logo
শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬

  রহিমা আক্তার মৌ   ১১ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

অবরুদ্ধতার অবসান ঘটিয়ে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন রাবেয়া খাতুন

রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে জন্মেও নারীর অবরুদ্ধতার অবসান ঘটিয়ে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন রাবেয়া খাতুন। সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে অল্প বয়সেই লেখনীর সূচনা ঘটান সাহিত্যে। সাহিত্য-অঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন নিজের অবস্থান

অবরুদ্ধতার অবসান ঘটিয়ে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন রাবেয়া খাতুন
রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে জন্মেও নারীর অবরুদ্ধতার অবসান ঘটিয়ে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন যিনি, তিনিই সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে অল্প বয়সেই লেখনীর সূচনা ঘটান সাহিত্যে। সাহিত্য-অঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন নিজের অবস্থান। বলছি একুশে পদক, একাডেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার পাওয়া লেখিকা রাবেয়া খাতুনের কথা। ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর মামারবাড়ি তৎকালীন ঢাকার বিক্রমপুরে পাউসার গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

বড় বোনের কাছে ছোটবেলায় গল্প শুনতে খুব ভালো লাগত। সেখান থেকেই গল্পকে ভালেবাসা। ধীরে ধীরে নিজের আগ্রহ তৈরি হয় গল্প লেখায়। বিভিন্ন পত্রিকায় ডাক মারফত লেখা পাঠানো শুরু পঞ্চাশের দশকেই। ১২-১৩ বছর বয়স থেকেই লেখালেখি শুরু করেন তিনি। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম প্রগতিশীল সাপ্তাহিক 'যুগের দাবি'তে ছাপা হয় ছোটগল্প 'প্রশ্ন'।

লেখালেখির পাশাপাশি এক সময় শিক্ষকতা করেছেন রাবেয়া খাতুন, করেছেন সাংবাদিকতাও। ইত্তেফাক, সিনেমা ও খাওয়াতীন পত্রিকায়, ছাড়াও পঞ্চাশ দশকে বের হতো তার সম্পদনায় 'অঙ্গনা' নামের একটি মহিলা মাসিক পত্রিকা।

পঞ্চাশের দশকে যে লেখকদের সক্রিয়তা বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে, রাবেয়া খাতুন তাদের অন্যতম। মুসলিম নারীদের জীবন যখন অনেক বিধি-নিষেধের বেড়াজালে বন্দি, ঠিক তেমন সময়ই রাবেয়া খাতুন আত্মপ্রকাশ করেন একজন লেখক হিসেবে। লেখাই যার জীবন ও ধ্যানজ্ঞান। রাবেয়া খাতুন সমকালীন বাংলা সাহিত্য এবং এই সময়ের বাঙালি লেখকদের আলোকিত ও আলোচিত নাম। তার সাহিত্য সৃষ্টিতে বহুমাত্রিকতা, '৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, মানুষের মনের অন্তচেতনার জাগরণ, নির্লিপ্ততা, শিল্পের জন্য শিল্প, মানুষের জন্য শিল্প, সাহিত্যের বস্তুতান্ত্রিকতা, নারী জাগরণ, সমাজের ব্রাত্য অন্তজ আবহমান বাংলা জীবনের ছবির সঙ্গে রাবেয়া খাতুনের নৈসর্গ চেতনা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে তার সৃষ্টিকর্মে। আর এ কারণেই সমকালীন সাহিত্যে আলোচিত ও প্রাসঙ্গিক নাম রাবেয়া খাতুন। রাবেয়া খাতুন অনেকটা উদার পরিবেশে নিজের স্বাধীনতা নিয়ে শুধু বেড়ে ওঠেননি, তৎকালীন মুসলিম সমাজের একজন নারী হিসেবে অগ্রসরমান থেকে শিল্প-সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করেছেন বেশ আগ্রহসহকারে।

রাবেয়া খাতুন রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জনপ্রিয় উপন্যাস 'মেঘের পর মেঘ' অবলম্বনে বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম ২০০৪ সালে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র 'মেঘের পরে মেঘ'। ২০১১ সালে তার আরেকটি জনপ্রিয় উপন্যাস 'মধুমতী' অবলম্বনে পরিচালক শাহজাহান চৌধুরী একই শিরোনামে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র 'মধুমতী'। এ ছাড়া অভিনেত্রী মৌসুমী ২০০৩ সালে তার লেখা 'কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি' অবলম্বনে একই শিরোনামে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র 'কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি'। তার কাহিনী নিয়ে ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম কিশোর চলচ্চিত্র তৈরি করা হয়। রেডিও ও টিভি থেকে প্রচারিত হয়েছে তার রচিত অসংখ্য নাটক। তার প্রথম উপন্যাস মধুমতী তাঁতি সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনের দুঃখগাঁথা নিয়ে রচিত। পরে এই উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি ও ইরানি ভাষায় অনূদিত হয়েছে রাবেয়া খাতুনের অনেক গল্প।

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় রাবেয়া খাতুনের অবদান তাৎপর্যপূর্ণ। সাহিত্যকর্ম বিবেচনায় তিনি একদিকে গ্রামভিত্তিক মধ্যবিত্ত সমাজের রূপান্তরের রূপকার এবং অন্যদিকে নাগরিক মধ্যবিত্তের বিকাশ ও বিবর্তনের দ্রষ্টা। সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে তার নিজস্ব জীবনবোধ ও অন্তর্দৃষ্টিমূলক প্রতিভার সমন্বয়। ছোটগল্প, ভ্রমণসাহিত্য, স্মৃতি কথামূলক রচনা, শিশুসাহিত্যে তার স্বকীয়তা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ও গল্প রচনায় তার অবদান বিশেষভাবে উলেস্নখযোগ্য।

সংখ্যার দিক থেকে রাবেয়া খাতুনের গ্রন্থের পরিমাণ বিপুল। মোটা দাগে তার রচনাসম্ভারকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। একদিকে তিনি ঔপন্যাসিক, অন্যদিকে ছোট গল্পকার; শিশুসাহিত্যের লেখক হিসেবেও তিনি সমাদরণীয়। ভ্রমণ যেমন তার শখের বিষয়, তেমনি তা আবার সাহিত্যেরও উপকরণ! রাবেয়া খাতুনের প্রতিভারও সবচেয়ে উজ্জ্বল ও জ্বলন্ত অধ্যায় হচ্ছে উপন্যাসগুলো। তার রচিত প্রথম উপন্যাসের নাম ছিল নিরাশ্রয়া (অপ্রকাশিত), বিদায় (অপ্রকাশিত) অশোক-রেবা (অপ্রকাশিত), 'মধুমতী', সাহেব বাজার', 'অনন্ত অন্বেষা', 'রাজারবাগ শালিমারবাগ', 'মন এক শ্বেতকপোতী', 'ফেরারী সূর্য', 'অনেকজনের একজন', 'জীবনের আর এক নাম', ইত্যাদি।

সাহিত্যকর্মে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাবেয়া খাতুন ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৮৯ সালে হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, ১৯৯৩ সালে একুশে পদক পান। ১৯৯৪ সালে পান বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার, ১৯৯৫ সালে নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক, ১৯৯৬ সালে জসিমউদ্দিন পুরস্কার, শেরে বাংলা স্বর্ণপদক ও শাপলা দোয়েল পুরস্কার। নাটকের জন্য টেনাশিনাস পুরস্কার পান ১৯৯৭ সালে। ১৯৯৮ সালে পান ঋষিজ সাহিত্য পদক, ও অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার। ১৯৯৯ সালে পান লায়লা সামাদ পুরস্কার ও অন্যান্য সাহিত্য পুরস্কার। মিলেনিয়াম অ্যাওয়ার্ড পান ২০০০ সালে, টেলিভিশন রিপোর্টার্স অ্যাওয়ার্ড ২০০১ সালে। বাংলাদেশ কালচারাল রিপোর্টার্স অ্যাওয়ার্ড ও শেলটেক পদক পান ২০০২ সালে। চলচ্চিত্রের জন্য ২০০৫ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার লাভ করেন। একই বছর তিনি মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার পান। সাহিত্য ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাবেয়া খাতুনকে স্বাধীনতা পুরস্কার ২০১৭ প্রদান করা হয়।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে