logo
শনিবার ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১১ ফাল্গুন ১৪২৫

  অনলাইন ডেস্ক    ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০  

বইমেলা লেখকদের মতামত

বইমেলা লেখকদের মতামত
বই-লেখক নিবার্চন ও আবিষ্কারের বিষয়টির অভাব রয়েছে

গোলাম কিবরিয়া পিনু, কবি

‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯’-তে দুবছর পর ‘ঝুলনপূণির্মা থেকে নেমে এলো’ নামে আমার কবিতার বইটি ইতোমধ্যে বের হয়েছে। এবার আমার তিনটি প্রবন্ধের বইÑ‘সমকালীন কবিতা ও বোধের দিগন্ত’, ‘উনিশ-বিশ শতকের নারী লেখক ও আত্মশক্তির বিকাশ’ এবং ‘ভাষানীতি, নন্দনতত্ত¡ ও লেখক-শিল্পীদের ভাবাদশের্র লড়াই’ বের হচ্ছে।

একুশের বইমেলা ২০১৯, এবারও বড় পরিসরে আয়োজন করা হয়েছে, এতে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা কাটানো সম্ভব হচ্ছে। অনেক নতুন নতুন প্রকাশকের অস্তিত্ব বিকশিত হচ্ছে, বই প্রকাশনারও সংখ্যা বাড়ছে। এর ফলে সোহ্রাওয়াদীর্ উদ্যানে বইমেলার সম্প্রসারণ করার যুক্তি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। বাংলা একাডেমি ও সোহ্রাওয়াদীর্ উদ্যানের চেতনাগত দশর্ন সাংঘষির্ক নয়, বরং তা কাছাকাছি ও আমাদের জাতীয় চেতনার মূলভ‚মিরই কণ্ঠলগ্ন।

তবে বইমেলার যে অন্তঃপ্রাণ প্রকাশনা, সেই প্রকাশনা শিল্পের এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। লেখক ও প্রকাশকের পেশাদারিত্বের বিষয়টি কাক্সিক্ষত পযাের্য় উন্নীত হওয়ার আরও সুযোগ রয়েছে। লেখকের পাÐুলিপি গ্রহণ ও বিবেচনা করার ক্ষেত্রে অনেক প্রকাশকের আগ্রহ ও নিয়ম-নীতির অভাব রয়েছে। সম্মানী ও অন্যান্য দিকও বিবেচনা করা হয় না। প্রকাশকও বেড়েছে, লেখকও বেড়েছে কিন্তু উভয়ের মঙ্গলের জন্য আরও বোঝা-পড়ার গভীরতা বাড়ানো দরকার। আমাদের বইয়ের প্রকাশনার মানও বাড়ছে, লেখার মানও বাড়ছে, তা আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দঁাড় করানো প্রয়োজন।

অন্যান্য বইয়ের কথা বাদ দিয়ে শুধু কবিতার কথাই যদি বলি, তাহলে দেখবোÑবইমেলায় শত শত কবিতার বই বের হচ্ছে। অনেকে লেখা শুরু করেই কোনো পত্রপত্রিকা-সাময়িকীতে কবিতা না ছাপিয়েই কিংবা কোনো পরীক্ষায় উত্তীণর্ না হয়েই মানহীন কবিতা নিয়ে বই বের করে ফেলছেন! এতে কবি ও কবিতার কতটুকু মযার্দা থাকছে, তা বিবেচনার বিষয়। পালা-পাবের্ন নতুন পোশাক না পরলে যেমন হয় না, তেমনি মনে হয় একটা বই বের না করে মেলায় পা ফেলা ঠিক নয়, এমন চঞ্চলতা দেখা যাচ্ছে কারও কারও মধ্যে! সমাজের বিভিন্ন পেশাজীবী ও বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে তা উদগ্রহ বাসনায় পরিণত হচ্ছে, তা আর গোপনীয় থাকছে না! এটা এমন পযাের্য় বেড়ে গেছে তাতে কবিতার পাঠকের মধ্যে বিভ্রান্তি বেড়ে যাচ্ছে।

বইমেলার সঙ্গে মিডিয়ার জড়িয়ে পড়া ভ‚মিকা ও আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে, সে ক্ষেত্রে বই-লেখক নিবার্চন ও আবিষ্কারের বিষয়টির অভাব রয়েছে, এ ক্ষেত্রে তাদের অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন রচনার জন্য আরও এগিয়ে আসা উচিত, তাহলে বই ও লেখক নিবার্চনে পাঠকরা উপকৃত হবেন। কিন্তু তা না হয়ে দেখা যাচ্ছে টিভি চ্যালেনগুলোর বেশির ভাগ মেলার মাঠ থেকে সরাসরি তাদের অনুষ্ঠান পরিচালনা করে, যে কেউ লাইনে দঁাড়িয়ে থেকে কয়েক সেকেন্ড বই হাতে নিয়ে সেসব অনুষ্ঠানে সহজেই নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেন, তাতেই তারা কেউ কেউ ধন্য হয়ে যান। এই প্রবণতায় দেখা যাচ্ছে কেউ কেউ এ ক্ষেত্রে নতুন বইকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে কুণ্ঠিত হোন না। এই সব প্রচারের ফঁাদে পড়েও কেউ কেউ মান ছাড়া বই বের করতে আজকাল বেশ উৎসাহী হচ্ছেন! কেউ কেউ হয়তো এক-ঝলক চেহারা দেখিয়ে আত্মপ্রমাদ লাভ করে থাকেন। বা কেউ কেউ হয়তো ভাবেন এভাবে লেখার জগতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবেন। সামাজিক মযার্দাও বৃদ্ধি হচ্ছে বলে মনে করেন! কিন্তু এতে কবি-লেখক ও লেখার কতটুকু মযার্দা বাড়ে, তা বিবেচনার বিষয়।

একুশের বইমেলার আকষর্ণ মানুষের মধ্যে অনেক কারণে দিন দিন বাড়ছে। বইমেলাকে ঘিরে নিজেদের ভাষা ও জাতিসত্তার বৈশিষ্ট্য নিয়ে এক ধরনের বোধ লালন করছে মানুষ সূ²ভাবে, যা বিকশিত হচ্ছে আরও। এই মেলা আজ বাঙালির এক উৎসবের অন্যতম মূলভ‚মি হয়ে উঠেছে, যেখানে এসে মানুষ তার সাংস্কৃতিকবোধের সংহতি নিয়ে একে অন্যের সঙ্গে মিলবার প্রেষণা অনুভব করেন। উৎসবের এই বইমেলা আরও সংহত হোক, আরও বিকাশ লাভ করুকÑতা বাঙালি মাত্রই চাইবেনÑআমি তাদের একজন হয়ে চাইবো না কেন?

বাংলাভাষা চচার্য় অগ্রণী ভ‚মিকা

রাখছে বইমেলা

নাহার ফরিদ খান, কবি ও সংগঠক

প্রাণের উচ্ছ¡াসে ভরা আমাদের বইমেলা প্রতিবার আসে আনন্দ সম্ভার নিয়ে। যারা লেখক তারা বইমেলাতে তাদের নতুন বইয়ের ঘ্রাণে আপ্লুত থাকেন । তাদের ধ্যান-জ্ঞান থাকে কখন বইটি প্রকাশকের মাধ্যমে পাঠকের দৃষ্টিগোচর হবে। একটি মাসব্যাপী বইমেলা মানুষের আগমনে থৈ থৈ করে। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পযর্ন্ত এই বইমেলায় আনন্দ আহরণ করে। বইমেলা ও বিনোদন চলে একসঙ্গে। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, মতবিনিময়, লেখক পাঠক আড্ডা, বাংলা একাডেমিতে সেমিনার, কবিতা পাঠ, গানের অনুষ্ঠান মেলাকে ভিন্নমাত্রা দেয়। বাঙালিদের এই প্রাণের মেলায় বিদেশি কবিদের অংশগ্রহণ চমৎকারিত্ব আনে। লেখক হিসেবে আমিও মুখিয়ে থাকি বইমেলার জন্য নতুন বই যেন পাঠককে উপহার দিতে পারি । প্রায় প্রতিবছরই একটা বা দুটো বই যেন প্রকাশিত হয় সেটায় সচেষ্ট থাকি। এবার আমার নিবাির্চত গল্প নামে বেশকিছু গল্প নিয়ে একটি গ্রন্থ বইমেলাতে থাকছে । রিদম প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থটি আশা করি পাঠকের কাছে ভালো লাগবে । গল্পগুলোেেত এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, প্রান্তিক নিযাির্তত নারী, প্রেম-বিরহ,সমাজের অসঙ্গতি ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রতিফলিত হয়েছে। জীবন ঘনিষ্ঠ কাহিনী এই বইটিতে রয়েছে। গল্পগুলো সমাজের প্রতিচ্ছবি। সমাজ, সংসার, সময় সবই গল্পের উপজীব্য বিষয়। বইমেলা বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতিতে এমনভাবে মিশে গেছে এখানে বাঙালি সত্তাকে সবত্র খুঁজে পাওয়া যায়। ভাষার মাসে, ফাগুনের এই মাসে বইমেলার আয়োজন হয়। ভাষার প্রতি বাঙালির শ্রদ্ধা, নিবেদন ও আমাদের বাংলা ভাষা চচার্য় অগ্রণি ভ‚মিকা রাখছে এই বইমেলা। বইমেলার পরিসর দিন দিন বাড়ছে। মানুষের প্রাণের আবেগ রুদ্ধ দুয়ার খুলে বেরিয়ে আসে বাংলা একাডেমি ছাড়িয়ে সোহরাওয়াদীর্ উদ্যানব্যাপী। প্রাণের অমীয় সুর তোলে প্রতীক্ষিত এই বইমেলা ।

একটি মধুর অপেক্ষা

আরিফ মঈনুদ্দীন, কবি

একটি অপেক্ষাÑশুধু অপেক্ষা নয় মধুর অপেক্ষা। লেখক প্রকাশক এবং পাঠকদের এই অপেক্ষাটি আর দশটি ধৈযর্ ধারণের মতো নয়। এখানে পবিত্র একটি আরজ এই তিন ধরনের মানুষের মনে চমৎকার একটি জায়গা দখল করে বসে থাকে। যেমনÑএকজন প্রকাশক বাণিজ্যিক দিকটির সঙ্গে সঙ্গে একটি পবিত্র সামাজিক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকারও অনুভব করেন এবং এই মাহাত্ম্যের জন্য তারা সমাজে নন্দিতও হন। অথার্ৎ বাণিজ্যিক দিকটার সঙ্গে যশপ্রাপ্তির বিষয়টাও বিবেচনা বোধে জায়গা করে নেয়। এর জন্য সুন্দর একটি মন লাগে। আমি মনে করি প্রকাশকদের এই মনটি আছে।

একজন লেখক নিজেকে প্রকাশ করার একটা পবিত্র উন্মাদনা নিয়েই অপেক্ষা করেন। নিজে যা লিখলেন সেই লেখাটি পাঠকের কাছে পেঁৗছে দেয়ার জন্য প্রকাশকরা যে যে মাধ্যমগুলো ব্যবহার করেন তার অন্যতম মাধ্যম হলো বইমেলা এবং প্রধান মাধ্যম হলো একুশের বইমেলা। এই মেলাকে কেন্দ্র করে নবীন লেখকদের উৎসাহটা একটু বেশি। তার একটি বই বের হবে, এই আয়োজনকে ফলপ্রসূ করার জন্য রাতদিন পরিশ্রম দৌড়ঝঁাপ শেষে যখন কাক্সিক্ষত মাহেন্দ্রক্ষণটি উপস্থিত হয় তখন লেখকের চেহারায় যে উজ্জ্বল আলোর দ্যুতি ফুটে ওঠে তার তুলনা খুঁজে পাওয়া ভার। এই ক্ষেত্রে কবিদের আত্মবিশ্বাসটা একটু বেশি। কেননা কবিরা আবেগের চাষ করেন। নিজের আবেগ অন্যের সঙ্গে, অন্যের আবেগ নিজের ভেতরে ধারণ করেই আনন্দ ভাগাভাগি করেন এবং সেটি নিমর্ল আনন্দই বটে।

সম্মানিত পাঠককুলের প্রতি লেখক প্রকাশকদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। কারণ পাঠকরাই এই দুই শ্রেণির সবচেয়ে প্রিয়জন। যত প্রশংসা করুন আর যত বিগলিতই হোন না কেন শেষ পযর্ন্ত আপনি বইটি কিনলেন কিনা এই-ই তাদের বিবেচ্য এবং আরাধ্য। সত্যিকার অথের্ তা-ই হওয়া উচিত। এই ক্রেতা-পাঠক শ্রেণির জন্যই মূলত বইমেলা। এখন আমাদের মেলাকেন্দ্রিক বই কেনার একটি রেওয়াজ চালু হয়েছে। সৃজনশীল মননশীল বই সারা বছর যেমন বিক্রি হয় বইমেলার সময় একটু বেশিই বিক্রি হয়। অনেকে সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন, যেমন ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারা’ অথবা ‘রথ দেখা কলাবেচা’ বা কলা কেনার মতো। বছরে একবার মেলায় যাবেন-দেখবেন এবং মনের মতো করে খুঁজে খুঁজে বই কিনবেন।

একুশের বইমেলা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে হচ্ছে এবং হবে। সেই আলোকে বলতে গেলে এবার বইমেলার বেশ প্রসংশা করা যায়। যেমন দীঘির্দন আলোচনা সমালোচনার পর বিগত কয়বছর থেকে সোহ্রাওয়াদীর্ উদ্যানে পরিসর বিস্তৃত করা হয়েছে। এতে প্রচুর জায়গা নিয়ে মেলা বসানো গেছে। এর ফলে পাঠক তথা ক্রেতা-দশর্নাথীের্দর বই কেনা এবং ঘুরে বেড়ানোটা বেশ সুবিধাজনক হয়েছে। সব থেকে উল্লেখযোগ্য হয়েছে প্রক্ষালন ব্যবস্থা। অস্থায়ীভাবে এমন চমৎকার টয়লেটের ব্যবস্থা বইমেলায় আর কখনো হয়েছে কিনা আমি মনে করতে পারছি না। আর একটি বিষয় সবিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে, মুসলমান নামাজীদের জন্য এমন দৃষ্টিনন্দন অস্থায়ী মসজিদ অতীতে কোনোদিন বইমেলায় স্থাপিত হয়নি। বইমেলায় গিয়ে নামাজ পড়া না-পড়া নিবিের্শষে আমি সবাইকে বলবো একবার মসজিদটি দেখে আসার জন্য, এতে মেলার আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত সবই আপনার ধন্যবাদ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন না।

বইমেলার আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো পশ্চিম পাশ্বির্স্থত মনুমেন্টের জলাশয়টি এবারের মেলাকে একটি নান্দনিক দিক উপহার দিয়েছে। প্রাচীর-বেষ্টিত না করে এই লেকসদৃশ জলের অবস্থানটি দিয়ে যে মায়া সৃষ্টি করা হয়েছে তা দশর্নাথীের্দর ভীষণভাবে অভিভ‚ত করছে। বতর্মানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক আমাদের অগ্রজপ্রতিম কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। মহাপরিচালকসহ আয়োজক কমিটিকে এর পুরো কৃতিত্বের জন্য ধন্যবাদ দিচ্ছি।

বাঙালি জাতিসত্তার স্মারক

অমর একুশে বইমেলা

মোহাম্মদ শামসুল কবির, লেখক ও গবেষক

ঘাসের ওপর চট বিছিয়ে মুক্তধারায় স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন দাস সাহা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সত্তর দশকের গোড়ার দিকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বইমেলা শুরু করেন। এরপর আশির দশকে ১৯৮৪ সালে বইমেলায় আনুষ্ঠানিক নাম রাখা হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলা। তখন বইমেলা ১৫ থেকে ২১ দিন চলত। এরপর একই দশকের দিকে মেলা আরও বড় হয়। এরপর ২০১৪ সাল থেকে বাংলা একাডেমির বাইরে সোহরাওয়াদীর্ উদ্যান প্রাঙ্গণে স্থানান্তর করা হয়। তারপর থেকে যথারীতিভাবে বাংলা একাডেমির বইমেলা সোহরাওয়াদীের্ত বিস্তৃত লাভ করে। মেলার বিন্যাসও সুন্দর হয়ে যত্রতত্র হঁাটাচলা করে পাঠকদের জন্য বই কেনা সুবিধা হয়। এবার বইমেলায় ২০১৯ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্মানিত অতিথি ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষ ও মিশরীয় লেখক ও সাংবাদিক মহসিন আল-আরিফি।

বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় ফেব্রæয়ারি মাসে, এটি ভাষার মাস নামে খ্যাত । ২১ ফেব্রæয়ারি আন্তজাির্তক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে ১৯৯৯ ইউনেস্কো কতৃর্ক। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন । তবে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বইমেলার কথা যতটা শুনতে পাই কিন্তু আমাদের দেশের মতো এত সুদৃঢ় নয়। পূবের্ বইমেলার প্রচার দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকত। এখন সেটি ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে দেশে ও বিশ্বে সম্প্রচার করা হচ্ছে । এটি অবশ্য ভালো দিক। সম্প্রতি এক দৈনিকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বলেছেন, বাংলা একাডেমির গুরুত্বপূণর্ দুটি কাজ গবেষণা এবং প্রকাশনা। তবে আপাতত একটি বিষয় আছে তাহলো অনুবাদ। তিনি বলেছেন, আমরা ৬টি ভাষার প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছি। বিশ্বের সঙ্গে তরুণরা প্রযুক্তির হাত ধরে হঁাটছে, আমাদেরও প্রযুক্তিবান্ধব একুশে বইমেলার উপহার দিতে হবে। বই যেহেতু জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ সেহেতু বই মেলার গুরুত্ব আমাদের অনুধাবন করতে হবে। বাঙালি জাতিসত্তার স্মারক অমর একুশে বইমেলা।

বইমেলা লেখক-পাঠক-প্রকাশকের ত্রিভ‚জ সম্পকের্র অদৃশ্য পিরামিড

সমীর আহমেদ, কবি ও কথাসাহিত্যিক

বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা, আবেগের মেলা, ভাষার মেলা, আমাদের সংহতি বা ঐক্যের মেলা। প্রতি বছর ঘুরেফিরে বইমেলা আসে। আমরা একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হই। ভাষা শহীদদের আমরা মনপ্রাণ দিয়ে স্মরণ করি। একুশ আমাদের প্রাণের দুয়ার খুলে দিয়েছে। আজকে বইমেলার যে বণির্ল, বিপুল বিস্তার, তার মূলে রয়েছে একুশের অবদান। আমাদের কাজ ও চেতনার অন্তশির্ক্ত একুশের চেতনা। বইমেলা লেখক-পাঠক-প্রকাশকের ত্রিভ‚জ সম্পকের্র অদৃশ্য পিরামিড। একটির সঙ্গে আরেকটি দেয়ালের নিবিড় সম্পকর্ বিদ্যমান। কিন্তু মানহীন বইয়ের কারণে এ সম্পকের্ চিড় ধরে।

সারা বছর লেখকের প্রস্তুতি, প্রকাশকের মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ সবকিছু তো পাঠককে কেন্দ্র করে। পাঠকরা বইমেলায় আসেন, ঘুরে-ফিরে বই দেখেন, প্রিয় লেখকের বা নিজস্ব পছন্দের বইটি খুঁজে বের করে কিনে নেন। অনেকে মানহীন বই কিনে প্রতারিত হন। যে আশা নিয়ে পাঠক বইটি কিনেছিলেন, লেখক ও প্রকাশক হয়তো তার কিছুই পূরণ করতে পারেননি। প্রতি বছর বইয়ের মোড়কে অ-বইয়ের বিপুল বাণিজ্য ঘটে। পাঠকরা বঞ্চনার শিকার হন। প্রকাশকের অথের্র মোহ ও প্রকাশনাশিল্পে সরকারের যথাথর্ নিয়ন্ত্রণের অভাবের কারণেই পাঠকরা এ ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হন। একদিন এই অচলায়তন থেকে আমাদের প্রকাশনাশিল্প বেরিয়ে আসবে। পাঠককে বই কিনতে হবে চোখ-কান খোলা রেখে। লেখক-প্রকাশককেও আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

প্রতি বছর আমার দু-একটি বই প্রকাশিত হয়। বইয়ের ভঁাজে ভঁাজে লেপ্টে থাকা ছাপাখানার গন্ধ আমাকে খুব তাড়িত করে। শিহরিত করে। নিজের বই বলে কথা নয়, যে কোনো নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকে, ভঁাজ খুলে পড়তে ভালো লাগে। এ বছর বইমেলায় জোনাকী পাবলিকেশন্স থেকে আসছে আমার উপন্যাস ‘দাওয়াল’। মেলায় দ্বিতীয় সপ্তায় পাওয়া যাবে, জোনাকীর স্টলে। ‘যারা নিজ এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় ভাগে ধান কাটতে যায়, তারাই ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর, খুলনা প্রভৃতি অঞ্চলে ‘দাওয়াল’ নামে পরিচিত।

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর পাক সরকার হঠাৎ আশঙ্কা করে যে দেশে দুভির্ক্ষ দেখা দেবে। এ কারণে তারা কডর্ন আইন বা বেষ্টনী প্রথা জারি করে। ফলে এক জেলার ধান অন্য জেলায় কেউ নিয়ে যেতে পারতো না। এতে দাওয়ালরা খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ তারা চড়া সুদে দাদন নিয়ে বা ধারকজর্ করে অন্য জেলায় ধান কাটতে যেত। দু’ একমাস অবস্থান করত। বাড়ি ফিরে এসে ভাগের ধান দিয়ে তারা ধারদেনা শোধ করত, সারা বছর সংসার চালাতো। কডর্ন আইন জারির ফলে দাওয়ালরা ধান নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারত না। পুলিশ জোর করে দাওয়ালদের নৌকা থামিয়ে ধান কেড়ে নিত। সরকার তাদের ক্ষতিপূরণের কোনো ব্যবস্থ না। শূন্য হাতে বাড়ি ফিরে সহায়সম্বলহীন দাওয়ালরা হতাশায় নিমজ্জিত হয়। সংসারে চরম অভাব ও দাদন ব্যবসায়ীদের ঋণের চাপে তারা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। অনেকে ভিটামাটি ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দাওয়ালদের পাশে এসে দঁাড়ান। কডর্নপ্রথা বাতিলের জন্য তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। এ কারণে তাকে কারাবরণ করতে হয়। এ পটভ‚মিতে দাওয়ালের আখ্যান গড়ে উঠেছে। গত বছর বইটি আলোর মুখ দেখেনি। এবার জোনাকী পাবলিকেশন্স বইমেলায় নিয়ে আসছে ‘দাওয়াল’। বইটির মূল্য ৪০০ টাকা। আশা করি পাঠকের ভালো লাগবে।

গ্রন্থনা : আশরাফ আহমেদ
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে