logo
শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

  মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক   ০৯ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০  

তওবার রজনী লাইলাতুল বরাত

মানুষ যদি এ রাতে নিজ কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে চক্ষু থেকে অশ্রম্ন প্রবাহিত করে তাহলে আলস্নাহ তার পাপরাশি মুক্ত করে দেন।

মুসলিম জাতির কাছে মহিমান্বিত, তাৎপর্যমন্ডিত, ফজিলতপূর্ণ ও বরকতময় রাত শবেবরাত। শবেবরাত শাবান মাসের পঞ্চদশ রজনীতে পালিত হয়। রাসূল (সা.)-এ মহিমান্বিত রাতকে 'লাইলাতুন্‌ নিসফি মিন শাবান' বা ১৫ শাবানের রাত বলেছেন। ফার্সি শব্দ 'শব' অর্থ রাত/রজনী। আর বরাত অর্থ মুক্তি, নিষ্কৃতি, অব্যাহতি, পবিত্রতা ইত্যাদি। শবেবরাতের শাব্দিক অর্থ হলো- মুক্তি, নিষ্কৃতি ও অব্যাহতির রজনী। এ রাতে যেহেতু আলস্নাহতায়ালা পাপী বান্দাদের ক্ষমা করেন, নিষ্কৃতি দেন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, সেহেতু এ রাতকে লাইলাতুল বরাত বা শবেবরাতের রজনী বলা হয়। শাবানের আরেকটি অর্থ হলো মধ্যবর্তী সুস্পষ্ট। যেহেতু এ মাসটি রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী; তাই এ মাসকে শাবান মাস নামকরণ করা হয়। শাবান মাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ মাসের পূর্ণ নাম হলো 'আশ শাবানুল মুআযযম' অর্থ মহান শাবান মাস। (লিসানুল আরব, ইবনে মানযূর (র.)।

মানুষ যদি এ রাতে নিজ কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে চক্ষু থেকে অশ্রম্ন প্রবাহিত করে তাহলে আলস্নাহ তার পাপরাশি মুক্ত করে দেন।

ইরশাদ হচ্ছে- হা-মীম, এ স্পষ্ট কিতাবের শপথ! নিশ্চয়ই আমি তা বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে বণ্টন করে দেওয়া হয় প্রত্যেক হিকমতের কাজ (সূরা দুখান, আয়াত. ১-৪)। তাফসিরে জালালাইনে রয়েছে- 'নিশ্চয়ই আমি তা বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। আর বরকতময় রাত হলো লাইলাতুল কদর (কদরের রাত) অথবা লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান (শাবানের মধ্য রাত তথা শবে বরাত)। কেননা, এই রাতে উম্মুল কিতাব (কোরআন শরিফ) ৭ম আসমান থেকে দুনিয়ার আসমানে (১ম আসমান) নাজিল হয়েছে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী'। (তাফসিরে জালালাইন পৃষ্ঠা ৪১০)। তাফসিরে বাগভিতে বর্ণিত আছে- নিশ্চয়ই আলস্নাহ শবেবরাতের রাতে সব বিষয়ের চূড়ান্ত ফয়সালা করেন এবং শবে কদরের রাতে তা সংশ্লিষ্ট দায়িত্ববান ফেরেশতাদের কাছে ন্যস্ত করেন (তাফসিরে বাগভি, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা ২২৮)।

'শাবান' মাসটি বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলতপূর্ণ। হিজরতের প্রায় দেড় বছর পর এ মাসেই কিবলা পরিবর্তন হয়; এ মাসে পূর্বের কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাসের পরিবর্তে কাবা শরিফের দিকে কিবলা নির্ধারিত হয়। 'বারবার আপনার আকাশের দিকে মুখমন্ডল আবর্তন আমি অবশ্যই লক্ষ্য করি। সুতরাং এমন কিবলার দিকে আপনাকে প্রত্যাবর্তন করে দেব, যাতে আপনি সন্তুষ্ট হন। অতএব, আপনি মসজিদুল হারাম (কাবা) এর দিকে চেহারা ঘুরান। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন ওই (কাবার) দিকেই মুখ ফিরাও।' (সূরা বাকারা. আয়াত ১৪৪)। রাসূল (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠের নির্দেশনা সংবলিত আয়াতটি এ মাসেই অবতীর্ণ হয়। 'নিশ্চয়ই আলস্নাহতায়ালা রাসূল (সা.)-এর প্রতি পরিপূর্ণ রহমত বর্ষণ করেন, ফেরেশতারা রাসূল (সা.)-এর জন্য রহমত কামনা করেন; হে মোমিনরা! তোমরাও তার প্রতি দরুদ পাঠ কর এবং যথাযথভাবে সালাম পেশ কর'। (সূরা আহযাব. আয়াত ৫৬)। শবেবরাতের গুরুত্ব হাদিসে ব্যাপক। ইরশাদ হচ্ছে- 'তোমরা রমজান মাসের জন্য শাবান চাঁদের হিসাব রাখো'। রাসূল (সা.) রমজানের রোজা ব্যতীত শাবান মাসে অধিক রোজা রাখতেন, অন্য মাসে ততোধিক রোজা রাখতেন না। রাসূল (সা.) শাবান মাসকে নিজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। আসমা ইবনে জায়েদ (রা.)-হতে বর্ণিত- রাসূল (সা.)-ইরশাদ করেন- 'শাবান আমার মাস, আর রমজান আলস্নাহর মাস'। আবু মূসা আশয়ারী (রা.) রাসূল (সা.)-হতে বর্ণনা করেন। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন- 'মধ্য শাবানের রাত্রিতে আলস্নাহ পাক রহমতের তাজালিস্ন ফরমান এবং তার সমস্ত বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু মুশরিক বা শত্রম্নতাপোষণকারী ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন না'। (ইবনে মাজাহ)। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত- রাসূল (সা.)-হতে তিনি বর্ণনা করেন- রাসূল (সা.) আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন- 'হে আয়েশা! শাবান মাসের মধ্য রাতের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কে তুমি কি জান? তিনি আরজ করলেন ইয়া রাসূলালস্নাহ (সা.) শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাতের কি মর্যাদা রয়েছে? রাসূল (সা.) উত্তরে বললেন- আগামী এক বছরে কতজন আদম সন্তান ভূমিষ্ট হবে এবং কতজন মৃতু্যবরণ করবে তা এ রাত্রে লিপিবদ্ধ করা হয়। আর এ রাত্রিতে তাদের আমল আলস্নাহ দরবারে উপস্থাপন করা হয় এবং তাদের রিজিক অবতীর্ণ কিংবা নির্ধারণ করা হয়। অতঃপর আয়েশা (রা.) বললেন- ইয়া রাসূলালস্নাহ (সা.) 'আলস্নাহ রহমত ছাড়া কারো পক্ষে কি জান্নাতে যাওয়া সম্ভব নয়? রাসুল (সা.) বললেন- আলস্নাহর বিশেষ রহমত ও একান্ত অনুগ্রহ ছাড়া কারো পক্ষে জান্নাতে যাওয়া সম্ভব নয়। এ কথাটি রাসূল (সা.) তিনবার বললেন'। (মিশকাত, ফাজায়েলুল আওকাত)। রাসূল (সা.) ১৫ শাবানের দিনে রোজা রাখা এবং রাতে ইবাদত করার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছেন। আলী (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন- 'শাবানের ১৫তম রজনীতে তোমরা অধিক হারে আলস্নাহ ইবাদত কর। অতঃপর দিনের বেলা রোজা পালন কর। সেদিন আলস্নাহ সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে প্রথম আকাশে অবতীর্ণ হন এবং আহ্বান করতে থাকেন- আছে কি কেউ ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করব; আছে কি কোনো রিজিক অন্বেষণকারী, আমি তাকে রিজিক দান করব; আছে কি কেউ বিপদগ্রস্ত, আমি তাকে বিপদমুক্ত করব। এমন আরো বিষয়ে কেউ প্রার্থনাকারী আছ কি? আমি তা সবই তোমাদের দান করব। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আহ্বান করতে থাকেন'। (মিশকাত)। আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত- তিনি বলেন- 'এক রজনীতে আমি রাসূলকে (সা.) বিছানায় পেলাম না। এই জন্য তার সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম। তারপর আমি জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে নবীজিকে আকাশের দিকে মাথা মুবারক উঠানো অবস্থায় দেখতে পেলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি এ ধারণা করছ যে, আলস্নাহ ও তার রাসূল (সা.) তোমার ওপর অবিচার করেছেন? আয়েশা (রা.) বললেন; আমি এমন ধারণা করিনি, ভেবেছিলাম আপনি আপনার অন্য কোনো বিবির কাছে গমন করেছেন। তখন রাসূল (সা.) ফরমালেন- 'নিশ্চয় আলস্নাহ পাক শাবানের ১৫ তারিখ রাত্রে প্রথম আকাশে তাজালিস্ন ফরমান- অতঃপর তিনি বনী কালব গোত্রের মেষের পশমসমূহের চেয়েও বেশি লোকের গুনাহ ক্ষমা করেন'। (তিরমিযি, মুসনাদে আহমদ)। এ জন্য ওই রাতে নফল নামাজ, বেশি বেশি কাজা নামাজ আদায়, কোরআন তেলাওয়াত করা, জিকির-আজকার, দরুদ ও তওবা-ইস্তিগফার করা উত্তম। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন- '১৫ শাবান রাত জেগে ইবাদাত কর এবং পরদিন রোজা রাখ। এ রাত্রে আপনজন যারা তাদের কবর জিয়ারত কর'। তাই নিজ পিতা-মাতা ও আয়ত্বের ভেতরে আওলিয়ায়ে কেরাম, বুজুর্গানে দ্বীনদের মাজার জিয়ারত করা অতি উত্তম। এতে ফয়েজ ও বরকত হাসেল হয়। তবে কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সারা রাত ব্যয় করা বোকামি। কেননা, 'রাসূলকে (সা.) মা আয়েশা (রা.) শাবানের ১৫ তারিখ রাতে জান্নাতুল বাকীতে মোনাজাতরত অবস্থায় পেয়েছেন'। (তিরমিজি, মুসনাদে আহমদ)।

শবেবরাতে বর্জনীয় এ রজনীতে তওবা-ইস্তেগফার ও ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে আলস্নাহর সন্তুষ্টি অর্জন মুমিনের কর্তব্য। তবে ওই রাতে বোমা ফাটানো, তারাবাজি, আতশবাজি, অতিরিক্ত আলোকসজ্জা, পোলাও-বিরানি ও হালুয়া-রুটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। করোনাভাইরাসের কারণে এবার ঘরে বসেই মুসলমানদের এবাদত করতে হবে। এবার আইন অমান্য করে আতশবাজি করারও সুযোগ নেই।

রাসূল (সা.)-হতে শিখিয়ে যাওয়া এবং সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, তাবে-তাবেয়িন এবং যুগে যুগে ওলামা পীর মাশাইখরা এ রাতে ইবাদাত করে গেছেন। তাদের রেখে যাওয়া আদর্শই হুবহুব আমাদের অনুসরণ করতে হবে। এতে বাড়ানো-কমানোর কোনোই অবকাশ নেই। আলস্নাহ আমাদের যথাযথভাবে শবেবরাত পালন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক: প্রাবন্ধিক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে