logo
বুধবার ১৯ জুন, ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬

  নূর মোহাম্মদ   ২৭ মে ২০১৯, ০০:০০  

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধ করার প্রস্তাব ডিসিদের

টিউশন ফি নীতিমালা, শিক্ষা টিভিসহ ৫০টি প্রস্তাব দিয়েছেন জেলা প্রশাসকরা। আগামী ১৪ জুলাই শুরু হওয়া ডিসি সম্মেলনে এসব প্রস্তাব তোলা হবে

শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধ করার প্রস্তাব ডিসিদের
বিভিন্ন দাবিতে রাজধানীতে বেসরকারি শিক্ষকদের সমাবেশ -ফাইল ছবি

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধ করতে চান জেলা প্রশাসকরা। পাশাপাশি শহরাঞ্চলের সেরা স্কুলের শিক্ষকদের গ্রামের স্কুলে অতিথি শিক্ষক হিসেবে পাঠানো, চরাঞ্চলের শিক্ষার মান বাড়াতে স্থানীয়ভাবে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টিউশন ফি নীতিমালা, শিক্ষা টিভিসহ ৫০টি প্রস্তাব করেছেন তারা। আগামী ১৪ জুলাই শুরু হওয়া ডিসি সম্মেলন উপলক্ষে এসব প্রস্তাব পাঠিয়েছেন জেলা প্রশাসক। জনপ্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে। ২৬ জন জেলা প্রশাসক শিক্ষার মান্নোয়নসহ বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে মোট ৫০টি প্রস্তাব করেছেন। এর মধ্যে একেবারে নতুন প্রস্তাবগুলো মধ্যে রয়েছে; মাঠপর্যায়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বিচারে বেসরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের অনুমোদন ও বিএড ডিগ্রির লাগাম টানা, প্রত্যেক জেলায় একটি করে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র বহনের জন্য প্রত্যক জেলায় নিজস্ব একটি কার্ভাড ভ্যান দেয়া, দেশের চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষাদানের জন্য স্থানীয়ভাবে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ করা, কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিবন্ধন আরও সহজ করা, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টিউশন ফির জন্য নীতিমালা প্রণয়ন উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষার মান যাচাইয়ের জন্য জেলা শিক্ষা কমিটি গঠন, গাইবান্ধায় কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর ও শিক্ষা টিভি নামে টিভি চ্যানেল চালু। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব প্রস্তাব আগামী জেলা প্রশাসক সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তুলে ধরবেন ডিসিরা। ডিসিদের প্রস্তাবের মধ্যে অন্যতম হলো বেসরকারি শিক্ষকদের শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ করার প্রস্তাব। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন এ প্রস্তাব করে বলেছেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কতিপয় শিক্ষক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। এর ফলে তারা ক্লাসরুমে পাঠদানে সময় দিতে পারেন না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ দক্ষ জাতি তৈরিতে এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রম্নতি ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানের অন্তরায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়ে বলেছে, সুনিদিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ হতে বিরত রাখা যায়। এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীর দেশের বাইরে থাকায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হাফিজুর রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, ম্যাডাম তার অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো এ প্রস্তাব দিয়েছেন। এর আগে গত বছর মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বেসরকারি শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধ করার জন্য শিক্ষমন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়া হয়। বেসরকারি শিক্ষকদের রাজনীতি নিয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের আলোকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধানমন্ত্রীর মতামতের জন্য পাঠায়। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকেও বেসরকারি শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধ করতে ইতিবাচক সাড়া মেলে। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেসরকারি শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়, বেসরকারি শিক্ষকদের চাকরি নিয়ন্ত্রণে সুনিদিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় তারা যেমন খুশি তেমন রাজনীতি করছেন। অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা অঙ্গ সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়ে সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে যুক্ত থাকছেন। এতে ক্লাসরুমে পাঠদানের মারাত্মক ব্যাঘাত হচ্ছে। তাদের নিয়ন্ত্রণে অনেক সময় মাঠ প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হয়। এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক প্রফেসর আবদুল মান্নান যায়যায়দিনকে বলেন, তারা শুধু নামে বেসরকারি, বেতন ভাতায় পুরোপুরি সরকারি। তবুও তাদের ওপর সরকারের অনেক নিয়ন্ত্রণ নেই। তার মতে, বেসরকারি শিক্ষকদের রাজনীতি সরাসরি বন্ধ না করে একটি নীতিমালার মধ্যে এনে নিয়ন্ত্রিত করা উচিত। এ ছাড়া রংপুর জেলা প্রশাসক দুর্গম চরাঞ্চল ও গ্রামের স্কুলের মান বৃদ্ধিতে শহরাঞ্চলের অবস্থিত সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের গ্রামাঞ্চলে স্কুলে অতিথি শিক্ষক হিসেবে কিছুদিন পদায়ণ করার প্রস্তাব করেন। সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস বন্ধে প্রশ্নপত্র বহনের জন্য প্রত্যেক জেলা প্রশাসকের দপ্তরে একটি নিজস্ব কাভার্ড ভ্যান দেয়া প্রস্তাব করেন। এতে ঝড় বৃষ্টি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময় প্রশ্নপত্র বহনের প্রতিবন্ধতা দূর হবে, গোপনীয়তা রক্ষা হবে। নওগাঁ জেলা প্রশাসক প্রত্যেক জেলায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য আলাদা একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বেসরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ ও বিএড কোস বন্ধের সুপারিশ করেন। তিনি তার সুপারিশে বলেন, বেসরকারি অধিকাংশ শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ নামসর্বস্ব, সরকারি টিটি কলেজ যে ধরনের প্রশিক্ষণ পায় বেসরকারিতে তার নূ্যনতম পায় না। যশোর জেলা প্রশাসক ত্রৈমাসিক শিক্ষা সম্মেলনের প্রস্তাব করেছেন। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে সমান কোটা বহাল করার প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, স্কুল, কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সন্তান, মুক্তিযোদ্ধার ও প্রবাসীদের সন্তানরা কোটা পেয়ে থাকেন। অথচ সরকারি চাকরিজীবীদের সন্তানরা এ কোটা পান না। এতে তাদের মধ্যে বিরূপ প্রক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এ কোটা সবার সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার উচিত। এ ছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে জেলা ও উপজেলা বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত স্কুলগুলোকে যোগ্যতা সাপেক্ষে সরকারি করা যেতে পারে বলেও প্রস্তাব করেন এ ডিসি। পিরোজপুর জেলা প্রশাসক প্রত্যেক জেলা সদরে সরকারি বালক ও বালিকা স্কুলে ইংরেজি ভার্সনের একটি শিফট চালু করার প্রস্তাব করেছেন। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক দুর্গম চরাঞ্চলের জন্য স্থানীয়ভাবে চুক্তিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করে বলেন, দুর্গম অঞ্চলের শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকেন না। অন্যান্য অঞ্চল থেকে শিক্ষক পদায়ন করলে তারা সেখানে থাকেন না। সারাদেশের মতো একই নিয়মে শিক্ষক নিয়োগের ফলে চরাঞ্চলে শিক্ষক হিসেবে কেউ যেতে চান না। এজন্য স্থানীয়দের মধ্য থেকে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত গাইবান্ধা কৃষি ইনস্টিটিউটকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপান্তরের প্রস্তাব করেন। ঝালকাটির জেলা প্রশাসন শিক্ষার মান্নোয়নে জেলা পর্যায়ে জেলা শিক্ষা কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। জেলার শিক্ষার গুনগত মান নিশ্চিতকরণে কোনো কমিটি না থাকায় শিক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এ জেলা শিক্ষা কমিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মত তার। কমিটিতে শিক্ষা-সংক্রান্ত সমস্যা আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া যাবে, শিক্ষার মান্নোয়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে প্রাধিকার নির্ধারণ করা যাবে। পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক শিক্ষা টিভি নামে একটি টেলিভিশন চ্যানেল চালুর প্রস্তাব করেন। এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন তিনি বলেন, শিক্ষার মান্নোয়নে এ টেলিভিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। \হ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে