logo
বুধবার ১৬ জানুয়ারি, ২০১৯, ৩ মাঘ ১৪২৫

  তারাপদ আচাযর্্য   ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০  

শিকাগো ধমর্-মহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দ

আদশর্ জীবন গড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষা যে গুরুত্বপূণর্ ভূমিকা রাখে, তা তিনি সবর্ত্র প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন এবং তারই আলোকে জীবন গড়ার কথা বলেছেন। শিকাগো ধমর্-মহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দর ভাষণ সবার জন্য আলোকবতির্কা। মহান এই বাঙালি মনীষীর কমর্ যুগে যুগে মানুষকে উদ্দীপিত করবে। সমাজে ন্যায়নিষ্ঠা ও সততা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রেরণা জোগাবে।

শিকাগো ধমর্-মহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দ
দাশির্নক, ধমীর্য়- সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, রামকৃষ্ণমিশন প্রতিষ্ঠাতা স্বামী বিবেকানন্দ । এক অনন্যসাধারণ প্রতিভা, যা আধুনিককালে ধমর্- সংস্কৃতি, পরোক্ষভাবে ভারতীয়দের জাতীয় আত্মচেতনার রূপ দিতে সাহায্য করেছিলেন। বাঙালি জাতি ও হিন্দু ধমের্ক বিশ্ব-মঞ্চে তিনিই সবর্প্রথম প্রতিষ্ঠিত করিয়ে দেন অত্যন্ত জোরালোভাবে। শিকাগোর সেই ধমর্সভার কথা সবাই জানে। অজ্ঞ কাতর অসহায় ও পীড়িত মানুষের পাশে দঁাড়ানোই ছিল তার প্রধান কতর্ব্য ও বিবেচনা। তাদের স্বমহিমায় উদ্ভাসিত করাই ছিলো তার প্রধান কতর্ব্য।

স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো ধমর্ মহাসভায় তার উদ্বোধনী ভাষণটি দিয়েছিলেন ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ১১ সেপ্টেম্বর। ওই দিনটি মানবসভ্যতার ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে এবং থাকবে। যুগনায়কের সেই বিস্ময়কর আবিভাের্বর কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল বিভিন্ন মহলে, তা আমাদের বিশেষভাবে জানা প্রয়োজন। কোন পটভ‚মিকায় তার ভাস্বর ব্যক্তিত্বের সাড়াজাগানো প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তাও লক্ষ্য করার বিষয়।

আমেরিকায় যাত্রার আগে স্বামীজী তার গুরুভাই স্বামী তুরীয়ানন্দকে (হরি মহারাজ) বলেছিলেন, ‘ধমর্ মহাসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে (নিজের দিকে অঙ্গুলি নিদের্শ করে) এইটের জন্য। আমার মন তাই বলছে। অদূর ভবিষ্যতে তা ঘটবে দেখে নিও।’ বাস্তবিক তা-ই ঘটেও ছিল।

১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে স্বামীজী বোম্বাই বন্দর থেকে ‘পেনিনসুলার’ জাহাজে শিকাগো রওনা হন। কলম্বো হয়ে সিঙ্গাপুর, হংকং, চীন ও জাপান ছুঁয়ে জাপানের ইয়াকোহামা বন্দর থেকে ১৪ জুলাই ‘এসএস এমপ্রেস অব ইন্ডিয়া’ জাহাজে তার অভিযাত্রার পরবতীর্ পযার্য় শুরু হয়। ২৫ জুলাই সন্ধ্যা ৭টায় তিনি কানাডার দক্ষিণ পশ্চিম কোণে অবস্থিত ভাস্কুভার বন্দরে অবতরণ করেন। ওখানে এক রাত্রী কাটাতে তিনি বাধ্য হন; কারণ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার শেষ ট্রেন সেদিন তার আগেই চলে গিয়েছিল। পরের দিন ভোরের গাড়িতেই তিনি শিক্ষাগোর উদ্দেশে রওনা হন এবং দীঘর্ পথে তিনবার ট্রেন পরিবতর্ন করে ৩০ জুলাই রাত ১১টায় পেঁৗছান। ট্রেনে এক বষীর্য়সী বাগ্মী ও লেখিকার সঙ্গে তার আলাপ হয়। ওই মহিলার নাম মিস ক্যাথারিন অ্যাবট স্যানবনর্ (সংক্ষেপে মিস কোট স্যানবনর্); তার বয়স তখন ৫৪ বছর। তিনি তখন স্বামীজীর সঙ্গে আলাপে মুগ্ধ হয়ে তাকে বস্টনের কাছে তার ব্রিজি মেডোজ (ইৎববুু গবধফড়ংি) নামে খামারবাড়িতে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানান।

ধমর্ মহাসভার সাধারণ সমিতি (এবহবৎধষ ঈড়সসরঃঃবব) গঠিত হয়েছিল ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের বসন্তকালে। এর সভাপতি হয়েছিলেন রেভারেন্ড জন হেনরি ব্যারোজ (শিকাগো ফাস্টর্ প্রেসবিটেনিয়ান চাচের্র তদানীন্তন পাদ্রী)। মহাসভার উদ্দেশ্যসমূহ ছিল সংখ্যায় দশটি। আপাতদৃষ্টিতে ওইগুলো উদারই ছিল; কিন্তু বস্তুতপক্ষে যাতে ওইগুলো খ্রিস্টধমের্র প্রাধান্য বিস্তারের পক্ষে সহায়ক হয়, তার প্রচেষ্টাই পরে হয়েছিল।

প্রথম দিনের অধিবেশনে শুধু কমর্কতাের্দর স্বাগত ভাষণ ও প্রতিনিধিদের তরফে তার প্রত্যুত্তরসমূহ শ্রোতারা শুনতে পেয়েছিলেন। ওইদিন সকালের বৈঠকে কয়েকটি দীঘর্ বাগ্মিতাভরা স্বাগত ভাষণ হয়েছিল। বিভিন্ন ধমের্র প্রতিনিধিরা সংক্ষিপ্ত প্রত্যুত্তর তার বিনিময়ে দিয়েছিলেন। ওই সময়ে স্বামীজী তার আসনে উপবিষ্ট থেকে যেন ধ্যানস্থ ও প্রাথর্নারত অবস্থায় ছিলেন। বিকালের বৈঠকে চারজন প্রতিনিধির পূবর্ থেকে প্রস্তুত বিবৃতির পরে বক্তা হিসেবে তার নাম ঘোষিত হলে স্বামীজী তার সংক্ষিপ্ত প্রথম ভাষণটি প্রস্তুতিহীনভাবেই তাৎক্ষণিক (কোনো লিখিত কাগজপত্র ছাড়াই বীঃবৎসঢ়ড়ৎব) দেন। তার পাশেই উপবিষ্ট ছিলেন ফরাসি প্রতিনিধি জি বোনেঁ ম্যরি (এ. ইড়হবঃ গধঁৎু)। তিনি ইতিপূবের্ বারবার স্বামীজীকে উঠে দঁাড়ানোর জন্য অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। অবশেষে মনে মনে দেবী সরস্বতীকে প্রণাম জানিয়ে স্বামীজী উঠে দঁাড়ালেন। তার প্রথম সম্বোধনেই শ্রোতাদের মধ্যে কী বিদ্যুৎ শিহরণ জেগেছিল তার কথা এখন সবারই জানা। ধমর্ মহাসভার সাধারণ সমিতির সভাপতি ড. ব্যারোজের বণর্না নিম্নরূপÑ

‘ডযবহ গৎ. ঠরাবশধহধহফধ ধফফৎবংংবফ ঃযব ধঁফরবহপব ধং ংরংঃবৎ ধহফ নৎড়ঃযবৎং ড়ভ অসবৎরপধ; ঃযবৎব ধৎড়ংব ধ ঢ়বধষ ড়ভ ধঢ়ঢ়ষধঁং ঃযধঃ ষধংঃবফ ভড়ৎ ংবাবৎধষ সরহঁঃবং. (যখন মি. বিবেকানন্দ শ্রোতাদের ‘আমেরিকা ভগ্নী ও ভ্রাতৃবৃন্দ’ বলে সম্বোধন করলেন, তখন কয়েক মিনিট ধরে আনন্দের উন্মাদনা বয়ে গিয়েছিল।) ওয়াল্টার আর. হাউটন (ডধষঃবৎ জ. ঐড়ঁমযঃড়হ) সম্পাদিত ‘ঞযব চধৎষরধসবহঃ ড়ভ জবষরমরড়হং ধহফ জবষরমরড়ঁং ঈড়হমৎবংংবং ধঃ ঃযব ডড়ৎষফ’ং ঈড়ষঁসনরধহ ঊীঢ়ড়ংরঃরড়হ’ নামক ইতিহাসগ্রন্থেও অনুরূপ বণর্না পাওয়া যায়। স্বয়ং স্বামীজীও পরে কথাপ্রসঙ্গে এর বণর্না দিয়েছিলেন : ‘ধ ফবধভবহরহম ধঢ়ঢ়ষধঁংব ড়ভ ঃড়ি সরহঁঃবং ভড়ষষড়বিফ’

ত্যাগ ও সেবা:

স্বামীজী দেখাইছেন, নিঃস্বাথর্ সেবাই চারিত্রিক উন্নতির সবের্শ্রষ্ঠ সোপান। তার সঙ্গে তিনি জুড়িয়ে দিয়েছেন ত্যাগ-স্বাথর্পরতা বিসজর্ন এবং কমর্ফলে অনাসক্তি। এই সেবা ত্যাগই আমাদের জাতীয় আদশর্। তার মতে, জাতিকে ওই আদশের্র পথে পরিচালিত করলেই বাকি সব আপনা হতেই হবে।, ‘ঐ দুইটি বিষয় উন্নত করুন, তাহা হইলে অবশিষ্ট যাহা কিছু আপনা হইতে উন্নত হইবে।’

ব্যক্তিত্ব:

গৃহস্থের জীবনে, ধনী, দরিদ্র, ব্যবসায়ীর জীবনে আধ্যাত্মিক জীবনে সবারই জীবনে এই ব্যক্তিত্বকে বাড়াইয়া তোলার মূল্য অনেক। প্রাকৃতিক যেসব নিয়ম আমাদের জানা আছে, সেগুলোরও পিছনে অতি সূ² সব নিয়ম রয়েছে। অথার্ৎ স্থূলজগতের সত্তা মনোজগতের সত্তা অধ্যাত্মজগতের সত্তা প্রভৃতি বলে আলাদা আলাদ কোনো সত্তা নেই। সত্তা বলতে যা আছে, তা একটিই। এই ক্ষুদ্র জগতেও যা আছে, ব্রহ্মাÐেও ঠিক তাই আছে।

সূ² এর মধ্যেই প্রচÐতম শক্তি নিহিত থাকে; স্থূলের মধ্যে নয়। কোনো লোককে হয়তো বিপুল ভার লয়ে উত্তোলন করতে দেখা যায়; তখন তার মাংশপেশিগুলো ফুলে ওঠে, তার সারা অঙ্গে শ্রমের চিহ্ন পরিস্ফুট হয়।

প্রত্যেক মানুষেরই ব্যক্তিত্বকে একটি কাচের গোলকের সঙ্গে তুলনা করতে পারা যায়। প্রত্যেকটির কেন্দ্রে একই শুভ্র জ্যোতি, ঐশী সত্তার একই প্রকার বিচ্ছুরণ; কিন্তু কাচের আবরণের বণর্ ও ঘনত্বের পাথের্ক্য রশ্মিনিঃসরণে বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা ঘটতেছে। কেন্দ্রে অবস্থিত শিখাটির দীপ্তি ও সৌন্দযর্ সমান কিন্তু যে জাগতিক যন্ত্রের মাধ্যমে তার প্রকাশ হয়, কেবল তারই অপূণর্তাবশত তারতম্যে প্রতীতি ঘটে।

শিক্ষা:

মানসিক ব্যবহার সমূহকে কি প্রকারে ব্যবহার করলে আপনার এবং অপরের মঙ্গল সাধিত হবে? তা-ই জীবনের সবোর্চ্চ শিক্ষা, তা-ই প্রকৃত শিক্ষা। সম্পূণর্ জীবনের একটি আদশর্ সম্মুখে রেখে সেদিকে অগ্রসর হওয়াই জীবনের উদ্দেশ্য; অতএব যে শিক্ষা প্রণালি যত পরিমাণে সেই দিকে অগ্রসর হবে, তা তত পরিমাণে উৎকৃষ্ট। শিক্ষা হচ্ছে মানুষের ভিতর যে পূণর্তা প্রথম থেকেই বিদ্যমান, তারই প্রকাশ। আমরা দেখেছি যে, স্বামীজীর মতে প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো মানুষ গড়া।

ভালোবাসাই ফলদায়ী

প্রেম নিষ্ঠা এবং ধৈযর্ এই তিনটি জিনিস ছাড়া, আর কিছুরই দরকার নেই। উন্নতি, অথার্ৎ বিস্তার, অথার্ৎ প্রেম এছাড়া আর জীবনের মূল্য কি?

সুতরাং প্রেমই জীবন। প্রেমই জীবনের একমাত্র বিধান এবং স্বাথর্পরতাই মৃত্যু। একথা ইহলোকে যেমন সত্য, পরলোকেও তাই। পরোপকারই জীবন এবং তা না করাই মৃত্যু।

আদশর্ জীবন গড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষা যে গুরুত্বপূণর্ ভূমিকা রাখে, তা তিনি সবর্ত্র প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন এবং তারই আলোকে জীবন গড়ার কথা বলেছেন। শিকাগো ধমর্ -মহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দর ভাষণ সবার জন্য আলোকবতির্কা। মহান এই বাঙালি মনীষীর কমর্ যুগে যুগে মানুষকে উদ্দীপিত করবে। সমাজে ন্যায়নিষ্ঠা ও সততা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রেরণা জোগাবে।

সূত্র: ব্যক্তিত্বের বিকাশ স্বামী বিবেকানন্দ শিক্ষা: হাবার্ট স্পেন্সার। চিন্তানায়ক বিবেকানন্দ: স্বামী লোকেশ্বরানন্দ

তারাপদ আচাযর্্য: কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে