logo
সোমবার ২২ জুলাই, ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬

  পার্বণী দাস   ২৯ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০  

তারুণ্যের আমেজ

তারুণ্যের আমেজ
তরুণ প্রজন্ম ঐতিহ্যবাহী উৎসব পালন করে এক সঙ্গে ছবি : সি ক্লিক
তরুণ প্রজন্ম উৎসবের আনন্দ নিতে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী আয়োজনে অংশ গ্রহণ করে থাকে। বাংলাদেশে দেশব্যাপী রয়েছে উৎসবকেন্দ্রিক নানা আয়োজন। লাঠিখেলা ছাড়া আমাদের দেশের অনেক স্থানে বৈশাখের আমোদ তেমন একটা জম্পেশ রূপ ধারণ করে না। এ খেলার মধ্যে বীরত্বব্যঞ্জক এক ধরনের সোৎসাহ লক্ষ্য করা যায় বলে লোকজনের কাছে এটি দারুণ জনপ্রিয় একটি খেলা হিসেবে ধরা দেয়। বর্তমানে এটি শুধু মজাদার খেলা হিসেবে পরিচিত হলেও এর ইতিহাস কিন্তু অন্য কথা বলে। জমিদারি যুগে প্রজা-নিপীড়নের জন্য জমিদাররা বেশ জাঁমজমকের সঙ্গে লেঠেল-বাহিনী পুষত। আবার গ্রামের দুই বিবদমান প্রতিপক্ষের মধ্যে নানা রকম উদ্দেশ্য হাসিলের শক্তিপরীক্ষাও করা হতো এই লেঠেল বা লাঠিয়াল বাহিনীর মাধ্যমে। ফরিদপুরে বিচিত্র ধরনের লাঠিখেলার প্রচলন রয়েছে। বত্রিশ আনির খেলা, বাগান খেলা, রংপশারি, কাউন্সিল খেলা, তুড়মি ও আড় খেলা। লাঠির অনেক কসরতের মধ্যে উলেস্নখ্য বেনট, পাট্টা, আলীপঁ্যাচ, রংভাজ, উস্তাদি, পাঁয়তারা, গরম, সেলামি ইত্যাদি। লাঠিখেলার মধ্যে কিছু কিছু নাচও থাকে। যেমন- সখা নৃত্য, হাজরা নৃত্য, পেট্টা, আলী আলী নৃত্য, রায়বেশে নৃত্য, নৌকাবাইচ নৃত্য, মানুষ পোঁতা নৃত্য, ঢেঁকি নৃত্য, জেকের নৃত্য, ময়ূর নৃত্য ইত্যাদি। তিন-চার হাত লম্ব্বা ও পরিমিতি ব্যাসার্ধের বাঁশের তৈলাক্ত মসৃণ লাঠি এ খেলার উপকরণ। আসরে একজন খেলোয়াড় কখনো এক হাতে, কখনো দুই হাতে দুটি লাঠি নিয়ে কৌশলে তা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খেলা দেখায়। বিভিন্ন চালে অতিক্ষিপ্রতার সঙ্গে লাঠি চালানোয় একেকজনের দক্ষতার পরিচয় মেলে। কৃত্রিম যুদ্ধের মহড়ায় দ্বৈত লাঠিখেলা হয়। আবার দলগত লাঠি সঞ্চালনও দেখার মতো। দলগত এ খেলায় লাঠিয়াল বা লেঠেলদের একে অন্যকে বিভিন্ন কৌতুককর বাৎচিত বিনিময় করে বাদ্যের তালে তালে লাঠিখেলা চলে। অনাবৃষ্টি আর দাবদাহের দিনে আরেকটি খেলার কথা উলেস্নখ করতে হয়, সেটি মূলত মেয়েলি ব্রত। তিস্তা আমাদের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান নদী। প্রধানত রাজবংশী বা রাভা সম্প্রদায়ের কৃষক-বধূরা বৈশাখ মাসজুড়ে এ নদীর নামে গ্রামে গ্রামে ছোট ব্রতিনী দল তৈরি করে। কোথাও এর নাম ঘাটো ব্রত, কোথাও মেছিনি আবার কোথাও বা ভেদই-খেলী। মাটির ডেলায় সিঁদুর-টিপ দিয়ে দই, আলোচাল ও ফুল দিয়ে তাকে ডালায় সাজিয়ে গৃহস্থদের বাড়ি বাড়ি যায় আর বৃষ্টি কামনার গান ধরে- 'তিস্তা বুড়ি সাজ্যেছে, সোনার খড়ম বাজ্যেছে/ছলছলাইয়া বৃষ্টি নামু, ডহর-বহর ভাস্যেছে/কুলাত কইর?্যা ধান দ্যাও, বাটা-ভরা পান দ্যাও/ঝিনঝিনায়া বৃষ্টি নামু, ডহর-বহর ভাস্যেছে/তিস্তা বুড়ি নামে রে, বাজে হীরামন বাঁশি রে/তিস্তা বুড়ি সালাম দে, ডহর-বহর হাস্যেছে'। বৃষ্টির জন্য জাদুবিশ্বাসজাত ব্রত-অনুষ্ঠান তথা ধর্মীয় আবরণে রাজবংশী সম্প্রদায়ের মেয়েরা বেশ ঘটা করে বৈশাখের এ আমোদপূর্ণ খেলাটি পালন করে আসছে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে এ সময়ে হয় কয়েকটি খেলা। এসব খেলার মধ্যে সবার আগে উলেস্নখ করতে হয় বলীখেলার কথা। এটি এখন বাঙালির বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় খেলা হিসেবে পুরো জাতির কাছে সমানভাবে আদৃত। কোনো কোনো লোকক্রীড়া যে লোক-উৎসবের রূপ নিতে পারে, তার আদর্শ উদাহরণ বলীখেলা। বর্তমানে জব্বারের বলীখেলা নামে আমরা যা দেখি, তা আসলে ১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের আবদুল জব্বার সওদাগর নামের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন সংগঠক কর্তৃক প্রবর্তিত আনুষ্ঠানিক এক খেলা। তার লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে দেশের যুবসমাজকে একাট্টা করা।

চট্টগ্রামের দুটি খেলা সম্পর্কে না বললেই নয়। একটি চুঁয়া খেলা, অন্যটি কইতর বাচ্চা খেলা। চুঁয়া খেলাটির আরেক নাম চুঙ্গা খেলা। এটি আতশবাজির খেলা। বেশ বিপজ্জনক খেলা। সাধারণত শবেবরাতকে উপলক্ষ করে এটি খেলা হলেও নববর্ষকে উদযাপন করায় ছেলের দল পিছিয়ে নেই। চট্টগ্রামে বাঁশের চুঙ্গা বা নলকে চুঁয়া বলে। এই চুঁয়ার ভেতর বারুদ, হাঁড়ি-পাতিলের ভাঙা চাড়া ইত্যাদি ঠেসে ভর্তি করা হয়। এ খেলার চুঁয়া বা চুঙ্গাগুলোকে ওজনভেদে পাইয়া (পোয়া), আধপাইয়া (আধপোয়া), ছডাইক্কা (ছটাক) ও লোছনধরা প্রভৃতি নামে ডাকা হয়। চুঙ্গা খেলোয়াড়রা প্রথমে দুই দলে বিভক্ত হয়ে মাঠের দুই দিকে অবস্থান নেয়। প্রাথমিক পর্যায়ের খেলায় নানা কেতায় চুঁয়ার আতশবাজি ফোটানো চলে। মাঠের রাতের আকাশ তখন অসংখ্য আলোর ফুলঝুরিতে উদ্ভাসিত হয়। দৃশ্যনীয় পরিবেশে হাজার হাজার লোকের সমাগমে খেলাটি প্রাণবন্ত রূপ লাভ করে। দ্বিতীয় পর্যায়ের খেলা আরো প্রাণ পায় যখন দ্বিপক্ষীয়, প্রতিযোগিতামূলক বাজি পোড়ানোয় মেতে ওঠে দুই দল।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে