যার পর সবাই জোরাজুরিতে একটু বিশ্রামের জন্য শুয়ে পড়লেন। তাও কি বিশ্রাম আছে! কোন ঘরে কে শোবে, কোথায় কি থাকবে, হাঁস-মুরগিগুলো ঠিকঠাকভাবে তোলা হয়েছে কিনা, কতগুলো ডিম আছে, শুয়ে শুয়েই সে সব খবর হাসনাবানুর করা চাই।

নিজেদের গাড়ি চালিয়ে দুপুরের আগেই ছেলে, বউমা আর রায়না, রায়হান এসে গেল। হাসনাবানু নয় বছরের রায়না আর সাত বছরের রায়হানকে দেখে একটু অবাক হলেন। দুটোরই চোখে মোটা পাওয়ারের চশমা উঠে গেছে। অথচ এই ৬৫ বছর বয়সেও তিনি দিব্যি খালি চোখে ধর্মীয় বই পড়তে পারেন। দাদিমার কাছে এসে রোবটীয় গলায় দুজনেই শেখানো তোতাপাখির মতো সালাম দিয়ে অন্যদিকে চলে গেল। হাসনাবানু মনে মনে একটু দমে গেলেন। ভেবেছিলেন ছেলেমেয়ে দুটোকে নিয়ে পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা দেখাবেন।

হাসনাবানু ঘরের মধ্যে এসে দেখেন রায়না একটা বড়সড় মোবাইল চোখের একেবারে সামনে ধরে মনোযোগ দিয়ে কি যেন করছে, রায়হানের হাতেও একটা ট্যাব ধরা। তিনি ওদের ডাকলেন, 'পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা হচ্ছে। দেখবি আয়।'

বউমা একটু বিরক্ত মুখেই শাশুড়ির দিকে তাকালো। 'থাক মা, ওরা যেতে না চাইলে, ওসবে অভ্যস্ত না তো। আর মা, আপনি ওদের তুইতোকারি করে ডাকবেন না। আমরা ওরকম শেখায়নি।'

হাসনাবানু দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বাইরে এলেন। ছেলে সবুরকে নিয়ে গাড়ির পেছন দিকের ডালা খুলে কী সব যেন বের করছে। বিশাল বড় বড় সব নীলচে কালারের পানির জার। তিনটে জার বের হলো। তিনি এগিয়ে গিয়ে কৌতূহলী স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, 'এসব কিসের পানি বাবা? এত পানি?'

'খাওয়ার পানি মা। মিনারেল ওয়াটার। আর এত পানি কোথায় দেখলে? ওদের গোসলেও তো লেগে যাবে। গ্রামের পুকুরের পানি কি আর ওদের সহ্য হবে?'

'কিন্তু খাওয়ার পানি তো আছে। তোর বাবার বসানো ডিপ টিউবওয়েলের পানি তো গোটা গ্রামের সবাই খায়।'

'ওটা তোমরা খেতে পারো মা। কিন্তু ওদের পেটে সহ্য হবে না। ওতে আয়রন, আর্সেনিক কত কিই না থাকে!'

'কিন্তু আমি তো এই পানি খেয়েই এতদিন বেঁচে আছি।'

'তোমাদের বডির ইমিনিটি আর ওদেরটা তো এক না মা। শোনো, এসব নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগছে না। আমরা দুদিনের জন্য গ্রামে বেড়াতে এসেছি। আমাদের নিজেদের মতো করেই বেড়িয়ে চলে যাব। খাওয়া-দাওয়া কোনো কিছু নিয়েই চিন্তা করতে হবে না।'

হাসনাবানু কথাটার অর্থ ঠিক বুঝতে পারলেন না। বোঝার চেষ্টাও করলেন না। কারণ দুপুরের রান্নার তদারকির জন্য তাকে রান্নাঘরের দিকে ডাক পড়ল। শুধু রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে লক্ষ্য করলেন, গাড়ির পিছন দিক থেকে আর অনেক বক্স, প্যাকেট একের পর এক বের হচ্ছে। ছেলে ওখান থেকেই হাঁক পাড়ল, 'মা, ফ্রিজটা মোটামুটি ফাঁকা আছে না? না থাকলে অন্তত একটা গোটা তাক আমাদের জন্য ফাঁকা করে দাও। ঢাকা থেকে অনেক খাবার-দাবার এনেছি। সব রাখতে হবে।'

হাসনাবানু ভাবলেন, ছেলে মনে হয় তার জন্যই খাবার-দাবার এনেছে। কিন্তু দুপুরের খাবার দিতে গিয়েই তার ভুল ভাঙল। এসব খাবার-দাবার ওরা নিজেদের জন্যই এনেছে। ফ্রিজিং করা খাবার, শুকনো খাবার, ফাস্ট ফুড, যেন ওরা কোনো অজানা গ্রহে এসেছে! রায়না ও রায়হানের জন্য ওদের আনা খাবারই বের করে সঙ্গে করে আনা মাইক্রোওভেনে গরম করে দিল। স্বামী-স্ত্রী অবশ্য মায়ের রান্নাই খেতে বসল। খেতে খেতে বলল, 'অনেক ঝাল মা। ওরা ঝাল খেতে পারে না। তা ছাড়া এসব গুরুপাক খাবার খেয়ে ওদের সহ্য হতো না। পেট খারাপ করত। আমার নিজেরই তো ভয় করছে। তুমি আবার ওরা খাবার না খাওয়া নিয়ে ইসু্য করো না।'

এই সময় মিনু খালা দুই-তিন রকম আচারের বাটি এনে বলল, 'চাচিমা, এই আচারের বাটি কি করব?'

হাসনাবানু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, 'তুলে রাখ। ওরা আচার খায় না, খাবেও না।'

'আর তুমি যে ওদের জন্য ডালের বড়ি ভেজে রেখেছিলে?'

'রেখে দে। সারাদিন যারা খেটে মরছে ওদের দিয়ে দে। খেয়ে নিক।'

মায়ের আচরণে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই একটু চুপসে গেল। একে অন্যের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। হাসনাবানু ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোমার ছেলেমেয়েদের জন্য রাতে পিঠের ব্যবস্থা করেছিলাম। ওগুলো কি করব নাকি বাদ দেব?'

'করো মা। আমরা তো একটু চেখে দেখতে পারি, নাকি? তুমি যখন এত কষ্ট করে করেছো?'

বউমা বোধ হয় কিছু না বললে ভালো দেখায় না তাই বলল, 'ওরা পিঠে খেয়েছে মা। পহেলা বৈশাখের মেলায়। আমাদের ওখানে স্টল দিয়েছিল। তবে ওগুলো সব প্যাকেট করা জিনিস দিয়ে বানানো। এরকম হাতে বানানো নয়।'

হাসনাবানু বুকে পাথর চেপে রাতে পিঠে করতে বসলেন। রান্নাঘরের চুলোর আগুনের সামনে ঝুঁকে বসেছেন। এমন সময় মনে হলো পিঠের উপর কেউ দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরেছে। তিনি পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখেন রায়না। 'দাদিমা, তুমি কি পিঠে করছো?'

'নারিকেলের পিঠে। আর তোমার মুখে ওটা কি?'

'বরইয়ের আচার। খুব টেস্টি। রায়হানও খাচ্ছে।'

হাসনাবানু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলেন রায়হানও চেটে চেটে আচার খাচ্ছে। তিনি একটু শংকিত বোধ করলেন। ছেলে না আবার ওদের উপরে রাগ করে।

তখনই দেখতে পেলেন ছেলে রান্নাঘরে ঢুকছে। 'বুঝলে মা, ভাবছি কটা দিন বেশি থেকে যাব। ওরা তো গ্রামের জীবনের কোনো স্বাদ পাইনি, একটু স্বাদ পেয়ে বড় হোক। যেভাবে আমরা ছোটবেলায় বড় হয়েছিলাম। কালকে তুমি ওদের নিয়ে আমাদের পুকুরে সাঁতার কাটা শেখাবে। ওরা মাছ ধরা দেখবে, তোমার হাতের ঝাল ঝাল রান্না খাবে। ওদের মোবাইল ট্যাব সব এ কদিন বন্ধ। আর শোনো, ঢাকা থেকে আনা ফ্রিজের খাবারগুলো সব লোকজনের মধ্যে তোমার ইচ্ছেমতো ভাগ করে দাও।'

হাসনাবানুর মুখে অকৃত্রিম হাসি ফুটে ওঠে। তিনি এক পেস্নট গরম গরম তেলের পিঠে ছেলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, 'ওদের সাথে নিয়ে বসে খা। আরও দিচ্ছি।'
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে