logo
রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১ ফাল্গুন ১৪২৬

  জসিম উদ্দীন   ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

একুশে বইমেলা ও বিকশিত তারুণ্য

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বই উৎসব 'অমর একুশে বইমেলা-২০২০'। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতিবছর এই বইমেলা বাংলা একাডেমি প্রান্তরের সামনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। এই বই মেলার প্রথম যাত্রা শুরু হয়েছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রম্নয়ারি তারিখে। চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বাংলা একাডেমির বটতলায় এক টুকরো চটের উপর, কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে বইমেলার গোডাপত্তন করেন। এই ৩২টি বই ছিল চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাসাহিত্য পরিষদ (বর্তমান মুক্তধারা প্রকাশনী) থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশি শরণার্থী লেখকদের লেখা প্রথম বই। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি একাই বইমেলা চালিয়ে যান। ১৯৭৬ সালে তার দেখাদেখি অন্যান্যরা অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমিকে মেলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭৯ সালে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে মেলার নামকরণ করা হয় 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা। ২০১৪ সাল থেকে এই বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মাঠে ব্যাপক আয়োজনের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

বইমেলা মানে জ্ঞানের মেলা। যেখানে প্রবীণ, তরুণ, আবালবৃদ্ধ সবার জ্ঞানের সমাহারে সৃষ্ট জ্ঞান কালো অক্ষরে বাঁধাই করা হয় সাদা কাগজে মোড়ানো বইয়ের মাঝে। বইমেলা মানে বইপ্রেমী পাঠকদের জন্য এক অনন্য আনন্দের মেলা। তীব্র জ্ঞান ক্ষুধা আহরণের মেলা। যেখানে বইপ্রেমী পাঠকরা ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে ভিড় জমায় বইমেলায় তাদের প্রিয় লেখকের বই কেনার জন্য। কিন্তু বড়ই অনুতাপের বিষয় হলো বাংলাসাহিত্যের অনন্য নক্ষত্র কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আহমদ ছফা, হুমায়ূন আহমেদেরসহ অন্যান্যের পর তেমন কোনো উলেস্নখযোগ্য লেখকের আবির্ভাব ঘটেনি। যা বই পড়ুয়া পাঠকদের জন্য চরম উদ্বেগ এবং কিছুটা হতাশার বিষয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কী আমাদের দেশে দিন দিন মেধাবীরা হারিয়ে যাচ্ছে? লেখক কী আমাদের দেশে আর জন্ম নিচ্ছে না! উত্তর 'হ্যা' আমাদের দেশে অনেক মেধাবী আছে এবং অনেক উদীয়মান লেখক আছে। যারা প্রতিনিয়ত আমাদের জন্য নতুন সৃজন করার জন্য ব্যস্ত থাকে। এ জন্য প্রতিবছর আমরা বইমেলার সময় দেখতে পারি যে, আমাদের দেশে কিছু তরুণ উদীয়মান লেখকের আবির্ভাব ঘটে যারা অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে তাদের লেখা বই বইমেলাতে প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু তরুণ এবং অপরিচিত লেখক হিসেবে পাঠকরা সেসব বইয়ের সঠিক মূল্যায়ন কিংবা কিনতে অগ্রগামী হয় না। যার ফলে সেই উদীয়মান তরুণ লেখক তার লেখালেখির স্প্রিহা হারিয়ে ফেলে।

কারণ তার লেখার সঠিক মূল্যায়ন করা হয়নি। এভাবে সে হতাশাক্রান্ত হয়ে সাহিত্যচর্চা কিংবা লেখালেখি ছেড়ে দেয়। হারিয়ে যায় একটি সুপ্ত প্রতিভা। হারিয়ে যায় তারুণ্যের বিকাশধারা। আমরাও হারিয়ে ফেলি এক অনন্য সুপ্ত আবিষ্কারকে। যার ধারাবাহিকতা সেই আদি থেকে শুরু হয়ে আসছে। আমাদের চোখের সামনে যত্নের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক মেধাবীর সুপ্ত জ্ঞানের ধারা।

আমরা জানি এ দেশে আর কখনই রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, ছফা, হুমায়ূন এবং অন্যরা জন্মাবে না। কিন্তু তাই বলে কী আর তাদের মতো লেখক আর পাবো না! উত্তর 'হ্যা' অবশ্যই আমরা তাদের মতো জ্ঞানীগুণী লেখক পাবো। কেননা, তাদের প্রতিভার মতই আরো অনেক প্রতিভাবান প্রতিনিয়ত জন্মাচ্ছে এবং জন্মাবে আমাদের দেশে। শুধু আমরা তাদের সঠিক মূল্যায়ন করলেই জ্ঞানের জগতে সৃজনশীলতা দিয়ে তারা অগ্নি শিখার মতো জ্বলে উঠবে। আহমদ ছফা তার অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী উপন্যাসে বলেছিল যে 'ঢাকা শহরে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি।' আহমদ ছফার কথাটি আমরা মুখে মুখে বললেও সত্যিকারার্থে কয়জন কবি কিংবা লেখকে আমরা আবিষ্কার করতে পারি। কোনো তরুণ লেখক তার সৃজনশীলতা দ্বারা কিছু সৃষ্টি করলে আমরা তাকে অনুপ্রেরণা না দিয়ে সমালোচনার ঝড় বইয়ে দেই। কীভাবে তাকে পেছনে টেনে নিয়ে আসা যায় সে পথ খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে যাই। যার ফলে সেই তরুণ লেখক কিছু সৃষ্টি করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলে। তার মাঝে যে নতুনত্বের বিকাশ স্ফীত হয়ে আছে সেটা সেখানেই চাপা পড়ে যায়। এভাবে বিলীন হয়ে যায় সুপ্ত প্রতিভার। সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত হতে না দিলে একটি জাতি কীভাবে উন্নতি করবে! কীভাবে জাতি জ্ঞানের জগতে নতুন নতুন দ্বার উন্মোচন করবে! কীভাবে বিকশিত হবে শত ভাবনার!এসব বিষয় নিয়ে কিঞ্চিত ভাবলেই কিন্তু আমরা সে উত্তর পেয়ে যাই যে, তারুণ্যই নতুনত্বের একমাত্র হাতিয়ার।

তাই আমাদের উচিত নতুনদের অবহেলা করা নয়, অবমূল্যায়ন করা নয় বরং তাদের অনুপ্রাণিত করা। নতুনদের সৃষ্ট কোনো বিষয়ে ভুল হলে সেটা পেছন থেকে সমালোচনা না করে তার সামনে উপস্থিত থেকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও অমর অকুশে বই মেলায় (২০২০) অনেক প্রতিভাবান তরুণ লেখকরা আশা নিয়ে বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে বই প্রকাশ করেবে। আমাদের উচিত সে সব বই ক্রয় করে তরুণ উদীয়মান প্রতিভাবান লেখকেদের খুঁজে বের করে আনা। সেসব তরুণ লেখককে আরো নতুন কিছু সৃষ্টি করার অনুপ্রেরণা দান করা। আমরা জানি, একজন লেখককে তখনই মূল্যায়ন করা হয় যখন সে লেখকের বই বাজার থেকে পাঠকরা ক্রয় করে। তাই সর্বশেষ কথা তরুণদের অবমূল্যায়ন নয়, সুস্থ মূল্যায়নের মাধ্যমেই এবাবের অমর একুশে বইমেলায় বিকশিত হোক হাজারো তরুণ ভাবনার।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে