logo
বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  ডা. এস এ মালেক   ২৫ জুন ২০১৯, ০০:০০  

বাজেট ও প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্ন

যারা প্রস্তাবিত বাজেটের সমালোচনা করছেন তারা দেশের শত্রম্ন নয়, এমনকি প্রতিপক্ষ নয়। প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাস থেকেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। সরকারের উচিত সব কিছু বিচার বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও দক্ষতার সঙ্গে জাতীয় সমস্যার প্রতি দৃষ্টি দিয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সোনার বাংলা বিনির্মাণে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাজেট জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে সফল হবে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়িত হবে, সেই প্রত্যাশা করছি।

চ্যালেঞ্জ ও নুতন স্বপ্ন নিয়ে গত ১৩ জুন মহান জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছেন। এটা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা তৃতীয়বারের ক্ষমতায় আসা ও বর্তমান অর্থমন্ত্রীর পেশকৃত প্রথম বাজেট। বাজেট বলতে আমরা সাধারণত বুঝি সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব এক বছরের। একটা গণতান্ত্রিক দেশে জনগণ প্রদত্ত অর্থ সরকার কীভাবে ব্যয় করছে বা কোন কোন উৎস থেকে কর আদায় হবে, তার হিসাব নেয়ার অধিকার জনগণের রয়েছে। একইভাবে সরকারের দায়-দায়িত্ব হচ্ছে কোন কোন খাতে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা জনগণকে অবহিত করা। এখানেই বাজেটের গুরুত্ব। স্বচ্ছতার ও জবাবদিহিতার প্রয়োজনে প্রতিবছর মহান জাতীয় সংসদে জনগণ প্রদত্ত অর্থ আয়-ব্যয়ের হিসাব বাজেটের মাধ্যমে উপস্থাপন হয়ে থাকে। বাজেট অধিবেশনেই জানা যায় কত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা ও তা কীভাবে ব্যয় হচ্ছে। সংসদে জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় বাজেট পাস করা হয়। কোন খাতে কত অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে, কী কারণে তা ব্যয় হবে, তার হিসাব সংসদে সরকারকে দিতে হয়। সংসদ সদস্যরা ইচ্ছা করলেই ওই বাজেটের পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংযোজন প্রস্তাব করতে পারেন। তাই সংসদে প্রদত্ত বাজেট সংশোধিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই জন্য বাজেট অধিবেশন সাধারণত দীর্ঘ হয়। প্রতিটি বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা হয়, প্রতিটি বিল মন্ত্রণালয়ভিত্তিক পৃথকভাবে পাস হয়। তাই বলে বাজেট শুধু বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়- যে সরকার বাজেট প্রণয়ন করছে, তার রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর বাজেট বাস্তবায়ন নির্ভর করে। গণবিরোধী স্বৈরাচারী সরকার যখন ক্ষমতায় থাকেন, তখন সংসদ সার্বভৌম থাকে না। এক ব্যক্তির ইচ্ছা পূরণে সংসদকে ব্যবহার করা হয়। তাই স্বৈরাচারী সরকারের বাজেট হয়ে থাকে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সরকারপ্রধানের ইচ্ছাই বাজেট প্রণীত হয়। তাই বাজেটপূর্বক আলোচনার আগেই কী ধরনের সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তার ওপর বাজেটের গতি-প্রকৃতি নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ৩ বছর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু দেশ শাসন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত ভঙ্গুর অর্থনীতিকে কত কম সময়ে, কত ব্যাপকভাবে অগ্রসরমান করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তা তৎকালীন উন্নয়নের গতি ও প্রকৃতি দেখেই অনুধাবন করা যায়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মহান জাতীয় সংসদে ৮০০ কোটি টাকার নিচে বাজেট পেশ করেন। সেই স্বল্প আয়ের ও বিদেশ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা এনে যেভাবে বঙ্গবন্ধু ৩ বছরের মধ্যেই শক্ত ভিত্তির ওপর অর্থনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তা অকল্পনীয়। তার পরে এসেছে প্রতি বিপস্নবের ধারাবাহিকতা। '৭৫-৯৬' এই দীর্ঘ একুশ বছরে দুজন স্বৈরশাসক, একজন তাদের অনুসারী বাংলাদেশ শাসন করেছেন। এই একুশ বছরে আমরা দেখেছি খাল কাটা বিপস্নব, মানি ইজ নো প্রোবলেম, এই ধারাই উন্নয়ন ও অগ্রগতি ধাবিত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে কিছু কিছু উন্নয়নও হয়েছে- যেমন সড়ক যোগাযোগ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন। তবে এই একুশ বছরে যেভাবে উন্নয়ন ও অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে কিন্তু হয় নাই। কারণ যারা এই সময়ে দেশ পরিচালনা করেছেন, তারা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষের সাধারণ জনগণকে রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারেননি। যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা স্বাধীনতাবিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে না। উন্নয়ন তাদের বিবেচ্য বিষয় ছিল না। কীভাবে ক্ষমতায় থাকা যায়, কীভাবে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা সফল করা যায়, এটাই ছিল তাদের দেশশাসনের মূল লক্ষ্য। তাই দেখা যায়, এই একুশ বছরে দেশের খাদ্য ঘাটতি, প্রবৃদ্ধি ৫% এর উপরে ওঠেনি, মুদ্রাস্ফীতি দুই অঙ্কে ছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন প্রভৃতি জনকল্যাণমুখী খাতে কোনো বিশেষ বরাদ্দ করা হয়নি। শিক্ষার সুযোগ সীমিত মানুষের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। গ্রামে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ ছিল না। প্রতিবছর প্রায় ৩০-৪০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। গ্রামে তেমন বিদু্যৎ পৌঁছেনি। স্কুল, কলেজের চিত্র ছিল দৈন্যদশা। প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা হয়নি। সার্বিক বিবেচনায় দেশের মানুষের অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ।

অথচ স্বৈরশাসনের সমর্থকরা অতি অল্প সময়ের মধ্যে শোষকশ্রেণি গড়ে তুলতে সক্ষম হন। পাকিস্তানের ২৩ পরিবারের বিপরীতে ২৩০০ পরিবারের জন্ম হয়। টাকা কোনো সমস্যাই নয়, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সুবিধাভোগীদের বিলি বণ্টন করা হয়। সরকারি দলের সমর্থক, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি কর্মীরা অল্প সময়ে ধনশালী ও বিত্তশালী হয়ে যায়। এক কথায় রাষ্ট্র জনগণের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ না হওয়ায় তাদের দেশ পরিচালনায় জনগণের কল্যাণ সাধিত হয়নি। ১৯৯৬ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়ে ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আগের দৃশ্যপটের সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটান। সরকারের জনকল্যাণমুখী নীতি এবং সরকারপ্রধানের অকুণ্ঠ দেশপ্রেম এবং জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের সুদীর্ঘ অঙ্গীকার, মাত্র ৫ বছরে দেশের চেহারাই পাল্টে যায়। এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে উন্নয়ন ও অগ্রগতি হয়নি। মধ্যে ২০০১-২০০৮ পর্যন্ত মেয়াদে এই ৭ বছর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ও সামরিক বাহিনী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের অগ্রগতি আবার থামিয়ে দেয়। সরকারের গণবিরোধী নীতির কারণে দেশ পশ্চাদমুখী হয়ে পড়ে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে আবার শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে ২০১৯ এই ১১ বছর একটানা ক্ষমতায় থেকে সেই ১৯৯৬ সালের কর্মসূচি নেন, তা সম্পূর্ণ করে দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে দেশ ও জাতিকে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যান। এই ১১ বছরের দেশের উন্নয়নের গতিপ্রকৃতি যেভাবে অগ্রসরমান হয়েছে, তা শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, পৃথিবীর অন্য দেশের জন্য শিক্ষণীয়। আমরা ইতোমধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেয়েছি। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশের পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। দেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। ১০ বছর আগে জাতীয় সংসদে যে বাজেট পেশ করা হয়েছিল, তার আকার ছিল ৬১ হাজার কোটি টাকা। আর এখন তা বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। সেই সময়ে দেশের ৩০-৪০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য আমদানি করতে হতো। আজ আমরা ১০-১৫ লাখ টন খাদ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছি। মাথাপিছু আয় ৫৭৫ মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ১৯০৯ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে সরকারিকরণ করা হয়েছে। বছরের শুরুতেই ৩৫ কোটি বই বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। দক্ষিণ এশিয়া কেন, পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশও এই কাজটি করতে সক্ষম নয়। এবার প্রবৃদ্ধি ৮.২৫% ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বাস আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে এবং উন্নয়নের এই গতিধারা অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালের মধ্যে আমাদের প্রবৃদ্ধি ২ ডিজিটে উন্নীত করা সম্ভব হবে। এবার মুদ্রাস্ফীতি সুনিয়ন্ত্রিত ৫.৫%। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজাভ ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গ্রামবাংলার প্রতিটি পলস্নীতে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে গেছে। বর্তমান বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রতিটি ঘরে বিদু্যৎ পৌঁছে যাবে। ১১ বছরে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট থেকে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ২১ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। সেদিন আর বেশি দূরে নয়, ঢাকার মানুষ মেট্রোরেলে চলাফেরা করবে। কর্ণফুলী ট্যানেলে গাড়ি চালিয়ে ঢাকা চট্টগ্রাম মাত্র ৩ ঘণ্টায় যাতায়াত করতে পারবে। বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু দ্রম্নত বাস্তবায়নের দিকে। এই সেতু নির্মিত হলে মাত্র ৫ মিনিটে পদ্মা পাড়ি দেয়া সম্ভব হবে। পারমাণবিক বিদু্যৎকেন্দ্র নির্মাণ করে বিদু্যৎ সমস্যার সমাধান হবে। বাংলাদেশে এক সময় আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর ছিল চট্টগ্রাম। এখন ৩টি আন্তর্জাতিক মানের বন্দর নির্মাণের কাজ শেষের পথে। এর সবকিছু ঘটেছে শেখ হাসিনার মতো একজন যোগ্য, প্রাজ্ঞ, বিচক্ষণ, দেশপ্রেমিক, কঠোর পরিশ্রমী, লোভ লালসাহীন, সুযোগ্য ও দক্ষ প্রধানমন্ত্রীর কারণে। দিনরাত তিনি নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ছুটে চলেছেন বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত এই শ্রদ্ধেয় নেত্রী মহান জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করেছেন। অনেকেই বলেছেন এটা অনিয়মতান্ত্রিক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কেবিনেট ব্যবস্থায় যে কোনো মন্ত্রীর অসুস্থতাজনিত কারণে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিতে পারেন। অর্থমন্ত্রী অসুস্থতায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ঐকান্তই বিধি সম্মত বটে। এটাকে বাঁকা চোখে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এবারের বাজেট জনকল্যাণমুখী। জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার কর্তৃক ঘোষিত বাজেট অবশ্যই জনকল্যাণমুখী হবে। তিনি বলেছেন তার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। জনগণের কল্যাণেই তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই তার রাজনীতির মূল্য লক্ষ্য। তিনি চান সমাজের শোষিত-বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের মুক্তি। অবশ্য এ কথা ঠিক যে পদ্ধতিতে সরকার চলছে, সেই পদ্ধতিতে শোষিত-বঞ্চিত মানুষের কল্যাণ করা একটা কঠিন প্রক্রিয়া। কিন্তু শেখ হাসিনার জন্য কোনো কিছুই করা কি অসম্ভব। বিশ্ব রাজনীতি আজ কোন অবস্থায় বিদ্যমান। দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতাটা কী; পারিপার্শ্বিকতা ও বাস্তবতাকে অস্বীকার করে যারা নতুন ধারার প্রবর্তনের মাধ্যমে বিকল্পভাবে বাংলাদেশকে পরিচালনার কথা বলেন মনে হয় তারা পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে কথা বলেন না। ৬০-৭০ বছরের পুরোনা অভিজ্ঞতা তাদের হৃদয়কে এমনভাবে আলোড়িত করে যেন তারা ২০১৯ সালে এসেও একই মতাদর্শ ও ভাবাদর্শে চলতে চান। যে বিশ্বব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল, তাকে পুনরুজ্জীবিত করার স্বপ্ন কল্পনা বিলাসী নয় কি? বাস্তববাদী, প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে শেখ হাসিনা এসব কথা বিবেচনা নিয়েই দেশ পরিচালনা করছেন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আজ সচল। বিশ্ব আর্থ-সামাজিকব্যবস্থার সঙ্গে মিল রেখে চলতে হলে বাংলাদেশ এ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। তবে শোষণমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের যে স্বপ্ন জাতির পিতা দেখেছিলেন, শেখ হাসিনাও কিন্তু তার থেকে একচুল নড়েননি। জনগণের জন্য তিনি যা করছেন তা সর্বজনবিদিত। কৃষি, শিল্প, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য খাত, দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এই সাফল্যের সুফল এ দেশের সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ ভোগ করছেন। গার্মেন্টশিল্পে কিছু কিছু সমস্যা থাকলেও তা সমাধানের পর্যায়ের রয়েছে। তবে এ কথা ঠিক সুনির্দিষ্ট শ্রমিকশ্রেণি, সমাজের দুর্বল জনগণের জন্য সরকার নিরাপত্তা বলয়ই তৈরি করে অনুদান ও আর্থিক সাহায্য দিচ্ছে। একজন বেকার মুক্তিযোদ্ধা এখন থেকে ১২ হাজার টাকা সম্মানী পাবেন। ১৬ লাখ মানুষকে নতুনভাবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এনে ৭৪ লাখ কোটি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বয়স্কভাতা, বৃদ্ধভাতা, স্বামী পরিত্যক্তভাতা, গর্ভকালীনভাতা, পেনশনভাতা ইত্যাদি বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকারি গৃহীত কর্মসূচি প্রশংসার দাবি রাখে। এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে অন্তত ৪-৫জন মানুষ এই ধরনের ভাতা পাচ্ছেন না। কেউ কি কখনো চিন্তা করেছেন, বৃদ্ধ মানুষ এ ধরনের ভাতা পাবেন। বৃদ্ধদের সন্তান সাহায্য না করলেও শেখ হাসিনার সরকার কিন্তু তাদের পাশে আছেন। আমি গ্রামে এক বৃদ্ধকে বলতে শুনেছি সরকারি ভাতা পেয়ে কপালে ছুঁয়ে বলেছেন, শেখ হাসিনার ভাতা। তার পরেও বলতে হবে সব লোক কি সুখে-শান্তিতে আছে। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত মানুষ, জোয়ারে ভেসে যাওয়া সর্বস্বান্ত মানুষ, শহরে বস্তি স্থাপন করে বসবাস করছে। এখনো কয়েক লাখ শিশু, বাসাবাড়ি কর্মচারীরা সঠিক বেতন ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তবে এসব মানুষের উন্নয়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা একটা কথা প্রায়ই বলেন, লেখাপড়া শিখে ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে চাকরি পেতে হবে, এটা কর্মসংস্থান নয়, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে সব শিক্ষিত মানুষ আত্মকর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী কর্মে নিয়োজিত হলেই বেকারত্ব দূরীকরণ সম্ভব। বেকার যুবকদের জন্য এবার বাজেটে ১০০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে বিনা জামানতে এই অর্থ সংগ্রহ করা যাবে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ১০০টি শিল্পনগরী গড়ে তোলার প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। ব্যাংকের সুদের হার এক অঙ্গে আনা হচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহী করা ও বিদেশি বিনিয়োগ দেশে এনে বেকারত্ব দূরীকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারি উদার নীতির কারণে ২০১৮ সালে ৩.৭ বিলিয়ন বিনিয়োগ এসেছে। সুতরাং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তেই থাকবে। অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই এবারের বাজেটে যোগাযোগ ক্ষেত্রে সরকার সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন। আমরা সড়ক পথ, নদী পথ, আকাশে উদীয়মান বিমান বহর, প্রভৃতির দিকে তাকালে সর্বত্র উন্নয়নের দৃশ্য দেখতে পারি। রাজশাহীতে ৪ ঘণ্টায়, বিশেষ ট্রেনে, পঞ্চগড়েও দ্রম্নতগামী বিশেষ ট্রেনের মাধ্যমে অল্প সময়ে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। সারা দেশে সড়ক ও রেল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চারদিকে উন্নয়ন ও অগ্রগতি, পদ্মা সেতুর ২ কিলোমিটার আজ দৃশ্যমান। যথাসময়ে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ না হলেও দ্রম্নতগতিতে এগিয়ে চলেছে। আমার বাড়ি দক্ষিণবঙ্গে। আমি বেঁচে থাকলে আমার বাড়ি পৌঁছাতে ৭ ঘণ্টার পথ ৩ ঘণ্টায় পৌঁছে যাবো। সব সময় যখন ভাবি, ৭৫ পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে দেশকে রক্ষা করেছি। আমরা এ দেশে যখন শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিই, তখন আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই বিরোধিতা করেছেন। বিরোধিতা করেছেন এই কারণে পারিবারিক শাসন প্রবর্তিত হবে, এই ধারণা থেকে। আজ আমাদের সিদ্ধান্ত সঠিক হয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা জাতির প্রত্যাশা পূরণে বহুগুণে সক্ষম হয়েছেন। তিনি আগামীতে নেতৃত্বে থাকলে আরও অবদান রাখবেন। বাজেট নিয়ে অনেক প্রতিক্রিয়া আসছে। বিএনপি বর্তমান বাজেটকে গতানুগতিক বলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাদের জোটের আহ্বায়ক এককালীন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ড. কামাল হোসেন বাজেট পরবর্তী সম্মেলনে বাজেটের ওপর যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার চেয়ে শেখ হাসিনার সরকারকে পতন ঘটানোর জন্যই বেশি তৎপর রয়েছেন। আমি ড. কামাল হোসেনের নিকট বলছি, আপনি বাজেট নিয়ে কথা বলেছেন, আবার শেখ হাসিনার পতনও চাচ্ছেন। একবার ভেবে দেখুন তো শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন না থাকলে দেশ কোন পর্যায়ে যাবে। আপনি যদি প্রধানমন্ত্রীর পদও পান, আপনি দেশকে মহা দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেন না। আপনি ঐক্যফ্রন্টের নেতা। আপনার নেতৃত্বে নির্বাচন হলো। আপনার নেতৃত্বে ডিসেম্বরে সরকার পরিবর্তন চাচ্ছেন। আপনি বুকে হাত দিয়ে বলুন, যাদের নেতৃত্বে আপনি প্রতিষ্ঠিত, তাদের কেউ কি আপনার নেতৃত্ব মানেন। বিরোধী দলের বাজেট সমালোচনা যে এক সময়ে নিরর্থক হবে, তা এ কথা সত্য। তবে বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক, রাজনৈতিকবৃন্দ এই বাজেট সমালোচনা করেছেন তা ধরে নিয়েই মনে হয় সমালোচনার কিছু ক্ষেত্র রয়েছে। কিছু অসঙ্গতি ও ভুলত্রম্নটি থাকলে সংসদে তা আলোচনার মাধ্যমে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রত্যাখ্যান করার কোনো সুযোগ নেই। আপনারা রাজনৈতিক কারণে মিথ্যাচার করছেন। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ সালের অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অবশ্যই বাস্তবসম্মত, জনকল্যাণমুখী ও সঠিক। উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে প্রস্তাবিত বাজেট যুগোপযোগী। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়া স্বাভাবিক। ঘাটতি বাজেট অর্থ এই নয় যে, উন্নয়ন ও অগ্রগতি ব্যাহত হবে। বরং অর্থনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রত্যাশা যদি সীমাহীন না হয়, তাহলে উন্নয়ন ও অগ্রগতি থমকে থাকবে না। সীমিত আকাঙ্ক্ষা থাকলে সমতা আনা সম্ভব। যারা বলেছেন বাজেট কল্পনাবিলাসী, ৩৭৭ লাখ ৮১০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা অসম্ভব, ১৪৫ লাখ ৩৮০ কোটি টাকার ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে। অবশ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলছেন, জনবল বৃদ্ধি করলে ও কর ব্যবস্থাপনা গতিশীল ও সম্প্রসারণ করা হলে এই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব। তার পরও শেষমেশ যদি প্রয়োজন পড়ে প্রতিবছরের মতো সম্পূরক বাজেট প্রণয়ন করে ও বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য, সঞ্চয়পত্র এবং ব্যাংক থেকেও ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরণের সুযোগ রয়েছে। অনেকেই বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়াকে সমর্থন করছেন না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে বলেছেন বিপুল অফঙ্গর কালো টাকা বিদেশে পাচার রোধেই এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

কালো টাকার দৌরাত্ম্যে সামাজিক অপরাধ সংঘটিত হয়। ওই কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ পেলে কিছুটা হলেও অপরাধ কমে আসবে। সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ১০% হারে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে বাকি টাকা শিল্প খাতে বিনিয়োগের জন্য সরকার উৎসাহ দিচ্ছেন। যেখানে বিনিয়োগের জন্য পুঁজির অভাব, বিশেষ করে পুঁজির অভাবে বেসরকারিভাবে নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না, এই ক্ষেত্রে সরকারের এই সিদ্ধান্ত সঠিক।

যারা এই বাজেট কল্পনাবিলাসী, অবাস্তবায়নযোগ্য ও রাজস্ব আহরণ অসম্ভব বলছেন তারা প্রতিবছরই একই উক্তি উচ্চারণ করেন। কিন্তু সরকার প্রমাণ করেছে বাজেট ১০০% বাস্তবায়িত না হলেও ৯৫% সফলতা অর্জিত হয়েছে এবং আগামীতেও হবে। তাই বলতে হয় বাজেট জনকল্যাণমুখী। আগামী ৫টি বছর ক্রমাগতভাবে বর্ধিত আকারে বাস্তবায়িত হলে মধ্যম আয়ের দেশে (ইতিপূর্বে উন্নীত হয়েছে) উন্নতসমৃদ্ধ দেশে উন্নীত হওয়া অবশ্যই সম্ভব হবে। এই ক্ষুদ্র পরিসরে সার্বিকভাবে বাজেট বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। আর বাজেটের সঠিক সমালোচনা করার যোগ্যতা ও আমারও আছে বলে মনে করি না। তাই রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই আলোচনা সীমাবদ্ধ রেখেছি।

যারা প্রস্তাবিত বাজেটের সমালোচনা করছেন তারা দেশের শত্রম্ন নয়, এমনকি প্রতিপক্ষ নয়। প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাস থেকেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। সরকারের উচিত সব কিছু বিচার বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও দক্ষতার সঙ্গে জাতীয় সমস্যার প্রতি দৃষ্টি দিয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সোনার বাংলা বিনির্মাণে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাজেট জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে সফল হবে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়িত হবে, সেই প্রত্যাশা করছি।

অর্থমন্ত্রীকে অভিনন্দন 'স্মার্ট' বাজেট সংসদে পেশ করার জন্য।

ডা. এস এ মালেক: রাজনীতিক ও কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে