logo
বৃহস্পতিবার ১৭ অক্টোবর, ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬

  আলীজা ইভা   ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০  

মেঘ পাহাড়ের টানে

মেঘ পাহাড়ের টানে
এই শীতে মেঘ পাহাড়ের টানে অনেকেই বেড়াতে বের হন ছবি : ইন্টারনেট
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ফুট উঁচু বান্দরবানের প্রাকৃতিক সৌন্দযের্র কারণে ভ্রমণপিপাসুদের মধ্যে আকষর্ণীয় হয়ে উঠছে। তবে ৩৩ কিলোমিটার দীঘর্ এ পথের মাঝখানে থাকা ‘ডিমপাহাড়’ এলাকাটি পযর্টকদের বেশি নজর কাড়ছে।

জেলার থানচি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্যহ্লাচিং মারমা জানান, দেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের ওপর থানচি-আলীকদম সড়কের মাঝপথে অবস্থিত ডিমপাহাড় এলাকাটি জেলার অন্যতম পযর্টন কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অজর্ন করতে শুরু করেছে। কারণ পুরো ৩৩ কিলোমিটার সড়কপথজুড়েই প্রাকৃতিক সৌন্দযের্র লীলাভ‚মি। রকমারি ফুল-ফলে আচ্ছাদিত সবুজ গাছ-গাছালিতে ঠাসা এই সড়কপথ। পিচঢালাই অঁাকাবঁাকা পথে এসব দৃশ্য দেখে ভ্রমণপিপাসুরা মনের ভেতর স্পন্দন খুঁজে পান।

পুরো সড়কপথের সঙ্গে যোগ হয়েছে সবুজপাহাড় আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ছোট-ছোট পাড়া, গ্রামগুলোর বৈচিত্র্যময় মানুষের জীবনধারা ও পথচলা। তবে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এখনো বিপদমুক্ত নয়, এমন এলাকাগুলোয় পযার্প্ত পরিমাণ নিরাপত্তা চৌকি কিংবা নিরাপত্তা ক্যাম্প বসানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।

বগুড়া থেকে ভ্রমণে আসা একদল তরুণ পযর্টক জানান, তারা তিনদিন আগে আলীকদম হয়ে থানচি উপজেলা সদরের সড়কপথ ভ্রমণ করেছেন এবং সেখানে তারা ডিমপাহাড় নামক স্থানে বিশ্রাম করে বেশ আনন্দ উপভোগ করেছেন। তারা আরও জানান, কেবল ডিমপাহাড় এলাকাটিই নয়, ৩৩ কিলোমিটার দীঘর্ থানচি-আলীকদম উপজেলা সড়কের প্রতি ১০ কিলোমিটার পর পর একটি করে পথিক বা পযর্টকদের জন্য অস্থায়ী বিশ্রামাগারসহ নিরাপত্তা চৌকি নিমার্ণ করা আবশ্যক। এসব নিমির্ত হলে ভ্রমণপিপাসুরা এ সড়ক ব্যবহারে আরও আগ্রহ এবং স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন বলে তারা জানিয়েছেন।

উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশ বিভাগের কমর্কতার্রা পযর্টকদের নিরাপত্তা বিষয়ে জানান, জেলার অভ্যন্তরীণ সড়কের পাশে পৃথকস্থানে স্থাপিত নিরাপত্তা চৌকিগুলোয় যাতায়াতকারী পযর্টকসহ যাত্রীবহনকারী যানবাহনগুলোর চালক এবং যাত্রীদের জরুরি মোবাইল নাম্বারসহ ডাটা লিপিবদ্ধ করা হয়। যাতে যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো যায়। যাতে পযর্টকরা সমস্যায় না পড়েন তার জন্য গাইডের ব্যবস্থাও রয়েছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের চকরিয়া বাস স্টেশন থেকে আলীকদমমুখি বাস কিংবা ছোট যানবাহনে আলীকদম উপজেলা সদরে যাবেন। সেখান থেকে হালকা যানবাহনে সহজেই যাওয়া যায় ‘ডিমপাহাড় এলাকা’। আবার বান্দরবান জেলা সদর হয়ে থানচি উপজেলা সদর থেকে যে কোনো হালকা যানবাহন চেপেই দ্রæত সময়ের মধ্যে ভ্রমণ করা যায় ওই সড়কপথে। তবে প্রাইভেট গাড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতকর্তা হিসেবে পাহাড়ে যানবাহন চালাতে দক্ষ এমন চালককেই সঙ্গে আনা আবশ্যক।

কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলা সদর থেকে আলীকদম-থানচি সড়কপথে যাওয়ার সময় লামা উপজেলার টপহিল মিরিন্জা পযর্টন কেন্দ্র এবং আলীকদম উপজেলা সদরের কাছে পযর্টন কেন্দ্র আলী ছড়ংগ দশের্নর সুযোগ পাবেন। জেলা সদর হয়ে থানচি-আলীকদম সড়কপথ ভ্রমণে গেলে দশর্নীয় স্থান প্রান্তিক লেক, নীলাচল, রাজবাড়ী, শৈলপ্রভাত, চিম্বুক পাহাড়, জিয়া পুকুর, সুভ্রনীলা, নীলগিরি এবং জীবননগর অবলোকনের সুযোগ রয়েছে। এখন পযর্টকদের ভ্রমণ মৌসুম না হওয়া সত্তে¡ও প্রতিদিনই বিশেষ করে শুক্রবার-শনিবারসহ সরকারি বন্ধের দিন বিপুল পযর্টকের সমাগম ঘটছে বান্দরবানে।

এদিকে পাবর্ত্য জেলা রাঙামাটিতে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘এক্সক্লুসিভ পযর্টন জোন’ বা বিশেষ পযর্টন এলাকা। এতে বদলে যাবে রাঙামাটির পযর্টন চিত্র। ইতোমধ্যে মাস্টার প্ল্যান তৈরি করে সরকারকে ডিপিপি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পে ১২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি পাবর্ত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠিয়েছে রাঙামাটি পাবর্ত্য জেলা পরিষদ। এটি বতর্মানে অনুমোদনের অপেক্ষায় বলে জানিয়েছে জেলা পরিষদ।

পযর্টন করপোরেশনের কতৃর্পক্ষ জানান, এ কয়দিন ধরে পযর্টকের আগমন শুরু হয়েছে। বতর্মানে পযর্টন মোটেলের কক্ষগুলো প্রায় সময় শতভাগ বুকিং থাকছে। বিশেষ করে সরকারি ছুটির দিনগুলোতে পযর্টকদের আগমন বেশি থাকে। ছুটির দিনে পযর্টকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে রাঙামাটি। প্রতি শুক্র-শনিবারসহ সরকারি ছুটির দিনে কয়েক হাজার পযর্টকের আগমন ঘটে।

রাঙামাটিতে পযর্টন কমপ্লেক্সের পাশাপাশি কাপ্তাই লেকে নৌ ভ্রমণসহকারে জেলা প্রশাসকের বাংলো, পলওয়েল লাভ পয়েন্ট স্পট, রাজবন বিহার, চাকমা রাজার বাড়ি, সুবলং ঝরনা স্পটসহ ঘোরার জন্য আশপাশে বিভিন্ন দশর্নীয় স্পট ও স্থাপনা রয়েছে।

শহরের দোয়েল চত্বরের আবাসিক হোটেল ‘প্রিন্স’-এর মালিক মো. নেছার আহম্মেদ জানান, এখন অনেক পযর্টক রাঙামাটি বেড়াতে আসছেন। আবাসিক হোটেলে পযর্টকদের অগ্রিম বুকিং অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষ জানান, এক্সক্লুসিভ পযর্টন জোন গড়ে তোলার লক্ষ্যে গৃহীত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্রæত বদলে যাবে রাঙামাটির পযর্টন চিত্র। গড়ে উঠবে বিশ্বমানের আধুনিক সৌন্দযর্মÐিত বিভিন্ন স্থাপনা। আর রাঙামাটি পরিণত হবে আন্তজাির্তক পযর্টন নগরীতে। পাবর্ত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবির্ক তত্ত¡াবধানে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে রাঙামাটি পাবর্ত্য জেলা পরিষদ।

রাঙামাটি পাবর্ত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা বলেন, রাঙামাটি আসলে পযর্টনের জন্য খুবই আকষর্ণীয় অঞ্চল। এখানে পাহাড়, হ্রদ, ঝরনার সমন্বয়ে গড়া প্রকৃতি যে কাউকে আকৃষ্ট করে তোলে। কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও কমর্পরিকল্পনার অভাবে পযর্টনের দিক থেকে রাঙামাটি এখনো পিছিয়ে। তাই রাঙামাটির পযর্টনশিল্পের উন্নয়নে জেলা পরিষদ এরই মধ্যে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছেÑ যা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এখানকার পযর্টনশিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগালে জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে দ্রæত অথৈর্নতিক অবস্থা পাল্টে যাবে।

বৃষ কেতু চাকমা আরও বলেন, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও জেলা পরিষদ আইনের শতর্ অনুযায়ী ২০১৪ সালে পযর্টন বিভাগটি তিন পাবর্ত্য জেলা পরিষদকে হস্তান্তর করে সরকার। এর পর রাঙামাটি জেলায় পযর্টনশিল্পের উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে রাঙামাটি পাবর্ত্য জেলা পরিষদ। এক্সক্লুসিভ পযর্টন জোন গঠনে যে মহাপরিকল্পনাটি হাতে নেয়া হয়েছেÑ সেটি বাস্তবায়িত হলে রাঙামাটি জেলার পযর্টন কেন্দ্রগুলোর আকষর্ণ যেমন বাড়বে, তেমনি সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর লোকজন আত্ম-কমর্সংস্থান গড়ে তোলার সুযোগ পাবে।

রাঙামাটি পাবর্ত্য জেলা পরিষদের দায়িত্বশীল কমর্কতার্রা জানান, প্রকল্পটি ডিপিপি অনুমোদনের অপেক্ষায়। পরিকল্পনাটির সুষ্ঠু বাস্তবায়নসহ এর ব্যবস্থাপনায় একটি পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের জন্য পাবর্ত্য মন্ত্রণালয়ে খসড়া পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ‘পাবর্ত্য চট্টগ্রাম পযর্টন উন্নয়ন বোডর্’ নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা গঠনের প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে।

জেলা পরিষদের নিবার্হী প্রকৌশলী কাজী আবদুস সামাদ বলেন, মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী রাঙামাটি শহরের ফিশারিঘাট থেকে পুরাতন বাস স্ট্যান্ড পযর্ন্ত যে সংযোগ বঁাধটি রয়েছে, তার দুই পাশে পযর্টকদের জন্য আন্তজাির্তক মানের গ্যালারি নিমার্ণ, উভয়দিকে আশপাশের দ্বীপগুলোকে সংযুক্ত করতে আধুনিক মানের ক্যাবল ব্রিজ নিমার্ণ, ক্যাবল কার সংযোগ স্থাপন, কাপ্তাই হ্রদের ভাসমান টিলাগুলোতে রেস্টুরেন্ট, গেস্ট হাউস নিমার্ণ, সরকারি পযর্টন মোটেল এলাকায় আধুনিক মানের বিনোদন স্পট, সুইমিংপুল, ক্যাবল কার সংযোগ স্থাপন, প্যাডল বোট, ওয়াটার ট্যাক্সি চালু, শহরের জিরো পয়েন্টে লাভপয়েন্ট স্পট উন্নয়ন, লুসাই হিলে আবাসিক গেস্ট হাউস নিমার্ণ, বালুখালী হটির্কালচার এলাকায় কমিউনিটি সেন্টার ও ক্যাবল ব্রিজ নিমার্ণ, শহীদ মিনার এলাকায় ৪০ কক্ষের একটি আবাসিক হোটেল নিমার্ণ, সুবলং ঝরনা স্পটটির উন্নয়ন, নিবার্ণপুর বৌদ্ধ বিহার স্পট উন্নয়ন, শহরের প্রবেশ মুখ মানিকছড়ি এলাকায় পযের্বক্ষণ টাওয়ার স্থাপন, আসামবস্তি-কাপ্তাই সড়কে গ্যালারি স্টেট ভিউ সাইট নিমার্ণ, ঘাগড়ায় ক্যাফেটোরিয়া এবং কাপ্তাই নতুনবাজার এলাকায় থ্রি স্টার হোটেল নিমাের্ণর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে