logo
শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬

  সাখাওয়াত হোসেন   ২৩ মে ২০১৯, ০০:০০  

ঈদযাত্রায় ৯ বড় চ্যালেঞ্জ

সড়কপথে খানাখন্দ-যানজট দক্ষ চালক সংকট রেলপথে ইঞ্জিন-বগির স্বল্পতা শিডিউল বিপর্যয় নৌপথে ফিটনেসবিহীন লঞ্চ প্রাকৃতিক দুর্যোগ যাত্রাপথে চুরি-ছিনতাই ডাকাতির আশঙ্কা

ঈদযাত্রায় ৯ বড় চ্যালেঞ্জ
ট্রেন, বাস ও লঞ্চে ঈদযাত্রা -ফাইল ছবি
গত কয়েক বছরে সড়ক, রেল ও নৌপথের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন হলেও ঈদযাত্রার মৌসুম ঘনিয়ে আসার সঙ্গে পালস্না দিয়ে শুরু হয়েছে সেই পুরান 'জোড়াতালি'। যদিও বরাবরের মতো এবারও যোগাযোগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখার জোরালো ঘোষণা দিয়েছে। তবে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিমত, সড়ক-রেল-নৌ কোনো পথেই ঈদের ঘরমুখো মানুষের বাড়তি চাপ নেওয়ার কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা নেই। তাই বরাবরের মতো এবারও ঈদযাত্রায় গণপরিবহনের যাত্রীদের নানা ধরণের ভোগান্তি পোহাতে হবে। বিশেষ করে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ো হাওয়াসহ নানা বিরূপ আবহাওয়ার মাঝে জোড়াতালির লঞ্চে চড়ে নৌপথের যাত্রীদের ঈদ আনন্দ মাটি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের ঈদযাত্রায় বাস-লঞ্চ মালিক, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনকে নয়টি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এরমধ্যে সড়ক পথে খানাখন্দ-যানজট, দক্ষ চালক সংকট, রেলপথে ইঞ্জিন-বগির স্বল্পতা, শিডিউল বিপর্যয় এবং নৌপথে মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনে চলা রঙচঙা লঞ্চ ও প্রাকৃতিক দূর্যোগ নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করেন তারা। এছাড়া আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গতানুগতিক প্রস্তুতিতে নৌ-সড়ক ও রেলপথে চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই বাড়ারও প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

সড়ক পথের গণপরিবহন পর্যবেক্ষণকারী সূত্রগুলো জানায়, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে নানা ধরণের বাগাড়ম্বর চললেও বাস্তবিক অর্থে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন রুটের ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করা যায়নি। এর উপর ঈদযাত্রার তাল সামলাতে নতুন করে আরো বেশকিছু লক্কর ঝক্কর বাস-মিনিবাস রাস্তায় নামানো হচ্ছে। আর এসব গাড়ির স্টেয়ারিং আগের মতোই অদক্ষ চালকের হাতেই থাকছে। তাই বরাবরের মতো ঈদযাত্রায় ছোট-বড় নানা দূর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েই গেছে।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদের সময় পেশাদার চালক ছাড়া অন্য কাউকে গাড়ি চালাতে দেওয়া হবে না বলে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন করা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। কেননা, বিআরটিএর তথ্যানুযায়ীই রাস্তায় চলাচলকারী ৩৮ লাখ গাড়ির বিপরীতে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া পেশাদার চালকের সংখ্যা মাত্র ২২ লাখ। এ হিসাবে প্রায় ১৬ লাখ অদক্ষ চালক লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালান। যাদের সংখ্যা ঈদযাত্রায় আরো কিছু বাড়বে। আর বিপুল সংখ্যক যানবাহনের চালককে মাঝপথে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হলে ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি কয়েকশ' গুণ বাড়বে।

এছাড়া ঈদযাত্রায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলেও মনে করেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, ঈদযাত্রার উপরি আয়ে পকেট ভরতে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের মালিকরা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তাদের লক্কর ঝক্কর বাস-মিনিবাস রঙচঙ করে যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত করেছে। অথচ তাদের এ অপতৎপরতা বন্ধে প্রশাসন বরাবরের মতো এবারও ব্যর্থ হয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই ঈদযাত্রার ধুম লাগলে ফিটনেসবিহীন এসব যানবাহন চিহ্নিত করে তা চলাচল বন্ধ করা সত্যিকার অর্থেই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এ ধরণের তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করলে গণপরিবহনের মালিক-শ্রমিকরা একজোট হয়ে ঈদযাত্রা পন্ড করার ষড়যন্ত্র করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

অন্যদিকে দেশের অধিকাংশ রুটের খানাখন্দে ভরা ভাঙাচোরা পথ ভারী বর্ষণে আরো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ঈদের আগে বড় ধরণের প্রাকৃতিক দূর্যোগ না হলেও সড়ক-মহাসড়কে ব্যাপক যানজট তৈরি হবে। যা সামাল দেওয়া হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশের পক্ষে কতটুকু সম্ভব হবে তা নিয়েও ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়লেও পরিবহন সংশ্লিষ্ট ও গণপরিবহন যাত্রীরা তা নিয়ে বরাবরের মতো আস্থাহীনতায় ভুগছে।

এ নিয়ে খোদ ট্রাফিক পুলিশও নানা সংশয়ে রয়েছে। হাইওয়ে ট্রাফিক পুলিশের সহকারী কমিশনার পদমর্যদার একজন কর্মকর্তা বলেন, গাজীপুরের ওপর দিয়ে যাওয়া দুই মহাসড়ক ঢাকা-ময়মনসিংহ এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ঈদযাত্রায় এবারও যানজটসহ নানা ভোগান্তির আশঙ্কা রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে যেসব কারণে যানজট বেঁধেছিল সেগুলোর সমাধান এখনও হয়নি। এ অবস্থায় সাধারণ সময়েই এ পথের যানবাহন ধীরগতিতে চলছে। ঈদযাত্রায় গাড়ির চাপ বাড়লে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে। এছাড়া খানাখন্দে ভরা ভাঙাচোরা সড়কের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও উত্তরাঞ্চলের বেশকিছু রুটে ঈদযাত্রায় ব্যাপক যানজটের আশঙ্কা করছে হাইওয়ে পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগ।

এদিকে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে রেল কর্তৃপক্ষ জোড়াতালি দিয়ে বগি সংখ্যা বাড়লেও দূর্বল হয়ে পড়া পুরান ইঞ্জিনের শক্তি বাড়াতে না পারায় বরাবরের মতো এবার অধিকাংশ রুটে সিডিউল বিপর্যয়ের জোরালো আশঙ্কা রয়েছে। যদিও এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিষয়টি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবার রীতিমত চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে।

তবে রেলওয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যায়যায়দিনকে বলেন, 'ট্রেনে বাড়তি বগি লাগালে এ জন্য শক্তিশালি ইঞ্জিনের ব্যাকআপও থাকতে হবে। তা না হলে তা 'গাধার পিঠে উটের বোঝা' হয়ে দাঁড়াবে।' পুরান বগি মেরামত করে তা দিয়ে বাড়তি যাত্রী পরিবহন করা গেলেও সে ট্রেন সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর গ্যারান্টি দেওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে ট্রেনের বগি সংকট ঈদের আগে কতটা পূরণ করা যাবে তা নিয়ে খোদ রেল কর্তৃপক্ষও নানা সংশয়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার ঈদে প্রতিদিন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে কমপক্ষে ৮০০ বগির চাহিদা রয়েছে। এরমধ্যে ৭৩০টি বগি প্রস্তুত থাকলেও ঈদের আগেই চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কসপ থেকে মেরামত করে অন্তত ৬০ বগির যোগান দিতে হবে। অথচ সেখানে যে জনবল রয়েছে তাতে সর্বোচ্চ ৩০টি বগি মেরামত করা সম্ভব। তাই ঈদের আগে বগি সংকট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

চট্টগ্রামের রেলওয়ে পাহাড়তলীর ওয়ার্কসপের ব্যবস্থাপক (নির্মাণ) সাইফুল ইসলাম বলেন, কারখানাটিতে ২ হাজার ২'শ জনবলের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ১ হাজার ৫০ জন শ্রমিক। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত বগিগুলো দ্রম্নত মেরামতের জন্য ৪০ কোটি টাকার বাজেট দেয়া হলেও অনুমোদন হয়েছে ৩০ কোটি টাকা। তাই সার্বিক পরিস্থিতি সামাল দেয়া কতটুকু সম্ভব হবে তা নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে নৌ-পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার নদী পথে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়বে। এছাড়া রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন এলাকা থেকে আরো অন্ততঃ ৫ লাখ মানুষ বিভিন্ন গন্তব্যে রওনা দেবে। তবে দূর্বল ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে এবারের ঈদযাত্রায় নৌপথে চরম ভোগান্তি ও ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে।

আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, বেশ ক'দিন ধরেই দেশে মৃদু তাপ প্রবাহ বইছে। যা আরো কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে। এর রেশ ধরে জ্যেষ্ঠের মাঝামাঝি থেকে টানা কয়েকদিন ভারি বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় সাগর ও নদী উত্তাল থাকার কারণে নৌপথের যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

অন্যদিকে ফিটনেসবিহীন ভাঙাচোরা পুরান লঞ্চ রঙচঙ করে যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত করার সময় তা প্রতিরোধ করতে না পারায় ঈদযাত্রায় এসব লঞ্চ চলাচল বন্ধ করা কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে সংশয়ে আছেন অনেকেই। বিশেষ করে নৌপথের যান চলাচল পর্যবেক্ষণকারীরা এ নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন। তাদের ভাষ্য, প্রতি বছরই ঈদের আগে ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয় না। তাই বিআইডাবিস্নউটিএর এ ঘোষণাকে লঞ্চ মালিকরা পাত্তাই দেন না। এছাড়া ফিটনেস সার্টিফিকেট থাকা অনেক লঞ্চই নৌপথে চলাচলের অযোগ্য। তাই নৌপথে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তারা।

আইডবিস্নউটিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৮ হাজার ৮৩০ কিলোমিটার নৌপথে ১২ হাজার নিবন্ধিত নৌযান চলাচল করে। অথচ মালিকদের হিসাবে এ সংখ্যা ২৩ হাজারের বেশি। সে হিসাবে অর্ধেকের বেশি নৌযান অনিবন্ধিত। যার বেশির ভাগেরই ফিটনেস নেই। অথচ ঈদযাত্রায় এসব নৌযান নির্বিঘ্নে চলাচল করবে। যা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

নৌপথের পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে ঈদের ছুটির আগে থেকেই অতিরিক্ত ভিড় সামাল দিতে ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলগামী নৌযানসহ সব নৌ-রুটে লঞ্চ, স্টিমারের সংখ্যা বৃদ্ধি, নৌ-নিরাপত্তামূলক সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে। অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে লঞ্চে না চড়ার ব্যাপারে যাত্রীদের সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসনকেও এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। পুরান জরাজীর্ণ অচল লঞ্চে রঙ মেখে নতুন সাজিয়ে চালানোর প্রবণতা বন্ধের সঙ্গে সরকার পরিচালিত স্টিমারের মতো আধুনিক নৌযানের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বাড়াতে হবে সদরঘাটে ভ্রাম্যমাণ ম্যাজিস্ট্রেটসহ নৌ-পুলিশের কর্মতৎপরতাও।

অন্যদিকে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সড়ক-রেল ও নৌপথে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি বন্ধে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গতানুগতিক কৌশল পাল্টে নতুন ছক তৈরি করা জরুরি বলে মনে করেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে