logo
বৃহস্পতিবার ১৮ জুলাই, ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

  অরিত্র দাস   ১২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

মোদির হাত ধরে ভারত কোন পথে হাঁটছে?

দ্বিজাতি তত্ত্ব বা ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হওয়ার পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান অগণতান্ত্রিক এবং ব্যর্থ রাষ্ট্রের তকমা পেয়েছে। অপরদিকে ভারত পেয়েছে উদার, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, বহু ধর্ম-সংস্কৃতির চর্চার বাহবা এবং সফল রাষ্ট্রের খেতাব। মোদি সরকার যদি উদারনীতি অবলম্বন করে এগোয়, যদি ধর্মকে ধর্মের জায়গায় রাখে তবে ভারত হবে অধিকতর আধুনিক উন্নত গণতান্ত্রিক সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র।

বড়লাট রিপনের আমলে ইলবার্ট বিলের বিরুদ্ধে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের আন্দোলনকালে প্রতীয়মান হয় যে, ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে প্রতিনিধিত্বশীল আলোচনার জন্য একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন অনিবার্য। নয়তো আলোচনা ফলপ্রসূ হবে না। ফলপ্রসূ হবে না ভারতের ভবিষৎ। বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতীয় রাজনীতিবিদদের বিকাশে এমন একটি সংগঠন অতীব দরকার। তারই ফলশ্রম্নতিতে ১৮৮৫ সালে তৎকালীন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ কর্মকর্তা অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমের উদ্যোগে থিওজোফিক্যাল সোসাইটির কিছু 'অকাল্ট' সদস্য প্রতিষ্ঠা করেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পার্টি। দাদাভাই নওরোজি, দিনশ এদুলজি ওয়াচা, উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেন্দ্র নাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মনমোহন ঘোষ, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে ও উইলিয়াম ওয়েডারবার্ন প্রমুখ ওই পার্টির সদস্য ছিলেন। রীতিমতো তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে সাধারণ ভারতীয়দের সংলাপ-প্রতিবাদের মঞ্চ হয়ে ওঠে নবগঠিত কংগ্রেস পার্টি। দলের প্রথম সভাপতি ছিলেন উমেশচন্দ্র ব্যানার্জি। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব দান করেছিল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বেও ছিলেন দলটির নেতা মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ঋষি অরবিন্দ, লালা লাজপত রাই, সরদার বলস্নভভাই প্যাটেল, বিপিনচন্দ্র পাল, আবুল কামাল আজাদ, বাল গঙ্গাধর তিলক, চিত্তরঞ্জন দাস ও সুভাষচন্দ্র বসু। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করলে, কংগ্রেস দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয় এবং প্রধানমন্ত্রী হন কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহরু। সেই থেকে মূলত নেহরু-গান্ধী পরিবারই কংগ্রেসকে নেতৃত্ব দান করতে থাকেন। অতঃপর জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে ১৯৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়ী হয় কংগ্রেস। ১৯৬৪ সালে মৃতু্যর আগ পর্যন্ত দল ও দেশের নেতৃত্ব দেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নেহরুর মেয়ে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে ভালোবেসে প্রিয়দর্শিনী নামে ডাকতেন। শ্রীমতি ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী সে সময় বাবার সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন এবং বাবার মৃতু্যর পর দলের হাল ধরেন। তখন প্রধানমন্ত্রী হন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। ১৯৬৬ সালে তিনি মারা গেলে ভারতের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন ইন্দিরা গান্ধী। খুব দ্রম্নতই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতবাসী এবং বিশ্ববাসীর কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেন ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু হঠাৎ করেই ইন্দিরা গান্ধীর দেশ শাসনে ছন্দপতন ঘটে, ১৯৭৫ সালের ভোটে কারচুপির অভিযোগে দেশে অস্থিরতা দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯৭৭ সালে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন তিনি। জরুরি অবস্থা শেষে কংগ্রেসের পুনর্নির্বাচনে হার হয়, তবে জনপ্রিয়তার ভাটা পড়েছিল কিনা তা বলা মুশকিল! কেননা ১৯৮০ সালে ইন্দিরার নেতৃত্বেই আবার ক্ষমতায় আসে কংগ্রেস দল। ছেলে রাজীব গান্ধীকে দলে টেনে নেয়। ১৯৮৪ সালে দেহরক্ষী রিয়ন্ত সিং ও সতবন্ত সিং এর গুলিতে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হলে দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি ছিলেন ভারতের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। ১৯৮৭ সালে শ্রীলংকায় শান্তিরক্ষা বাহিনী পাঠিয়ে চরমপন্থি তামিল গোষ্ঠী লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলমের (এলটিটিই) রোষের মুখে পড়েন তিনি। ১৯৯১ সালে নির্বাচনের প্রচারকালে এলটিটিই কর্মীদের আত্মঘাতী বোমায় নিহত হন রাজীব গান্ধী। এতে পুনরায় নেতৃত্বের সংকটে পড়ে কংগ্রেস। রাজীব গান্ধীর মৃতু্যর পর কংগ্রেস সভাপতি ও ভারতের প্রধামন্ত্রী হন পিভি নরসিংহ রাও। পাশাপাশি চলতে থাকে রাজীব গান্ধীর ইতালীয় বংশোদ্ভূত স্ত্রী সোনিয়া গান্ধীকে রাজনীতিতে নিয়ে আসার সকল আয়োজন। ১৯৯৮ সালে ক্ষমতায় আসে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকার। ২০০৪ সালে কংগ্রেস আবার যখন ক্ষমতায় আসে তখন দলের সভাপতি ছিলেন সোনিয়া গান্ধী। তবে দলের প্রধানমন্ত্রী হন মনমোহন সিং। ২০০৪ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত তারাই ক্ষমতায় ছিল।

ভারতের স্বাধীনতার ৭২ বছরের মধ্যে ৫০ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর পরিবারের সদস্যদের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে তেমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়নি ভারতবর্ষের প্রাচীনতম এ দলটিকে। তবে ২০১৪ সালের পর টানা দুই লোকসভা নির্বাচনে ভরাডুবির শিকার হয়েছে দলটি। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের ফল ছিল ২০১৪ সালে মোদির জয়। চলতি বছরে মে মাসের বৃহস্পতিবারের জয় ছিল মোদির প্রতি সমর্থন। ১৯৭১ সালের পর তিনিই প্রথম নেতা যার নেতৃত্বে দুইবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করল তার দল। ভারতের অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মহেশ রাঙ্গারাজন বলেন, এটা হলো মোদি ও তার নয়া ভারতের স্বপ্নের বিজয়।' ভারতে যেকোনো রাজনৈতিক জোট বা দলের সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন হয় ২৭২ আসন। সেখানে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-জোট জয়ী হয়েছিল ৩৩৬ আসনে। এবার সাত দফায় অনুষ্ঠিত ১৭তম লোকসভা নির্বাচনের ভোট গণনা হয় গত ২৩ মে ২০১৯। এদিন নির্বাচন কমিশনের দেয়া ফল অনুযায়ী ৫৪২টি আসনের মধ্যে ৩৫১টি আসনে নিরঙ্কুশ কেবল নয়, বলা চলে ভূমিধস সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করেছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-জোট। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট পেয়েছে মাত্র ৯২টি আসন। ১৯ মে সপ্তম ও শেষ দফা ভোট গ্রহণ শেষে বুথফেরত জরিপেই আভাস পাওয়া গিয়েছিল, ফের নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি অনায়াসে টানা দ্বিতীয় দফার জন্য ক্ষমতায় আসে। কিন্তু এ কথা কোনো বিরোধী দলই মানতে রাজি হয়নি বরং তা নিয়ে হয়েছে কাদা ছুড়াছুড়ি এবং তুমুল বিতর্ক। অবশেষে সব বিতর্ক এবং যুদ্ধংদেহী পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উপেক্ষা করে বুথফেরত জরিপ ছাপিয়ে জয় পেল বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-জোট।

মোদির বিরুদ্ধে মমতা বন্দোপাধ্যায় এবার বড় গলা করে বলেছিলেন- '৪২ এ ৪২', অর্থাৎ রাজ্যের সবকটি লোকসভা আসনে তৃণমূলের জয় হবে, তা যেন ফলাফল ঘোষণার পর শুকনো পাতার মতো উড়ে গেল। বাংলা ভাগ ধর্মের ভিত্তিতে হলেও ১৯৪৭-এর পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলো কোনোদিন স্থান পায়নি। দেশ ভাগ হওয়ার সাথে সাথে পশ্চিম বাংলার প্রধানমন্ত্রী ড. প্রফুলস্ন চন্দ্র ঘোষ খুব জোরালোভাবে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতির চর্চা করেন এবং তার ইস্তফা দানের পর ড. বিধান চন্দ্র রায় প্রধানমন্ত্রী হয়ে কঠোর হস্তে সাম্প্রদায়িকতা দমন করেন এবং ড. ঘোষের নীতি পুরাপুরি অনুসরণ করেন। হিন্দুসভার প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী একজন বাঙালি, কিন্তু তার দল কিংবা ভারতীয় জনসংঘ অথবা বিজেপি, কেউই পশ্চিমবঙ্গে তেমন কোনো প্রতাপের সাথে ঢুকতে পারেনি। প্রথমে কংগ্রেস (১৯৪৭-৭৭), তারপর সিপিএমএর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট (১৯৭৭-২০১১), এরপর ২০১১ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের সবাই বলিষ্ঠভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি করেছেন পশ্চিম বাংলায়। তবে এবার সারা ভারতের মতো এ রাজ্যেও ওঠা প্রবল মোদি সুনামিতে বেসামাল হয়ে গেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এবার এ রাজ্যের মোট আসনের মধ্যে ১৮টিই পেয়েছে মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। গতবার তারা পেয়েছিল মাত্র দুটি আসন। কংগ্রেস পেয়েছে দুটি আসন, গতবার পেয়েছিল চারটি। এবার মমতার তৃণমূল ২২টি আসন পেলেও গতবারের চেয়ে কমেছে ১২টি। তাহলে কি পশ্চিম বাংলার মানুষ নতুন কোন পরিবর্তন চায়? এ প্রশ্নের উত্তর আরও স্পষ্ট হবে ২০২১ সালের বিধান সভার নির্বাচনে। ১৯৭৭ এর পর এই প্রথম বাংলায় কোনো জাতীয় দল এতটা জায়গা দখল করতে পেরেছে। হয়তো এ কারণে তৃণমূল নেতা ও বর্ষীয়ান সম্পাদক চন্দন মিত্র বলেছেন, 'বিজেপি ইজ এ গভর্নমেন্ট ইন ওয়েটিং', অর্থাৎ বিজেপি তো মনে হচ্ছে আগামী দিনে বাংলায় সরকার গড়তে চলেছে। মহাজোটের স্বপ্ন এবার অধরাই থেকে গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। তিনি এদিন টুইট করে বলেন, 'সব জয়ীকে অভিনন্দন। কিন্তু সব পরাজিত পরাজিত নন।'

দিলিস্নভিত্তিক থিংকট্যাংক সেন্টার ফর ডেভেলপিং সোসাইটিসের এক জরিপে দেখা গেছে- 'মোদি প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী না হলে বিজেপি ভোটারদের এক-তৃতীয়াংশ অন্য দলকে ভোট দিতেন।' কারণ নির্বাচনী প্রচারণায় একটা কথা বেশ শোন গেছে এবার- মোদি বনাম কে? অর্থাৎ ভারতবাসী ব্যক্তি মোদিকে একহাতে বসিয়ে বাকি সবাইকে অন্য হাতে বসিয়েছেন। দল বা নেতা নয়, মোদিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন ভারতবাসী। এখন মোদির দেখানোর পালা, সে ভারতবাসীকে গুরুত্ব দেয় নাকি ধর্মীয় উগ্রবাদকে গুরুত্ব দেয়!

বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে বিজেপির মতো হিন্দুত্ববাদী দলের উত্থান ঘটেছে ধীরে ধীরে। স্বাধীনতার পর থেকে উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের কংগ্রেস প্রভাবিত সরকার গঠিত হয়ে এলেও আশির দশক থেকে বিজেপির উত্থান ঘটতে থাকে। এবার তারা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসেছে। এর আগে অটল বিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার আরেকবার ক্ষমতায় ছিল। দল হিসেবে বিজেপি যদিও হিন্দুত্ববাদী আদর্শে বিশ্বাসী, তথাপি ব্যক্তি হিসেবে অটল বিহারি বাজপেয়ি উদার সম্প্রীতির রাজনীতি করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে বিজেপির নেতৃত্বে যারা এসেছে তারা অটল বিহারি বাজপেয়ির মতো উদার নয় বরং কট্টরপন্থির আখ্যা পেয়েছেন। মোদির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ধর্মীয় কট্টরপন্থির অভিযোগ আছে। কিন্তু বিগত পাঁচ বছরে মোদির আমলে কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটেনি দেশটিতে, এটি অবশ্যই ভাল দিক। কিন্তু এই বছর মোদি ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে প্রথম কয়েকমাসেই ভারতজুড়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন বেড়েছে। বিজিপি নেতারা তীব্র উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে। ধর্ম যতক্ষণ দেবালয়ে আরাধনার বা বন্দনার বিষয় হয়ে থাকে ততক্ষণ সেটি মঙ্গলজনক। ধর্ম যখন মন্দির মসজিদ উপেক্ষা করে বাইরে বেরিয়ে আসে তখন আর তা মঙ্গলজনক থাকে না। বরং তা হয়ে উঠে ধ্বংসাত্মক, হীন কাজের অস্ত্র। বিএনপির আজকের পরিণতির জন্য কি ধর্মভিত্তিক রাজনীতি দায়ী নয়? জাতীয়তাবাদী বিএনপি খোলাখুলিভাবে ধর্মভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল না হলেও বিএনপির রাজনীতির ভিত্তিমূল হচ্ছে- ধর্ম। অপরদিকে জামায়াতের রাজনীতির মূল ভিত্তি হচ্ছে ধর্ম এবং বাংলাদেশ-বিরোধিতা। ছিয়ানব্বই সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি অনেকাংশে ছিল পরিচ্ছন্ন রাজনীতি এবং পরিচ্ছন্ন সুস্থ প্রগতিশীল ধারার রাজনৈতিক কর্মীর ভরপুর। ছিল অসংখ্য সম্ভাবনাময় জাঁদরেল তরুণ ছাত্রনেতা। যারা ধর্ম বর্ণ জাত পাত নির্বিশেষে সবার জন্য রাজনীতি করত বা করতে পছন্দ করত কিন্তু ছিয়ানব্বই সালের নির্বাচনের পর জামায়েত শিবির ট্যাগ জোরালোভাবে গায়ে মেখে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করার কারণে বিএনপি মূল ধারার রাজনীতি থেকে ছিটকে গেছে। বিএনপি-জামায়েত জোট ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল অবধি দেশ পরিচালনা করার সময় আমরা দেখেছি, কথায় কথায় ধর্মকে টেনে এনে দেশে একটি ধর্মাশ্রয়ী উগ্রবাদের জন্ম দিয়েছে এবং প্রশ্রয় দিয়েছে উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকে। সংসদে ধর্ম নিয়ে প্রায়ই সাম্প্রদায়িক বক্তব্য চলত। চলত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করে এমন লেখালেখি। যার কারণে আস্তে আস্তে একপর্যায়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বিএনপি। সেই সব উজ্জ্বল নেতাকর্মী এখন আর বিএনপি তে নেই। ফলে দলটি আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের দিকে তাকিয়ে দেখুন, রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ধর্মকে আঁকড়ে ধরার কারণে তাদের পরিণতি আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে। ইতিহাস বলে, পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রেই ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি ভালো ফল এনে দেইনি। ধর্মকে ধর্মের জায়গায় রাখলেই বরং ধর্মের মাহাত্ম্য প্রকাশ পায়, নয়তো ধর্ম মরে যায়।

দ্বিজাতি তত্ত্ব বা ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হওয়ার পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান অগণতান্ত্রিক এবং ব্যর্থ রাষ্ট্রের তকমা পেয়েছে। অপরদিকে ভারত পেয়েছে উদার, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, বহু ধর্ম-সংস্কৃতির চর্চার বাহবা এবং সফল রাষ্ট্রের খেতাব। মোদি সরকার যদি উদারনীতি অবলম্বন করে এগোয়, যদি ধর্মকে ধর্মের জায়গায় রাখে তবে ভারত হবে অধিকতর আধুনিক উন্নত গণতান্ত্রিক সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র।

আর যদি বদ্ধ ধ্যান-ধারণা আঁকড়ে ধরে দেশ শাসন করে তবে ভারত হবে সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্রের মতো। তাই এখন দেখার অপেক্ষা, মোদির হাত ধরে ভারতবর্ষ কোন পথে হাঁটে? আলোর পথে পথে নাকি অন্ধকারের পথে।

অরিত্র দাস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে