logo
শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬

  কিশোর সরকার   ২৩ মে ২০১৯, ০০:০০  

ইলেকট্রিক ট্রেন চালুতে আগ্রহ নেই কর্তৃপক্ষের

ডিজেল ইঞ্জিনে বছরে শত কোটি টাকার তেল চুরি দফায় দফায় সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের রুট পরিবর্তন বুলেট ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রেলমন্ত্রীর

ইলেকট্রিক ট্রেন চালুতে আগ্রহ নেই কর্তৃপক্ষের
ইলেকট্রিক ট্রেন -ফাইল ছবি
যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন থেকে বছরে প্রায় শত কোটি টাকার তেল চুরি হলেও এ অপতৎপরতা রোধে ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর প্রক্রিয়ায় আগ্রহ নেই রেল কর্তৃপক্ষের। অভিযোগ রয়েছে, রেলের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার কারণে ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর প্রক্রিয়া এগুচ্ছে না। দফায় দফায় পরিবর্তন করা হচ্ছে ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্পের রুট। এর ফলে পরিকল্পনা কমিশনে বছরের পর বছর ফাইল চালাচালির মধ্যেই এ প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ রয়েছে। অথচ রেলের গতি বাড়াতে ও লোকসান কমাতে তেল চুরি বন্ধের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ পার্যক্রমে ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে জয়দেবপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর নির্দেশ দিয়েছিলেন।

সূত্র জানায়, রেলের তেল চুরি বন্ধের জন্য ইলেকট্রিক ট্রেন চালু করার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম সেকশনে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রবর্তনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১২ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এটি পরিকল্পনা কমিশন থেকে অনুমোদনের আগেই আবার রেল থেকে রুট পরিবর্তন করে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ইলেকট্রিক ট্রেন পরিচালনার লক্ষ্যে 'ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন' তৈরির সম্ভাব্যতা যাইয়ের জন্য ৭ কোটি ৫৫ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পআিসি) সভাও অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ২০১৬ সালের ২৫ আগস্টে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্পে পরিবর্তন আনা হয়। পরিকল্পনা কমিশনের বৈঠকে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রামের পরিবর্তে, নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নতুন এ সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ১১ জুন নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত ইলেকট্রিক ট্রেন চালানোর লক্ষ্যে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রবর্তনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। কিন্তু দফায় দফায় রুট পরিবর্তন করার ফলে, ইলেকট্রিক ট্রেন চালানো তো দূরের কথা, ইলেকট্রিক ট্রেন চালানোর জন্য ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন প্রবর্তনের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্পের ফাইল রেল থেকে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের মধ্যে ফাইল চালাচালির মধ্যেই সিমাবদ্ধ রয়েছে।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা ইলেকট্রিক ট্রেন চালু করা সম্ভব হলে প্রতি কিলোমিটার ট্রেন চলাচলে খরচ হবে ১০ পয়সা। আর দিনে ২০ ট্রিপে (যাতায়াত) বিদু্যৎ খরচ হবে মাত্র ১০ মেগাওয়াট। এসব ইঞ্জিনের দামও অনেক কম, মাত্র ২ থেকে আড়াই কোটি টাকা। অথচ বাংলাদেশ রেলওয়েতে বর্তমানে ব্যবহৃত ডিজেল ইঞ্জিনের দাম গড়ে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ একটি ডিজেল ইঞ্জিনের দামে কেনা যাবে ১২ থেকে ১৫টি ইলেকট্রিক ইঞ্জিন। এছাড়া বৈদু্যতিক ইঞ্জিনের মেরামত ব্যয়ও অনেক কম। ডিজেল ইঞ্জিন বড় ধরনের মেরামতে (ওভারহোলিং) যেখানে ৬০ লাখ টাকা ব্যয় হয়, বৈদু্যতিক ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে তা হবে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ লাখ। কিন্তু সার্বিকভাবে সাশ্রয়ী হলেও ইলেকট্রিক রেলপথ (ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন) চালু করতে আগ্রহ নেই বাংলাদেশ রেলওয়ের।

জানা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থ বছরে রেলের পরিচালনার জন্য তেল বাবদ বরাদ্দ ছিল ২৪৭ কোটি, বকেয়া ২৭৬ কোটি, ২০১৩-১৪ বরাদ্দ ২৪৯ কোটি, বকেয়া ৩২৩ কোটি, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বরাদ্দ ২৫৬ কোটি, বকেয়া ৩৫২ কোটি, ২০১৫-১৬ সালে বরাদ্দ ২৮১ কোটি, বকেয়া ৩৯৪ কোটি, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ২৬৮ কোটি, বকেয়া ৪০১ কোটি টাকা এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৩১৭ কোটি টাকা, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির কাছে বকেয়া হয় ৫৭৪ কোটি টাকা।

বিদ্যমান ট্র্যাকের ওপরও ইলেকট্রিক ট্রেন চালানো সম্ভব। বিশ্বের সকল দেশেই একই ট্রাকে ইলেকট্রিক ও ডিজেল চালিত ট্রেন চলাচল করে। সিমেন্ট-পাথরে ঢালাই করেও ইলেকট্রিক ট্রেন চালানো সম্ভব। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয় প্রায় ১৫ কোটি টাকা। আর সাধারণ মাটির ভিত্তির ওপর রেলপথ নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ১৪-১৫ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, 'ইলেকট্রিক ট্রেন চালু হলে পরিচালন ব্যয় অনেক কমবে। ফলে রেলের লোকসান কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে। তবে কর্তৃত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কায় রেলওয়ের মেকানিক্যাল বিভাগ বরাবরই এটি বাস্তবায়নে নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করছে।'

জানা গেছে, মাত্র ২৫০ কিলোওয়াট বিদু্যতে ইলেকট্রিক ট্রেন চালানো সম্ভব। তবে এর গতি কিছুটা কম। গতি বাড়াতে বেশি ইলেকট্রিক ট্রেন দরকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, 'জনবহুল হওয়ায় ও রেলপথের পাশে বাড়িঘর ও হাটবাজার থাকায় আমাদের দেশে খুব বেশি গতির ট্রেন চালানো সম্ভব নয়। ফলে ২৫০ কিলোওয়াট বিদু্যতের ইঞ্জিনই যথেষ্ট। প্রাথমিকভাবে নারায়ণগঞ্জ থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত এ ট্রেন চালু করা যেতে পারে। পরবর্তীতে গুরুত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন আন্তঃনগর রুটও বৈদু্যতিক রেলপথে রূপান্তর করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, রেলের উন্নয়নে সরকার বিনিয়োগ বাড়ালেও ইলেকট্রিক রেলপথ নির্মাণ বাস্তবায়ন না হওয়াটা দুঃখজনক। বর্তমানে অনেক উন্নত বৈদু্যতিক ইঞ্জিন আবিষ্কার হয়েছে। এতে খুব বেশি বিদু্যৎ প্রয়োজন হয় না। এছাড়া বিদু্যৎ উৎপাদনে দেশ অনেক এগিয়ে গেছে। তাই এখনই এ বিষয়ে রেলওয়ের পদক্ষেপ নেয়া উচিত। তা না হলে রেলের লোকসান কমানো সম্ভব হবে না।

জানা গেছে, সারা দেশে প্রতিদিন ৩৩৭টি ট্রেন চলাচল করে। এসব ট্রেনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পৌনে দুই লাখ লিটার ডিজেল খরচ হয়। এ হিসাবে বছরে ব্যয় হয় ৬ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার লিটার। কোনো কোনো বছর এর চেয়ে কম-বেশি ডিজেল ব্যবহৃত হয়। এই ব্যবহৃত তেল থেকে বছরে চুরি হচ্ছে প্রায় দেড় কোটি লিটার। যার বাজারমূল্য ৯৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা (এক লিটার ৬৫ টাকা হিসাবে)। গড়ে প্রতিদিন চুরির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার লিটার। এর মধ্যে শুধু ইঞ্জিন ও পাওয়ার কার থেকে দিনে ২০ হাজার লিটার, ১১টি লোকো শেড থেকে প্রায় ১৫ হাজার লিটার এবং চলন্ত ট্রেন থেকে ৫ হাজার লিটার তেল চুরি হচ্ছে। এ ছাড়া বছরে প্রায় ১ কোটি টাকার মবিলও চুরি হয়। তেলের বাজারমূল্যের ভিত্তিতে চুরির অর্থ নির্ধারণ হয়। এর ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে এর ভাগ চলে যায়। কর্মকর্তা-কর্মচারী, ট্রেনের চালক, গার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে চুরির বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে কখনো কখনো ট্রেনচালক ও গার্ডদের জিম্মি করেও তেল চুরি হচ্ছে বলে তারা জানান।

তবে রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন যায়যায়দিনকে বলেন, 'আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথমে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত ইলেকট্রিক ট্রেন চালু করার জন্য সব ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছি। পর্যায়ক্রমে সারাদেশে ইলেকট্রিক ট্রেন চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছি। তবে একটু সময় লাগবে। এতদিন বিদু্যৎ সমস্যা ছিল। এখন সে সমস্য অনেকটা মিটে গেছে। এছাড়া এখনো দেশের অনেক জায়গায় শুধু মিটার গেজ লাইন রয়েছে। সেগুলো ডুয়েল গেজে উন্নিত করতে হবে।'

তিনি বলেন, 'এখন আমরা শুধু ইলেকট্রিক ট্রেনই নয়, বুলেট ট্রেন চালানোরও পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছি। সে ব্যাপারেও কাজ চলছে।'

মন্ত্রী গণমাধ্যম কর্মীদের রেলের উন্নয়নের বিষয় সঠিক তথ্য দেশের জনগণের কাছে তুলে ধরার আহবান জানিয়ে বলেন, 'আমরা রেলের উন্নয়নের বিষয় যে কাজ করছি তা জনগণকে জানানো দরকার। কারণ জনগণকে অন্ধকারে রেখে কোনো উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই সংবাদ মাধ্যমকে রেলের উন্নয়নের বিষয় গণমাধ্যমে তুলে ধরতে হবে।'
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে