logo
সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬

  তারার মেলা রিপোর্ট   ২১ মার্চ ২০১৯, ০০:০০  

নাটক ও চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর- দীর্ঘ নয় মাসের এই যুদ্ধের ঘটনাবলিকে বিভিন্ন কাহিনী বা দৃশ্যের ভেতর দিয়ে উপস্থাপন করাটা দেশের লেখকদের জন্য নৈতিক দায়িত্ব হয়ে ওঠে। সেই দায় থেকেই প্রেক্ষাগৃহ, মঞ্চ ও টেলিভিশনেও উপস্থাপিত হয়ে আসছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র- নাটক। মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের কাহিনী বারবারই দেশের প্রেক্ষাগৃহ, মঞ্চ ও টিভি নাটকে উঠে এসেছে আবেগঘন হয়ে...

নাটক ও চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ
বাংলাদেশের নাট্যমঞ্চে বিভিন্ন সময়ে আলোড়ন তুলেছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক। সেসব নাটকের মধ্যে উলেস্নখযোগ্য নাটক হচ্ছে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, সময়ের প্রয়োজনে, কথা ৭১, লাল জমিন, বিদেহ, আমি বীরাঙ্গনা বলছি, টার্গেট পস্নাটুন, ক্ষ্যাপা পাগলার পঁ্যাচাল, জিয়ন্তকাল, যুদ্ধ এবং যুদ্ধ, জয় জয়ন্তী, একাত্তরের পালা, মুখোশ, কিংশুক, যে মরুতে, বিবিসাব, সময়ের প্রয়োজনে, খারন্নি, বলদ প্রভৃতি। তবে নূরলদীনের সারাজীবন, কোর্ট মার্শাল, সাতঘাটের কানাকড়ি ইত্যাদি নাটককেও মুক্তিযুদ্ধের নাটক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের কথা না থাকলেও চেতনা প্রবাহমান রয়েছে।

পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে মামুনুর রশীদ রচিত 'সমতট', মমতাজ উদ্দিন আহমদের 'কি চাহ শঙ্খচিল', ও 'রাজা অনুস্বারের পালা', সৈয়দ শামসুল হকের ' তোরা জয়ধ্বনি কর', আবদুলস্নাহ আল মামুনের 'তোমরাই' ও 'দ্যাশের মানুষ', মান্নান হীরার 'একাত্তরের ক্ষুদিরাম' ও 'ফেরারি নিশান', নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর 'ঘুম নেই', নীলিমা ইব্রাহিমের ডায়েরি অবলম্বনে 'শামুক বাস', শহীদ জননী জাহানারা ইমামের 'একাত্তরের দিনগুলি' থেকে নির্বাচিত অংশ অবলম্বনে শ্রম্নতি নাটক 'স্মৃতিসত্তা ভবিষ্যৎ', হুমায়ূন আহমেদের '১৯৭১', শান্তনু বিশ্বাসের 'ইনফরমার', সেলিম আল দীনের 'নিমঞ্জন' বিশেষভাবে উলেস্নখযোগ্য। এসব নাটকে শুধু বাংলাদেশের মুক্তির কথাই বলা হয়নি; সমগ্র পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের ইচ্ছার কথা বলা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বজুড়ে গণহত্যার দলিল উপস্থাপিত হয়েছে। এ ছাড়াও যুদ্ধের আগে মঞ্চস্থ হওয়া 'এবারের সংগ্রাম' ও 'স্বাধীনতার সংগ্রাম' নাটকও উলেস্নখযোগ্য।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কেটে গেছে চারটি দশক। সব মিলিয়ে এই চার দশকে সারা দেশের বিভিন্ন নাট্যদল মঞ্চে এনেছে আনুমানিক পাঁচ শতাধিক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক। শুধু তা-ই নয়, কেবল ২০১৩ সালেই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দেশে কলেজ পর্যায়ে মঞ্চে এসেছে শতাধিক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক। বাংলা নাটকের ইতিহাসে এটি একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। এ ছাড়া সরকারি অনুদানে বিভিন্ন নাট্যদল মঞ্চে এনেছে ত্রিশটির মতো নাটক। এ ছাড়া বিভিন্ন নাট্যদল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই নিজেদের অর্থায়নে অনেক নাটক মঞ্চে এনেছে শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য।

নাট্যবোদ্ধারা মনে করেন, এ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের ওপর যে সব নাটক লেখা হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে উলেস্নখযোগ্য নাটক হচ্ছে সৈয়দ শামসুল হকের 'পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়'। নাটক হিসেবে এটি সফলতম একটি নাটক। মুক্তিযুদ্ধের ওপর এমন সাহিত্য-শিল্পমানসম্পন্ন নাটক বা সাহিত্যকর্ম এর আগে বা পরে দৃষ্টিগোচর হয়নি। সুসাহিত্য হতে হলে উপমা, রূপক, চিত্রকল্প, প্রতীকীব্যঞ্জনা ইত্যাদির প্রয়োজন। নাট্যকার সফলভাবে তা ব্যবহার করেছেন। নাটকটির আরও একটি বিশেষ দিক হচ্ছে যা নাট্যকার শেষ দৃশ্যে নিজেই আলোর নির্দেশনা দিয়েছেন, যা বিশেষ ইঙ্গিত বহন করে। সবশেষে আলো স্থির হয় পতাকার ওপর। কারণ এই পতাকার জন্যই যুদ্ধ। আর যুদ্ধের বিভীষিকা নিয়েই এ অমর নাটক। পাশাপাশি মমতাজ উদ্দীন আহমেদের 'স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা', 'এবারের সংগ্রাম', 'স্বাধীনতার সংগ্রাম' এবং 'বর্ণচোর' নাটকেও পাকিস্তানি শোষকদের অত্যাচার-নির্যাতনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। 'বর্ণচোর' নাটকে তিনি রাজাকার, আল বদরদের বিশ্বাসঘাতকতার চিত্র সুনিপুণভাবে অঙ্কন করেছেন। তার 'কি চাহ শঙ্খচিল' নাটকটিও পাকিস্তানি হায়েনাদের নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের নিষ্ঠুর বর্বরতা নিয়ে রচিত।

আবদুলস্নাহ আল মামুনের 'তোমরাই', 'দ্যাশের মানুষ' ও 'বিবিসাব' মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক। তিনি তার নাটকের মধ্যে বিপথগামী তরুণদের স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে সচেষ্ট ছিলেন। স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারদের বিরুদ্ধে তার ক্ষোভ ফুটে উঠেছে। তাদের প্রতিহত করার জন্য তিনি সচেতন মানুষের আরেকটি সংগ্রামের আহ্বান জানিয়েছেন নাটকের মধ্য দিয়ে। তার নাটকের বিষয়বস্তু এখনও মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে। তাই আশা করা যায়, ভবিষ্যতেও মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করবে। ফলে বলাই যায় যে, আব্দুলস্নাহ আল মামুন জনগণকে অনুপ্রাণিত করতে সফল হয়েছেন।

আমাদের দেশে টেলিভিশনের সম্প্রচার শুরু হয় ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর। সম্প্রচারের কিছুদিনের মধ্যেই অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে টিভি নাটক বেশি জনপ্রিয় হতে থাকে। তবে সে সময়ের নাটকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা যায়নি। তারপরও ইশারায় বা প্রতীকীভাবে এসেছে বাঙালির অধিকার বা স্বাধিকারের মূলমন্ত্র।

১৯৭১ সালে যখন মানুষ শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তখন টেলিভিশনে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানেও বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ৭১ সালের ২১ মার্চ ঢাকা টেলিভিশন কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয় 'আবার আসিব ফিরে' নাটকটি। সৈয়দ মাহমুদ আহমেদের কাহিনীতে প্রয়াত আবদুলস্নাহ আল মামুনের নাট্যরূপে প্রচারিত হয় এ নাটক।

১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচার হওয়া প্রথম নাটকটি মুক্তিযুদ্ধের। 'বাংলা আমার বাংলা' নাটকটি লিখেছিলেন ড. ইনামুল হক, প্রযোজনা করেছিলেন আবদুলস্নাহ আল মামুন। ১৯৭২ সালের মধ্যবর্তী সময়ের আলোচিত মুক্তিযুদ্ধের নাটক 'জনতার কাছে আমি'। আমজাদ হোসেনের লেখা নাটকটি মুস্তাফিজুর রহমানের পরিচালনায় প্রচারিত হয়। এ সময়ের আরেকটি উলেস্নখযোগ্য নাটক 'এরা ছিল এধারে'। মোর্শেদ চৌধুরীর লেখা নাটকটি প্রযোজন করেছিলেন মোহাম্মদ বরকতউলস্ন্যাহ। ১৯৭৩ সালে জেসমিন চৌধুরীর লেখা 'প্রতিদ্বন্দ্বী' নাটকটি প্রযোজনা করেন আবদুলস্নাহ ইউসুফ ইসাম। শুধু তা-ই নয়, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে টিভি নাটকে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে বহুবার।

আশির দশকেই বেশি চেতনাসমৃদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের টিভি নাটক নির্মিত হয়েছে। হাবিবুল হাসানের রচনায় ও আবদুলস্নাহ আল মামুনের প্রযোজনায় 'আমার দ্যাশের লাগি' নাটকটি সে সময়ের দর্শককে মুগ্ধ করেছে। এ ছাড়া মমতাজ উদ্দীন আহমেদের লেখা মোস্তফা কামাল সৈয়দের প্রযোজনার 'এই সেই কণ্ঠস্বর' নাটকটি দর্শকপ্রিয়তা লাভ করে। সে সময়ের আলোচিত মুক্তিযুদ্ধের টিভি নাটকের মধ্যে আবদুলস্নাহ আল মামুনের 'আয়নায় বন্ধুর মুখ' ও 'একটি যুদ্ধ অন্যটি মেয়ে', আসাদুজ্জামান নূরের 'এ মোর অহংকার', রাহাত খানের 'সংঘর্ষ', আল মনসুরের 'শেকল বাঁধা নাও' ও 'নয়ন সমুখে তুমি নাই', আতিকুল হক চৌধুরীর 'যদিও দূরের পথ' ও 'স্বর্ণতোড়ন', মামুনুর রশীদের 'খোলা দুয়ার' ইত্যাদি উলেস্নখযোগ্য।

বিটিভির পর দেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের যাত্রা শুরু হয়। ফলে টিভি মিডিয়া বিস্তৃতি লাভ করতে সক্ষম হয়। তবুও নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত মুক্তিযুদ্ধের নাটকই সবিশেষ উলেস্নখযোগ্য। এর মধ্যে হাবিবুল হাসানের 'মেঘের ছায়ার নিচে', আখতার ফেরদৌস রানার 'সেই এক গায়েন', মোস্তফা কামালের ' পোড়ামাটির গন্ধ', বুলবন ওসমানের 'পুষ্পের পবিত্রতা', নাসির আহমেদের 'কোনো এক বুলা গল্প', মুহম্মদ রওশন আলীর 'নীল নকশা' জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এ ছাড়া বিটিভিতে প্যাকেজের আওতায় ফেরদৌস হাসানের 'ঠিকানা' এবং রেজানুর রহমানের 'পতাকা'র নাম বিশেষভাবে উলেস্নখ করতে হয়।

২০০১ সালে বিটিভিতে প্রচারিত তারিক আনাম খানের 'জেরা' নাটকটিও ভালো নাটক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সে সময়ে আবুল হায়াতের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক টেলিফিল্ম 'পিতা' দর্শকের কাছে প্রশংসিত হয়। এটিএন বাংলা সাইদুর রহমান জুয়েলের পরিচালনায় 'কোন সীমানায় মুক্তি' নামের একটি মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক নাটক প্রচার করে। একই চ্যানেলে ২০০৫ সালে মামুনুর রহমানের নাটক 'অচেনা বন্দর' আলোচিত হয়। এটিএন বাংলার আলোচিত নাটকের মধ্যে 'একটি আত্মহত্যা' ও 'তুফান আলীর ভূত' অন্যতম।

২০০৮ সালে আলোচিত হয় ফেরদৌস হাসানের নাটক 'দাগ'। একই বছর সৈয়দ শামসুল হক রচিত ও আশরাফী মিঠু পরিচালিত 'ম্যাজিক' নাটকটিও বেশ প্রশংসা অর্জন করে। ২০১০ সালে তাহের শিপনের 'কক্ষপথের যুদ্ধ' মুক্তিযুদ্ধের একটি ভালো নাটক হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে। ওই বছরের ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক প্রচার করা হয়। এর মধ্যে ১৬ পর্বের প্রতিদিনের ধারাবাহিক 'মুক্তিযুদ্ধ-১৯৭১' নাটকটি উলেস্নখযোগ্য। ২০১১ সালে 'ট্রানজিস্টার' নামের নাটকটিও আলোচনায় আসে।

২০১৪ সালে প্রচারিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নাটকগুলোর মধ্যে 'গুডবাই কমান্ডার', 'পেজ সিক্সটিন', 'সাক্ষাৎকার', 'বাংলাদেশ', 'জনক ৭১', 'শহীদ মোসাম্মৎ কুলসুম বেগম', 'পালকি' এবং 'ডায়রি-৭১' বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। এরপর থেকে দেখা যায়, প্রতিবছর স্বাধীনতা বা বিজয় দিবস এলে টিভি চ্যানেলগুলো প্রচার করে মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ নাটক। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে আমরা পাই 'সেলিব্রেটি ৭১', 'একজন দুর্বল মানুষ', 'ঋণ শোধ', 'আলোর মিছিলে ওরা', 'একটি লাল শাড়ির গল্প', 'বীরমাতা' 'এবং অতঃপর', 'কাঁটা', 'মুক্তিযুদ্ধ ৭১', 'এ কোন ভোর', 'অলিভ গাছ, ক্রিস্টাল নদী', 'রক্তস্নান', 'ছোট বাড়ি বড় বাড়ি', 'আলোর পথে', 'বীরাঙ্গনা', 'বৈঠা', 'ফসিলের কান্না', 'একজন মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে', 'পতাকা', 'একাত্তরের দিনগুলি', 'অবশিষ্ট বুলেট', 'অবহন', 'শুক্লপক্ষের আহ্বান', 'ক্ষুদিরামের ফাঁসি' প্রভৃতি। এ ছাড়া ফরিদুর রেজা সাগরের ছোটকাকু সিরিজের মুক্তিযুদ্ধের একটি বিখ্যাত গল্প নিয়ে আফজাল হোসেনের নির্মাণ এবং অভিনয় ব্যাপক আলোচিত হয়েছে।

বিগত বছরগুলোর মতো এবছরও নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক টিভি নাটক। স্বাধীনতার মাস মার্চ উপলক্ষে অনেক চ্যানেলে প্রচারও শুরু হয়েছে। কোনো কোনোটি প্রচারের অপেক্ষায় রয়েছে।

স্বাধীনতার চার বছর পর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়। যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একমাত্র রাষ্ট্রীয় ও সর্বোচ্চ পুরস্কার। ১৯৭৫ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তনের পর ৪০ বছরে ১৩টি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।

১৯৭৫ সালে প্রথম চলচ্চিত্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখার জন্য পুরস্কার দেয়া শুরু হয়। প্রতি বছর বিজয়ীদের নির্বাচন করে সরকার নিযুক্ত জাতীয় প্যানেল। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদানের প্রথম অনুষ্ঠানিকতা ১৯৭৬ সালের ৪ এপ্রিল সম্পন্ন হয়। এর পরের বছর ১৯৭৬ সালে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র 'মেঘের অনেক রং' শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার পায়। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন হারুনর রশীদ। ১৯৭৭ সালে 'বসুন্ধরা' চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়। ঔপন্যাসিক আলাউদ্দিন আল আজাদের উপন্যাস 'তেইশ নম্বর তৈলচিত্র' অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সুভাষ দত্ত। এটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ মোট ৬টি বিভাগে পুরস্কার অর্জন করে।

১৯৯০ সালে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ' শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র' হিসেবে 'আমরা তোমাদের ভুলব না' পুরস্কার পায়। ১৯৯২ সালে 'শঙ্খনীল কারাগার' চলচ্চিত্রকে শ্রেষ্ঠ কাহিনীর জন্য পুরস্কার দেয়া হয়। এতে শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার হিসেবে পুরস্কার পান নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তার একবছর পর হুমায়ূন আহমেদের 'আগুনের পরশমণি' শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়। ১৯৯৫ সালে তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বাংলা প্রামাণ্যচিত্র 'মুক্তির গান' জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। প্রামাণ্যচিত্রটি দক্ষিণ এশিয়া চলচ্চিত্র পুরস্কারে বিশেষ উলেস্নখযোগ্য পুরস্কার এবং ২০তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ' শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র' বিভাগে পুরস্কার লাভ করে। ১৯৯৭ সালে সেলিনা হোসেনের উপন্যাস 'হাঙর নদী গ্রেনেড' অবলম্বনে নির্মিত 'হাঙর নদী গ্রেনেড' চলচ্চিত্রটি ৩টি বিভাগে পুরস্কৃত হয়। এটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। এই ছবিটি পরিচালনা করেছেন বাংলাদেশের বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম। 'বীর সৈনিক' ২০০৩ সালের মুক্তিপ্রাপ্ত যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। ছবিটি রচনা ও পরিচালনা করেছেন দেলোয়ার জাহান ঝন্টু। চলচ্চিত্রটি ২৮তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে দুটি বিভাগে পুরস্কার লাভ করে। ২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'জয়যাত্রা' ছবিটি সে বছর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার পায়। বিখ্যাত সম্পাদক, কাহিনীকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক আমজাদ হোসেনের কাহিনী নিয়ে সংলাপ, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন তৌকীর আহমেদ। এটি তার পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবিটি প্রযোজনা ও পরিবেশনা করেছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। ছবিটি শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ২৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকারের পুরস্কার লাভ করে। এ ছাড়া ছবিটি শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার, শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক, শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্রে অভিনেত্রী ও শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক বিভাগে পুরস্কার লাভ করে।

'গেরিলা' ছবিটি ২০১১ সালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কার লাভ করে। নাসির উদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত চলচ্চিত্রটি মূলত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের 'নিষিদ্ধ লোবান' উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করা হয়েছে চলচ্চিত্রটি। সিনেমাটি ২০১১ সালে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করে।

২০১৪ সালে মাসুদ পথিক পরিচালিত ' নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ' প্রাথমিকভাবে পাঁচটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য ঘোষিত হয়। পরে 'বৃহন্নলা' চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে গুল্প চুরির অভিযোগ উঠলে নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগেও পুরস্কৃত হয়। ২০১৫ সালে 'অনিল বাগচীর একদিন' ও 'বাপজানের বায়স্কোপ' যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগে পুরস্কার লাভ করে। দুটিই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। 'অনিল বাগচীর একদিন' পরিচালনা করেছেন মোরশেদুল ইসলাম। অনিল বাগচীর একদিন চলচ্চিত্রের উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয় ২০১৫ সালের অক্টোবওে শ্রীলঙ্কার কলম্বো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। পরে ২০১৫ সালের ১১ ডিসেম্বর ছবিটি মুক্তি পায়। ছবিটি ২০১৫ সালে ২৩ ডিসেম্বর কলকাতায় উপ হাইকমিশনে এবং ২০১৬ সালের ২৮ মে কানাডায় মন্ট্রিলে প্রদর্শিত হয়। ছবিটি ৪০তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ও শ্রেষ্ঠ পরিচালক পুরস্কারসহ ছয়টি বিভাগে পুরস্কৃত হয়।

একই বছর রিয়াজুল রিজু পরিচালিত ও প্রযোজিত 'বাপজানের বায়স্কোপ' সিনেমাটিও শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ আটটি বিভাগে পুরস্কার লাভ করে। চলচ্চিত্রটি ২০১৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর মুক্তি পায়। ৪০তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ছবিটি যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ আটটি বিভাগে পুরস্কার লাভ করে।

সুতরাং বলা যায়, মঞ্চে বা টেলিভিশনের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটকগুলো আমাদের দেশপ্রেমকে সমুন্নত রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে আসছে। আশা করি, ভবিষ্যতেও এ যাত্রা অব্যাহত থাকবে। তবে চলিস্নশ বছরে মাত্র ১৩টি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার সংখ্যাটি খুব বেশি বলে মনে হয় না। আমরা চাই, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের সংখ্যা আরও বাড়ুক, সেই সঙ্গে বাড়ুক চলচ্চিত্র পুরস্কারে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের সংখ্যাও। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন পৃথিবী থাকবে, যতদিন মানুষ থাকবে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে