logo
  • Fri, 21 Sep, 2018

  শওকত নূর   ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০  

গল্প

মনিরার ডায়েরি

মনিরার ডায়েরি
চৌরাস্তার মোড় প্রান্তের কাটা ঝোপের গা ঘেঁষে দিনভর বসে থাকে লোকটা। প্রায়ই কী যেন বিড়বিড় করে। বয়সে ন্যুয়ে পড়া শরীর. ভঁাজ খেয়ে গেছে মুখের চামড়া। সাদা চুল দঁাড়িতে মুখমÐল একাকার। চোখের ঔজ্জ্বল্যটা বেশ। ঢি’ ঢি’ করে প্রায়ই চেয়ে থাকে সে রাস্তার লোকজনের দিকে। কেউ ভ্রæক্ষেপ করে না। খুব কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় একদিন বিড়বিড় শুনে কৌত‚হলে দঁাড়ালাম। খানিকটা থতমত খেল লোকটা। নিশ্চয়ই তার কল্পনায় ছিল না আমি দঁাড়াব। বললাম, কিছু কি বললেন? ফ্যালফ্যাল করে চাইল সে। এই প্রথমবারের মতো লক্ষ্য করলাম তার হতদরিদ্র বেশভ‚ষার ভেতর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে হারিয়ে যাওয়া কোনো আভিজাত্য। চোখে চোখ রাখা থেকে মাথা নোয়ালো সে। বললাম, কী যেন বলছিলেন মনে হলো? আবারও মাথা তুলল সে। সেই একই অসহায় দৃষ্টি চোখে। অনিচ্ছায় মৃদু দীঘর্শ্বাস বেরিয়ে গেল তার নাসারন্ধ্র পথে। আমি চোখমুখের অভিব্যক্তি যথাসম্ভব কোমল করে বললাম, বলুন।

কী? খুব অসহায় দেখালো তার দৃষ্টি।

ওই যে কী যেন বিড়বিড় করছিলেন? কিছু একটা বলছিলেন মনে হলো?

সে খুব লম্পট ছিল। অস্ফুট বলল সে।

কে? কার কথা বলছেন?

আওরঙ্গ শেঠ।

কে সে? আপনার কে হন?

কেউ না।

তবে কে? কার কে?

মনিরার ফুপাতো ভাই। মৃদু শোনাল তার কণ্ঠ।

মনিরা কে? উদ্গ্রীব হলাম আমি।

শুনতে থাকুন। শিগগিরই জানবেন।

আওরঙ্গ শেঠ লম্পট হলো কীভাবে? কী লাম্পট্য করেছে সে?

মনিরাকে প্রায়ই সে ফুসলাত।

যেমন? কীভাবে ফুসলাত?

ওর সবকিছু কেড়ে নিতে চাইত।

সবকিছু বলতে কী বোঝাচ্ছেন?

একজন নারীর যা থাকে, তাই।

কী তা? অথর্কড়ি, ঘরবাড়ি?

উ-হু।

তবে?

ওই যে সেই সব। লাজুক মাথা নোয়াল সে।

কী সব?

ও যখনই একা থাকত, লম্পটটা নিলর্জ্জ কাছে গিয়ে বসত।

তারপর?

গায়ে গা ঘেঁষতে চাইত। আর কীসব বলত।

কী বলত?

এত একা কেমন লাগে তোর? এভাবে কেউ থাকে? তাকা আমার দিকে; কথা বল; আনন্দ পাবি ইত্যাদি। বাজে সব কথা। বলতে রুচি থাকে না।

আচ্ছা, আর?

ওই তো ধীরে ধীরে গায়ের সঙ্গে ঠেস দিতে চাইত।

মনিরা কী করত?

সরে যেত।

কোথায় সরে যেত?

যেখানে অন্যরা থাকত।

অন্যরা কারা?

ওর ফুপু, ফুপাত বোনরা, লম্পটটার অশিক্ষিত স্ত্রী, আর কাজের মানুষ।

তাহলে ও ওর ফুপুর বাসায় না গেলেই পারত।

ও ওখানে থেকেই পড়ালেখা করত।

ওখান থেকে চলে গেলেই হতো।

ও তখন এসএসসি পরীক্ষাথীর্। টেস্ট পরীক্ষা চলছিল। তখনই দানবটা চাকরি খুইয়ে গঁায়ের বাড়ি এসে বসে।

আচ্ছা তারপর?

ওইতো ও যখনই পড়ার ঘরে পড়তে বসে, তখনই কোনো না কোনোভাবে দানব গিয়ে হাজির। নানা প্রলোভন দেখায়। শেষে ...।

কী শেষে?

একদিন সম্মান বঁাচাতে ও চিৎকার দেয়।

তারপর?

শুনে ওর ফুপু দৌড়ে যান। লম্পটের স্ত্রীটাতো হাবাগোবা। বুঝত না কিছু সে।

তারপর কী হয়?

লম্পট তখন বার দরজার দিয়ে সটকে পড়েছে।

হুম। ওর ফুপু কি বিষয়স্তু জানতে পেরেছিলেন পরে?

হুম। কিছুটা।

জেনে কী করলেন তিনি?

ওঘর থেকে ওকে সরিয়ে নিলেন নিজ ঘরে।

তবে তো ভালোই হলো। বেশ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন তিনি।

না। ভালো হয়নি তাতে। শিশুর মতো শোনাল তার কণ্ঠ।

কেন ভালো হয়নি?

সে অনেক কথা।

বলুন।

কী?

ওই যে বললেন ভালো হয়নি পরবতীর্ ঘটনা। কীভাবে ভালো হয়নি তা?

লম্পটটা পাগলামী ধরল।

কেন?

নিজের ভেতরের পশুটাকে আড়াল করতে।

কেমন পাগলামী? কীভাবে শুরু হলো?

একদিন ওর ফুপু ও ফুপাত ভাইরা লম্পটটাকে খুব শাসায় নতুন করে।

নতুন করে কেন?

বড় বিশ্রী বিষয় ভাই। বলতে রুচিতে বাধে।

যতটা সম্ভব বলুন।

মনিরা যখন স্কুলের পথে হঁাটত, তখন...।

কী তখন, বলুন।

এই ঝোপটার পেছনে ওই যে জংলাগুলো দেখুন। ওর পাশ দিয়েই ওর স্কুলের পথ।

হুম, কী তাতে?

লম্পটটা ঝোপের আড়াল থেকে আচমকা বেরিয়ে এসে ওকে না দেখার ভান করে ওখানে বসে পড়ত।

তাতে কী?

তার পরনে লুঙ্গি থাকত। বিশ্রী ব্যাপার। খুবই নোংরা।

আচ্ছা, তারপর? খুলে বলাটাই অসম্ভব।

মনিরা লজ্জায় ঘৃণায় আধমরা হয়ে যেত।

হুম, বুঝেছি, সত্যি সে লম্পট, ইতর যাকে বলে। পরের কথা বলুন।

মনিরা ওর ফুপুকে একদিন আকারে-ইঙ্গিতে সেসব বলে। তা থেকেই নতুন করে ওই শাসানোটা।

ও একা স্কুলে যেত?

ওই সময়টাতে ওর পরীক্ষা চলছিল। ওকে একাই যেতে হতো। ওপরের ক্লাসের আর কেউ এদিকটায় ছিল না।

আচ্ছা তারপর?

ওর অন্য ফুপাত ভাইরা মিলে লম্পটটাকে ক্রমাগত চাপ দেয়।

তারপর?

সে আবোল-তাবোল বকতে থাকে। যেন বদ্ধ পাগল।

তারপর?

ওর অন্য ভাইরা তা মেনে নেয় না। পরিস্থিতি ভীষণ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

শেষে?

তকের্র মুখে লম্পট হাতে বঁাশ নিয়ে তাদের পেটাতে যায়। তারা দৌড়ে প্রাণ বঁাচায়। না পেরে শেষে ঘরবাড়ি, গাছপালা, হঁাড়ি-পাতিলে বাড়ি শুরু করে সে। এরপর পিটিয়ে গরু-বাছুরের মাথা ফাটায়, রক্তাক্ত করে। বীভৎস ব্যাপার।

তারপর কী হলো?

লম্পট বঁাশ ফেলে চিৎকারে বার আঙিনায় ছোটে। তখনকার দৃশ্যটা ছিল আরও বীভৎস।

যেমন?

তার গায়ে একেবারেই কোনো বস্ত্র ছিল না। মুখের ভাষায় ছিল না এতটুকু শ্রবণযোগ্যতা। অতি মূখর্রাও লজ্জায় মাথা ন্যুয়ে সরে যায় সেখান থেকে। কুকুর বলে গালি-গালাজ করতে থাকে তারা।

তারপর কী হয়?

সে লাপাত্তা।

লাপাত্তা মানে?

দিনভর জঙ্গল ঘেঁষে উবু হয়ে ছিল সে? কেউ কাছে গেলে চিৎকার দিত। ওই অবস্থাতেই নাকি সন্ধ্যায় কেউ কেউ হেঁটে চলে যেতে দেখেছে তাকে।

যখন সে পড়ে রইল তখন কেউ ধরতে গেল না?

চেষ্টা করেছে, পারেনি। সবারই তো সম্মান ভয় থাকে। আর খুব বেশি সময় ধরে সে পড়েও ছিল না। সন্ধ্যার প্রাক্কালেরই তো ঘটনা।

পরে কী হলো? মনিরা কি নিশ্চিন্ত হলো?

তা হয়েছিল, তবে সেটাই...।

কী তবে?

এক রাতে ও ঘুমাচ্ছিল।

হুম।

একা। ঘুমটা সম্ভবত খুব গভীরই ছিল, যেহেতু ও রাত জেগে পড়ত। ডায়েরির বণর্নায় তেমনটিই পাওয়া যায়।

বলুন।

ওর কোনো উপায় ছিল না।

মানে?

আচমকা ঘুম থেকে জেগে ও বুঝতে পারে, ওর মুখ-হাত-পা বঁাধা, শরীরও খুব অবশ, আর ওই অবস্থায় দানবটা ক্রমাগত...।

কিন্তু সে ঘরে ঢুকল কীভাবে?

সিঁধ কেটে। নিজ বাড়িতে সিঁধ কাটা সঙ্গত কারণেই খুব সহজ বুঝতেই পারেন।

জি, তারপর?

ও চলে গেল; ঠিক সে রাতেই।

কোথায়?

যেখান থেকে কেউ কখনো ফেরে না। ওই যে কড়ই গাছটা দেখতে পাচ্ছেন। ওই যে—। কঁাদো কঁাদো দেখালো তাকে।

কিন্তু আপনি এত কিছু জানলেন কী করে?

যাবার আগে ও ডায়েরিতে সব লিখে যায়। ঘুম থেকে জেগে দরজার বাইরে আমি তা দেখতে পাই। ভেতরের নোটটা পড়ে রুদ্ধশ্বাসে ছুটে যাই ওই গাছটার দিকে। কী বীভৎস দৃশ্য ও বড্ড ভুল করল। ওসব চেপে ও বেঁচে থেকে দেখত। ও তো নিষ্পাপ নিষ্কলুষ ছিল।

কিন্তু সে ডায়েরি লিখে আপনার দরজায় কেন রেখে গেল? সে আপনার কে, এবার নিশ্চয়ই বলবেন।

এখনো বোঝেননি কে হলে এমন ডায়েরির উত্তরাধিকার পাওয়া যায়?

হুম। সেই থেকে কি আপনি অপ্রকৃতিস্থ?

নাহ্।

তবে?

খুব কষ্টে সামলেছি নিজেকে। অপ্রকৃতিস্থ হওয়াটাই একান্ত স্বাভাবিক ছিল। কতটা অন্তরঙ্গতা ছিল আমাদের!

কিন্তু এখানে এভাবে বসে থাকেন কেন? মানুষ তো জানে আপনি উন্মত্ত। আর সেটাই স্বাভাবিক। কেন এভাবে বসে থাকেন?

আরেকটা দানবকে ধরতে।

কে সে?

সে রাতে ওই দানবটার যে সঙ্গী বাইরে পাহারায় থেকে চাপা স্বরে কথা বলে বলে দানবটাকে সহায়তা করেছিল। পরেও অনেক অপকীতির্ করেছে।

কিন্তু মূল দানবটার কী হলো? সে-ই তো আসল।

তার পরিবার তার পক্ষ নিয়ে তাকে বঁাচাতে চেয়েছিল।

কেন?

তাদের মতে যে যাবার সে গেছে। তা ছাড়া সে পরের মেয়ে ছিল। নিজের ছেলে কিংবা ভাইকে কে না বঁাচাতে চায়? ওরা পাগল হয়ে তার নিখেঁাজ হওয়াটাকেই পুঁজি করে আমার ডায়েরির ভাষ্যকে সাজানো প্রতিপন্ন করতে চায়। থানা পুলিশকে সেভাবে ম্যানেজও করে। এতে করে আমার প্রচেষ্টার ফল দঁাড়ায় শূন্য। ওরা বোঝাতে চায় কাজটা অন্য কারও।

মামলা আপনি করেছিলেন?

জি।

তারপর কী হলো?

ওই যে হেরে গিয়ে থিতু হয়ে রইলাম।

এখন?

মূলটাতে জিতেছি।

কীভাবে?

আসল দানবটাকে গেল সপ্তাহে ধরেছি।

কিন্তু আপনি সাধারণ মানুষ হয়ে?

শাটের্র নিচ থেকে ঝটপট একটা পরিচয়পত্র বের করে দেখাল সে। দ্রæত গুঁজে নিল যথাস্থানে। খানিকটা শিহরিত হলাম। মুখে কথা সরছিল না। সে বলে চলল, ওর মৃত্যুর দু’ মাস পরই আমার গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি হয়। ওপরের সহায়তায় সময়মতো মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করি। তারই ধারাবাহিকতায় দানবটাকে গত সপ্তাহে গ্রেপ্তার করাই। অচেনা পাগল সেজে এই গাছটার নিচেই সে বসেছিল। সাদা পোশাকীরা আমার দেয়া তথ্যমতে ওত পেতে ছিল আগে থেকেই। হাতেনাতে ধরে ফেলে তারা।

গ্রেপ্তারের পর কী হচ্ছে?

ডিএনএ টেস্টসহ সবই হয়েছে। সে তার পাওনা প্রাপ্তির পথ ধরে চলছে। পেয়েও যাবে যথারীতি। আর ওই সহায়ক দানবটা...?

ওই যে সে আসছে। আপনি সরে পড়–ন, প্লিজ। আপনি ধষর্ণবিরোধী কিছু কাজ করেছেন তা জানি। সময়ে মুখোশ খুলে একদিন আপনাকে সত্যিকার আমাকে দেখাব। ভালো থাকবেন। সরে যান, প্লিজ।

দ্রæত জায়গাটা থেকে সরে পড়ি আমি। একটু হেঁটে গিয়ে অদূরে দঁাড়াই। দেখি লোকটা ওখান থেকে উঠে ঝোপের পেছনে গিয়ে শুয়ে জীণর্ চাদরে ত্বরিত আপাদমস্তক ঢেকে দিল। ইতোমধ্যে একটা অচেনা লোক জায়গাটাতে এসে দঁাড়িয়েছে। সম্ভবত সে সরে পড়া ওই ছদ্মবেশীকে নজর করতে চাইছে। এরই মধ্যে একটা মাইক্রোবাস এসে দঁাড়ায় তার পাশে। দরজা খুলে ঝটপট নেমে পড়ে ক’জন লোক। কী একটা কাডর্ দেখিয়ে অচেনা লোকটাকে তারা তুলে নিল তাদের গাড়িতে। চোখের পলকে উধাও হলো সে গাড়ি। আমি কৌত‚হলে খানিকটা দূর ঘুরে গিয়ে ঝোপের পেছনের পথ ধরি। দেখি ওই লোকটা শুয়েই আছে ঝোপের পেছনে। শিয়রে ডায়েরি। মনে মনে আউড়ালাম, মনিরার ডায়েরি। চাদরের নিচ থেকে লোকটা অস্ফুট বলল, শিহাব সাহেব, ঠিকই ভাবছেন। এটাই মনিরার ডায়েরি।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

উপরে