logo
মঙ্গলবার ১৬ জুলাই, ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬

  অনলাইন ডেস্ক    ২৫ জুন ২০১৯, ০০:০০  

অপরাধ এবং শাস্তি সম্পর্কে অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি

আইনের অপূর্ণতা, যথাযথ প্রয়োগের অভাব, দুর্বল ও জটিল বিচার প্রক্রিয়া এবং অপরাধীর কার্যকর সাজার অভাবে নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতা বেড়ে চলছে। আইন ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধ এবং শাস্তির ব্যাপারে আন্তঃশাস্ত্রীয় পর্যালোচনা করেছেন মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম...

অপরাধ এবং শাস্তি সম্পর্কে অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
মানুষের সমষ্টি নিয়ে সমাজ, মানুষ সমাজ গড়ে, শাসন করে, সভ্যতা রচনা করে এবং মানুষই সমাজ ধ্বংস করার বড় কারণ। একদিকে সুন্দর পরিবেশ যেমন মানুষ দ্বারা গঠিত হয় আবার সেই সাজানো সুন্দর পরিপাটি সমাজ মানুষের জঘন্য কাজের মাধ্যমে নষ্ট হয়। সমাজ ও মানুষের নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনার জন্য আইনের আবশ্যকতা, তাই সমাজ বা রাষ্ট্রে আইন প্রণয়ন হয়। আইন তৈরির অনেক উদ্দেশ্যের মধ্যে অন্যতম হলো মানুষকে নিয়মের মধ্যে রেখে সবার অধিকার সমুন্নত করার মাধ্যমে আইন ও অর্থনীতি হলো অর্থনীতির পরীক্ষামূলক পদ্ধতির মাধ্যমে আইন অধ্যয়ন করা। এ আন্তঃশাস্ত্রীয় অধ্যয়ন অর্থনৈতিক সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করা।

বর্তমান সময়ে আন্তঃশাস্ত্রীয় গবেষণার মধ্যে আইন ও অর্থনীতি সবচেয়ে প্রথম সারির। এটাকে আবার আইনের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণও বলা হয়ে থাকে। সূত্র এবং নীতির মাধ্যমে আইনের পর্যালোচনা করে থাকে মানুষের সহজাত আচরণের আলোকে। আমেরিকায় এর উৎপত্তি হলেও বর্তমানে ইউরোপ, চায়না, জাপান, ভারতসহ প্রায় সর্বত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে উচ্চতর অধ্যয়নের সুযোগ রয়েছে।

যদিও বাংলাদেশে তার আলোচনা খুবই সামান্য এবং আইনের ছাত্র বা আইনজীবীদের কাছে তা অনেকটাই নতুন। আইন ও অর্থনীতিমূলত অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে আইনের কার্যকারিতা পর্যালোচনা করে থাকে। এ ক্ষেত্রে মূলত তিন ধরনের পর্যালোচনা পদ্ধতি রয়েছে, এক. চড়ংরঃরাব ধহধষুংরং- যার উদ্দেশ্য হলো আইন কি, আইনের প্রভাব মানুষের ওপর কেমন, এবং আইনের প্রতি মানুষের আচরণ কি তা পর্যালোচনা করা। এ পর্যালোচনার মূল বক্তব্য হলো আইন সমাজে কার্যকরী। দুই. ঘড়ৎসধঃরাব ধহধষুংরং- যার প্রধান বক্তব্য, বর্তমান আইন ত্রম্নটিযুক্ত তাই ভবিষ্যৎ আইন হতে হবে কার্যকরী। এটি পরীক্ষামূলক গবেষণার মাধ্যমে কার্যকর আইনের সাজেশন দিয়ে থাকে। এ দুই ধরনের গবেষণা হয়ে থাকে মূলত অর্থনৈতিক মূলনীতি ঞযবড়ৎু ড়ভ ৎধঃরড়হধষ পযড়রপব-এর ভিত্তিতে। তিন. ঋঁহপঃরড়হধষ ধহধষুংরং-এটি মূলত রাজনৈতিক ব্যক্তি, দল, আমলা এবং বিচারিক প্রতিষ্ঠানের আচরণ পর্যালোচনা করে। এটি হয়ে থাকে ঞযবড়ৎু ড়ভ ঢ়ঁনষরপ পযড়রপব-এর ভিত্তিতে।

আইন ও অর্থনীতির বড় পর্যালোচনা হয়ে থাকে অর্থনৈতিক মূলনীতি চৎরহপরঢ়ষব ড়ভ ৎধঃরড়হধষ পযড়রপব বা ঞযবড়ৎু ড়ভ ৎধঃরড়হধষ পযড়রপব-এর ভিত্তিতে। এ মূলনীতি অপরাধ কার্যক্রম এবং যৌন আচরণের পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ও ব্যবহার হয়ে থাকে। অর্থনৈতিকবিদদের কাছে এ মূলনীতির আসল বক্তব্য হলো মানুষ হলো যৌক্তিক অথবা স্বার্থবাদী। সে নিজের জন্য যা ভালো তাই পছন্দ করে থাকে তার সীমিত সাধ্যের মধ্যে। যদিও পরবর্তীতে অন্য মতবাদের জন্ম হয় যার মাধ্যমে এর প্রবক্তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে মানুষ সবসময় যৌক্তিক আচরণ করে থাকে না, যেমন- ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক জেনেও মানুষ তা করে থাকে।

সব ধর্মেই অপরাধ নির্ধারণ করে তা থেকে বাঁচার জন্য সতর্ক করা হয়েছে এবং অপরাধ করলে তার শাস্তি বর্ণনা করা হয়েছে। সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থাও নাগরিকদের জন্য অপরাধ নির্ধারণ করে তা থেকে বিরত থাকার জন্য আইনের মাধ্যমে শাস্তি নির্ধারণ করে দিয়েছে। অপরাধীকে অপরাধের শাস্তি প্রদানের কারণ হলো অন্যের অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান এবং ভবিষ্যৎ অপরাধ থেকে বিরত রাখার মাধ্যমে সমাজকে সুন্দর রাখা।

আইন বিজ্ঞানে শাস্তির অনেক তত্ত্ব আছে। রাষ্ট্রে আইন প্রণয়ন, বাতিল কিংবা সংশোধনে নাগরিকদের আচরণ বড় ভূমিকা রাখে কারণ আইনের মাধ্যমে মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অর্থনীতি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রদান করে অনুমান করে থাকে মানুষের আচরণে আইন এবং শাস্তির প্রভাব।

অর্থনৈতিক সূত্রে আইন এবং শাস্তি 'মূল্য' তৈরি করে থাকে, মানুষ তাতে সাড়া দেয় এবং আচরণে পরিবর্তন আসে। যেমন- কোন আইনে যে শাস্তি দেয়া আছে তাতে যদি অপরাধ না কমে তাহলে বোঝা যাচ্ছে মানুষের আচরণের পরিবর্তন হয়নি তখন আইনে শাস্তির বিধান বাড়ানো হয়। উলেস্নখযোগ্য উদাহরণ হলো, সড়ক নিরাপত্তা আইন যেখানে সাজা বাড়ানো হয়েছে, দ্রম্নত বিচার ট্রাইবু্যনালের আওতায় শাস্তি বাড়ানো হয়েছে।

চাহিদা বিধির মূল বক্তব্য হলো বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলে চাহিদা কমে, এ ক্ষেত্রে কোনো ক্রেতা পণ্য কম ক্রয় করে অথবা কেউ ক্রয় থেকে বিরত থাকে। অন্যদিকে পণ্যের দাম কমলে ক্রয়ের চাহিদা বাড়ে। একইভাবে আইন ও অর্থনীতির বক্তব্য হলো অপরাধের বাজারে যখন অপরাধের শাস্তি বৃদ্ধি পায় এবং তা কার্যকর হয় তখন অনেক অপরাধী অপরাধ কম করে অথবা অপরাধ করা থেকে বিরত হয়। বিপরীতভাবে, অপরাধের শাস্তি যদি কম হয় এবং বিচার বা সাজা প্রদানে টালবাহানা হয় তখন সমাজে অপরাধ বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ কঠিন ফৌজদারি আইনের কারণে অপরাধের মূল্য যখন বেশি হবে তখন অপরাধ কমে আসবে।

আইন ও অর্থনীতি বলে মানুষ অপরাধ করে যা লাভবান হয় তা যদি অনুমেয় শাস্তি, গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা এগুলো থেকে বেশি হয় তখন সে অপরাধ করবে। আর যদি তার সুবিধার থেকে ঝুঁকি বেশি হয়, যেমন- গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা বেশি এবং শাস্তি বেশি, তাহলে সে অপরাধ থেকে বিরত থাকবে।

সমাজে অপরাধের মাত্রা কমানো শাস্তি বৃদ্ধির সঙ্গে যেমন জড়িত, তেমনি সঙ্গে আনুষঙ্গিক আরও বিষয় আছে যা প্রাসঙ্গিক। অপরাধীকে অপরাধ থেকে বিরত থাকার জন্য সেগুলোকে বিবেচিত হয়ে থাকে। যেমন- অপরাধের শাস্তি কি, গ্রেপ্তার হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, বিচারের সম্ভাবনা কেমন, বিচার হলেও শাস্তি আসলে কতটুকু পাবে, শাস্তি পাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমার সম্ভাবনা ইত্যাদি।

অর্থনীতি বলে অপরাধ সমাজে 'মূল্য' তৈরি করে থাকে। এ মূল্য দুই ধরনের; এক হলো অপরাধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির খরচ, অন্যটি হলো অপরাধের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য খরচ। সুতরাং অপরাধের ক্ষেত্রে অর্থনীতির সূত্র হলো আইন হবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সামাজিক মূল্য দূর করা এবং ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য খরচ কমিয়ে আনা।

অনেক সময় অপরাধ সংঘঠিত হয় রাজনৈতিক লোক দ্বারা অথবা রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে। অনেক সময় অপরাধী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশ্রয়েও অপরাধ করে থাকে। সুতরাং আইনে অপরাধের শাস্তির অপ্রতুলতা, বিচারিক জটিলতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অপরাধীর রাজনৈতিক আশ্রয় এবং পুনর্বাসন, পেশিশক্তির কাছে আইনের অসহায়ত্ব, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমা পাওয়া যতদিন অব্যাহত থাকবে ততদিন এ সমাজ বা রাষ্ট্রের মধ্যে অপরাধ বাড়বে এটাই স্বাভাবিক, এটাই যুক্তিযুক্ত।

\হ

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম, বর্তমানে চায়নার বেইজিংয়ে পিএইচডি গবেষণারত।

\হঊ-সধরষ: ষধংিধরভঁষ@মসধরষ.পড়স
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে