logo
  • Tue, 13 Nov, 2018

  মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ   ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০  

আজকের কন্যাশিশু আগামীর মহীয়সী

আজকের কন্যাশিশু আগামীর মহীয়সী
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক ও শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠলেও আমাদের কন্যারা পিছিয়ে রয়েছে অবজ্ঞা, বঞ্চনা ও বৈষম্যমূলক মনোভাবের ফলে? বতর্মান আধুনিক ও শিক্ষিত সমাজব্যবস্থায় আমরা কথায় কথায় বলি, ‘সন্তান ছেলে হোক আর মেয়ে হোক, মানুষ হওয়াটাই আসল কথা।’ কিন্তু অনেকেই মৌখিকভাবে তা মানলেও মনে মনে ঠিকই চিন্তা করেন ‘সন্তান হতে হবে ছেলে’। কন্যাসন্তান হওয়ার ক্ষেত্রে একজন নারীর কোনো ভূমিকা নেইÑ এই প্রমাণিত সত্যটি শিক্ষিত পুরুষ জানার পরও মানসিকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই এ দায় চাপিয়ে দেন নারীর ওপরই। ফলে কোনো অন্যায় না করে আমাদের দেশে হাজার হাজার নারী কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার অভিযোগে মানসিক ও শারীরিক নিযার্তন ভোগ করেন? ভারতীয় কবি পাওনি মাথুর বলেনÑ ‘ঝযব ধিং ঃযব শববঢ়বৎ ড়ভ ঃযব যড়ঁংব, নঁঃ ঃযব যড়ঁংব ধিং হড়ঃ যবৎ শববঢ়বৎ.’ কন্যাশিশুদের নিয়ে এমনই উদ্বিগ্নতার কথা আরও পাওয়া যায় অসংখ্য কবির কবিতায়। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধনী, মধ্যবিত্ত, গরিব নিবিের্শষে আমাদের সমাজে এমনকি নিজেদের পরিবারেও আমরা লক্ষ্য করে থাকি, মেয়ে শিশুর প্রতি অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈষম্যমূলক আচরণ। ফলে অনেকাংশেই দারিদ্র্যের প্রথম শিকার হয় আমাদের কন্যাশিশুরা। কিছু সামাজিক কথিত নীতির ফলে শিশুকাল থেকেই কন্যাশিশুদের এমনভাবে গড়ে তোলা হয়, যেন তারা আগামীর কিছু হতে না শেখে। তাদের প্রতি করা বৈষম্যমূলক আচরণকে অন্যায় হিসেবে না দেখে সহজাত ও সমঝোতার সঙ্গে গ্রহণ করতে শেখানো হয়। যা পরবতীের্ত নারীর প্রতি নিযার্তন ও সহিংসতার পথটিকে প্রশস্ত করতে সাহায্য করে।

কন্যাশিশুর প্রতি মূল্যবোধ, সামাজিক অবস্থান সৃষ্টি, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, যৌন হয়রানি বন্ধ, প্রতিহিংসা দূরীকরণ, অধিক বয়সের ব্যবধানে বিয়ে করে দাম্পত্যে অশান্তি সৃষ্টি রোধসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ইস্যুতে কাজ করার লক্ষ্যে প্রতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বর কন্যাশিশু দিবস পালন করা হয়? কিন্তু হতাশার বিষয় হলো, এর সফলতা এখনও আশানুরূপ নয়? কন্যাশিশুদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যদিও ২০০০ সাল থেকে জাতীয়ভাবে এ দিবসটি পালনের অনুমোদন দেয় নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়; কিন্তু সেভাবে কন্যাশিশুর যথাযথ শিক্ষা, পুষ্টি, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ তথা সুষ্ঠু বিকাশ হচ্ছে না? বেড়েই চলেছে ইভ টিজিং, এসিড সহিংসতা এবং যৌন নিযার্তনসহ কন্যাশিশুর প্রতি যাবতীয় হয়রানি, নিযার্তন। সবর্ত্র এখন কন্যাশিশুরা বিভিন্ন দিক দিয়ে বৈষম্যের শিকার। এর সবের্শষ এবং করুণ উদাহরণ ‘আদুরী’। যে দু’মুঠো খাবার সংস্থানের জন্য কাজ করতে গিয়ে ডাস্টবিনে পড়েছিল।

বাংলাদেশ নয় কেবল, বিশ্বের প্রায় সবর্ত্রই এমনকি পাশ্বর্বতীর্ দেশ ভারতেও কন্যাশিশু হত্যাসহ তাদের বৈষম্যের ইতিহাস কয়েক শতক ধরে চলে আসা এক চলমান ইতিহাস। দারিদ্র্য, যৌতুক ব্যবস্থা, আজন্ম অবিবাহিত থাকা, বিকৃত দেহ, দুভির্ক্ষ, অভাব, শিক্ষায় অসমথর্ন, প্রসবজনিত অসুস্থতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সে সময়ে সঠিক যতœ বা সেবা না পাওয়া, এসব কারণই বিষয়টি অনুধাবনে যথেষ্ট। কন্যাশিশু সুরক্ষা, অবমাননা বা হত্যা ভারতবষের্ একটি গহির্ত অপরাধ এ ব্যাপারে কঠোর নিয়মনীতি থাকলেও আইনের প্রয়োগ বা এ বিষয়ে রুজু হওয়া রিপোটের্র সংখ্যা খুবই কম। ২০১০ সালে পেশ করা এক রিপোটের্র ভিত্তিতে জানা যায়, ভারতে এমন হত্যার সংখ্যা মাত্র ১০০ জন? যা দেশের জনসংখ্যা হিসেবে লাখে ১ জন? (যেটি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নয়)? অথচ ভারতীয় সমাজ বিচার করে দেখা যায়, এখানে লিঙ্গ-নিধার্রক পরীক্ষার মাধ্যমে অনেক কন্যাশিশুর হত্যা তার জন্মের আগে সম্পাদিত হয়? এর জন্য অবশ্য সমাজব্যবস্থাই দায়ী? ১৯৯১ সালে ভারতীয় জনসংখ্যা গণনায় প্রকাশ পায় এমনই তথ্য, যা এখনও বতর্মান।?

‘কন্যা মানেই বোঝা নয়, করবে তারা বিশ্ব জয়’ এই প্রতিপাদ্যকে ঘিরে সারাদেশে কন্যাশিশু দিবসটি পালিত হয়? প্রতি বছর দিবসটির একটা থিম বা প্রতিপাদ্য থাকে। প্রথম কন্যাশিশু দিবসের থিম ছিল ‘বাল্যবিয়ে বন্ধ করা’ দ্বিতীয়বার ২০১৩ সালে থিম ছিল ‘মেয়েদের শিক্ষাক্ষেত্র অভিনব করে তোলা।’ তৃতীয় ও চতুথর্বারের থিম ছিল ‘কৈশোরকে ক্ষমতাসম্পন্ন করা ও হিংসা চক্র বন্ধ করা’ ও ‘কিশোরীর ক্ষমতা : ২০৩০-এর পথপ্রদশর্ক।’ ২০১৬ সালের এই দিবসের থিম হলো ‘মেয়েদের উন্নতি : লক্ষ্যের উন্নতি।’ কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজও এর তেমন কোনো প্রতিফলন ঘটেনি কোথাও এ নিয়ে কারোর তেমন কোনো মাথাব্যথাও নেই? যেখানে তেল আছে, সেখানেই তেল ঢালা হচ্ছে কেবল? মধ্যখানে অসহায় নিযাির্ততা কন্যাশিশু ধুঁকে ধুঁকে মরছে? এ ব্যাপারে কোনো কাযর্করী ভূমিকা গ্রহণ না করে খামোখা দিবস পালনে কতটুকুন সফলতা!

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু এবং এদের মাঝে ৪৮ শতাংশই কন্যাশিশু? শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষায় বিভিন্ন কমর্সূচি পালন করা হলেও আজও দেশের অধিকাংশ কন্যাশিশুর বিয়ে হচ্ছে প্রাপ্তবয়স্কা হবার আগেই? বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সাভের্ ২০০৭-এর তথ্য অনুযায়ী দেশে এখনও পূণর্ বয়স্কা হবার আগেই ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে এবং দু-দশক ধরে এ হারের কোনো পরিবতর্ন হচ্ছে না? তেমন কিছু বুঝে ওঠার আগেই গভর্বতী হচ্ছে ৬৬ শতাংশের এক শতাংশ? বাংলাদেশে নারীর গড় বিয়ের বয়স ১৫ বছর ৩ মাস? ইউনিসেফের তথ্য মতে, শিশুবিবাহের হারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয় গত ৩০ বছরে শিশুবিবাহ আনুপাতিক হারে হ্রাস পেলেও গ্রামাঞ্চলে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে সমস্যাটা প্রকট? আইসিডিডিআরবি এবং প্ল্যান বাংলাদেশের যৌথ জরিপ ২০১৩ মতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষিত শতকরা ২৬ জনের বিয়ে হয়েছে পূণর্ বয়স্কা হবার আগেই এবং নিরক্ষর নারীদের ক্ষেত্রে এই হার শতকরা ৮৬? ইউনিয়ন পরিষদের স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলো কাযর্কর করা হলে শিশুবিয়ের মাত্রা অনেকাংশে কমে যাবে বলে মনে করেন বোদ্ধামহল? এটি প্রতিরোধে করণীয় এবং শাস্তি সম্পকের্ বিভিন্ন ধরনের বিলবোডর্, পোস্টার প্রকাশ এবং তৃণমূলে তা ছড়িয়ে দেয়া জরুরি? সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিশুবিয়ে বন্ধ করতে পরিবার থেকেই এ প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন? কন্যাশিশু ও নারীকে অবজ্ঞা, বঞ্চনা ও বৈষম্যে রেখে কখনোই একটি ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত এবং আদশর্ দেশ ও সমাজ গড়ে উঠতে পারে না। এই বাস্তবতায় নারী ও কন্যাশিশুর শিক্ষার বিকাশ অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষা কন্যাশিশুর উন্নয়ন, বাল্যবিবাহ রোধ এবং শিশু মৃত্যুর হার কমানোর নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। সেটি কন্যাশিশুর জন্য সবোর্চ্চ বিনিয়োগের মধ্যদিয়ে আরম্ভ করা চাই। পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ সকল ক্ষেত্রে তাদের জন্য সমসুযোগ ও সমঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার। তাদের ব্যাপারে আমাদেরকে আরও সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি সরকারকেও পালন করতে হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা। তাহলেই কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় আমাদের অঙ্গীকার এবং প্রত্যাশা পূরণ হবে। তাদেরকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা চাই? আর এই মানবসম্পদ গড়ার প্রক্রিয়াটি শুরু করতে হবে কন্যাশিশুর জন্মলগ্ন থেকেই। মনে রাখতে হবে, আজকের শিশুকন্যা আগামীর একজন মহীয়সী নারী।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে