logo
বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬

  শওকত নূর   ২৫ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

খেলার মাঠে

খেলার মাঠে
এ গাঁয়ে আমি একেবারে নতুন। মাস খানেক হলো এক ধনী বাড়িতে জায়গীর হয়ে এসেছি। কলেজে পড়ি। সকালে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাই, দুপুরে ফিরি। বিকালবেলাটা ঘরের মধ্যে থাকলে হাঁপিয়ে উঠি। চিরকালের অভ্যাসমতো তাই বেরিয়ে পড়ি ঘর থেকে। গাঁটা আমার খুব ভালো লাগে। সারি সারি গাছ, পগার, পুকুর, ছোট্ট খাল, সরু পথ, মসজিদ, মন্দির, স্কুল, মাদ্রাসা, গেরস্থ বাড়ির উঁচু খড়ের পালা, কুমার পাড়ার সারিসারি মাটির পাতিল, কামার শালায় কামারদের হাতুড়ি পেটানো, গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়ার ছুটোছুটি, হাজারো পাখির কলরব- সবই লক্ষ্য করি। হাঁটা না থামিয়ে এসব লক্ষ্য করি। হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি গাঁয়ের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে। এখানে অবারিত ফসলের মাঠ শুরু হওযার আগে এক চিলতে খেলার মাঠ আছে। এ মাঠই আমার বড় আকর্ষণ। মাঠ পেরিয়ে গাঁয়ের মাথায় নেমে থাকা নীল আকাশের হাতছানি বড় মধুর লাগে। বড় মুগ্ধ হই।

মাঠের একেবারে কাছাকাছি আমি কখনো হই না। একটু দূর থেকেই মাঠের দৃশ্যে চোখ নামাই। এমাঠে বড়দের কাউকে কখনো দেখা যায় না। মাঠ ছোট্ট বলেই হয়তো বড় ছেলে-পুলেদের কেউ এখানে আসে না। প্রতিদিন একটাই দল থাকে, তা হচ্ছে ছোট্ট ছেলে-পুলের দল। ফাইভ সিক্সে পড়ে এমন ছেলেপুলের দল। ছোট এক ফুটবল নিয়ে ওরা দৌড়-ছুট দেয়। কখনো বলে লাথি মারে, কখনো বল হাতে ছুড়ে মারে, কখনো বা হেড দেয়। আমি অদূরে দাঁড়ানো মাত্রই ওরা হুট করে খেলা থামায়। আমার দিকে তাকিয়ে কী যেন কানাকানি করে। তারপর কান ফাটানো হো-শব্দে আবারও খেলা শুরু করে। বল নিয়ে তুমুল ছোটাছুটি, কাড়াকাড়ি। ছেলেরা আমাকে দেখে কী কানাকানি করে, এ নিয়ে আমার কোনো কৌতূহল হয় না। তবে আমাকে নিয়ে ওদের নিশ্চয়ই কৌতূহল থাকে। জোর লাথি বা হেডে আমাকে বীরত্ব দেখিয়ে ওরা যেমন আনন্দ পায়, আবার তেমনই লজ্জা পায় হেরে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে। প্রতি ক্ষেত্রেই ওরা দ্রম্নত আমাকে এক নজর দেখে নেয়। আবারও হো শব্দে খেলা শুরু করে। প্রায় দিনই আমি খেলা শেষ হওয়া নাগাদ অপেক্ষা করি। বিজয়ী দলটি তুমুল লাফাতে লাফাতে আমার সামন দিয়ে চলে যায়। হেরে যাওয়া দলটি আমার প্রস্থান অপেক্ষায় কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। আমি শিগগির চলে না গেলে মাথা নিচু করে দ্রম্নত আমাকে অতিক্রম করে যায়। আমি কোনো দিনই ডেকে কোনো দলকে অভিনন্দন বা সান্ত্বনা কোনোটি দিই না। চুপচাপ ওদের আনন্দে আনন্দিত হই ওদের কষ্টে কষ্ট পাই।

খেলায় প্রতিদিন ওরা নতুন নতুনভাবে দুই দলে বিভক্ত হয়। তবে সবে য়ে লম্বা ছেলে দুটি কখনো একদলে খেলে না। ওরা দুজন দুদলকে নেতৃত্ব দেয়। সবচেয়ে ছোট্ট ছেলেটি কোনো দিন এ দলে, কোনো দিন ওদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক মাসের পর্যবেক্ষণে লক্ষ্য করেছি, ও যে দলে পড়ে, সে দলটি অধিকাংশ দিনই হারে। আর খেলা শেষে হারা দলের দলনেতা ছেলেটি ওকে খেলায় হারার জন্য রীতিমতো দায়ী করে বকাঝকা করে এবং পরদিন থেকে ওকে মাঠে আসতে কিংবা এলেও খেলতে মানা করে। ছেলেটি উচ্চবাচ্য না করে মাথা নিচু করে দৌড়ে চলে যায়। প্রতিদিন ভাবী, পরদিন হয়তো ওকে আর মাঠে দেখা যাবে না। কিন্তু ও ঠিকই আসে ও ভর্ৎসনার পর খেলা ধরে। একদিন ফুটবল খেলায় ওর দলটি সর্বোচ্চ গোল খেল। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক খেলায় একটিও গোল না করে দশটি গোল খেল ওর দল। খেলা শেষে সবাই দৌড়ে গেলেও ওর দলের নেতা ছেলেটি গেল না। ও দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, আমার স্যান্ডেল, আমার স্যান্ডেল। দলনেতা ছেলেটি ওর কথার কোনো জবাব না দিয়ে আচমকা ওর গলা টিপে ধরে উপরে জাগিয়ে তুলল। প্রথমে ভেবেছিলাম তামাশা, কিন্তু মুহূর্তেই ভুল ভাঙল। দেখলাম ওকে মাটিতে নামিয়ে ধাক্কা দিয়ে চিৎ করে ফেলা হলো। ছেলেটি উঠে দাঁড়ালেও পাল্টা আঘাতের সাহস পেল না। বড় ছেলেটি হুমকি দিল পরদিন মাঠে এলে ওকে আবারও মারা হবে। ছোট ছেলেটি কেঁদে বলল, আমার আব্বা আছে, আব্বা মারবে, হুম। বড় ছেলেটি বলল, আসিস তোর আব্বাকে নিয়া। তোর আব্বাকেও মারব!

পরদিন আমি যথারীতি মাঠে যাই। সেদিনও ছোট্ট ছেলেটির দলের হার হলো। তবে আজকের দলনেতা হচ্ছে অন্য বড় ছেলেটি। সে ছেলেটি খেলা শেষে ওকে জোরছে একটা ল্যাং মেরে ফেলে দৌড়ে চলে গেল। ছেলেটি উঠে দাঁড়িয়ে কেঁদে বলল, আমার আব্বা আছে, হুম। আব্বা মারবে। কাঁদতে কাঁদতে মাথা নিচু করে চলে গেল ছেলেটি। মনে মনে সন্দিহান হলাম। আগের দিনও ছেলেটি বলেছে ওর আব্বা আছে, ওর আব্বা আসবে, কিংবা মারবে। কিন্তু সে তো আসেনি। ভাবলাম আরেকদিন দেখি। কিন্তু সেদিনও দেখলাম ওর দল হারল এবং ও মার খেলো। কিন্তু ওর আব্বা নেই। এবারে আমি ভাবলাম ছেলেটির সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু আমি ওর পিছু নিতেই কী ভেবে ও ছুট দিল। কিছুদূর গিয়ে থামল ও ধীরে হাঁটতে লাগল। আমি অন্যদিকে তাকানোর ভান করে ওর গন্তব্যটা দেখে নিলাম। সন্ধ্যার আবছায়ায় একটা জরাজীর্ণ কুটিরে ও অদৃশ্য হলো। সেদিনের মতো আমি জায়গীর বাড়ি চলে যাই।

পরদিন দুপুরবেলা কলেজ থেকে ফেরার পথে আমি ওই কুটিরে হাজির হই। আমাকে উঠানে পা ফেলতে দেখেই উঠান থেকে দৌড়ে ঘরে চলে যায় ওই ছেলেটি। দেখলাম উঠানে বসে টাকুরে রশি পাক দিচ্ছেন বুড়ো মতো এক লোক। আমি জানালাম আমি ছেলেটির বাবার সঙ্গে কথা বলতে চাই। লোকটি ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকালেন। বললাম, দয়া করে ওর বাবাকে একটু ডাকুন।

সে তো এখানে নেই। বৃদ্ধ লোকটি চাপাস্বরে বললেন।

একটু প্রয়োজন ছিল তাকে। আমি বিড়বিড় করলাম।

কেন কী হয়েছে? কেন খুঁজছেন তাকে?

আপনাদের এ বাড়ির ছেলেটি রোজ রোজ খেলার মাঠে গিয়ে মার খায়। কেঁদে বলে ওর বাবা পরদিন মাঠে যাবে, কিন্তু কেউই মাঠে যায় না। এভাবে চলতে থাকলে ----।

কিন্তু ওর বাবা তো এখানে থাকে না।

আপনি ওর কে?

দাদা।

ওর বাবা কোথায় থাকেন?

মৌলভীবাজার, চা বাগানে কাজ করে। দুই মাস পর পর আসে।

কিন্তু ও যে ওভাবে বলে? প্রতিদিনই বলে, পরদিন ওর বাবা মাঠে যাবেন।

ছোট্ট মানুষ, শক্তিতে পারে না; তাই বাবার ভয় দেখায়। ওর বাবা কোথায় থাকে সেটা তো বিষয় নয়। ও যা বলে সান্ত্বনা পায়, তাই বলে।

কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে ------------।

ঠিক আছে কাল থেকে আমি দেখব। ওই ছেলেগুলোকেও ভালোমতো বোঝাবো।

পরদিন যথাসময়ে মাঠে গিয়ে দেখি যথারীতি খেলা চলছে। ছোট্ট ছেলেটিও এক দলে খেলছে। আর ওর দাদা মাঠের বাইরেই বসে টাকুরে রশি পাকের ফাঁকে থেকে থেকে মাঠে দৃষ্টি ছুড়ছেন।

সেদিনের মতো আমি দূর থেকেই নীরবে প্রস্থান করি। এরপর মাঝেমধ্যে মাঠে ঢুঁ' দিলেও বেশিক্ষণ থাকিনি। আর দূর থেকেই নীরবে প্রস্থান করেছি। যে সব দিন বিকালে মাঠে না গিয়ে অন্যত্র ঘুরে বেরিয়েছি, সেসব দিনও মনের ভেতর ভেসে উঠেছে সেই খেলার মাঠ। মনে মনে এই ভেবে আশ্বস্ত হয়েছি, বৃদ্ধ লোকটি নিশ্চয়ই এখন তার প্রিয় নাতিটির দেখভালে আছেন ওই খেলার মাঠে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে