logo
বুধবার ১৭ জুলাই, ২০১৯, ২ শ্রাবণ ১৪২৬

  সাইফুদ্দিন সাইফুল   ১০ মে ২০১৯, ০০:০০  

বাংলাসাহিত্যের প্রবাদপুরুষ রবীন্দ্রনাথ

বাংলা ভাষা বাংলাসাহিত্য আর রবীন্দ্রনাথ একই সূত্রে গাঁথা। একটাকে উপেক্ষা করে অন্যটার পরিপূর্ণতার রূপ প্রকাশ পায় না, বলা যায় অপূর্ণ থেকে যায়। কবি রবীন্দ্রনাথ একজন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী মানুষ ছিলেন। তিনি মূলত একজন সৃষ্টিশীল মননশীল প্রজ্ঞাবান শক্তিশালী সৃজনশীল কবি। বিস্ময়কর জ্ঞানের ব্যক্তি বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ রবীন্দ্রনাথ সর্বোপরি একজন সাহিত্য বিচারে পরিপূর্ণ সফল মানুষ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- তিনি তার অমর সাহিত্যকর্মের জন্যই আমাদের কাছে, মানুষের কাছে, সব পাঠকের কাছে, চিন্তাশীল ভাবুকদের কাছে, আপন মহিমায় মহিমান্বিত হয়ে আছে এবং আগামীতেও থাকবেন। জয়তু বাংলা, জয়তু বাংলাসাহিত্য, জয়তু আমাদের কবি, বাংলার কবি, বাংলা ভাষার কবি রবীন্দ্রনাথ।

বাংলাসাহিত্যের প্রবাদপুরুষ রবীন্দ্রনাথ
আধুনিক বাংলাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান প্রতিভাবান শিল্পী এবং বাংলা কাব্যের অনিন্দ্য ও নান্দনিক ছন্দের রূপকার বাংলা ভাষা শব্দের অমর কৃর্তিমান মহাপুরুষ, বাংলা কবিতার মহান বরপুত্র; বাংলা বাঙালির অতিব একান্তে বিশ্বাসে বোধে চেতনার আত্মার আত্মীয় এবং বাংলার বিশ্বাল বৈচিত্র্যময় সাহিত্যাকাশে দীপ্তমান নক্ষত্রের নাম বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মানুষের কবি জীবনের কবি রবীন্দ্রনাথ বাংলাসাহিত্যে বাংলা কাব্যে একজন প্রকৃতার্থে অতীব যোগ্য পথিকৃত। আর এই জন্য আমাদের কবি রবীন্দ্রনাথ প্রাণের কবি, প্রেমের কবি, মানবতার কবি, প্রকৃতির কবি, গানের কবি, নদীর কবি, পাখির কবি এবং সর্বোপরী মানুষের ভালোবাসার প্রাণপুরুষ। কবি ও মানুষ রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যপ্রিয় প্রকৃতিপ্রিয় সব মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায় এক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। আমরা তার রচনাসমূহের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখতে পাব যে, সেখানে তিনি মানুষ ও মানবতার জয়গান গেয়েছেন। তার রচনাতে মানুষকে প্রাধান্য দিয়েছেন, মানবতার ভিত্তি স্থাপন করেছেন এবং সব শ্রেণির মানুষকে বিশেষ করে সাধারণ মানুষের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। তিনি মানুষকে বিভিন্নভাবে দেখেছেন এবং বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করেছেন। এক কথায় মানুষকে উপেক্ষা করে তিনি কোনো সাহিত্য রচনা করেননি। তার বৈচিত্র্যময় রচনার প্রধান কেন্দ্রই হলো মানুষকে নিয়ে। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ তিনি তার অঢেল রচনার মাধ্যমে মানুষের পাশাপাশি বাংলা ভাষা বাংলাসাহিত্য বাংলাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছেন। মূলত তিনি সাহিত্যচর্চা করেননি, করেছেন মনে-প্রাণে সাহিত্য সাধনা। সাধারণ মানুষকে করেছেন লেখার প্রধান বিষয়। রবীন্দ্রনাথের 'গল্পগুচ্ছ' পাঠ করলে সাধারণ মানুষের কথায় আমাদের সামনে দিবালোকের মতো ষ্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর তাই এই সুন্দর পৃথিবীতে যতদিন রবে সূর্য চন্দ্র তারা আর পাখি গাইবে গান নদী বইবে ধারা ততদিন পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ অতি উজ্জ্বল আলো হয়ে সাহিত্য ও মানুষের মাঝে জ্ঞানের ছন্দের রূপ ও রসের গন্ধের আলো ছড়াবে।

একথা ঠিক যে, মানুষ রবীন্দ্রনাথ সশরীরে এই মাটির পৃথিবীতে অথবা আমাদের মাঝে নেই তার সম্মুখ উপস্থিতি আর কেউ কোনোদিন কখনো দেখতে পাবে না, তবে তিনি মানুষের মাঝে সমাজের কাছে শিল্প সাহিত্য জগতে সতত তার বহুমাত্রিক সৃজনশীল কর্মের গুনের জন্য বেঁচে থাকবে কাল থেকে কালান্তরে যুগ থেকে যুগান্তরে- তাতে নেই কোনো সন্দেহ। আসলে মৌলিক প্রকৃত সৃষ্টিকর্মকে এবং সৃজনশীল মানুষকে কোনো কিছুর বিনিময়ে এবং কালের বিচারে কভু মুছে ফেলা যায় না। কেননা, প্রত্যেক সৃজনশীল ও মননশীল মানুষ তার জ্ঞান প্রতিভা এবং সৃজনশীল কাজের দ্বারাই সমাজ, কাল ও মানুষের কাছে বেঁচে থাকে। সত্যি কথা কি! এক জীবনে বিশাল রবীন্দ্রনাথকে পাঠ করা অত্যন্ত কঠিনতর। রবীন্দ্রনাথ তার বিপুল সৃষ্টিশীল রচনা সম্ভারের জন্যই এই অপরূপ সুন্দর ভুবনে মানবের মাঝে বাঁচার প্রার্থনা করেছেন। কেননা, জীবন সচেতন কবি রবীন্দ্রনাথ তার কবিতায় মানুষকে খুউব নিবীড় করে কাছে টানতে চেয়েছেন আর এই বিশ্ব অপার প্রকৃতিকে আপন সত্তার মাঝে ধারণ করে ভালোবাসার অথই সাগরে ভেলা ভাসাতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

কবি তাই বলেছেন-

''মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে,

মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।''

আজ একথা দৃঢ় বিশ্বাসে বলা যায় যে, বর্তমান অবধি বাংলাসাহিত্যে হাতে গোনা যে ক'জন বড়ো মাপের খ্যাতিসম্পন্ন কবি হিমাদ্রীর মতো মাথা উঁচু করে বাংলাসাহিত্য কাব্য জগতে দাঁড়িয়ে আছে তার মধ্যে একজন এবং অন্যতম পুরোধা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন আধুনিক ও নিরেট কবি। রবীন্দ্রনাথের গানে কবিতায় ছোটো গল্পে কালকে ধারণ করে বহুমাত্রিক চিন্তার পাশাপাশি আধুনিকতার রূপ প্রকাশ পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথের কাব্য বাংলা ভাষা-ভাষীদের অমূল্য সম্পদ। শিল্পস্রষ্টা সাহিত্যদ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ তিনি বিশেষ করে তার কবিতায় ও গানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতাকে খুব ভালো করেই ধারণ করেছিলেন। এ ছাড়া তার কবিতায় গানে আধ্যাত্মিকতারও উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। মূলত রবীন্দ্রনাথের কল্পনা শক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর ও দীপ্তমান, তবে তা ছিল সৃজনশীল ও শৈল্পিকতায়পূর্ণ ভরপুর। আর তাই রবীন্দ্রনাথের ছোটো গল্পসমূহ তাকে এক অনন্য মানুষ এবং মননশীল লেখক হিসেবে পাঠক ও কালের কাছে উপস্থাপন করেছে।

এ কথাতো দিবালোকের মতো অতীব সত্য যে, কবি রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে বাংলাসাহিত্যের অস্তিত্ব কখনোই কল্পনা করা যায় না। মা ছাড়া যেমন সন্তানের অস্তিত্ব মেলে না, ফল বা ফুল ছাড়া যেমন বৃক্ষের পূর্ণতা পায় না, মেঘ ছাড়া যেমন বৃষ্টির আশা করা বৃথা, তেমনি রবীন্দ্রনাথ ব্যতিত বাংলাসাহিত্য বাংলা কাব্য ভাবাটা একেবারে নিরর্থক। কেননা, তার রচনাসমূহ কালের সবুজ ফসলের মতো সজীব। কাজেই বলা যেতে পারে যে, রবীন্দ্রনাথ আর বাংলা সাহিত্য বা কাব্য একে অপরের সহিত অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ও গভীর সম্পর্ক। বাংলাসাহিত্যের যে কোনো বিষয় নিয়ে ভাবতে গেলে অথবা কিছু করতে বা বলতে গেলেই সেখানে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দিব্যি মূর্তিমান হয়ে আবির্ভাব হবে। এই জন্যই শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি সমাজ সভ্যতা মানুষ জীবন ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা পর্যালোচনা এবং চিন্তা ভাবনার মাঝে কবি রবীন্দ্রনাথ স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সামনে চলে আসে। কেননা, রবীন্দ্রনাথ শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির যে বিশাল নান্দনিক এলাকা জুড়ে দখল করে আছে, তা আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে কাব্যকে করেছে অনেক বেশি সমৃদ্ধ বিকশিত ও গতিময়। মোটকথা, রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীল বৈচিত্র্যময় সাহিত্যকর্ম মানুষ জীবন সমাজ সভ্যতা সম্পর্কে জানতে বুঝতে বোধে ভাবে ভাবনায় অধিক শিল্পময় সত্তার প্রেরণা জোগায়, মানব মনের ভীষণ খোরাক মেটায়, মানুষ জীবন নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে শেখায়। কেননা, কালের বিচারে রবীন্দ্রনাথের যে বিপুলায়তন সম্ভার পাঠকের সামনে উপস্থিত তা বিস্ময়ে হতবাক করে দেয়ার মতো ঘটনায় বটে। আমরা তাই কবি রবীন্দ্রনাথের কাছে অনেকাংশে ঋণী, যা কখনো শোধ হওয়ার নয়। অবশ্য একথা বর্তমানকালে চরম সত্যি যে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম বাংলাসাহিত্যকে পাহাড়ের মতো উঁচুতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ফলে বিশ্ব সাহিত্য দরবারে বাংলাসাহিত্য বিশেষ করে বাংলাকাব্য আজ যে অবস্থানে আছে, তা পৃথিবীর মানুষকে স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছে মূলত কবি রবীন্দ্রনাথের অক্লান্ত আন্তরিক চেষ্টা ও সাধনার ফলে। আসলে বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো দিক নেই যেখানে রবীন্দ্রনাথের হাতের কলমের কালি ষ্পর্শ লাগেনি বা ছুয়ে যায়নি। সাহিত্যের সব শাখাতেই রয়েছে তার সরব উপস্থিতি। কি কবিতায়, কি ছড়ায়, কি গানে, কি ছোট গল্পে, কি কথাসাহিত্যে, কি প্রবন্ধে ও কি নাটকে সবখানেই রবীন্দ্রনাথের রয়েছে নিপুণ হাতের অতি মাধুর্য নান্দনিক ছোঁয়া। এমনকি তিনি সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি অনেকগুলো চিত্রও এঁকেছেন। যা তার সৃজনশীলতার প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হয়ে আছে। তার ছবি আজ বিশ্ববাসীর কাছে নতুন করে ভাবনার খোরাক মেটাতে সক্ষম হচ্ছে। আর তাই কবি রবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র একজন কবিই ছিলেন না, কবির পাশাপাশি তিনি চিত্রশিল্পী হিসেবেও সমধিক। কবি রবীন্দ্রনাথের বিচিত্রভাবনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা শিল্পরঙ আর কলমের কালির ছোয়ায় লিখিত শব্দমালা বাংলাসাহিত্যের সব বিভাগই আজ আলোর মতোই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ধন্য সমৃদ্ধ উন্নত হয়েছে বাংলাসাহিত্য এবং বাংলা কাব্যভান্ডার।

কবিতা, গানতো মানুষের জীবনের কথা বলে, প্রেরণার শক্তি জোগায়, চেতনার উৎস হয়ে বিবেক ও বোধে নির্মল কাজ করে। প্রেম ভালোবাসা সাম্য সম্প্রীতি সৌজন্যবোধ সৃষ্টিশীলতা মননশীলতা সব সময়ের জন্য সুন্দরের সহায়ক। আর তাই রবীন্দ্রনাথ তিনি তার রচনায় সমৃদ্ধ শত শত হাজার হাজার গান কবিতা সৃষ্টি করে মানুষের মনকে করেছে সাহিত্যের প্রতি উৎসাহিত, বিবেককে করেছে চেতনার বন্ধু, চিন্তাকে দিয়েছে অদম্য প্রেরণা, দিয়েছে অসীম শক্তি আর মানুষের অন্তরে দিয়েছে অকৃৃত্রিম ভালোবাসা। আমরা জানি যে, কবি রবীন্দ্রনাথ কোনোভাবেই হতাশাবাদী নন। মানুষের মাঝেই তিনি স্বপ্ন দেখেছেন, আপনাকে সতত মানুষের একজন বন্ধু জ্ঞান করে মানুষের কথাই বারংবার তার রচনার মধ্যে তুলে ধরবার প্রয়াস করেছেন। আর তাই আমরা দেখি যে, তিনি তার সব রচনাতে সবক্ষেত্রে মানুষকে সমাজকে আশার আলো দেখিয়েছে। আমাদের জীবনের সঙ্গে চেতনার সঙ্গে মননের সঙ্গে ভাবে ভাবনায় আন্দোলনে ভাষার মধ্যে চেতনার জগতে দেশপ্রেমে সৃষ্টিশীলতার কর্মের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ছিল আছে এবং আগামীতেও থাকবে। অক্ষয় তার শিল্প সত্তা।

কাজেই রবীন্দ্রনাথের তার রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা, সমাজ সভ্যতা নিয়ে ভাবনা, শিল্প-সাহিত্য- সংস্কৃতি নিয়ে সাধনা, রাজনীতি অর্থনীতি নিয়ে সুচিন্তিত মত, জীবন চেতনা নিয়ে গভীর চিন্তা বোধ উপলব্ধি, ধর্ম নিয়ে তার বাস্তবিক উপলব্ধিবোধ আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে অর্জন করতে হবে। কেননা, রবীন্দ্রনাথের পূর্ণতা আমাদের সমাজ সভ্যতা জাতীয় জীবনে আকড়ে ধরলে এবং ধারণ করলে আমরা বাঙালি জাতি হিসেবে সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারব। অন্যথায় আমরা অনেক অনেক পিছিয়ে পড়ব। অর্থাৎ আমরা জানি যে, কোনো নদী কিংবা খাল পার হতে গেলে আগে সেতু অথবা সাঁকো পার হতে হয়। আর তদ্রূপ বাংলাসাহিত্যে বাঙালির চেতনায় মননে রবীন্দ্রনাথ একটা শক্তিশালী সেতু সাঁকো হয়ে আছে। এই সেতু বা সাঁকোকে উপেক্ষা করলে আমাদের কি সাহিত্যে, কি শিল্পে, কি গানে, কি জীবনে চেতনায় একেবারে অসামপ্ত থেকে যাবে। রবীন্দ্রনাথ অর্থাৎ তার সাহিত্য নিয়ে আমাদের সব সময়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের শিল্পে, সাহিত্যে, ইতিহাস, ঐতিহ্যে, সংস্কৃতি ও রাজনীতি জীবনের চেতনায় রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই অপরিহার্য। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পরিচ্ছন্ন্ন পারিমার্জিত পরিশীলিত জীবনবোধ চেতনাবোধ বিনির্মাণে একজন সফল স্বার্থকর রূপকার ও কারিগর। কারণ, সমাজে যারা ব্রাতজন মহাত্মন তারাই মানুষকে সমাজের জ্ঞানকে সৃষ্টিশীলতাকে চেতনাকে মননকে আলোর শিখার মতো সতত জালিয়ে রাখে।

\হবাংলা ভাষা পৃথিবীর প্রধান ভাষাগুলোর মধ্যে একটি এবং অন্যতম। এই বাংলা ভাষার জন্য বাঙালি জাতি জীবন উৎসর্গ করেছে। আজ সেই বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। আর কালের ব্যবধানে রবীন্দ্রনাথের আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা রূপে। যে অর্জন বাঙালি জাতির জন্য একটা বড়ো পাওয়া। কবি রবীন্দ্রনাথ তার বৈচিত্র্যময় সাহিত্যবিষয়ক লেখার মধ্যে দিয়ে বাংলা ভাষাকে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি সাহিত্য রচনাতে থেমে থাকেননি; তিনি সাধারণ মানুষকে একান্তে আপনার করে ভেবেছেন এবং অন্তরের অন্তঃস্থল দিয়ে তাদের জেনেছেন, চিনেছেন আর হৃদমাঝারে স্থান দিয়েছেন। তার সব রচনাতে মানুষকে বিভিন্নভাবে বিচিত্র আকারে ভিন্ন প্রকারে দেখতে পাওয়া যায়। তিনি এত বড় একজন শিল্পী ও কবি হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে সাধারণ মানুষের কাতারে নিয়ে এসেছেন এবং তাদেরই একজন এই পরিচয় দিতে অনেক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন। তিনি তার চারপাশের মানুষ, অসীম নীলাকাশ, পাখি, বৃক্ষ, নদী, ফুল, জল, প্রকৃতি মাটিকে এতটায় ভালোবেসেছিলেন যে নিজেকে তাদের কাছ থেকে আলাদা ভাবতে পারেননি, তিনি এসবেরই একজন ভেবেছেন। আসলে যারা জীবন সমাজ মানুষ ও মানুষের সুখ দুঃখ যাতনা প্রেম ভালোবাসা ইত্যাদি নিয়ে ভাবে, চিন্তা করে তারা সমাজের রাষ্ট্রের মানুষের আপনজন এবং অকৃত্রিম অভিভাবক। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠিক এমনই একজন মানুষ। রবীন্দ্রনাথ অনেক বড় মনের মানুষ ছিলেন বলেই তিনি নিজেই অকপটে দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে বলেছেন-

''মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক

আমি তোমাদেরই লোক,

আর কিছু নয়

এই হোক শেষ পরিচয়।''

প্রিয় মা মাটি বাংলার বাংলাসাহিত্যের বিস্ময়কর গভীর জ্ঞান প্রতিভার অধিকারী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলাসাহিত্যে জ্ঞানের অতল সাগরে তিনি আজীবন সাঁতার কেটেছে। বাংলাসাহিত্যের নির্মল বাতাসে তিনি প্রখর প্রতিভার মুক্ত ডানা উড়িয়েছেন। সাহিত্য সাধনার মধ্য দিয়েই নিজেকে মহানকবি করে তুলেছেন। এ ছাড়া তার বহুমাত্রিক সাহিত্যকর্ম জ্ঞান প্রজ্ঞা সাহিত্যকে বাংলার নির্দিষ্ট সীমানা পেরিয়ে তিনি নিয়ে গেছেন অনেক অনেক দূরে। বাংলার আকাশ ছেড়ে পৃথিবীর আকাশ ছুয়েছে। তার লেখাকে বাংলা সাহিত্যকে তিনি বিশ্বের মাঝে যেখানে নিয়ে গেছেন তার তুলনা মেলা ভার।

কবি রবীন্দ্রনাথ তিনি নিজেই তার লেখা সম্পর্কে বলেছেন- 'অতি অল্প বয়স থেকে স্বভাবতই আমার লেখার ধারা আমার জীবনের ধারার সঙ্গে সঙ্গেই অবিচ্ছিন্ন এগিয়ে চলেছে। চারিদিকের অবস্থা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনে এবং অভিজ্ঞতার নতুন আমদানি ও বৈচিত্র্যে রচনার পরিণতি নানা বাঁক নিয়েছে ও রূপ নিয়েছে।' আর তাই রবীন্দ্রনাথের অমর কালজয়ী সৃষ্টি ''গীতাঞ্জলী'' কাব্যের জন্য তিনি বিগত ১৯১৩ সালে বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার 'নোবেল' অর্জন করেছেন। বাংলাসাহিত্যে এই প্রথম বাঙালি কোনো কবি নোবেল পুরস্কার পেল। এই পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে তিনি বাংলাসাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে পৃথিবীর মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন। ফলে বাংলা বাঙালি জাতি বাংলাসাহিত্য স্বগর্বে মাথা উঁচু করে বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে। এবং বিশ্ববাসী বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতিকে নতুন করে চিনেছে এবং জেনেছে। আমরা তার রচনাতে দেশমাতৃকার বন্দনার কথা পাই, দেশপ্রেমের আকুল প্রার্থনার সুর শুনতে পাই এবং দেশকে ভালোবাসার ও দেশকে জানার আহ্বান দেখি। তিনি বলেছেন- 'দেশকে ভালোবাসিবার প্রথম লক্ষণ ও প্রথম কর্তব্য দেশকে জানা। দেশে জন্মালেই দেশ আপন হয় না। যতক্ষণ দেশকে না জানি ততক্ষণ সে দেশ আপনার নয়।'

বিশ্বের অন্য কোনো দেশে যা নেই আমাদের দেশে তা আছে। যা নিয়ে আমরা গর্বিত। আমাদের আছে লালন গীতি, রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি, ভাটিয়ালি, জারিসারি ও মারফতি ইত্যাদি নানা রকমের গান। এসব আমাদের প্রাণ ঐতিহ্য এবং অহঙ্কার আমাদের জাতীয় জীবনে এগুলো প্রেরণার উৎস ও বড় অর্জন। এই নিয়েই আমরা বেঁচে আছি এবং থাকব। বাঙালি জাতির জীবনে বড় অর্জনগুলোর মধ্যে একটা হলো রবীন্দ্রনাথ। সেই রবীন্দ্রচর্চা থেকে যদি আমরা পিছিয়ে পড়ি তাহলে জাতি হিসেবে অনেক পেছনে পড়ে যাব। যেটা আমাদের কাম্য হতে পারে না। সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের প্রাণের টানে, জীবনের টানে, চেতনার টানে, শিল্প ও সাহিত্যের টানে রবীন্দ্রনাথের কাছে বারবার ফিরে যেতে হবে। এটাকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। কবি রবীন্দ্রনাথকে দেবতার (!) চোখে নয়, মানুষ হিসেবেই সদা দেখতে হবে। যেহেতু তিনি তার কাব্যে গানে ভাবে ভাবনায় চেতনায় এই মানুষকেই যথাযথ মূল্যায়িত করেছেন। মানুষ হয়ে মানুষের প্রভু হতে পারে না, দুর্বল মানুষ সবলের দাস হওয়া যাবে না। যুগ যুগ ধরে ক্ষমতাশালীরা ও প্রভাবশালীরা ধর্মের দোহায় দিয়ে সমাজপতি সেজে ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে সমাজে সাধারণ দুর্বল মানুষের প্রতি যে ব্যবহার, লাঞ্ছনা, অবহেলা ও নিপীড়ন করেছে বা করছে তা কবিকে বড়ই আহত করেছে, এবং কবি সত্তাকে বিদ্রোহী করে তুলেছে। কবি বলেছেন-

''কেহ কারো প্রভু নয়,

নহে কেহ দাস।''

কবি আবারও বলেছে-

''যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো

তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছো, তুমি কি বেসেছো ভালো।''

বাঙালি সমাজে এক শ্রেণির হীন নোংড়া মন-মানসিকতার মানুষ আছে যারা কবি রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্য বিবেচনায় ও তার কাব্য প্রতিভার শরীরে ধর্মীয় রঙ লাগিয়ে তাকে অস্বীকার এবং খাটো করার অপচেষ্টা করে থাকে। এমনকি রবীন্দ্রনাথের অমর লেখা গান বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ''আমার সোনার বাংলা/আমি তোমায় ভালোবাসি'' বাঙালির জাতীয় জীবনের এই গানকেও তারা মুছে ফেলতে চায়। এবং এই গানের মধ্যে হিন্দুয়ানির গন্ধ খুঁজে ফেরে। প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক অপশক্তিরাই তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের আমল থেকে বর্তমান পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথকে বাংলা বাঙালির হৃদয় মানসপট থেকে মুছে ফেলার হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল এবং এখনো অনেকেই সেই একই ঘৃণীত কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু এসব নির্বোধ আহম্মকি অসুস্থ হীনচিন্তা চেতনার মানুষরা হয়তো জানে না বা বিশ্বাস করে না যে, রবীন্দ্রনাথকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। কেননা, রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করা মানেই বাংলাসাহিত্যকে অস্বীকার করা। আকাশের মেঘ ছাড়া যেমন বৃষ্টির আশা করা যায় না তেমনি রবীন্দ্রনাথ ব্যতিত বাংলাসাহিত্য বাংলা কবিতা পরিপূর্ণতার রূপ পায় না।

আসলে ঘৃণীত নিন্দুকরা রবীন্দ্রনাথকে যতই অস্বীকার করুক, অবহেলার চোখে দেখুক, এমনকি ধর্মীয় বেড়াজালে আবদ্ধ করে দূরে সরানোর অপচেষ্টা করুক না কেন বাংলা সাহিত্যাকাশে বাংলা কাব্যের কাননে বাংলা শব্দের আকাশে চির উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে অনন্তকাল ফুটে থাকবে। সেখান থেকে তাকে চুল পরিমাণ এতটুকু নিচে নামানোর ক্ষমতা কারো নেই বা কখনোই হবেও না। অতীতে যারাই বারংবার রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে তাকে অবজ্ঞা হেয় করার নোংড়া চেষ্টা করেছে তারাই মিথ্যা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ হয়েছে। আর এখনও কেউ যদি সেটাই করে বা ভাবে তারাও ব্যর্থ হবে, ময়লা আবর্জনায় পতিত হবে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তার অমর মহৎ সাহিত্যকর্মের জন্যই বাঙালি জাতির কাছে মানুষের কাছে যুগযুগ ধরে স্বমহিমায় আত্মসৃষ্টি নিয়ে বেঁচে থাকবে। কেননা, তার লেখা কবিতা গান নাটক গল্পে ইত্যাদি সব রচনার মধ্যেই জীবন লাভের রূপ রস স্বাদ গন্ধ নিবিড় করে আস্বাদন করা যায়। আপনাকে বিকশিত করার উৎকৃষ্ট সুন্দর পথের সন্ধান মেলে।

বাংলা ভাষা বাংলাসাহিত্য আর রবীন্দ্রনাথ একই সূত্রে গাঁথা। একটাকে উপেক্ষা করে অন্যটার পরিপূর্ণতার রূপ প্রকাশ পায় না, বলা যায় অপূর্ণ থেকে যায়। কবি রবীন্দ্রনাথ একজন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী মানুষ ছিলেন। তিনি মূলত একজন সৃষ্টিশীল মননশীল প্রজ্ঞাবান শক্তিশালী সৃজনশীল কবি। বিস্ময়কর জ্ঞানের ব্যক্তি বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ রবীন্দ্রনাথ সর্বোপরি একজন সাহিত্য বিচারে পরিপূর্ণ সফল মানুষ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তিনি তার অমর সাহিত্য কর্মের জন্যই আমাদের কাছে, মানুষের কাছে, সব পাঠকের কাছে, চিন্তাশীল ভাবুকদের কাছে, আপন মহিমায় মহিমান্বিত হয়ে আছে এবং আগামীতেও থাকবে। জয়তু বাংলা, জয়তু বাংলাসাহিত্য, জয়তু আমাদের কবি, বাংলার কবি, বাংলা ভাষার কবি রবীন্দ্রনাথ।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে