logo
রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১ ফাল্গুন ১৪২৬

  মো. জোবায়ের আলী জুয়েল প্রাবন্ধিক গবেষক   ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

অধুনালুপ্ত দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজ

ব্রিটিশ রাজত্বকালের শেষের দিকে বাংলাদেশের জেলাগুলোয় সর্বশেষ কলেজটি স্থাপিত হয় ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে দিনাজপুরে। অর্থাৎ দেশের অন্যান্য জেলায় উচ্চ শিক্ষার অগ্রগতি যখন অনেক দূর এগিয়ে যায় অর্থাৎ জেলা শহরে একটি করে কলেজ প্রতিষ্ঠার পালা যখন শেষ তখন ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় দিনাজপুরে কলেজ। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে তদানীন্তন শিক্ষামন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন দিনাজপুরে আগমন করলে দিনাজপুরবাসীর তরফ থেকে তাকে একটি মানপত্র দেয়া হয়। সেই মানপত্রে দিনাজপুরবাসীর একটি কলেজের দাবি ছিল। মন্ত্রী মহোদয় মানপত্রের উত্তরে বলেছিলেন- 'নিকট জেলা রংপুরে একটি ভালো কলেজ হইয়াছে (কার মাইকেল কলেজ ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত)। এইরূপ অবস্থায় দিনাজপুরে একটি কলেজ করা কখনই ঠিক হইবে না' (সাপ্তাহিক আহলে হাদিস পত্রিকা, কলকাতা ১৯৩৩ খ্রি.)। জেলাবাসীরা নিজস্ব টাকায় কলেজ গড়বে তাতেও সরকারি বাধা। তবে জেলাবাসীর কলেজ গড়ার স্বপ্ন-সাধ যে মন্ত্রীর ধমক খেয়ে চুপসে যায়নি পরবর্তী উদ্যোগ থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। যদিও সেসময় মন্ত্রী মহোদয়ের অমত থাকায় দিনাজপুরে কলেজ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি পরে প্রায় একদশকের মধ্যেই অনুকূল পরিবেশে কাকতালীয়ভাবে রাতারাতি একটি কলেজ গড়ে ওঠে দিনাজপুরে। তখন সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৩ খ্রি.-১৯৪৫ খ্রি.)। জাপানিরা বার্মা দেশ (বর্তমানে মিয়ানমার) দখল করে কলকাতার বুকে অগ্রসর হয়। কলকাতানগরীর বুকে বেশ কয়েকটি বোমাও তারা নিক্ষিপ্ত করে। আতঙ্কগ্রস্ত কলকাতা শহরবাসীরা ভয়ে বাড়ি-ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য গ্রামগঞ্জের দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে। সেই সংকটাপন্ন বিপদের দিনে কলকাতার অসংখ্য অফিস, আদালত, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজের শাখাও মফস্বল শহরে স্থানান্তরিত হয়। যেহেতু সেই সময় কলকাতা রিপন কলেজের (১৮৮২ খ্রি. প্রতিষ্ঠিত) অধ্যক্ষ ছিলেন স্বনামধন্য দিনাজপুরবাসী বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ পাহাড়পুরের ষষ্ঠীতলা মহলস্না নিবাসী রবীন্দ্রনারায়ণ ঘোষ তাই তারই প্রধান উৎসাহ ও প্রেরণায় রিপন কলেজের শাখা কলেজটি অন্য কোনো শহরে স্থানান্তরিত না হয়ে দিনাজপুর শহরে স্থানান্তরিত হয়। রবীন্দ্রনারায়ণ ঘোষ কলকাতার রিপন কলেজে ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দিনাজপুর শহরের পাহাড়পুর ষষ্ঠীতলার এলাকার একজন আইনজীবী পরিবারের কৃতীসন্তান ছিলেন। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে দুর্গাপূজার ছুটিতে দিনাজপুরে বেড়াতে এসে তিনি রিপন কলেজ স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। মিলিত হন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে। তিনি সর্বসম্মতিক্রমে দিনাজপুরে একটি কলেজ স্থাপন কমিটি গঠন করেন। তৎকালীন দিনাজপুরের মহামান্য মহারাজা জগদীশনাথ রায় শাখা কলেজটি প্রতিষ্ঠায় নবাগত অধ্যাপকদের রাজবাড়ীর অতিথি ভবনে থাকার সুব্যবস্থা করে দিয়ে সর্ব বিষয়ে সহযোগিতা করেন।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুলাই থেকে দিনাজপুর গিরিজানাথ হাইস্কুলের (১৯১৩ খ্রি. প্রতিষ্ঠিত) বিরাটকায় ভবনটিতে (একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর দালানটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে যায়) প্রভাতিক ব্যবস্থায় দিনাজপুরে প্রথম পূর্ণাঙ্গ কলেজের কার্যক্রম শুরু হয়, নাম দেয়া হয় 'শাখা রিপন কলেজ দিনাজপুর'। প্রথম ব্যাচে ছাত্র ভর্তি করা হয় ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে। আইএ, আইএসসি, আইকম ও বিএ, বিকম (পাস) শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৫০ থেকে ১৭৫ জন। প্রথম অধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন ক্ষীতিশ চন্দ্র ব্যানার্জী (কেসি ব্যানার্জী)। পরে ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে শ্রী অমরেন্দ্র সুন্দর ঠাকুর ভাইস প্রিন্সিপাল ছিলেন। এ সময় ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব (ড. জিসি দেব) কলেজের দর্শনের একজন লেকচারার ছিলেন। দিনাজপুর রিপন কলেজের প্রথম ব্যাচের (১৯৪৩ খ্রি.-১৯৪৪ খ্রি.) ০৩ জন শিক্ষার্থীরা হলেন যথাক্রমে- ১) মো. তাহের উদ্দিন আহমেদ (প্রখ্যাত ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী, গ্রিন সুপার মার্কেট, দিনাজপুরের স্বত্বাধিকারী, বর্তমানে জীবিত)। ২) শামসুদ্দিন আহমেদ (প্রাক্তন সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস, দিনাজপুর সরকারি কলেজ)। ৩) আলহাজ মো. সামছউদ্দিন খান (সমাজসেবী)। পরবর্তী ব্যাচ অর্থাৎ ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে আরেকজন ছাত্র ভর্তি হন। তিনি বর্তমানে দিনাজপুরের প্রখ্যাত আইনজীবী, মো. ইছাহাক (অ্যাডভোকেট)। তিনিও রিপন কলেজের ছাত্র ছিলেন (বর্তমানে জীবিত)। সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে স্থাপিত কলেজটি ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসান না হওয়া পর্যন্ত দিনাজপুরে কলেজটির কার্যক্রম সর্ব বিষয়ে চালু থাকে। তার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটলে সমুদয় অধ্যাপক ও সব আর্থিক তহবিলসহ কলেজটিকে কলকাতায় প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। তবে ওই কলেজটির সূত্র ধরে ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দেই সচেতন দিনাজপুরবাসীর সমবেত ঐকান্তিক চেষ্টায় এসএন কলেজ (সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) নামে দিনাজপুরে প্রথম নিজস্ব গৌরবান্বিত কলেজ প্রতিষ্ঠার শুভলগ্ন শুরু হয়। প্রকাশ থাকে যে ওই সময় দিনাজপুরের মাড়োয়াড়ি বণিকরাও কিছু অবদান রাখেন কলেজ প্রতিষ্ঠায়। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে কলেজটির নামকরণ করা হয় সুরেন্দ্রনাথ কলেজ। আরও উলেস্নখ করা যেতে পারে, কলেজটি প্রতিষ্ঠায় মান্যগণ্য প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে উলেস্নখযোগ্যরা হলেন- হাসান আলী (প্রাক্তন মন্ত্রী), মাওলানা আব্দুলা হেল বাকী (রাজনৈতিক নেতা), নরেশ দাসগুপ্ত, যতীন্দ্র মোহন সেন, সুরেশ চন্দ্র সেন, তারেকশ্বর চক্রবর্তী, হরিদাস সেন (ঠিকাদার), সৈয়দ তোজাম্মেল আলী (অ্যাডভোকেট), চন্দ্রকান্ত দাশসহ আরও অনেক নেতা, বুদ্ধিজীবী ও বিত্তশালী ব্যবসায়ীর যথেষ্ট অবদান রয়েছে। দিনাজপুরবাসীর নিজস্ব প্রচেষ্টায় স্থাপিত প্রথম কলেজটির নাম কেন এসএন কলেজ করা হয় এটি জনগণের মনে একটি প্রশ্ন। শিক্ষিত সমাজে সুরেন্দ্রনাথের নাম জানা থাকলেও সাধারণ লোকের পক্ষে তা জানার কথা নয়। তবে সাধারণ লোকের জানার দরকার সুরেন্দ্রনাথ কে ছিলেন? স্যার সুরেন্দ্রনাথ ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক ছিলেন। ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে সুরেন্দ্রনাথ বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে বিলেত থেকে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইসিএস) পরীক্ষায় পাস করে তিনি সিলেটের মৌলভী বাজারের সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিযুক্ত হন। সুরেন্দ্রনাথের (১৮৪৮-১৯২৬ খ্রি.) সঙ্গে একত্রে ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে আরও তিনজন ভারতীয় বিলেত থেকে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে (আইসিএস) উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগ পান। তারা হলেন রমেশ চন্দ্র দত্ত (১৮৪৮-১৯০৯ খ্রি.), বিহারীলাল গুপ্ত (১৮৪৬-১৯২২ খ্রি.) ও প্রথম ঢাকার পূর্ববঙ্গীয় আইসিএস অফিসার কৃষ্ণ গোবিন্দ গুপ্ত (১৮৫১-১৯২৩ খ্রি.)। এরা একত্রে চারজনই হলেন অবিভক্ত বাংলার দ্বিতীয় বিলেত ফেরত আইসিএস। উলেস্নখ করা যেতে পারে, অবিভক্ত ভারতে সর্বপ্রথম বিলেত ফেরত আইসিএস (ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস) অফিসার হলেন সতেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪২-১৯২৩ খ্রি.)। সতেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বিলেত থেকে আইসিএস পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। আমাদের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১ খ্রি.) বড় ভাই ছিলেন সতেন্দ্রনাথ ঠাকুর। কর্মজীবনে সতেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন আহমেদাবাদের জেলা জজ। আবারও সুরেন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে আসা যাক- চাকরিরত অবস্থায় দুই বছর পর ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট সুরেন্দ্রনাথের কাজে অসন্তুষ্ট হয়ে কয়েকটি অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনায়ন করে এবং তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। নানা চেষ্টা করেও তিনি আর চাকরিতে পুনর্বহাল হতে পারেননি। পরে তিনি মেট্রোপলিটন কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হন। ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রিপন কলেজ স্থাপন করেন। তিনি এই সময় 'বেঙ্গলী' পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে তার চেষ্টায় 'ভারত সভা' স্থাপিত হয়। তিনি পর পর দুবার কংগ্রেসের সভাপতিত্ব করেন। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বঙ্গভঙ্গের পর দেশে যে প্রবল আন্দোলন ও বিদেশি জিনিস বর্জনের যে প্রস্তাব হয় সুরেন্দ্রনাথ তার অন্যতম নেতা ছিলেন। ভারতের সব সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রীতি ও ঐক্যবদ্ধ সৃষ্টি করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। এই জন্য তাকে 'ভারতীয় জাতীয়তা বাদের জনক' হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কলকাতায় মৃতু্যবরণ করেন। উলেস্নখ করা যেতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রিপন কলেজের (কলকাতায় ১৮৮২ খ্রি. প্রতিষ্ঠিত) শাখারূপে দিনাজপুরে শাখা রিপন কলেজ স্থাপিত হয় ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে যা আগেই উলেস্নখ করা হয়েছে। সেই রিপন কলেজের ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রধান পুরোধা দেশমান্য নেতা অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। সেই পটভূমিতে মূল রিপন কলেজের কর্তৃপক্ষের শর্ত ছিল দিনাজপুরে প্রস্তাবিত কলেজের নামটি হবে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ। জেলাবাসী নেতারা সানন্দে প্রস্তাবটি মেনে নেন বস্তুত এসএন কলেজ প্রতিষ্ঠা এরূপই একটা পরোক্ষ সূত্র সম্পর্ক ছিল মাত্র।

এ ছাড়া দিনাজপুরে কলেজ করার ভূমিকায় প্রয়াত সুরেন্দ্রনাথ পরিবারের প্রত্যক্ষ কোনো অবদানই ছিল না। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে দিনাজপুর মুসলিম হোস্টেল ভবনে এসএন কলেজের শুভ যাত্রা শুরু হয়। প্রথম অধ্যক্ষ হন ড. গোবিন্দ্র চন্দ্র দেব। মুসলিম হোস্টেল (১৯১০ খ্রি. প্রতিষ্ঠিত) বর্তমানে দিনাজপুর সরকারি কলেজের ইন্টারমেডিয়েট সেকশন বিল্ডিং নামে পরিচিত। আজ থেকে ১০০ বছর আগে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান বাংলাদেশে একটিও বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। সেদিন ছাত্রদের উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য অবিভক্ত ভারতের কয়েকটি হাতেগোনা কলেজে গিয়ে লেখাপড়া করতে হতো। সে যুগে নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে তারা দেশের সামনে উচ্চশিক্ষা লাভের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন বলেই আজ সর্বত্রই অবারিত শিক্ষার দ্বার উন্মোচন হয়েছে এবং আমরা সবাই এযুগে শিক্ষিত হতে পারছি। আসুন আমরা সবাই দেশবাসী তাদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করি।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে