logo
বৃহস্পতিবার ২০ জুন, ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৬

  ফাহিমা রিপা   ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০  

পূণর্তা

পূণর্তা
রিত্তিকা নামটা যেমন সুন্দর, মেয়েটাও সুন্দরী। মায়াবতী কাজলকালো চোখগুলোর দিকে যে কোনো মানুষ একবার তাকালে দ্বিতীয়বার তাকাতে বাধ্য। চোখের লম্বা পাপড়িগুলো সৌন্দযর্ আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মাথার লম্বা চুল রূপকথার রাপুঞ্জেলের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তিন ভাইয়ের পর রিত্তিকার জন্ম। রিত্তিকাকে জন্ম দিতে গিয়ে তার মা ভারতী দাসের মৃত্যু হয়। বাবা দিনমজুরের কাজ করে।

প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে অসম্পূণর্তা রয়েছে। কেউই সবদিক থেকে সম্পূণর্ নয়। এ কথাটাই রিত্তিকার মাধ্যমে সৃষ্টিকতার্ আরেকবার প্রমাণ করে দিয়েছেন। রিত্তিকা জন্ম থেকেই কানেও শুনতে পায় না, কথাও বলতে পারে না। জুতো সেলাই থেকে চÐীপাঠ সব কাজেই পটু। পরিবারে সবার জন্য রান্নাবান্না, ঘর ঝাড় দেওয়া, কাপড়কাচা সব একা হাতেই করে। তারপরও বউদীদের দুই চোখের বিষ রিত্তিকা। দিনরাত রিত্তিকাকে গালমন্দ করে। রিত্তিকাকে যাতে এসব বিষাক্ত কথা হজম করতে না হয়, তাই হয়ত সৃষ্টিকতার্ তাকে শ্রবণশক্তি দেয়নি।

কিন্তু তার বউদীরা যখন তাকে গালমন্দ করে তখন তাদের মুখের ভাবভঙ্গি দেখে আন্দাজ করতে পারে। তারপরও হাসিমুখে সব কাজ করে। মায়ের কথা মনে পড়লে মায়ের নামে পূজা দেয় আর ঠাকুরের সামনে বসে নীরবে চোখের জল ফেলে।

একদিন রিত্তিকা বন্ধুদের সাথে নদী থেকে জল নিয়ে ফেরার সময় এক বড়লোক পরিবারের ছেলে তাকে দেখে। ছেলেটির নাম ঋজু। রিত্তিকাকে প্রথম দেখায় ঋজুর ভালো লেগে যায়। এদিকে ঋজুর পরিবারও তার জন্য পাত্রী খুঁজতে থাকে। ঋজু শহরে পড়ালেখা করেছে। মাস্টাসর্ পাস করেছে সে। ঋজু রিত্তিকাকে দেখে ভাবতে থাকে এই মেয়েটিই হবে তার উপযুক্ত জীবনসঙ্গিনী। সে তার পরিবারকে রিত্তিকার ব্যাপারে জানায় এবং আরও বলে বিয়ে করলে সে একমাত্র রিত্তিকাকেই করবে।

ঋজুর পরিবার খুঁজতে খুঁজতে রিত্তিকার বাড়িতে এসে পৌঁছায়। রিত্তিকাকে এক ঝলক দেখে তাদেরও ভালো লাগে। এত বড় বাড়ি থেকে রিত্তিকার বিয়ের প্রস্তাব এসেছে দেখে রিত্তিকার বাবা বিশ্বাসই করতে পারে না যে, এটা বাস্তব নাকি কল্পনা। আনন্দে তার চোখে জল চলে আসে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা ভয়ও তার আনন্দকে ছাপিয়ে নিজে জায়গা দখল করে নিতে চাচ্ছে। রিত্তিকা যে কথা বলতে পারে না। কোনো পরিবার কি মেনে নিবে তার বাড়ির বৌ বাকপ্রতিবন্ধী হোক! এসব কথা ভাবতে ভাবতে তার বুকে চিনচিন করে ব্যথা করতে থাকে। আবার ছেলে মাস্টাসর্ পাস, অথচ রিত্তিকা ক্লাস নাইন পযর্ন্ত পড়ে আর পড়তে পারেনি। অভাবের সংসারে তাকে ক্লাস নাইন পযর্ন্ত পড়তেই অনেক বেগ পেতে হয়েছে।

এদিকে রিত্তিকার বৌদীরা তো মহাখুশি। রিত্তিকার বড়লোক পরিবারে বিয়ে হচ্ছে সেই সঙ্গে তাদের ভাগ্যের চাকাও ঘুরছে। রিত্তিকার মাধ্যমে ওই বাড়ি থেকে গহনা, টাকাপয়সা আদায় করতে পারবে। তাদের ঘাড় থেকে বোঝা নামবে। তাই তারা বিয়ের প্রস্তাব আসার পর থেকেই রিত্তিকার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছে, যতœ নিচ্ছে। রিত্তিকার মন জয় করার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। এদিকে বিয়ের তারিখ পাকা হয়। বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসতে থাকে। এতদিনেও ঋজু ও তার পরিবার জানতে পারেনি যে রিত্তিকা কথা বলতে পারে না। যতবারই তারা রিত্তিকার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে ততবারই বৌদিরা ছলচাতুরী করে ব্যাপারটা এড়িয়ে গিয়েছে। এ জন্য রিত্তিকা ও তার বাবার মনের ভয়টা ধীরে ধীরে গাঢ় হতে থাকে।

বিয়ের দিন যখন পুরোহিত রিত্তিকা ও ঋজুকে মন্ত্র পড়তে বলে তখন রিত্তিকা ছলছল চোখে পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে থাকে। রিত্তিকার বাবার মনে ভয় হতে থাকে এই বুঝি তার মেয়ের বিয়ে ভেঙে গেল, এই বুঝি তার মেয়ে লগ্নভ্রষ্টা হলো। একবার লগ্নভ্রষ্টা হলে যে তার মেয়েকে কেউ আর বিয়ে করবে না। সমাজ তার অসহায় মেয়েটাকে বিতাড়িত করবে।

রিত্তিকার কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। তার মনে হতে থাকে সে ঋজুকে ঠকাচ্ছে। রিত্তিকা মÐপ থেকে উঠে চলে যেতে চাইলে ঋজু তাকে আটকায় এবং হাতের ইশারায় বুঝিয়ে বলে,

‘আমি জানি আপনি কথা বলতে পারেন না। এই কথাটা আপনার পরিবার লুকিয়েছে। এটাই স্বাভাবিক। আপনার পরিবারের জায়গায় অন্য কারো পরিবার হলেও একই কাজ করত।’

রিত্তিকা জানতে চায়, ‘আপনি জানলেন কীভাবে?’

আপনাকে কোনো প্রশ্ন করলে আপনার বৌদীরা বারবার আপনাকে থামিয়ে দিচ্ছিল, এড়িয়ে যাচ্ছিল তখন আমার মায়ের সন্দেহ হয়... আমার মা আপনার প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারে এই কথা।

‘তারপরও আমাকে বিয়ে করছেন কেন?’

এই সময় ঋজুর বাবা পাশ থেকে এসে ইশারায় রিত্তিকাকে বলে,

‘দেখ মা, এই পৃথিবীতে কোনো মানুষই স্বয়ংসম্পূণর্ না। আমাদের সবারই কোনো কোনো দুবর্লতা আছে, অপূণর্তা আছে...’

রিত্তিকা অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কি নিয়ে অহঙ্কার করব? আমরা কথা বলতে পারি আর তুমি কথা বলতে পারো না এটা নিয়ে! তুমি তো সব কাজে পারদশীর্ কিন্তু সবাই তো তোমার মতো সব কাজে পারদশীর্ না। এটাও তো তাদের একটা অপূণর্তা।’

ঋজু এবার বলে, ‘শুনলেন তো বাবার কথা? আমার পরিবার কেমন এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন।’

ঋজু তোমাকে ভালোবাসে। আর আমরা আমাদের ছেলেকে এমন শিক্ষা দিইনি যে, মানুষের দুবর্লতাকে হেও করবে... ঋজুর ছোট ভাই হঁাটতে পারে না। আমরা তোমাকে উপহাস করলে আমাদের ছেলেকেও কেউ না কেউ উপহাস করবে।

এসব কথা শুনে বিয়েতে উপস্থিত যারা রিত্তিকাকে নিয়ে উপহাস করত, তারা লজ্জিত বোধ করতে থাকে। ঋজুর বাবার কথাগুলো ভেবে রিত্তিকা কিছু সময় নেয় ও বিয়ে করতে রাজি হয়। এদিকে রিত্তিকার বৌদীরা বুঝতে পারে রিত্তিকার মাধ্যমে ঐ বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা, গহনা আদায় করতে পারবে না। এতে করে তারা আফসোস করে কপাল চাপড়াতে থাকে।

বিয়ের পর ঋজু রিত্তিকাকে উচ্চ শিক্ষিত করার জন্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং সেই সাথে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। ঋজু তাকে আরও যোগ্য করে তুলতে থাকে। এসব পদক্ষেপ যেন রিত্তিকার অপূণর্তাকে ঢেকে পূণর্তা দিতে থাকে।

সদস্য

জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে