logo
মঙ্গলবার ২০ আগস্ট, ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬

  যাযাদি রিপোর্ট   ১৭ মে ২০১৯, ০০:০০  

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার

ঋণখেলাপিদের বড় ছাড়

খেলাপিরা ঋণ পরিশোধে সময় পাবেন টানা ১০ বছর মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়েই ঋণ পুনঃতফসিল তিন মাসের মধ্যে পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করতে হবে

ঋণখেলাপিদের বড় ছাড়
 


অনেকে শিল্প করার জন্য ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু সময়মতো গ্যাস-বিদ্যুৎ না পাওয়ায় কারখানা করেও তা চালু করতে পারেননি। কারখানা চালু করতে না পেরে পরিশোধ করতে পারেননি ব্যাংকঋণও। পরিস্থিতির কারণে খেলাপি হয়ে গেছে এ ঋণ। 


অন্যদিকে, অনেকেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে দেশ ছেড়েছেন। ঋণের টাকায় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বিলাসী জীবনযাপনও করছেন। আইনি ফাঁকফোকরে বেরিয়ে যাচ্ছেন ‘ইচ্ছাকৃত’ ঋণখেলাপিরা। মামলা করেও এসব খেলাপির কাছ থেকে অর্থ আদায় করা যাচ্ছে না।


খেলাপি ঋণকে অর্থনীতির বড় ‘বোঝা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ অবস্থায় কঠোরতা নয়, ‘বোঝা’ নামাতে বরং আপসের পথে এলো অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংলাদেশ ব্যাংক।


ঋণখেলাপিদের নিয়মিত হওয়ার সুযোগ দিয়ে নীতিমালা সংশোধন করেছে বাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী খেলাপিরা মাত্র দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট করেই ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবেন। পুনঃতফসিল হওয়া ঋণ পরিশোধে তারা সময় পাবেন টানা ১০ বছর।  এ ক্ষেত্রে প্রথম এক বছর কোনো কিস্তি দিতে হবে না। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঋণ পুনঃতফসিলের এসব সুযোগ দিয়ে একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশোধিত নীতিমালায় বলা হয়েছে, ঋণ স্থিতির ওপর ৩ শতাংশ হারে সুদ প্রযোজ্য হবে। তবে সুদের হার ৯ শতাংশ হারে থাকবে।


নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, প্রজ্ঞাপন জারির পরবর্তী ৯০ দিন, তথা তিন মাসের মধ্যে পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করতে হবে। তবে পরিস্থিতির বিচারে এ মেয়াদ বাড়ানোও হতে পারে। পুনঃতফসিলের আবেদন করতে হবে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক এককালীন হিসাবায়ন করে।


যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেকেই অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, এর ফলে  ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ভেঙে পড়বে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব বড় গ্রাহক ঋণ পরিশোধ করছেন না, ব্যাংকিং খাতের ওপর তারা আরো চাপ তৈরি করবেন।


ঋণের সুদহার অতীতে যা-ই থাক না কেন, পুনঃতফসিলের পর ওই ঋণের সুদহার হবে ৯ শতাংশ। তবে ৯ শতাংশের সুযোগ পেতে হলে ঋণটি এক বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। এক বছরের মধ্যে এককালীন ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সে ঋণের সুদহার হবে ১১ শতাংশ। সম্পূর্ণ মওকুফ করে দেয়া হবে ঋণখেলাপিদের অনারোপিত সুদ। স্থগিত থাকবে আরোপিত সুদের ওপর ধার্যকৃত সুদও। ঋণ পরিশোধে থাকতে পারে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ড। পুনঃতফসিলকৃত খেলাপি ঋণ পরিশোধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সময় পাবেন খেলাপিরা।


কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর কাছে পাঠানো এই নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যাংকের ঋণ অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত পরিশোধ হচ্ছে না। যে কারণে ওই সব ঋণ বিরূপভাবে খেলাপি হয়ে পড়ায় ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।


কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে ৩১ ডিসেম্বর সময়ে মন্দ বা ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত রয়েছে এমন ঋণগ্রহীতার অনুকূলে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে পুনঃতফসিল বা এক্সিট সুবিধা দেয়া যাবে।


নতুন নীতিমালা অনুযায়ী সুবিধা পাবে যেসব খাত: ট্রেডিং খাত (গম, খাদ্যদ্রব্য, ভোজ্যতেল ও রিফাইনারি), জাহাজ শিল্প (শিপ ব্রেকিং ও শিপ বিল্ডিং), লৌহ ও ইস্পাত শিল্প। অন্যান্য খাতের ব্যাংক কর্তৃক বিশেষ নিরীক্ষার মাধ্যমে চিহ্নিত প্রকৃত ব্যবসায়ী, যাদের ঋণ নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে মন্দ মানে শ্রেণিকৃত হয়েছে। এছাড়া বিশেষায়িত ব্যাংকের অকৃষি খাতের আমদানি-রপ্তানিতে সম্পৃক্ত শিল্পঋণ।


নীতিমালায় বলা হয়েছে, ঋণ পরিশোধের জন্য ৯টি মাসিক কিস্তি অথবা ৩টি ত্রৈমাসিক কিস্তির মধ্যে ২টি ত্রৈমাসিক কিস্তি অনাদায়ী হলে এ সুবিধা বাতিল হবে।


পুনঃতফসিল-পরবর্তী ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যাংক থেকে গ্রাহক নতুন ঋণ নিতে পারবে। তবে নতুন নেয়া ঋণ যথানিয়মে পরিশোধে ব্যর্থ হলে এই সার্কুলারের আওতায় দেয়া সব সুবিধা বাতিল হবে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ এককালীন এক্সিট করতে হলে এই সার্কুলারের আওতায় ঋণগ্রহীতার আবেদন পাওয়ার তারিখ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেবে। তবে যেসব ক্ষেত্রে বিশেষ নিরীক্ষার প্রয়োজন হবে, সেসব ক্ষেত্রে নিরীক্ষা প্রতিবেদন পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।


প্রসঙ্গত, এর আগে ২০১৫ সালে বিশেষ বিবেচনায় ডাউনপেমেন্ট ও মেয়াদের শর্ত শিথিল করে ৫০০ কোটি টাকার ওপরে ঋণ নেয়া ১১টি ব্যবসায়ী গ্রুপকে দেয়া হয় বিশেষ সুবিধা। ওই সময় তারা ১৫ হাজার ২১৮ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করে। পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠিত ঋণের টাকা ফেরত না দেয়ায় সুদে-আসলে ব্যাংকগুলোর পাওনার পরিমাণ ১৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।


২০১৫ সালে ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে, এমন গ্রাহকদের ঋণ বিশেষ বিবেচনায় পুনর্গঠন করা হয়েছিল। ওই সময় ১১টি শিল্প গ্রুপের ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করে বড় ধরনের সুবিধা দেয়া হয়। যদিও বড় সুবিধা পাওয়ার পরও দুই-তিনটি ছাড়া বাকি গ্রুপগুলো ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এবার বিশেষ পুনঃতফসিল নীতিমালার আওতায় ছোট, মাঝারি, বড় তথা সব ধরনের ঋণখেলাপি সুযোগ পাবেন। তবে এ প্রজ্ঞাপনের আওতায় বিশেষ সুবিধা পেতে ঋণখেলাপি ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে যৌথভাবে আদালতে চলমান মামলা স্থগিত করার আবেদন করতে হবে।


প্রসঙ্গত, গত মার্চ থেকে ঋণখেলাপিদের মাফ করে দেয়া, খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বেশ কয়েক দফায় বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যে গত ২৫ মার্চ এক ঘোষণায় তিনি বলেন, মোট ঋণের ২ শতাংশ এককালীন জমা দিয়ে ভালো খেলাপিরা নিয়মিত হতে পারবেন। ঋণের পুরো অর্থ পরিশোধে সময় পাবেন ১২ বছর। সুদহার ১০, ১২ বা ১৫ যা-ই থাকুক না কেন, ঋণের সুদ হবে ৭ শতাংশ। ১ মে থেকে এটি বাস্তবায়ন হবে। এরপর ২ এপ্রিল তিনি ঋণের সুদহার ৭-এর পরিবর্তে ৯ শতাংশ হবে বলে জানান। পরে খেলাপি গ্রাহকদের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে বিশেষ ঋণ পুনঃতফসিলের একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায় অর্থ মন্ত্রণালয়। নীতিমালায় পুনঃতফসিলকৃত ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দিতে বলা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো খসড়া নীতিমালা ধরেই ঋণখেলাপিদের বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা দেয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।


গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। স্বাভাবিক পন্থায় আদায় অযোগ্য হওয়ায় একই সময়ে ৩৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পুনঃতফসিল করা খেলাপি ঋণ হিসাবে ধরলে ব্যাংক খাতে ২ লাখ কোটি টাকার বেশি স্ট্রেসড লোন রয়েছে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে