logo
মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬

  যাযাদি রিপোর্ট   ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০  

বাঁধভাঙা আনন্দ উচ্ছ্বাসে বর্ষবরণ

বাঁধভাঙা আনন্দ উচ্ছ্বাসে বর্ষবরণ
গত রোববার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। ষ নববর্ষ উদযাপনের অ্যালবাম-পৃষ্ঠা-৩ -যাযাদি

রমনা বটমূল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বর্ষবরণ উৎসবকেন্দ্রিক রাজধানীর প্রতিটি অনুষ্ঠানস্থল ঘিরে রোববার ভোর থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে রাখলেও এ গন্ডির মাঝেই বর্ণিল আনন্দে মেতেছে সর্বস্তরের মানুষ। জীর্ণ পুরানকে পেছনে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে নগরীর সীমান্ত পেরিয়ে উচ্ছ্বাসের সে জোয়ারে ভেসেছে গাঁও-গেরামসহ গোটা দেশ। খুশির ঝিলিক গায়ে মেখে নিতে ১৪২৬ বঙ্গাব্দের প্রথম প্রহরেই ঘর ছেড়ে পথে নেমেছে লাখো মানুষ। রাজপথে নামে মানুষের ঢল। গাঁয়ের মেঠো পথেও বয়ে যায় উদ্বেলিত জনশ্রোত। তবে দেশজুড়ে উৎসব হলেও দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতায় এবারও রমনার বটমূলে ছায়ানটের নববর্ষ আবাহন ছিল আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রাও ছিল বর্ষবরণ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। এ দুইটি আয়োজন থেকে দেশবাসীর সুখ-সমৃদ্ধি প্রত্যাশার পাশাপাশি এবারও সব অপশক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। বাংলা নববর্ষ ১৪২৬ বরণ করতে রোববার ভোর সোয়া ছয়টায় রাজধানীর রমনার বটমূলে বরাবরের মতো প্রভাতী আয়োজন শুরু করে ছায়ানট। 'অনাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হোক শুভবোধ' আহ্বান নিয়ে সাজানো হয় এ আয়োজন। নতুন বছরের প্রথম সূর্যোদয়কে স্বাগত জানানো হয় রাগালাপ দিয়ে। অসীম কুমারের পরিবেশনায় এই রাগ ললিত চলে প্রায় ১৩ মিনিট। রাগ ললিতের পর সম্মিলিতভাবে গাওয়া হয় 'মোরে ডাকি লয়ে যাও মুক্তদ্বারে তোমার বিশ্বের সভাতে/আজি এ মঙ্গলপ্রভাতে' গানটি। এরপর 'আপনারে দিয়ে রচিলি রে কি এ আপনারই আবরণ!/খুলে দেখ দ্বার, অন্তরে তার আনন্দনিকেতৃ'সহ দুটি পরপর একক সংগীত পরিবেশিত হয়। পরের ভাগে ছিল অনাচারকে প্রতিহত করা এবং অশুভকে জয় করার জাগরণী সুরবাণী, গান, পাঠ, আবৃত্তিতে দেশ-মানুষ-মনুষ্যত্বকে ভালবাসবার প্রত্যয়। সংস্কৃতি সংগঠন ছায়ানটের শিক্ষার্থী-প্রাক্তনী-শিক্ষক নিয়ে, ছোট বড় মিলিয়ে এবারের অনুষ্ঠানে সম্মেলক গান পরিবেশন করেন প্রায় শ'খানেক শিল্পী। ছায়ানটের আহ্বান অনুযায়ী রবীন্দ্র রচনা থেকে বেছে নেয়া হয় দুইটি আবৃত্তি। একই ধারায় গানগুলো নির্বাচন করা হয় কাজী নজরুল ইসলাম, অতুলপ্রসাদ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, লালন শাহ্‌, মুকুন্দ দাস, অজয় ভট্টাচার্য, শাহ্‌ আবদুল করিম, কুটি মনসুর, সলিল চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা থেকে। আয়োজনে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানার আগে ছায়ানট সভাপতি সন্‌জীদা খাতুন শুভবোধ জাগরণের আহ্বান জানান তার কথনে। নানা কারুকাজে বাঙালিয়ানার ছাপে দেশীয় পোশাক পরে ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ-শিশু, বাঙালি কিংবা আদিবাসী, ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই যোগ দেয় বাঙালির সর্ববৃহৎ সর্বজনীন বর্ষবরণ উৎসবে। নানা স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান হওয়ায় প্রায় পুরো দিনই জনসমুদ্র ছিল রাজধানীর শাহবাগ, রমনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ধানমন্ডি এলাকা। ফুটপাথগুলোতে ছিল বাহারি পণ্যের মেলা। দলবেঁধে বন্ধুবান্ধব কিংবা পরিবারসমেত মানুষ ঘুরে বেড়িয়েছে এক অনুষ্ঠান থেকে আরেক অনুষ্ঠানে, করেছে কেনাকাটা। কেউ বা দল বেঁধে মাটিতে পাটি কিংবা চাদর বিছিয়ে খেয়েছে পান্তা ইলিশ। এদিকে প্রতি বছরের মতো এবারও ঘড়িতে সকাল ৯টা বাজতেই ঢাকঢোল, ডুগডুগি আর মন্দিরার তালে বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্বোধনের পর শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ অসংখ্য মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে চারুকলা থেকে বের হয়ে শাহবাগ শিশুপার্ক ঘুরে এসে টিএসসি হয়ে আবার চারুকলায় গিয়ে শেষ হয় এই শোভাযাত্রা। তবে এবার এ শোভাযাত্রার চারদিকে সোয়াট, ডিবি, র?্যাব, পুলিশ ও স্কাউট সদস্যদের কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিল চোখে পড়ার মতো, যা অনেকটা ভয়ার্ত পরিবেশও তৈরি করে। আর এ কারণে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল বেশখানিকটা কম। গতবারের মতো এবারেও শোভাযাত্রায় মুখোশ পরতে বা বেষ্টনীর বাইরে থেকে কাউকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। বর্ষবরণ উৎসবে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার এই বাড়াবাড়ি এক ধরনের বাধার সৃষ্টি করছে বলে মনে করেন চারুকলা অনুষদের ডিন এবং এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রা উপ-কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক নিসার হোসেন। তবে নিরাপত্তার বাড়াবাড়ির কারণে মঙ্গল শোভাযাত্রায় মানুষের উপস্থিতি কম হওয়ার অভিযোগ মানতে চাননি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনেকেই। তাদের ভাষ্য, সাপ্তাহিক শুক্র ও শনিবারের ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে রোববার পহেলা বৈশাখের ছুটি থাকায় অনেকে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ায় নগরকেন্দ্রিক প্রতিটি অনুষ্ঠানেই লোক সমাগম কিছুটা কম হয়েছে। তবে তা চোখে পড়ার মতো নয়। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রথমে মানুষ নিরাপত্তার এই বিষয়টিকে ভিন্নভাবে নিয়েছে। যদিও এখন তারা এই কড়া নিরাপত্তায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তবে উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ততা বজায় রাখতে নিরাপত্তার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে। পহেলা বৈশাখে গণভবনে সর্বস্তরের নাগরিকসহ আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলা বছরের প্রথম দিনে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত সকল বাঙালিকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'নতুন বছরে নতুন সূর্যের মতো সকলের জীবন আরো সুখীময়, সুন্দর ও সমৃদ্ধ হবে।' সারাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে সন্তোষ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'দেশ আরো সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে এবং বাঙালি জাতি বিশ্বে অন্যতম আত্মপরিচয় ও সম্মান নিয়ে বাচবে। আমরা সোনার বাংলা পরিণত করব বাংলাদেশকে। আমরা সেটি করতে সক্ষম। আমরা সেই লক্ষ্যে অর্জনে নিরলসভাবে কাজ করছি।' শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'এসো এসো এসো হে বৈশাখ' এবং 'আনন্দ লোকে মঙ্গল আলোকে' গানে গেয়ে বাংলা ১৪২৬ নববর্ষকে স্বাগত জানান সেখানে উপস্থিত সবাই। এ সময় অতিথিদের বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী খাবার মিষ্টি, পিঠা, খই, বাতাসা, কদমা এবং ঐতিহ্যবাহী বাঙালি মিষ্টি জিলাপি ও মোয়া বিতরণ করা হয়। বাংলা নতুন বছর বরণে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজন করা হয় 'হাজারো কণ্ঠে বর্ষরবণ' অনুষ্ঠান। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় সুরের ধারার এই আয়োজন। সত্য ও সুন্দরকে ধারণ করার আহ্বান জানানো হয় অনুষ্ঠান থেকে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডাক্তার লোটে শেরিং বাংলা ভাষায় শুভেচ্ছা জানান নববর্ষের। এসরাজের পরিবশনা দিয়ে শুরু হয় সুরের ধারার হাজার শিল্পীর কণ্ঠে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। রবি ঠাকুরের গান, আবৃত্তি, লোকগীতি, দেশের গানে মুগ্ধ হন অতিথিরা। দলীয় গান ছাড়াও একক গানে সুরের পরশ ছড়ায় শ্রোতাদের মধ্যে। এদিকে শুধু রমনার বটমূল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ কিংবা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রই নয়, গোটা নগরী সেজে ওঠে উৎসবের রঙে। রোববার পুব আকাশে সূর্যের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই সুসজ্জিত নানা বয়সী মানুষের স্র্রোতধারা নামে নগরীর পাড়ামহলস্নাকেন্দ্রিক বিভিন্ন বৈশাখী অনুষ্ঠানে। লাল-সাদা পোশাকের শাড়িতে আবৃত তরুণীদের মাথায় শোভা পাচ্ছিল নানান রঙের ফুল, একই রঙের পাঞ্জাবি পরুয়া তরুণদের উপস্থিতিও ছিল সমানতালে। প্রচন্ড ভিড়, প্রখর রোদ, অগণিত মানুষের কোলাহল, হর্ষধ্বনি, গান ও ঢাক-ঢোলের ঐকতানে গোটা নগরী হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। বাঙালি জাতির নিজের এ সংস্কৃতি উদ্‌?যাপনে বাঙালির সঙ্গে বিদেশী বন্ধুরাও সমবেত হয়েছিল বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। তারাও আনন্দচিত্তে বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জনিয়েছে। বৈশাখের প্রধান উৎসবস্থল রমনা বটমূল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, চারুকলা, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সবকটি উৎসবস্থলে বিদেশি নাগরিকদের উৎসবমুখর দেখা গেছে। অনেকেই আবার বাঙালির সংস্কৃতির রঙে রঞ্জিত হয়ে মুখের মধ্যে শিল্পীর তুলিতে লিখে নিয়েছেন স্বাগত হে পহেলা বৈশাখ, শুভ নববর্ষ, আবার অনেকের মুখে দেখা গেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী যন্ত্র ঢোল, তবলা ও একতারার ছবি। এদিকে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও ছিল উপচে পড়া ভিড়। গভীর রাত অবধিও হাতিরঝিলসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে নগরবাসী উৎসবে মেতে থাকে। নববর্ষের পহেলা দিনে ব্যবসায়ীরা খুলেছেন হালখাতা। আবহমান গ্রামবাংলার ঐতিহ্য অনুযায়ী এদিন লালসালুতে বাঁধাই করা এ 'হালখাতা' বা নতুন খাতায় হিসাব উঠানো এবং পুরনো হিসাব চুকানোর লক্ষ্যে খদ্দেরকে মিষ্টিমুখ করানোর ঐতিহ্য পালন করতেও দেখা যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক ব্যবসায়ীকে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে