logo
রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  আতাতুর্ক কামাল পাশা   ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০  

দুই বছরের দুই প্রজ্ঞা

দুই বছরের দুই প্রজ্ঞা
ওলগা তোকারজুক
প্রায় সবারই জানা আছে সুইডেনের নোবেল কমিটির এক সদস্যের অতৃপ্তকর আচরণে নোবেল কমিটি গত বছর সাহিত্যে আর নোবেল ঘোষণা করেনি। এ বছর তাই দু'জনকে নোবেল পুরস্কার দেয়ার কথা ঘোষণা দিলেন তারা। এ দু'জন হচ্ছেন অস্ট্রীয় নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, কবি ও রচনাবিদ, আদি জর্মন ভাষার লেখক, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক পিটার হান্ডকে ও পোলিশ কবি, ঔপন্যাসিক ও গদ্য লেখক নিরামিষভোজি ওলগা তোকারজুক। প্রায় প্রতিবারই সাহিত্যে নেবেল পুরস্কার ঘোষণার পর পরই পাশ্চাত্য পত্রপত্রিকতায় অনেক সমালোচনার ঝড় ওঠে- যা এবারও থেমে নেই। পুরস্কার ঘোষণার পর পরই নিউইয়র্ক টাইমসে পরদিন শুক্রবার লেখা হলো, ঋড়ৎ সড়ৎব :যধহ ধ পবহঃঁৎু, :যব ঘড়নবষ চৎরুব রহ খরঃবৎধঃঁৎব যধং ড়ভঃবহ নববহ ধ ঢ়ড়ষধৎরুরহম ংঢ়বপঃধপষব, রিঃয পৎরঃরপং ফবহড়ঁহপরহম :যব রিহহবৎং ধং :ড়ড় ড়নংপঁৎব, :ড়ড় ঊঁৎড়পবহঃৎরপ, :ড়ড় সধষব, :ড়ড় বীঢ়বৎরসবহঃধষ, ড়ৎ ংরসঢ়ষু ঁহড়িৎঃযু ড়ভ ষরঃবৎধঃঁৎব্থং যরমযবংঃ যড়হড়ৎ.

তবে সমালোচকরা এর পক্ষে অনেক যুক্তিও দেখিয়েছেন, আফ্রিকার, সিরিয়ারসহ আরো বেশ ক'জন প্রখ্যাত লেখককে কেন এ পুরস্কারের আওতায় আনা হলো না, এমনটি দেখে পেন আমেরিকাও বিস্ময় প্রকাশ করেছে। ঔবহহরভবৎ ঊমধহ, চঊঘ অসবৎরপধ চৎবংরফবহঃ তো হতবাক হয়ে গেছেন।

দু'জন লেখকই বিতর্কিত হিসেবে প্রখ্যাত আলোচকরা মনে করেছেন। তারা বলেছেন, গৎ. ঐধহফশব, যিড় রং ভৎড়স অঁংঃৎরধ ধহফ যিড়ংব সড়ঃযবৎ ধিং ঝষড়াবহরধহ, যধং বংঢ়ড়ঁংবফ হধঃরড়হধষরংঃরপ ারবংি, ধহফ যধং ঢ়ঁনষরপষু বীঢ়ৎবংংবফ ফড়ঁনঃ ধনড়ঁঃ :যব সধংংধপৎবং ড়ভ গঁংষরসং ফঁৎরহম :যব ইধষশধহং ডধৎ. গং. ঞড়শধৎপুঁশ যধং নববহ ধ ভৎবয়ঁবহঃ পৎরঃরপ ড়ভ ৎরমযঃ-রিহম হধঃরড়হধষরংঃং রহ চড়ষধহফ, যিড় যধাব নৎধহফবফ যবৎ ধ :ৎধরঃড়ৎ. ঐবৎ চড়ষরংয ঢ়ঁনষরংযবৎ ধঃ ড়হব ঢ়ড়রহঃ যরৎবফ নড়ফুমঁধৎফং :ড় ঢ়ৎড়ঃবপঃ যবৎ.

তারা এমনও উলেস্নখ করেছেন যে, ওগলা তোকারজুক সাহিত্যে ১১৬ জন পুরস্কার বিজয়ীদের মধ্যে মাত্র ১৫তম নারী বিজয়ী। তারা এও বলেন, সচরাচর ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বের নারীরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে নোবেল পেয়েছেন যার মধ্যে এবার ব্যতিক্রম দেখা গেল। এবারে পেলেন ৫৭ বছর বয়সী এক কনিষ্ঠা নারী। তারা কেনিয়ান ঔপন্যাসিক এমনকি চীনা লেখক ক্যান জু (ঈধহ ঢঁব), সিরিয়ার লেখক আডুনিস, যাদের অনেক বছর ধরে নোবেল দেয়া হচ্ছে বলে জল্পনা-কল্পনা করে আসা হচ্ছিল তাদের কাউকে নোবেল দেয়ার আওতায় আনা হলো না বলে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। বেশ ক'বছর ধরে আসলেই সুইডিস নোবেল কমিটি এক ধরনের চমক দিচ্ছেন বলে মনে হয়। ইউরোপের ছোট্ট একটি দেশ লুক্সেমবার্গ। সে দেশের এলফ্রিদ ইয়ালিয়ানেক (ঊষভৎরবফব ঔবষরহবশ), ২০০৪ সালে যখন নোবেল বিজয়ী হন তখন তার বয়স ছিল ৫৮ বছর। তার ঞযব চরধহড় ঞবধপযবৎ উপন্যাসটি অবলম্বনে হলিউডে সিনেমা তৈরি হলে তা অস্কার পুরস্কার লাভ করলে তিনি অনেকের চোখে আসেন। যদিও সীমিত লেখা নিয়ে নোবেল পান তিনি, তবে তার ভাষাগত লেখা দারুণ চমৎকৃত্বের সৃষ্টি করে। অ্যালিস মুনরো (অষরপব গঁহৎড়) ৮২ বছর বয়সে নোবেল পান, এখনো তিনি লিখছেন, ক'দিন আগে ঞযব ঘবি ণড়ৎশবৎ পত্রিকায় তার একটি শর্ট ফিকশান দেখলাম। আমরা আর এ বিতর্কিত বিষয়গুলোতে না গিয়ে এ নোবেল বিজয়ীদের সাহিত্যিক মূল্যায়নের চেষ্টা করি। কালো কেশী, শ্যাওলা সবুজ রঙের আঁখির ওগলা তোকারজুক ১৯৬২ সালের ২৭ জানুয়ারিতে পোল্যান্ডের সেলচৌয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মা দু'জনই শিক্ষকতা পেশায় ছিলেন, বাবা লাইব্রেরিয়ানেরও কাজ করতেন আর, সেখানেই বইয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মায় ওগলার। ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি মনোবিজ্ঞানে গ্র্যাজুয়েশন করেন। ১৯৯৩ সালে তার প্রথম পোলিশ গদ্য প্রকাশ হলেই তিনি আলোচিত লেখকের পর্যায়ে আসেন যে উপন্যাসটির নাম ইংরেজি অনুবাদের নাম ঞযব ঔড়ঁৎহবু ড়ভ :যব ইড়ড়শ-চবড়ঢ়ষব। সতর শতকে ফ্রান্স ও ইতালীয় সীমান্তের পীরানীয় পর্বতমালা অঞ্চলের একটি রহস্যময় বই হিসেবে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। বইটির বহুল পাঠকপ্রিয়তার জন্য ১৯৯৩-৯৪ সালের পোলিশ পাবলিশার বা পোল্যান্ডীয় প্রকাশক সংস্থার পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে তার তৃতীয় উপন্যাসটি প্রকাশ হলে তা আরো বেশি পাঠকপ্রিয়তা পায়- যা ২০১০ সালে চৎরসবাধষ ধহফ ঙঃযবৎ ঞরসবং ইংরেজিতে বিশ্বের বাজারে আসে। এক সুচারু গাঁথুনিতে কয়েকটি পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে একটি পারিবারিক কাহিনীর সংযোগ রেখে খুবই সূক্ষ্ণভাবে বুনট এটি যা পৌরাণিক বলে দৃশ্যত মনে হলেও বাস্তববাদী এবং স্পষ্ট বিবরণে সমসাময়িক উপন্যাস হিসেবেই গৃহীত হয়। এর কাহিনী ১৯১৪ সাল থেকে শুরু হলেও ওলগা দাবি করেন এতে বিংশ শতকের পোল্যান্ডের চিত্র উঠে এসেছে। তিনি বলেন, উপন্যাসটিতে তিনি পোল্যান্ডের অতীত দিনের গৌরবাদীপ্ত জাতিসত্তার চিত্র এনেছেন। বলা হয়ে থাকে উপন্যাসটি ১৯৮৯ সালের পরের পোল্যান্ডের জাতির মানবিক বিচার ক্ষমতা ও জাতীয় চেতনার অবমূল্যায়নের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম। এটি একটি উচ্চতর শৈল্পিক রচনার ভেতর কল্পনার একটি অসাধারণ উপহার।

সার্বজনীন বর্ণনাকারীর সঙ্গে রৈখিক রূপকথার, একই সঙ্গে শক্ত রূপক তরঙ্গ ছড়িয়ে গেছে তার লেখায় ঐড়ঁংব ড়ভ উধু, ঐড়ঁংব ড়ভ হরমযঃ বইটিতে, ১৯৯৮ সালে। পেলব এক সুন্দর আর সাড়াজাগানো চিন্তা নিয়ে একজন নিজের মাঝে খুঁজে পায় একটা ইচ্ছেশক্তি- যা একটি বিশাল অঞ্চলের বর্ণনা দেয়; যেখানে সাংঘর্ষিক কৃষ্টি প্রচলিত, ব্যক্তিক ভাগ্য ও দৃষ্টিকোণের ভিন্নতা বহমান।

নারীবাদী ওলগা তোকারজুক নিজস্ব দৃষ্টিকোণ দিয়ে মাতৃভূমি পোল্যান্ডকে ভালবেসেছেন যদিও পোল্যান্ডেই এক সময় অন্য আর কিছু মানুষ তাকে অদেশপ্রেমিক হিসেবে চিহ্নিত করছিলেন। কিন্তু তোকারজুক বিশ্বাস করেন পোল্যান্ড ইউরোপের ভেতর এমন একটি দেশ যার নিজস্ব ভাষা, ইতিহাস, নিজস্ব জাতিসত্তা রয়েছে- যা ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক মৌলিক ও শাশ্বত। তিনি মনে করেন তার দেশপ্রেম হচ্ছে তার নিজস্ব স্টাইলে, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে। পোল্যান্ডের ঘড়ধি জঁফধ চধঃৎরড়ঃং অংংড়পরধঃরড়হ তাকে অদেশপ্রেমিক আখ্যায়িত করে একবার হত্যার হুমকি দেয়। তবু তিনি নিজস্ব বলয়ে স্থির থেকে নিজস্ব দৃষ্টিকোণ দিয়ে লিখে গেছেন। তার ঞযব ইড়ড়শ ড়ভ ঔধপড়ন প্রকাশ হলেও তিনি বিতর্কিত হন। এখানে দেখা যায়, আঠারো শতকের ধর্মীয় নেতা জ্যাকব ফ্রাঙ্ক তার নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতে বিভিন্ন সময়ে তার ইহুদি অনুসারীদের জোর করে ইসলাম ও ক্যাথলিক ধর্মে ধর্মান্তরিত করেছিলেন। ২০১৪ সালে বইটি প্রকাশ হওয়ার পর তাকে এক সাক্ষাৎকারে পরামর্শ দেয়া হয় যে, পোল্যান্ডের ইতিহাস শতাব্দীর পর শতাব্দী শত অত্যাচার সয়েও নিজস্ব সংস্কৃতিতে দাঁড়িয়ে থাকার ইতিহাসই শুধু নয়, এর ইতিহাসও ছিল একটি নিজস্ব অধ্যায়ে নিষ্ঠুর। এ বইটি সে সময়ের সবচেয়ে বহুল বিক্রির ধাপ অতিক্রম করে ১৭০,০০০ কপি বিক্রি হয়। বইটি তাকে দ্বিতীয়বার দেশের সবচেয়ে বড় সম্মানজনক পদক নাইক (ঘরশব) এনে দেয়। তবু তার প্রকাশক এ বইটি প্রকাশের পর তার একজন দেহরক্ষী ঠিক করে দেয়।

২০০৭ সালে লেখা তার উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ ঋষরমযঃং ২০১৮ সালে ইংরেজিতে প্রকাশ হলে তিনি ম্যান বুকার পুরস্কার লাভ করেন যার অর্ধেক অর্থ তিনি তার অনুবাদক জেনিফার ক্রফট্‌কে দেন। এ বইতে তিনি আরো বেশি বিশ্বকেন্দ্রিক বা বিশ্বজনীনতায় বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন, যেখানে মানচিত্রের সীমান্তরেখা ভেদ করে তিনি সমজাতির, একই অভ্যাস আর আচরণের জনগোষ্ঠীর মানুষের মাঝে চলে যান। তাঁর পোলিশ ভাষার মূল বইটির শিরোনাম রাশিয়ার একটি পুরনো গনোস্টিক (এহড়ংঃরপ) সম্প্রদায়ের নাম থেকে নেয়া যারা বিশ্বাস করতো যে বিরামহীন চলাচল মন্দ দেবতার বিজয়কে ঠেকিয়ে দেয়। তবে অনেক সময় দেখা যায়, তিনি এ বইতে একটি বিশাল এনসাইক্লোপিডিয়ার ধারণা পোষণ করেছেন। আর এ বিশালতা বা এনসাইক্লোপিডিয়ার কাজকে এবারের কমিটি বিশেষভাবে উলেস্নখ করেছেন।

ওলগা তোকারজুক ২০১৮-এর নোবেল মেডেল লাভ করেন। তার লেখাগুলোতে কিছু কাল্পনিক চরিত্র অতীত ইতিহাসে যুক্তিগ্রাহ্য হিসেবে এসেছে। আবার সে চরিত্রগুলোও বর্তমান শতকের কয়েক প্রজন্মের সঙ্গে এমনভাবে মিলে গেছে যে এগুলোকে সাধারণ জ্ঞান ও বিবেকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তোকারজুক কখনো বাস্তবকে চিরন্তন বা স্থির হিসেবে দেখেননি। তিনি তার উপন্যাসে সাংস্কৃতিক ভিন্নতা, যুক্তি এবং পাগলামি, পুরুষ এবং নারী, দেশ ও বিদেশকে একটি অস্থির চিন্তার ভেতর এনে সেগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। আর এটি তার গল্প বা কথা বলার সময় যুক্তিগ্রাহ্য করার বর্ণনায় সফল হয়ে ওঠে। তিনি তার চারপাশের মানুষদের পাগল মনে করেছেন, তিনি পুরুষ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সংকীর্ণ মনের শিকার হিসেবে বিবেচনা করে তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। এখানে একজন পাঠককে আসলেই দ্বিধান্বিত হতে দেখা যায় যে, কোথায় তিনি তার সহানুভূতি দেখাবেন! এটিই তার সাহিত্য-কীর্তির বিশাল বৈশিষ্ট্য। মন, মনন ও মানসিকতায় তিনি পরিপূর্ণভাবে একজন দেশপ্রেমিক যদিও তাকে অনেকেই অদেশপ্রেমিক বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তার লেখার বা পস্নটের চিত্রকল্প বা রূপকল্প এতটাই মূর্ত করতে পেরেছেন যে, তার শর্ট ফিকশন ও ফিকশনগুলো ২৯টি ভাষায় অনুবাদ হয়ে বিশ্বের বাজারগুলোতে এসেছে। পরন্তু তিনি বিষয় বা ব্যক্তি বা চরিত্রগুলোকে এমন নিপুণ কৌশলে বুনট করতে পেরেছেন যে, তা বিগত জেনারেশানকে যুক্ত করে সামনের আগত জেনারেশনকে সুংযুক্ত করতে পেরেছে। আর এ নিখুঁত কাজটিই তার অসাধারণ প্রজ্ঞা, বলা চলে প্রাপ্তি। তার বিবাহিত জীবন বেশ অস্পষ্ট, তবে একজন মনোবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রকে তিনি বিয়ে করেছিলেন, শুধু এটুকুই জানা যায়।

দ্বিতীয় প্রজ্ঞা

অস্ট্রীয় নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, কবি ও রচনাবিদ পিটার হ্যান্দকে আদি জর্মন ভাষায় লিখেছেন। এ কারণে প্রথম থেকেই তার লেখা পাঠকের দৃষ্টিতে পড়ে যায়। জার্মানির ভাষা শুধু জার্মানিতেই প্রচলিত নয়, সুইজারল্যান্ডের অর্ধেক স্থানে, লুক্সেমবার্গে এ ভাষা, কথ্য ভাষা হিসেবে প্রচলিত রয়েছে, এ ছাড়াও আরো কয়েক কলোনিতে যেগুলো বর্তমানে স্বাধীন দেশ হিসেবে পরিচিত, সেখানেও দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে প্রচলিত। পিটার হান্ডকে ১৯৪২ সালে অস্ট্রিয়ার ক্যারেনথিয়া নগরের ছোট্ট একটি শহর গ্রিফিনে ৬ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার সাধ ছিল তিনি একজন পুরোহিত হবেন এবং সে আশায় কিশোর বয়সেই একটি খ্রিস্টীয় যাজক সম্প্রদায়ের বিদ্যালয়ে ঢুকে পড়েন এবং সেখানে ১৯ বছর পর্যন্ত সময় কাটান। পরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি আইনবিদ্যা পড়বেন। তাঁর জন্মস্থানটি ছিল শান্ত, সুন্দর পাহাড়ঘেরা, নীল হ্রদে মেশা একটি ছোট্ট সুন্দর শহর, স্বম্ভবত এ কারণেই তিনি কিশোর বয়সেই এমনটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে এখানে তার পারিবারিক পরিবেশটিও বুঝতে হবে। হান্ডকের মা কোরিন্থীয় স্থানীয় স্স্নোভোনীয় মেয়ে যিনি ১৯৭১ সালে আত্মহত্যা করেন। তখন পিটার হান্ডকের বয়স প্রায় চলিস্নশ। কিন্তু এই মায়ের সঙ্গেই আবারো গ্রিফিনে এসে পুনরায় বসবাস করার আগে তিনি ১৯৪৪ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত রাশিয়া অধিকৃত বার্লিনের পাকৌ জেলায় ছিলেন। এখানেই তার সৎ বোন, মনিকার জন্ম হয় ১৯৪৭ সালে। হান্ডকে তার বাবার অ্যালকহলের প্রতি আসক্তির ভয়াবহতা এখানেই দেখেন। এরপর পরিবারটি আবারো মায়ের শহর গ্রিফিনে ফিরে যায়। পিটার হান্ডকের রক্তের সম্পর্কের পিতা, এনরিখ সনেমানের সঙ্গে অনেক পরে প্রাপ্ত বয়সে হান্ডকের দেখা হয়। তিনি একজন জর্মন সৈনিক ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে ব্যাংক করণিক হিসেবে কাজ করতেন। তার মা মারিয়া, ক্যারেন্থীয় স্স্নোভান নারী পরে একজন ট্রাম কন্ডাকক্টর ওহেরম্যাচকে বিয়ে করেন। তিনিও বার্লিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একজন সৈনিক ছিলেন।

যখন আইন মহাবিদ্যালয়ে হান্ডকে পড়া শুরু করেন তখন থেকেই তিনি ম্যানুসক্রিপ্ট নামে একটি পত্রিকায় ছোট ছোট লেখা ছাপানো শুরু করেন। এর পরই ১৯৬৫ সালে আইন পাঠ শেষ করে এলে তিনি পুরোপুরি লেখালেখির কাজে নিজেকে যুক্ত করেন। ১৯৬৬ সালে তার প্রথম উপন্যাস দ্যা হর্নেটস্‌ (ঞযব ঐড়ৎহবঃং) প্রকাশ পায়। আর তার পরের বছরই প্রকাশ পায় দ্যা পেডলারস্‌ (ঞযব চবফফষবৎং)। দ্যা হর্নেটস্‌য়ে দেখা যায় একজন অন্ধ মানুষ তার অন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে কিভাবে পৃথিবীকে দেখতে চেয়েছিলেন এবং কিভাবে তিনি নিজেকে পুনঃনির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। এখানে একজন মানুষের অন্ধ হয়ে যাওয়ার আগের চেতনাশক্তির প্রকাশ ঘটেছে। দ্যা পেডলারস্‌য়ে সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গিতে কাফকেসের হত্যা রহস্যের বর্ণনা করা হয়েছে। হান্ডকে ভয় এবং উদ্বেগের মানসিক অবস্থাটি শারীরিক বাস্তব জগতের ওপর যে প্রভাব ফেলে তার বর্ণনা করেছেন। দু'টো কাজই তার দক্ষ নির্মাণ কুশলীর বড় ধরনের সৃষ্টি বলে বিবেচিত হয় সে সময়। তার এই দক্ষ নির্মাণ কৌশলই পরবর্তী সময়ে তার নাটক ও উপন্যাসকে আরো জনপ্রিয় করে তোলে। প্রখ্যাত আলোচক নিকোলাস হার্ন তার বইতে পিটার হান্ডকের এ রীতি বা ধারাটি তার আইন অধ্যায়নের ফসল বলে বর্ণনা করেছেন, 'সময় ও রীতির সঙ্গে অ-আনুক্রমিক বা সর্বযুগব্যাপী একটি একক বাক্যের ব্যবহার'-এর ফসল হিসেবে।

হান্ডকে নিজেই এ সময়ে তার মানসিক প্রক্রিয়ার কথাটি এভাবে বলেন যে, আমি আইভরি টাওয়ারে বাস করতাম। মৃতু্য এবং যন্ত্রণার ভাষাগুলোকে যুক্তিগ্রাহ্য করে তুলতে একটি বিমূর্ত ভাষার আবিষ্কার আমার পক্ষে ভয়াবহ কঠিন ছিল। 'আমার আগের সাহিত্যিক উপস্থাপনায় মৃতু্য ও মুমূর্ষুকাতর যন্ত্রণার সাহিত্যিক বর্ণনা এসব চিন্তাধারা বদলে দেয়। তারা নিজেরাই আমার মৃতু্য ও মুমূর্ষুকাতর যন্ত্রণার ধারণাগুলো বদলে দেয়। তখন আইন বিদ্যার একটি পদ্ধতি সাহিত্যে অনুপ্রবিষ্ট ঘটাই। এমনকি তাতে করে কিছু বাক্য আইনের সত্যিকার ধারা হয়ে দাঁড়ায়।'

অধিকাংশ আলোচক (বা সমালোচক) একমত হয়েছেন যে, হান্ডকের প্রথম ধারার লেখা পড়ে একটি দীর্ঘ আইনি দলিলের মতো ওসব মনে হয়েছে তাদের কাছে। এটিকে আবেগপ্রসূত, সুন্দর সজ্জিতকৃত এবং ধারাবাহিক বর্ণনারীতির সাহিত্যের পরিভাষাকে পরিহার করেছে। এতে হান্ডকে যুদ্ধত্তোর সহযোদ্ধা জর্মন লেখকদের সাহিত্য পরিভাষাকে তুচ্ছজ্ঞান করেছেন এবং নিন্দা করেছেন। জর্মন সাহিত্যিক ও সমালোচকদের ২৮তম সভায় তার এ ধিক্কার আর সংক্ষুব্ধ আক্রমণ উচ্চারিত হয়। এখানে তিনি 'গ্রম্নপ-৪৭'-কে ১৯৬৬ সালের এপ্রিলে প্রিন্সটনে বেত্রাঘাত করেন এই বলে যে তারা নির্বোধের মতো এবং সাজানো গোছানো গদ্যের ভেতর দিয়ে চলছে- যা অনেকটা 'চিত্রিত এনসাইক্লোপিডিয়া'র মতো একটি মিথ্যে দৃশ্য সত্য বলে মানুষের চোখের সামনে তুলে ধরছে। মাত্র ২৪ বর্ষের এক তরুণ হান্ডকে, যে কিনা তখন পর্যন্ত সাহিত্যে অনেক কিছু দিতে পারেনি, প্রচলিত ধারার সাহিতের প্রতি তারা এত কটাক্ষপাত করছে ও সাহস প্রদর্শন করছে দেখে 'গ্রম্নপ-৪৭' সেদিন তার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।

নাটকের ক্ষেত্রেও তাই। তিনি এগুলোকে শোরগোল হিসেবে বললেন। এগুলোতে বাস্তবের প্রতিফলন না ঘটিয়ে কেবল দর্শকদের মাঝে এক মায়াবিভ্রম ঘটানো হচ্ছে এবং বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যে, মঞ্চে বাস্তব পৃথিবীর ছবি তুলে ধরা হচ্ছে। অভিনেতারা চরিত্রগুলোতে বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলার বদলে মঞ্চে স্রেফ অভিনয় করে যাচ্ছে। অভিনেতারা দর্শকদের আপত্তিকে এড়িয়ে যাচ্ছে, নিজেদের আত্মতুষ্টি আর সাহসিকতা দিয়ে দর্শকদের পরিহাস করছে।

পরের বছরই হ্যান্দকের সাহিত্যিক সুনাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে আর এই ১৯৬৮ সালেই তিনি বার্লিনে 'গারহার্ট হাম্পটন' পুরস্কার পান যখন মে মাসে তার পূর্ণ দৈর্ঘ্য নাটক 'ক্যাসপার' ফ্যাঙ্কফুট ও ওবারহসামে প্রদর্শিত হলো। এ বছরই দেশের প্রখ্যাত পত্রিকা 'থিয়েটার হুট' নাটকটিকে বছরের সেরা নাটক বলে মনোনয়ন দেয়। পরের বছরও তার ভাষাগত সচেতনা ও শৈল্পিক চেতনা নিয়ে লেখা ক্যাসপার নাটকটি হলমার্ক কান্ড হিসেবে সাড়া জাগালো। তবে কেউ কেউ এটিকে বিরক্তিকর, ভান করা ধরনের কাজ বলতেও ছাড়েনি। পরবর্তী বছর গু ভড়ড়ঃ, সু :ঁঃড়ৎ নাটকটি দেখে সমালোচকরা স্তম্ভিত হয়ে যান, বাকরুদ্ধ হয়ে যান, যারা কিছুই বলতে পারেননি। বরং নির্বাক এ কাজটিকে পরে তারা স্যামুয়েল বেকেটের 'ডরঃযড়ঁঃ ড়িৎফং্থ-এর সঙ্গে তুলনা করেন।

১৯৬৯ সালের বসন্তে তার প্রথম কবিতা সংহিতা ঞযব ওহহবৎ ডড়ৎষফ ড়ভ :যব ঙঁঃবৎ ডড়ৎষফ ড়ভ :যব ওহহবৎ ডড়ৎষফ প্রকাশিত হয়। এর অল্প কয়েক মাস পর তার ঞযব জরফব ড়াবৎ খধশব ঈড়হংঃধহপব রহ-প্রথম মঞ্চায়ন হয়।

এ বছরই তার তৃতীয় উপন্যাস ঞযব এড়ধষশববঢ়বৎ্থং ধহীরবঃু ধঃ ধ চবহধষঃু করপশ প্রকাশ পায়। এ বইয়ে একটি ভীষণ বিভ্রান্ত, এলোমেলো মাথার কিশোর বয়সীর অসচেতন অবস্থায় নিজেকে হত্যা করার গল্প পাওয়া যায় যেখানে হ্যান্দকের স্বভাব বরাবরের মতো নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন আগন্তুক, হিংস্রতা আর সামাজিক কপটতায় আচ্ছন্ন মানসিকতায় ভরা। ১৯৭২ সালে তার ঝযড়ৎঃ ষবঃঃবৎ ও ১৯৭৮ সালে ঞযব খবভঃ-ঐধহফবফ ডড়সধহ উপন্যাস দু'টি প্রকাশিত হয়।

এর মাঝে ১৯৭৪ সালে তিনি আরো একটি বই লেখেন। ১৯৭১ সালে তার মা আত্মহত্যা করেন। এটি তার জীবনকে দারুণভাবে আলোড়িত করে। এ নিয়ে তিনি জীবনের বিভিন্ন নিঃসঙ্গতার দিকগুলো গভীর আন্তঃলোক থেকে তুলে আনেন। এ মাতাই তাকে জীবনের অনেকটা দিন বুকে আগলে রেখেছেন বিভিন্ন প্রতিকূলতা সত্ত্ব্বেও।

নিজস্ব রীতিতে তিনি আরো বেশ কিছু বই লিখেছেন। ১৯৭৯ সালে তিন খন্ডে লেখেন ঝষড়ি ঐড়সবপড়সরহম, ১৯৯৭ সালে লেখেন ঙহ ধ উধৎশ ঘরমযঃ খবভঃ গু ঝরষবহপব ঐড়ঁংব। ২০০২ সালে তিনি লেখেন ঞযব এৎবধঃ ঋধষষ আর তার পর ২০১৭ সালে লেখেন ঞযব ঋৎঁরঃ ঞযরবভ; ড়ৎ, অ ঝরসঢ়ষব ঞৎরঢ় রহঃড় :যব ওহঃবৎরড়ৎ। নোবেলে মনোনীত করে যখন তার নাম ঘোষণা করা হচ্ছিল, তখন সুইডিশ ভাষার পাশাপাশি ইংরেজিতেও তার লেখার স্বরূপ এভাবে বলা হচ্ছিল যে, ুরহভষঁবহঃরধষ ড়িৎশ :যধঃ রিঃয ষরহমঁরংঃরপ রহমবহঁরঃু যধং বীঢ়ষড়ৎবফ :যব ঢ়বৎরঢ়যবৎু ধহফ :যব ংঢ়বপরভরপরঃু ড়ভ যঁসধহ বীঢ়বৎরবহপব" অর্থাৎ ভাষার মৌলিক দিকটি নিয়ে তার সুদক্ষ কাজ মানুষের অভিজ্ঞতার বৈশিষ্ট্য ও পরিধি অর্জন করেছে।

এটি ঠিক যে, পিটার হান্ডকে প্রায় ৭৯ বছর বয়সে নোবেল পুরস্কারের সম্মানে ভূষিত হলেন। কিন্তু তিনি ভাষা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। জর্মন ভাষার মৌলিক রূপটিই তিনি ব্যবহার করেছেন। তা দিয়ে আধুনিক একবিংশ শতকের কাজ করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এর পরও তার লেখাগুলোতে রয়েছে অনেক মৌলিক কাজ যেখানে প্রকট বাস্তবতা উঠে এসেছে। উঠে এসেছে মানুষের না বলা অথচ অনুভূত কথাগুলো। এই দৃঢ় ও সুনির্দিষ্ট দায়িত্বটি তিনি সফলভাবে সম্পাদন করে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, যে কোনো পরিবেশে মানুষ নিজ ভাষায় সফল যোগাযোগ সম্পাদন করতে পারে। যদিও গত বৃস্পতিবার ১০ অক্টোবরের সন্ধ্যায় সুইডেনে পিটার হান্ডকেকে ২০১৯ সালের নোবেল বিজয়ী বলে ঘোষণা দেয়া হলো যার পরপরই ইউরোপ ও আমেরিকায় সমালোচনার ঝড় উঠল যে, "একজন যুদ্ধাপরাধী যুগোস্স্নাভীয় নেতা স্স্নোবোদান মিলোসেভিকের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে একজন শ্রম্নতিমধুরকে পুরস্কার দেয়া হলো" তারপরও তাকে নন্দনতাত্ত্বিক ও উত্তরাধুনিক সাহিত্যিক বলে চিহ্নিত করা যায়।

যে যা-ই বলুক, সাহিত্য মৌলিকভাবে মনের খোরাক। মানুষ অবসরে এটি পাঠ করে। পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা মানসিকভাবেও চিন্তা করে। আর এ মানসিক চিন্তার ফলেই তার অবসর সময়টি হয়ে ওঠে একটা চরম যৌনক্ষুধাসম্পন্নহীন অপর একটি আনন্দময় সময়। আর এ আনন্দের কাজ করাটাই সাহিত্যের ধর্ম। সে হিসেবে সম্প্রতি নোবেলখ্যাতদের লেখামালা মানুষকে একটু ভাবাবে, নতুন করে জীবন, বাস্তব ও মানবিক চিন্তাগুলোকে সাজাতে সাহায্য করবে-- এ তো বিশ্বের সৃজনশীল কর্মকান্ডের ধর্মই। এতে আর অবাক হওয়ার কীই বা আছে !
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে