logo
বৃহস্পতিবার ২৩ মে, ২০১৯, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

  নিলয় তানজিম   ১৪ মে ২০১৯, ০০:০০  

মুঘল শাসনামলে বাংলার ভূমি ব্যবস্থাপনা

শেরশাহের সর্বাপেক্ষা গৌরবময় কৃতিত্ব ছিল ভূমি রাজস্বব্যবস্থার সংস্কার সাধন। মধ্যযুগের কোনো শাসকই শেরশাহের মতো প্রজার জন্য নিরাপত্তা বিধানের জন্য ব্যাপক ভূমিকা পালন করেননি। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের প্রতি শেরশাহের কড়া আদেশ ছিল যে তারা যেন প্রজাদের সঙ্গে সর্বোচ্চ সদয় আচরণ করে। কোনো সৈনিক বা রাজ কর্মকর্তা কখনো কোনো প্রজাপীড়ন করলে ওই সৈনিক বা কর্মকর্তাদের জন্য ছিল কঠোর শাস্তির বিধান।

মুঘল শাসনামলে বাংলার ভূমি ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশে শের শাহের আমলে জরিপপ্রথা অঞ্চল বিশেষে প্রবর্তিত হয়েছিল বলে জানা যায়। ১৫৪০ সালে শেরশাহ বাংলার শাসনকার্য শুরু করেন। সম্রাট শেরশাহের শাসনামলে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা সংস্কার ও যুগোপযোগী করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ সময় যারা বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে বনভূমিকে চাষের উপযোগী করে গড়ে তুলতেন তাদের প্রজা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার লক্ষ্যে পাট্টা ও কবুলিয়াত পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়।

পাট্টা হলো কোনো ব্যক্তির জমি ভোগ দখলের অধিকার পত্র। পাট্টার শর্তগুলো মেনে নিয়ে প্রজা যেই সম্মতিপত্র দিতেন তাই কবুলিয়াত। চাষিরা জমির মালিকানা ও দখল প্রমাণের সুযোগ পায়। এই আমলে জমি জরিপের জন্য কানুনগো নিয়োগ দেয়া হয়।

শেরশাহ উৎপাদিত ফসলের এক-চতুর্থাংশ খাজনা নির্ধারণ করেছিলেন। তবে মনে করা হয় এই খাজনার হার উৎপাদিত ফসলের এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-চতুর্থাংশের মধ্যে ছিল। প্রত্যেক কৃষক তার প্রদানকৃত মূল রাজস্বের ২.৫ শতাংশ শস্য সঞ্চয় আকারে রাষ্ট্রের ধর্মগোলায় জমা দিত। ওই খাদ্যশস্য দুর্ভিক্ষ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জন সাধারণের মধ্যে সস্তা দরে বিতরণ করা হতো।

শেরশাহের সর্বাপেক্ষা গৌরবময় কৃতিত্ব ছিল ভূমি রাজস্বব্যবস্থার সংস্কার সাধন। মধ্যযুগের কোনো শাসকই শেরশাহের মতো প্রজার জন্য নিরাপত্তা বিধানের জন্য ব্যাপক ভূমিকা পালন করেননি। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের প্রতি শেরশাহের কড়া আদেশ ছিল যে তারা যেন প্রজাদের সঙ্গে সর্বোচ্চ সদয় আচরণ করে। কোনো সৈনিক বা রাজ কর্মকর্তা কখনো কোনো প্রজাপীড়ন করলে ওই সৈনিক বা কর্মকর্তাদের জন্য ছিল কঠোর শাস্তির বিধান। সৈন্য পরিচালনার সময় বা অন্য কোনো কারণে প্রজার ক্ষেতের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি কৃষকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করতেন। যার দৃষ্টান্ত আমরা হযরত ওমর ফারুকের (রা.) শাসনামলেও পাই।

মুসলিম শাসক শেরশাহ কর্তৃক প্রবর্তিত ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রজা ও রাষ্ট্র উভয়ই উপকৃত হয়। পাট্টা ও কবুলিয়াত প্রথা ভূমিতে রাজা ও প্রজার স্বত্ব নির্ধারণ করে। রাজস্বের হার ফসলের উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল ছিল তাই কৃষকদের জন্য এই পন্থা অধিকতর সুবিধাজনক ছিল। আবার স্থানীয় বাজারমূল্যের ওপর ভিত্তি করে রাজস্বের পরিমাণ নির্ধারিত হতো। বস্তুত শেরশাহের ভূমি প্রশাসন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেই সম্রাট আকবরের জগৎখ্যাত রাজস্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।

পূর্ববর্তী সময়ের মতো মুঘল আমলেই ভূমি রাজস্ব বা খারাকজ ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ের প্রধান উৎস। সম্রাট আকবর সিংহাসনে আরোহণের পর ভূমিকে তিনটি ভাগে ভাগ করেন:

১) খালসা অর্থাৎ এই প্রকারের জমি ছিল খাস জমি। যার ওপর সরকারি মালিকানা ঘোষণা করা হয়েছিল। রাষ্ট্র কর্তৃক বিজিত এলাকার জমি বা রাষ্ট্রের আওতাধীন এলাকার মালিকানাহীন জমি ছিল খাস জমি।

২) জাগীর। এই শ্রেণির ভূমি সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক কর্মকর্তাদের বেতন প্রদানের বিনিময়ে দান করা হতো।

৩) সায়ুরগাল। এই প্রকারের জমি ব্যবহার করা হতো ধর্মীয় উদ্দেশ্যে। যেমন- মাদরাসা, মক্তব, আলিম ব্যক্তিত্ব বা ফকির দরবেশদের আস্তানা বা খানকা পরিচালনার উদ্দেশ্যে।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখে তিনি মুজাফফার খান তুরবাতিকে ভূমি সংস্কারের নির্দেশ দেন এবং রাজা টোডারমালকে নিয়ে নতুনভাবে কর ধার্য করেন। টোডারমাল সতর্কতার সঙ্গে দশ বছর (১৫৭০/৭১ থেকে ১৫৭৯/৮০ খ্রি.) প্রদত্ত রাজস্বের গত হিসাব ধরে এবং আবাদি জমি জরিপ করে বাৎসরিক প্রদেয় ভূমি রাজস্ব স্থির করেন। এই বন্দোবস্তকে টোডারমাল বন্দোবস্ত বলা হয়ে থাকে। এই বন্দোবস্তের ফলে ১৫৮০ সালে বিখ্যাত দশ সালা আইন ( আইন-ই-দেহ সালাহ) কার্যকর করা হয়।

আইন-ই-দেহ সালাহ বিশেষত্বঃ

(ক) শনের ফিতার পরিবর্তে বাঁশের তৈরি লোহার আংটাযুক্ত যন্ত্র দিয়ে আবাদি ভূমি সুষ্ঠুভাবে জরিপ করান। (খ) উৎপাদন শক্তি ও আবাদ যোগ্যতা অনুসারে তিনি ভূমিকে চার শ্রেণিতে বিভক্ত করেন। যেমন- ১) পোলাজ (প্রতি বছর আবাদযোগ্য), ২) পারউডি (মাঝে মাঝে পতিত জমি আকারে ফেলে রাখতে হয়), ৩) চাচার (৩/৪ বছর পর পর চাষ করতে হয় এমন জমি), ৪) বনজর ( ৫ বছর বা তার অধিককাল অনাবাদি জমি), (গ) শস্য উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ রাজস্ব ধার্য করা হয়। (ঘ) মূল্যমান ভিত্তিতে সমগ্র সাম্রাজ্যকে কতগুলো পরগণায় ভাগ করা হয় এবং দশ বছরের ফসলের ভিত্তিতে গড় নির্ণয় করে বাজারমূল্য স্থির করা হয়। (ঙ) শেরশাহের মতো সম্রাট আকবর রায়তওয়ারি প্রথা প্রবর্তন করেন এবং শেরশাহের আমলের পাট্টা- কবুলিয়াত বজায় থাকে।

লেখক : নিলয় তানজিম, শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে