logo
বুধবার ১৭ জুলাই, ২০১৯, ২ শ্রাবণ ১৪২৬

  অনলাইন ডেস্ক    ০৯ জুন ২০১৯, ০০:০০  

তারুণ্যের সাম্রাজ্যে মাদকের রাজত্ব কেন?

তারুণ্যের সাম্রাজ্যে মাদকের রাজত্ব কেন?
একটি দেশের তরুণদের নিয়েই তরুণসমাজ। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনসমষ্টি এই তরুণসমাজ। তাদের মাধ্যমে দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণ সাধিত হয়। দেশে মুক্তি ও উন্নতির জন্য তারাই বারবার এগিয়ে এসেছে। স্বপ্নহীনদের দেখিয়েছে স্বপ্ন, আশাহতদের নতুন দিনের প্রত্যাশায় করেছে উদ্দীপ্ত। তরুণসমাজের অপ্রতিরোধ্য শক্তি দিয়ে সব বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে তারুণ্যের আলোয় আলোকিত করে সারা পৃথিবী।

বর্তামানে তারুণ্যের সাম্রাজ্যে মাদকের রাজত্ব বেড়েই চলেছে। বিশ্বের ভয়ংকর সমস্যাগুলোর মধ্যে মাদক সমস্যা অন্যতম। কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরাই সবচেয়ে বেশি মাদকাসক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশেও মাদকাসক্তের সংখ্যা বেশির ভাগ তরুণসমাজে। মাদকের দাবানলে ছেয়ে গেছে সারাদেশ। আর এই দাবানলে পুড়ছে তরুণসমাজ। প্রতিনিয়তই তারা মাদকাসক্ত হয়ে যাচ্ছে। মাদক নিজের গতি বলে কোনো শক্তির কাছে মাথা নত না করেই আপন মনে তারুণ্যের সাম্রাজ্যে রাজার বেশে রাজত্ব করে চলেছে। প্রজা হিসেবে তরুণসমাজ মাদক রাজার শাসনও মেনে নিয়েছে। আর এই মাদক রাজাকে রাজত্ব পরিচালনায় সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছে কিছু অসাধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী। এদের মধ্যে সরকারের উচ্চমহল থেকে গ্রামের পাতি নেতারাও রয়েছে। তারাই মূলত মাদকের রাজত্ব সম্প্রসারণে অনেক বড় সহায়ক। দেশের স্বার্থের জন্য তারা কোনোদিন কাজ করে না। সর্বদা নিজের স্বার্থরক্ষার জন্য ব্যস্ত থাকেন। এরাই দেশের প্রকৃত শত্রম্ন। এদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। দেশের ক্ষতি করে যে নিজে ভালো থাকা যায় না সেটা একেবারেই ভুলে যায় এরা। বর্তমানে অবৈধ পথে অর্থ উপার্জনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো মাদকের ব্যবসা। এই ব্যবসার সঙ্গে কেউ জড়িত হলে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ। তাই একটি চক্র দেশের মধ্যে মাদকের রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো মাদক উৎপাদন ও চোরাচালান কারবারে বিশ্বের নজর কেড়েছে। এসব প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য সরবরাহ করছে। ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, মিয়ানমারসহ সবদেশেই মাদকাসক্তের পরিমাণ বেড়ে চলেছে। এসব দেশে উৎপাদন হচ্ছে মরণ নেশা বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমার বাংলাদেশকে মাদকদ্রব্য ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র বানানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায় যে তারা অনেকটা সফল হয়েছে। তবে আমাদের সরকার মাদক নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো সফলতা অর্জন করতে পারিনি। এখনো চলছে সর্বত্রই মাদকের ছড়াছড়ি। কেননা, মাদক নিয়ন্ত্রণে যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাদের ভিতরেই দুর্নীতি। তাদের দুর্নীতির কারণেই আজও বাংলার বুকে মাদক ব্যবসা টিকে আছে। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র মিয়ানমার থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা এদেশে চালান হচ্ছে। এই মরণ নেশা ইয়াবার কবলে পড়ে তরুণসমাজ মৃতু্যকে পুজো-অর্চনা করে চলেছে। ভারত থেকেও বিভিন্ন মাদকদ্রব্য বাংলাদেশে আসে। এগুলোর মধ্যে ফেনসিডিল অন্যতম। আমাদের দেশে প্রচলিত মাদকদ্রব্য হলো হিরোইন, কোকেন, ইয়াবা, আফিম, মারিজুয়ানা, গাঁজা, ফেনসিডিল, বিয়ার প্রভৃতি। মাদক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে যাচ্ছে এই মাদকদ্রব্য। মাদক সেবনের ফলে একজন ব্যক্তি স্বাভাবিক সুস্থ জীবন-যাপন করতে পারে না। সাময়িক সময়ের জন্য ভালো অনুভব করলেও ব্যক্তি সর্বদাই অসুস্থ জীবন-যাপন করে থাকে। বর্তমান সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। মাদক নির্মূলের জন্য কাজ করে চলেছে অবিরাম। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও দৈনন্দিন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মাদকদ্রব্য উদ্ধার করছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করা হচ্ছে। তবুও থামছে না মাদকের রাজত্ব। তবে দুঃখের বিষয় হলো- বড় বড় রাঘব-বোয়ালরা আইনের বাইরেই থেকে যায়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এসব রাঘব-বোয়ালদের আইনের আওতায় আনতে সরকারকে আরও কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনের ক্ষমতা যে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তার প্রমাণ করতে হবে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে প্রশাসনের লোক জড়িয়ে আছে। যাদের মাদক নির্মূলের দায়িত্ব দেয়া হয় তারাই গোপনে মাদক কারবারের সঙ্গে আতাত রাখে। দেশের দৈনিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে চোখ পড়লেই দেখা যায় সরকারের বিভিন্ন কর্মচারীরা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই এই ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। যাদের কাছ থেকে তরুণসমাজ শিক্ষা নিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব দেবে তাদের অবস্থার এই পরিণতি। মাদককে তারা তরুণসমাজে ছড়িয়ে দিয়ে দেশের সম্পদকে চিরতরে নষ্ট করে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। বর্তমানে দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও মাদকাসক্ত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। প্রশাসনেরও নেই তেমন কোনো নজরদারি। ফলে ধ্বংস হচ্ছে তাদের ভবিষ্যৎ। মাদকাসক্তের ফলে তারুণ্যের জীবনব্যবস্থা হয়ে ওঠে আরও খুব জটিল। সমাজের চোখে তারা ঘৃণিত হয়। তারা কোনোভাবেই সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারে না। এমনকি মাদক সেবনের নেশা ধরলে যে কোনো পরিস্থিতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারে। মাদকাসক্ত হওয়ার ফলে তরুণসমাজ প্রকৃত শিক্ষা থেকে দূরে সরে যায়। মানুষের নৈতিক গুণগুলো ভুলে অনৈতিক গুণগুলো চর্চা করে। এমন কার্যকলাপ নিঃসন্দেহে দেশের জন্য ক্ষতিকর। যার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা লেগেই থাকে। তরুণসমাজে মাদকাসক্তের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। আর এই প্রভাব কাটিয়ে উঠতে দেশের সরকারকে হিমশিম খেতে হয়। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে এই সমস্যা আরও বেশি প্রকট। যে তারুণ্যের শক্তিতে ফিরে পেয়েছি বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার সেই তারুণ্যের মহাশক্তি আজ মাদকের কবলে পড়ে নিঃস্ব হতে চলেছে। যে তরুণ সমাজের ওপর ভর করে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ তারাই আজ মহাবিপদের মধ্যে। আমি কখনোই চাই না তারুণ্যের আলো নিভে যাক। সোনার বাংলাদেশ হিসেবে দেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে মাদকমুক্ত করতে হবে। মাদক নামক দাবানল এদেশের বুক থেকে চিরতরে নিভিয়ে ফেলতে হবে। তা হলেই বিপথগামী তরুণদের সঠিক পথে ফেরানো সম্ভব। মাদকাসক্ত তরুণদের গঠনমূলক সুচিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। এজন্য দেশের সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন এনজিওগুলোকে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। তরুণসমাজের মাদকাসক্ত হওয়ার পিছনে ঝুঁকে পড়ার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। এগুলোর মধ্যে মাদকের সহজলভ্যতা, দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন ও নিঃসঙ্গতা, বিবাহ বিচ্ছেদ, দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ কর্মসংস্থানের অভাব, অপসংস্কৃতির প্রসার, নোংরা রাজনীতির ছোঁয়া প্রভৃতি উলেস্নখযোগ্য। এসব কারণেই তরুণসমাজে মাদকের রাজত্ব চলছে। তাই তরুণসমাজকে মাদকাসক্তের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে মাদকের সঙ্গে জড়িত সব সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধান করতে হবে। তা হলেই তরুণসমাজকে সব বিপদের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। আর আমরা বিশ্বের বুকে একটি উন্নত জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবো।

\হ

জুয়েল নাইচ

শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে