logo
বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২০, ২৫ আষাঢ় ১৪২৬

  সালাম সালেহ উদদীন   ০৩ জুন ২০২০, ০০:০০  

শিক্ষার্থীর আত্মহনন ও শতভাগ ফেল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

অতীতে আমরা দেখেছি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় খারাপ ফল করে পরের বছর পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফল করেছে। কেবল তাই নয়- পৃথিবীর বহু খ্যাতিমান লোক সফল ব্যক্তি পরীক্ষায় ফেল করেছে। মনে রাখতে হবে জীবনকে জীবন দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে, ভালোবাসতে হবে নিজের জীবনকে। আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া কোনো সমাধান নয়। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে হবে। পরীক্ষার ফল খারাপ হলে পরিবারের অভিভাবকরা যাচ্ছেতাই বলে ছেলেমেয়েদের গালমন্দ করে থাকে। এই প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর ফলে ছেলেমেয়েরা হতাশ, দিশাহারা ও আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে ওঠে এবং এক সময়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

শিক্ষার্থীর আত্মহনন ও শতভাগ ফেল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
করোনাভাইরাসের কারণে দেরিতে হলেও এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর ৩ হাজার ২৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে; কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০৪টি। এই হিসাবে শতভাগ পাসের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবার গতবারের তুলনায় ৪৪০টি বেড়েছে। সব পরীক্ষার্থী ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে তিনটি। গত বছর এ পরীক্ষায় ২ হাজার ৫৮৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছিল এবং ১০৭টি প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী ফেল করেছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এবারের মাধ্যমিকের ফল প্রকাশ করেন। পরে ফেসবুক লাইভে ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। মাধ্যমিক স্তরের এই সমাপনী পরীক্ষায় এবার ৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৯৮ জন। এসএসসিতে ২০১৮ সালে ১০৯টি, ২০১৭ সালে ৯৩টি এবং ২০১৬ সালের ৫৩টি, ২০১৫ সালে ৪৭টি এবং ২০১৪ সালে ২৪টি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী ফেল করেছিল। আর ২০১৮ সালে ১ হাজার ৫৭৪টি, ২০১৭ সালে ২ হাজার ২৬৬টি এবং ২০১৬ সালে ৪ হাজার ৭৩৪টি, ২০১৫ সালে ৫ হাজার ৯৫টি এবং ২০১৪ সালে ৬ হাজার ২১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ পরীক্ষার্থী পাস করেছিল। পাসের হারে টানা অষ্টমবারের মতো শীর্ষে রয়েছে রাজশাহী বোর্ড এবং জিপিএ-৫ পাওয়ায় এবারও শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বোর্ড। অভিভাবকদের ব্যয়, রাষ্ট্রীয় ব্যয়, শিক্ষকদের হাজার হাজার শ্রমঘণ্টা শিক্ষার্থীদের লাখ লাখ ঘণ্টা ব্যয় করে যদি শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হয় মাত্র তিন হাজার সেটিও পুরো আনন্দের সংবাদ নয়।

যেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শতভাগ পাস করেছে তাদের অভিনন্দন। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শতভাগ ফেল করেছে তাদের দায়ভার কে নেবে? কী করে দেশের শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করে না, এটা মাথায় ধরে না। এটা জাতির জন্য লজ্জাজনক। আমরা দীর্ঘকাল ধরে লক্ষ্য করে আসছি এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় শতভাগ ফেল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। যদি নেওয়া হতো তা হলে দৃশ্যপট পাল্টে যেত। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ছাত্রছাত্রী পাস করবে না এটা কী করে সম্ভব। আর এটাই আমরা দেখে আসছি বছরের পর বছর ধরে। এ যেন প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কঠোর সিদ্ধান্তে আসতে হবে। আগামী বছর থেকে যাতে একই দৃশ্যের অবতারণা না হয়। এমপিওভুক্তি বাতিল, জরিমানা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া এটা কোনো সমাধান নয়, শতভাগ ফেলের হার বন্ধ করতে হবে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফল ভালো করতে পারেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের খারাপ ফলের কারণ খুঁজে বের করতে হবে। আমরা যেমন আমাদের ছেলেমেয়েদের ভালো ফল দেখে উলস্নসিত হই, একইভাবে খারাপ ফল দেখে বেদনাহত হই। কোনো অকৃতকার্য শিক্ষার্থী যখন আত্মহননের পথ বেছে নেয় তখন চোখ অশ্রম্নসিক্ত হয়ে ওঠে। কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায়, 'যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ মরিবার হলো তার সাধ।'

দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে- হাতাশা ক্ষোভ থেকে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছে এবারও। এসএসসি পরীক্ষায় ফেল ও জিপিএ-৫ না পাওয়ায় শরীয়তপুরে, ঝিনাইদহে, শায়েস্তাগঞ্জ, শ্রীপুরে, ঠাকুরগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। শরীয়তপুরে এক কিশোরী জিপিএ সাড়ে ৪ পেয়েছিল কিন্তু জিপিএ-৫ না পেয়ে ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। ঝিনাইদহে এসএসসি পরীক্ষায় 'সি' গ্রেড পাওয়ায় আত্মহত্যা করেছে একজন শিক্ষার্থী। এক কিশোরী ফলাফল দেখার পর ফেল করায় রাগে ও অপমানে বিষপান করে। এভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে কেউ জিপিএ-৫ না পাওয়া, কেউ আশানুরূপ ফলাফল অর্জন করতে না পারায় আত্মহত্যা করেছে। এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক। দুঃখ হতাশায় অতিরিক্ত আবেগের বশবর্তী হয়ে নিজের জীবনপ্রদীপ অকালে নিভিয়ে দেওয়ার মতো বোকামি আর হতে পারে না।

অতীতে আমরা দেখেছি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় খারাপ ফল করে পরের বছর পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফল করেছে। কেবল তাই নয়- পৃথিবীর বহু খ্যাতিমান লোক সফল ব্যক্তি পরীক্ষায় ফেল করেছে। মনে রাখতে হবে জীবনকে জীবন দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে, ভালোবাসতে হবে নিজের জীবনকে। আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া কোনো সমাধান নয়। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে হবে। পরীক্ষার ফল খারাপ হলে পরিবারের অভিভাবকরা যাচ্ছেতাই বলে ছেলেমেয়েদের গালমন্দ করে থাকে। এই প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর ফলে ছেলেমেয়েরা হতাশ,দিশাহারা ও আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে ওঠে এবং এক সময়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশে পরিবারের অভিভাবকদের যথেষ্ট কর্তব্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকরাও দায় এড়াতে পারেন না। শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। তাদের সুস্থ বিকাশের পথে যেসব বিষয় অন্তরায় দূর করতে হবে তাও। শিক্ষার্থীর ওপর সবসময় চাপ প্রয়োগ করলে তার ফল কখনো ভালো হয় না। তাদের জন্য দরকার আনন্দদায়ক পরিবেশ। কিছু কিছু অভিভাবকে দেখা যায়, তারা অকারণে ছেলেমেয়েদের ধমকান। এর ফলে তাদের মধ্যে জিদ তৈরি হয়, যা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।

শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাটাই হচ্ছে মুখ্য বিষয়। তাই নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ ও শিক্ষার্থীদের সঠিক দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে প্রকৃতি শিক্ষার মাধ্যমে। এগুলো যথাযথ উপায়ে করতে পারলে সমাজের নানা অনাচার ও নেতিবাচক কর্মকান্ড অনেকাংশেই কমে যাবে। পাশাপাশি ভর্তির সুযোগ আরও অবারিত করতে হবে। ভালো ফলই কেবল নয়- ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া গৌরবের বিষয়।

গত কয়েক বছর ধরে আমরা একটি বিষয় লক্ষ্য করে আসছি, তা হলো দেশের হতদরিদ্র ও শ্রমজীবী যারা তাদের সন্তানরা ভালো ফল করে আসছে। অনেকেই বলছেন আঁধার ঘরে চাঁদের আলো। ভাঙা ঘরে স্বপ্ন উড়ছে। পিতা-মাতার শ্রম-ঘাম সার্থক হচ্ছে কতো কী। ২০ বছর আগে এটা ভাবা যায়নি। বোর্ড স্ট্যান্ট যখন ছিল, তখন প্রতি বোর্ডে মেধাতালিকায় ১০ জনের মধ্যে আট জনই ছিল ধনীর সন্তান। এখন চিত্র উল্টে গেছে। ধনীর সন্তানরা হয় বিদেশে লেখাপড়া করছে, না হয়ে মাদকাসক্ত হয়ে গোলস্নায় গিয়েছে। এই চিত্র থেকেও আমরা শিক্ষা নিই না।

আরও একটি বিষয়, তা হলো কোচিংনির্ভরতা, গাইড বই নোট বইনির্ভরতা, এটাও বন্ধ করতে হবে, যে কোনো মূল্যে। যদিও সরকার এ ব্যাপারে তৎপর ও মনোযোগী। তারপরেও ফাঁক গলে কত ঘটনাই তো ঘটছে। কত অনিয়ম নিয়ম হয়ে যাচ্ছে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বহুমাত্রিক। বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম। ইংলিশ ভার্সন, আলিয়া মাদ্রাসা ও ইবতেদায়ী মাদ্রাসাভিত্তিক ও কারিগরি শিক্ষা। শিক্ষাব্যবস্থাকে একমুখী করা যায় কিনা সে বিষয়ে ভাবতে হবে। কারণ দীর্ঘদিন থেকে এই দাবি উঠে আসছে দেশের সচেতনমহল থেকে। দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং উচ্চশিক্ষার স্তর বেড়েছে; কিন্তু শিক্ষার মান বেড়েছে কি? এই প্রশ্নও একেবারে অবান্তর নয়। এ বিষয়গুলোও সরকারকে ভাবতে হবে। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে আরও প্রসারিত করতে হবে। শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড এই সনাতন কথাটিও আমাদের মনে রাখতে হবে। সঠিক পথে পরিচালিত হয়ে আমাদের ছেলেমেয়েরা হোক জাতির সম্পদ আমাদের গর্ব এ প্রত্যাশাই করছি।

সালাম সালেহ উদদীন : কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে