logo
সোমবার ১৪ অক্টোবর, ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

  যাযাদি রিপোর্ট   ০৯ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০  

গণপূর্তের ৫৩ প্রকল্প

জি কে শামীমের বিকল্প ভাবছে মন্ত্রণালয়

জি কে শামীমের বিকল্প ভাবছে মন্ত্রণালয়
জি কে শামীম
মাদক ও অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা ঠিকাদার জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠানের বিকল্প খুঁজছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

শামীমের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে নতুন ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হতে পারে বলেও আভাস দিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।

তিনি বলেন, "কোনো ঠিকাদারের অপারগতার কারণে সরকারি কোনো উন্নয়ন কাজই আটকে থাকবে না। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে আমরা আইন অনুযায়ী নোটিস পাঠাব। তিনি যদি কাজ এগিয়ে নিতে না পারেন, কি পরিমাণ কাজ তিনি করেছেন সেটাকে আমরা পরিমাপ করে প্রয়োজনে চুক্তি বাতিল করব। প্রয়োজনে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করব। কোনোভাবেই এসব কাজ বন্ধ থাকবে না।"

তবে এ প্রক্রিয়া শেষ করতে কতদিন লাগতে পারে সে বিষয়ে কোনো ধারণা দিতে পারেননি তিনি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা বলছেন, চুক্তি বাতিল করে নতুন করে কাজ শুরু করতে গেলে লম্বা সময় লাগবে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ৫৩টি প্রকল্পের নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করছে জি কে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড। এসব প্রকল্পের চুক্তিমূল্য চার হাজার ৫৫০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

এর মধ্যে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এককভাবে ১৩টি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ কাজ করছে। বাকি ৪০টি প্রকল্পের কাজ যৌথভাবে চলছে বলে জানিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।

এসব প্রকল্পের ২৪টির অনুমোদন দিয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। আটটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী।

এছাড়া অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী তিনটি, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছেন। বাকি ১৭টি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম নিজের পরিচয় দিতেন 'নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও ?যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক' হিসেবে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মধ্যেই গত ২০ সেপ্টেম্বর শামীমের কার্যালয়ে অভিযান চালায়র্ যাব।

নিকেতনের ৫ নম্বর সড়কের ১৪৪ নম্বর হোল্ডিংয়ে পাঁচ তলা ওই ভবনে অভিযান শেষে নগদ প্রায় দুই কোটি টাকা, পৌনে দুইশ কোটি টাকার এফডিআর, আগ্নেয়াস্ত্র ও মদ পাওয়ার কথা জানানো হয়। শামীম ও তার সাত দেহরক্ষীর বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় তিনটি মামলা।

এদিকে জি কে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার হাতে থাকা বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ থমকে যায়। রোববার রাজধানীর বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপেস্নক্স ভবনে গিয়ে দেখা যায়, ওই ভবনের নির্মাণ কাজ বন্ধ।

পুরো নির্মাণ এলাকায় কোনো শ্রমিককে দেখা যায়নি। দুজন নিরাপত্তাপ্রহরী প্রকল্প এলাকা পাহারা দিচ্ছিলেন। তাদের সঙ্গে গল্প করে সময় কাটাচ্ছিলেন কামাল হোসেন নামের এক ব্যক্তি।

জানতে চাইলে কামাল বলেন, ওই ভবনের যাবতীয় কাঠের কাজ তিনি করছেন। নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছেন তিনি। তিনি বলেন, "আমি এই ভবন ছাড়াও আরও কয়েকটা ভবনে কাঠের কাজ করি। কিন্তু এখন কাজ বন্ধ। কবে শুরু হবে তা বলতে পারছি না। শুনি আজ (শামীমের) জামিন হবে, কাল জামিন হবে।"

আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবন ও ন্যাশনাল নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের একটি ভবন যৌথভাবে নির্মাণ করছে জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড এবং পিএইএল (জেভি)।

সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পাশাপাশি থাকা দুটি ভবনের নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। নির্মাণ এলাকার প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। দুজন নিরাপত্তাকর্মী সেখানে পাহারা দিচ্ছেন।

তাদের একজন মাহবুব জানান, জি কে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পাঁচ দিন পর থেকেই এ প্রকল্পের কাজ বন্ধ।

"শামীম স্যার অ্যারেস্ট হওয়ার পরও পাঁচদিন কাজ চলছিল। কিন্তু এরপরে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এখানে অনেক লোক কাজ করে। সবার বেতন দেওয়া যাচ্ছিল না। এ কারণে শ্রমিকরা চলে গেছে।"

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবনের মূল কাজ শামীমের হলেও কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কাজ করছে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা বলেন, ভবনের সব কাজ বন্ধ।

"আমাদের হেড অফিস থেকে মালামাল সাপস্নাই বন্ধ করে দিয়েছে। এ কারণে কাজ পুরোই বন্ধ হয়ে গেছে।"

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের একটি ভবনের নির্মাণ কাজ করছে জিকেবি। এ ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ। তবে এখনও অভ্যন্তরীণ বিদু্যৎ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থার কাজ শেষ হয়নি।

সেখানে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাউকে পাওয়া যায়নি। গোলাপ নামে একজন আনসার সদস্য জানান, জি কে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর কর্মীরা সবাই চলে গেছে।

"এই বিল্ডিংয়ের সব কাজ শেষ। বাকি কাজ শেষ করে খুব তাড়াতাড়ি এটা বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জি কে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে কাজ বন্ধ। শ্রমিকরা সবাই চলে গেছে। এখন কেউ নেই এখানে।"

জি কে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণাধীন প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে একটি তালিকা করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।

এর মধ্যে এককভাবে জিকেবির হাতে থাকা ১৩টি প্রকল্পের কোনোটিই পুরোপুরি শেষ হয়নি। কোনো প্রকল্পের কাজ হয়েছে ৯৯ শতাংশ। আবার কোনো প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি শূন্য শতাংশ।

০ ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা নির্মাণ কাজের ভৌত অগ্রগতি ৯০ শতাংশ, আর্থিক অগ্রগতি ৮৮ শতাংশ।

০ রাজধানীর বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপেস্নক্স নির্মাণ প্রকল্পের চারটি অংশের গড় ভৌত অগ্রগতি ৭১ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৫১ দশমিক ১৭ শতাংশ।

০ ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় নির্মাণ কাজের ভৌত ৯৫ শতাংশ, আর্থিক ৯২ শতাংশ।

০ গাজীপুরে পাঁচটির্ যাব কমপেস্নক্স এবং একটির্ যাব ট্রেনিং স্কুল নির্মাণ প্রকল্পের ভৌত ৯৯ শতাংশ, আর্থিক ৯৪ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে।

০ সচিবালয়ের নির্মাণাধীন নতুন ২০ তলা ভবনের ষষ্ঠ তলা থেকে ২০ তলা পর্যন্ত পূর্ত এবং অভ্যন্তরীণ স্যানিটারি ও বৈদু্যতিক কাজের ভৌত ৮০ শতাংশ এবং ৫২ শতাংশ আর্থিক আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে।

০ আগারগাঁওয়ে জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান, নিটোরের এলইডি বাতি স্থাপন ও বৈদু্যতিক কাজের ১০০ শতাংশ ভৌত এবং ৯৯ শতাংশ আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে।

০ শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সম্প্রসারণ প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৩২ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৩১ শতাংশ।

০ আজিমপুরে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতি শূন্য শতাংশ।

০ সচিবালয়ে নতুন ২০ তলা ভবনের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৩ শতাংশ, আর্থিক অগ্রগতি শূন্য দশমিক ০৪ শতাংশ।

০ মহাখালীতে জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের আধুনিকায়ন প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৯৮ শতাংশ, আর্থিক ৬৭ শতাংশ।

এছাড়া যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে এমন প্রকল্পগুলোর মধ্যে শুধু উত্তরা নিম্ন ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ১০০ শতাংশ ভৌত অগ্রগতি হয়েছে। একটি প্রকল্পের অগ্রগতি শূন্য শতাংশ।

এসব প্রকল্পের ভবিষ্যৎ কী জানতে জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের প্রধান প্রকৌশলী মো. গোলাম মুস্তাফার মোবাইলে অনেকবার কল দিলেও তিনি ধরেননি। বিষয়টি জানিয়ে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

শামীমের প্রতিষ্ঠানকে কাজ শেষ করার জন্য কবে নাগাদ নোটিস দেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমও কোনো ধারণা দিতে পারেননি।

এক প্রশ্নে তিনি বলেন, "আমরা এখনই নির্দিষ্ট তারিখ বলছি না। এটা করতে গেলে অনেকগুলো প্রক্রিয়া আছে, নিয়ম আছে। যেসব প্রকল্পের কাজ স্তিমিত হয়ে গেছে বা বন্ধ হয়ে গেছে সেগুলোর ব্যাপারে আমরা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে নোটিস দেব। খুব শিগগিরই নোটিস দেব।"

তবে সেই প্রক্রিয়ার জন্য সময় প্রয়োজন জানিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, চুক্তি অনুযায়ী নিয়ম মেনে সবকিছু করতে হবে।

"এই কাজ শেষ করার দায়িত্ব জিকেবির। তারা কাজ শেষ করতে না পারলে চুক্তি অনুযায়ী আমাদের যা করার তা করব। নিয়ম অনুযায়ী তাকে শোকজ করব, আরও কিছু প্রসেস আছে সেগুলো করা হবে। তারপর সে কাজ না করতে পারলে চুক্তি ক্যান্সেল হবে। এগুলো করতে অনেক সময় লাগবে।'
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে