logo
বৃহস্পতিবার ১৮ জুলাই, ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

  য় সুস্বাস্থ্য ডেস্ক   ১৫ মে ২০১৯, ০০:০০  

কিডনি ও মূত্রনালির সংক্রমণ

কিডনি ও মূত্রনালির সংক্রমণ
কিডনি মানবদেহের একটি অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গ। যা মানবদেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিডনির ভেতরে নেফ্রন নামক প্রায় ১০ লাখ ছাঁকনি থাকে। কোনো কারণে কিডনির স্বাভাবিক কাজের ব্যাঘাত ঘটলেই মানবদেহে শুরু হয় ছন্দপতন। কিডনির রোগের মধ্যে রয়েছে- জন্মগত ত্রম্নটি, হঠাৎ বা ধীরে ধীরে বিকল হয়ে যাওয়া, পাথর এবং প্রস্রাবের সংক্রমণ ইত্যাদি।

কোনোভাবে কোনো জীবাণু যদি মূত্রতন্ত্রে প্রবেশ করে সংক্রমণ সৃষ্টি করে, তাহলে সেই অবস্থাকে বলা হয় মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণ বা সংক্ষেপে ইউটিআই (টৎরহধৎু :ৎধপঃ ওহভবপঃরড়হ)। এটি একটি বিব্রতকর স্বাস্থ্য সমস্যা।

কিডনির কাজ : মানবদেহের পিঠের নিচের অংশে মেরুদন্ডের দুই পাশে দু'টি কিডনির অবস্থান। মানবদেহে কিডনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে। দেহের বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশন করে এবং বাড়তি তরল পদার্থ নিঃসরণ করে।

ষ দেহের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

ষ দেহের প্রয়োজনীয় লবণের সমতা ঠিক রাখে।

ষ দেহে এসিড ও ক্ষারের সমতা বজায় রাখে।

ষ এক ধরনের হরমোন তৈরির মাধ্যমে অস্থিমজ্জাকে প্রভাবিত করে শরীরে রক্ত তৈরি করে।

ষ দেহের হাড়গুলোকে সরল ও মজবুত রাখতে সাহায্য করে।

মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণ : কিডনি, মূত্রথলি, মূত্রনালি এবং ইউরেটার- এ চারটি অংশ নিয়ে মূত্রতন্ত্র গঠিত। মূত্রতন্ত্রের যে কোনো অংশ জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হলে তাকে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা ইউটিআই বলে। ইউরেথ্রাইটিস, সিস্টাইটিস, পায়েলোনেফ্রাইটিস প্রভৃতি প্রস্রাবের সংক্রমণের বিভিন্ন নাম, ই. কলাই নামক জীবাণু শতকরা ৭০ শতাংশ প্রস্রাবের সংক্রমণের কারণ। এ ছাড়া অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন প্রস্রাবের নালিতে নল থাকলে ইউটিআই হতে পারে।

মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণের প্রকার : অবস্থান অনুযায়ী মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণ তিন প্রকারের হয়ে থাকে।

ষ উপসর্গবিহীন বা অ্যাসিম্পটোমেটিক সংক্রমণ।

ষ নিম্ন মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণ। যা শুধু মূত্রথলি বা বস্নাডার এবং মূত্রনালি বা ইউরেথ্রা আক্রান্ত হয়।

ষ উপর মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণ বা পায়েলোনেফ্রাইটিস। যা কিডনি নিজেই আক্রান্ত হয়।

জীবাণু কিভাবে মূত্রতন্ত্রে প্রবেশ করে

মূত্রনালি থেকে প্রস্রাবের থলি, সেখান থেকে ইউরেটরের মাধ্যমে জীবাণু কিডনি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ই. কলাই জীবাণুর শতকরা ৯৫ শতাংশ খাদ্যনালি বা বৃহদন্ত্রে বসবাস করে। মলত্যাগের সময় যদি কোনোভাবে এ জীবাণু প্রস্রাবের নালির সংস্পর্শে আসে, তখন এ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়। ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা বেশি আক্রান্ত হয়।

কারণ : মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণের কারণ বহুবিধ। কারণগুলো নিম্নরূপ :

ষ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া (প্রায় ৯০ ভাগ) এবং কিছু ক্ষেত্রে যা ছত্রাক বা পরজীবী দ্বারা আক্রান্ত হয়।

ষ অ্যালার্জিজনিত কারণেও হতে পারে।

ষ মূত্রতন্ত্রে সংক্রমণ মেয়েদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। কারণ মেয়েদের মূত্রনালির দৈর্ঘ্য ছোট। যেখানে ছেলেদের দৈর্ঘ্য ৮ ইঞ্চি, সেখানে মেয়েদের দৈর্ঘ্য মাত্র ১.৫ ইঞ্চি।

ষ মেয়েদের মূত্রদ্বার এবং যোনিপথ খুব কাছাকাছি, ঋতুস্রাবের সময় অনেকে নোংরা কাপড় ব্যবহার করে, ফলে সহজেই জীবাণু যোনিপথে এবং পরে মূত্রনালিকে সংক্রমিত করে।

ষ মেয়েদের প্রস্রাব আটকে রাখার প্রবণতা বেশি। ফলে সহজেই সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

ষ যারা পানি কম পান করে।

ষ ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগী।

ষ ষাটোর্ধ্ব বয়স, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম।

লক্ষণ : ইউটিআইর বেশ কিছু লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। তবে সংক্রমণের উপসর্গ আক্রমণের স্থানভেদ ভিন্নতর। যেমন :

ষ প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া ও ঘনঘন প্রস্রাব।

ষ প্রস্ররাবের সময় ব্যথা অনুভব হওয়া।

ষ প্রস্রাবের বেগ বেশি অথচ কম প্রস্রাব ত্যাগ।

ষ প্রস্রাবের পরও প্রস্রাব করার ইচ্ছা।

ষ তলপেটে ব্যথা এবং ভার ভার বোধ।

ষ ঘন ফেনার মতো দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব ত্যাগ।

ষ প্রস্ররাবের রং ঝাপসা বা লালচে।

ষ ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাব ত্যাগ, অনেক সময় রক্ত যাওয়া।

ষ দুর্বলতা, খাবারে অরুচিভাব।

ষ বারবার জ্বর হওয়া।

ষ শিশু বিছানায় প্রস্রাব ত্যাগ এবং যথাযথ না বেড়ে ওঠা।

ষ পেটের রোগ (যেমন : অজীর্ণ, ডায়রিয়া ইত্যাদি)

জটিলতা : ইউটিআইর বিরক্তিকর দিক হলো পুনরাগমন বা বারবার সংক্রমণ। ইউটিআই আক্রান্ত মহিলা একবার আক্রান্ত হওয়ার পর প্রতিবার পাওয়ার পর বারবার হতে পারে। যখন বারবার একই জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন পুনরাগমন রিকারেন্সকে রিলাপ্স বলে।

ষ সংক্রমণ রক্তে প্রবেশ চার সেপসিস এবং ক্ষেত্র বিশেষে জীবণসংহারী সেপটিসিমিয়া হতে পারে। এ অবস্থা অত্যন্ত মারাত্মক। যা সঠিক চিকিৎসা না করালে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটতে পারে।

ঝুঁকিপূর্ণ কারণ : মহিলাদের ক্ষেত্রে : যৌন সম্পর্কের সময় জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া মূত্রথলিতে চলে যায়। ফলে যৌন সম্পর্কে মূত্রথলির সংক্রমণ একটা বড় কারণ।

ষ যেসব নারী বিভিন্ন স্পার্মিসাইড, কৃত্রিম ডায়াফ্রাম ব্যবহার করেন, তাদের ঝুঁকি আরো বেশি।

ষ গর্ভধারণকালে ইউরেটর মোটা হয়, ফলে আবার গর্ভাবস্থায় ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন প্রস্রাব দিয়ে বেশি নির্গত হবে, ফলে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে সংক্রমণ হয়।

ষ ঋতুকালে যারা অস্বাস্থ্যকর কাপড় ব্যবহার করেন তাদের সংক্রমণের হার বেশি।

ষ ঋতুবন্ধ হওয়ার পরও মেয়েদের মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণ হওয়ার হারও বেশি।

পুরুষের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা : রোগ নির্ণয়ের জন্য নিম্নোক্ত পরীক্ষাগুলো করা যেতে পারে।

ষ প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা, প্রস্রাবের কালচার।

ষ রক্তের সেরাম ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা।

ষ তলপেটের আন্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা।

ষ মূত্রনালির রস পরীক্ষা।

ষ সিস্টোস্কপি।

চিকিৎসা : ইউটিআই আসলে খুব সাধারণ রোগ। সময়মতো যদি চিকিৎসা না করা হয় তবে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। চিকিৎসকরা উপযুক্ত রোগের উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দিলে এ রোগ থেকে সহজেই পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। এ সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং প্রচুর পানি বা তরল পান করতে হবে।

প্রস্রাবের বেগ আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রস্রাব করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ক্র্যানবেরি জুস খাওয়া যেতে পারে।

প্রতিরোধ : প্রস্রাব আটকে না রাখা। যখনই বেগ আসে তখনই প্রস্রাব করা।

ষ ক্র্যানবেরি জুস খেলে মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণ কমে যায়, তা খাওয়ার অভ্যাস করা।

ষ কোষ্ঠকাঠিন্য যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

ষ বাথরুম ব্যবহারের পর টয়লেট টিসু্য পেছন হতে সামনের দিকে না এনে, সামনে হতে পেছনের দিকে ব্যবহার করতে হবে। যাতে করে মলদ্বারের জীবাণু মূত্রপথে এসে সংক্রমণ না করতে পারে।

ষ মূত্রত্যাগের পর যথেষ্ট পানি ব্যবহার করতে হবে।

ষ শারীরিকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে।

ষ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে।

ষ যৌন সহবাসের পূর্বে প্রস্রাব ত্যাগ করতে হবে। এতে মূত্রনালিতে আসা সব জীবাণু পরিষ্কার হয়।

ষ মেয়েরা স্যানিটারি প্যাড ঘন ঘন বদলিয়ে নেবেন।

ষ মেয়েদের ডিওডারেন্ট ব্যবহার না করাই উত্তম। এগুলো ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে।

ষ মুসলমানি বা সারকামসিশন করানো হলে সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

ষ খুব আঁটসাঁট অন্তর্বাস না পরা। সুতি কাপড় আর্দ্রতা শুষে নেয়। তাই সুতি অন্তর্বাস পরিধান করা উত্তম।

সতর্কতা : প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া বা ব্যথা করা মানেই সংক্রমণ নয়। অন্য কোনো কারণেও এটা হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অযথা ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে