logo
মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬

  জাহিদ হাসান   ২৭ মে ২০১৯, ০০:০০  

ডাক্তার, নার্স, সরঞ্জাম সংকট

কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা সেবা মিলছে না গ্রামাঞ্চলে

মফস্বল শহর কিংবা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা অন্যান্য ক্যাডারদের মতো পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট পাচ্ছেন না

মফস্বল শহর ও গ্রামীণ জনপদে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি ও প্রয়োজনীয় সেবাদানে অনীহা প্রকাশের ঢালাও অভিযোগ থাকলেও এর নেপথ্যের নানা গুরুত্বপূর্ণ কারণ বরাবরই অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। এমনকি এসব ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার চিত্র আগের অবস্থানেই স্থির হয়ে আছে। অথচ চিকিৎসা সেবার দুর্বলতার অভিযোগে গ্রামীণ জনপদে কর্মরত চিকিৎসকদের প্রায়ই নানা ধরনের হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সর্বোচ্চ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও মফস্বল শহর কিংবা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসক অন্যান্য ক্যাডারদের মতো পর্যাপ্ত লজিস্টিক সার্পোট পাচ্ছেন না। ফলে যথেষ্ট সদ্দিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় তারা রোগীর প্রয়োজনীয় সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একটি উপজেলা হেলথ-কমপেস্নক্সের অর্গানোগ্রামে ২৩ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও সেখানে পাঁচ-ছয়জনের বেশি ডাক্তার নেই। এমনকি এসব চিকিৎসাকেন্দ্রর জরুরি বিভাগের জন্য ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের পদ নেই। নামকাওয়াস্তে চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও অধিকাংশ যন্ত্রপাতি দিনের পর দিন বিকল থাকে। সরবরাহকৃত ওষুধেরও ঘাটতি রয়েছে। আর এসব কারণে সেবাদাতা ও গ্রহীতার মধ্যে সমন্বয়হীনতা বাড়ছে। ফলে সেবা নিতে ও দিতে গিয়ে প্রায়ই রোগীর স্বজন ও চিকিৎসকদের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন।

প্রান্তিক পর্যায়ে একাধিক উপেজেলা ও জেলা-সদর হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজের ইউরোলজি বিভাগের এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেন স্থানীয় এক ছাত্রলীগ নেতা। এমনকি শিক্ষানবিস ওই চিকিৎসককে নেতার পা ধরে ক্ষমা চাওয়া ও হাসপাতাল প্রধানকে কান ধরে ডেকে আনার ভয় দেখান ক্ষমতাসীন ওই নেতা।

গত ৪ এপ্রিল কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভুল চিকিৎসার ইসু্য তুলে ওই হাসপাতালের চিকিৎসক ও বিএমএ নেতা ডা. শাহেদুল ইসলাম শার্দুলকে নির্মমভাবে ওয়ার্ডেই প্রহার করা হয়। তাকে রক্ষা করতে নারী ইন্টার্ন চিকিৎসক, নার্সরা এগিয়ে এলে তাদেরকেও লাঞ্ছিত করা হয়। ডাক্তারের কক্ষের আসবাবপত্র তছনছ করা হয়।

১৪ মার্চ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় রোগী মৃতু্যর হয়েছে এমন অভিযোগে কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. হালিমা ও ডা. আলেয়াকে লাঞ্ছিত করা হয়।

এছাড়া ১৬ মার্চ সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতাল চত্বরে দুই চিকিৎসককে (কনসালটেন্ট জাকির হোসেন ও মেডিকেল অফিসার ডা. আব্দুর রাজ্জাক) শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। এ ঘটনায় চিকিৎসকরা রোগী দেখা বন্ধ করে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যায়যায়দিনকে বলেন, মূলত চিকিৎসা সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন না হওয়া, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়া ও চিকিৎসকদের রাজনৈতিক মনোভাব এসবের জন্য দায়ী। কারণ ২০১৪ সালে স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনের একটি খসড়া তৈরি করা হয়। ২০১৬ সালে চিকিৎসকদের বাধার মুখে খসড়ায় কিছু বিষয় সংযোজন-বিয়োজন করে 'রোগী এবং স্বাস্থ্যসেবাদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা আইন- ২০১৬' নামকরণ করা হয়। খসড়ায় চিকিৎসক, রোগী, রোগীর স্বজনদের আচরণ ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে বিস্তারিত উলেস্নখ করা হয়। কিন্তু আইনটি পাশ না হওয়ায় চিকিৎসক বা রোগীর স্বজনরা শৃঙ্খলা বহির্ভূত কাজ করলেও কোনো আইনি ব্যবস্থায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।

অন্যদিকে জেলা-উপজেলা হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, একজন চিকিৎসককে একই সঙ্গে রোগী দেখা ও ভিড় সামাল দেয়া অনেকটা কষ্ট সাধ্য। অথচ হাসপাতালসমূহে চিকিৎসকের কক্ষে সিরিয়াল-মাফিক রোগীদের ডাকা ও ওষুধ বুঝিয়ে দেয়ার মতো কোন সহায়ক জনবল নেই। এক্ষেত্রে একটু অব্যবস্থাপনা দেখলেই হাসপাতালের প্রটোকল না মেনে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নষ্ট করে রোগীর স্বজনরা। অথচ ক্যাডার সার্ভিসে একই উপজেলা বা জেলা প্রতিষ্ঠানে সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরকে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয় না।

তারা আরও বলেন, সম্প্রতি জাতীয় দলের ক্রিকেটার ও সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুজার সঙ্গে জেলা নড়াইল সদর হাসপাতালে এক চিকিৎসকের সঙ্গে কথোপকথনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে ঢাকা মেডিকেলের সাবেক শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুন-নূর তুষার গ্রামের চিকিৎসক ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের কতিপয় সংকটের চিত্র তুলে ধরে একটি খোলা চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি বলেন, একটি জেলা বা উপজেলা হাসপাতালে ২৭ জনের জায়গায় ৭ জন ডাক্তার, ৩০০ বেডের হাসপাতালে ১ হাজার ৮০০ রোগী ভর্তি থাকলেও জনবল নিয়োগ দেয়া হয় না, হাসপাতাল স্টোরে ওষুধ সংরক্ষণ পদ্ধতি মানসম্মত নয়, জেলা হাসপাতালে কার্ডিওলজিস্ট থাকলেও সব যন্ত্রপাতি নেই। ওটিতে এসি থাকলে তার হেপা ফিল্টার ও মেডিকেল সেন্ট্রাল গ্যাস সাপস্নাই নেই, অনেক হাসপাতালে নেই অ্যানেসথেশিওলজিস্টের পদে সরকারি কোনো ডাক্তার। ফলে যন্ত্রপাতিহীন হাসপাতালে রোগী মরলে চিকিৎসককে যখন মারধর করা হয়। এতেই প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালের করুণদশা বুঝা যায়।

পাবনা সদর হাসপাতাল ও একই জেলার আটঘরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেস্নক্সে দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. জাকারিয়া মানিক যায়যায়দিনকে বলেন, লজিস্টক সাপোর্টের অভাবই এ সমস্যার বড় কারণ। প্রতিদিন বহির্বিভাগে যদি ৫০০ প্যারাসিটামল বরাদ্দ দেয়া হয় ৫০ জন রোগীকে ১০টা করে দিলেই শেষ যায়। যেখানে রোগী আসেন শতাধিক। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের চোর থেকে শুরু করে অকথ্য গালাগাল দিতে থাকেন রোগীরা। অথচ রোগীদের বসানো বা লাইন ঠিক করে দেয়ার মতো একজন পিয়নও নেই। ৫০ শয্যার একটি হাসপাতালে প্রতিদিন ভর্তি রোগী ছাড়াও জরুরি ও বহির্বিভাগের রোগীর চাপ থাকে। এতে করে এক ওয়ার্ডে গেলে অন্য ওয়ার্ডে দেরি হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু স্বজনরা বুঝতে চান না। আবার রোগীদের সামাল দিতে গিয়ে স্থানীয় ক্ষমতাসীনদের ভয়ে তটস্থ থাকতে হয় সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত চিকিৎসককে।

চাটমোহর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. সবিজুর রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, তার হাসপাতালে ২২ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে মাত্র ৫ জন ডাক্তার কাজ করছেন। এই চিকিৎসক দিয়ে ইনডোর ও আউটডোরে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ রোগীকে সেবা দেয়া হচ্ছে। হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে সহায়ক জনবল বেশি আসে যারা হাসপাতাল প্রটোকল মানতে চান না। এতে করে নিরাপদ কর্মপরিবেশ ব্যাহত হয়। রোগী ও স্বজনদের কাউন্সিলিং করতে জনবল ঘাটতি আছে। তাই হাসপাতালের অর্গানোগ্রামে প্রতি চিকিৎসকের বিপরীতে অন্তত একজন করে জনবল নিয়োগ দিয়ে রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। পাশাপাশি চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত সম্ভব।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আমিনুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি যায়যায়দিনকে বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালসমূহে এসব সমস্যা রোধে কমিউনিটি পর্যায়ে মবিলাইজেশনের চেষ্টা করা হচ্ছে। মূলত চিকিৎসক, নার্স ও যন্ত্রপাতি সংকট থাকার কারণে সমন্বয় হচ্ছে না। সাধারণ মানুষও এটা বুঝতে চান না। সরকারের সামর্থ্য অনুযায়ী সীমাবদ্ধতার মধ্যেই চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে রোগীদের চিকিৎসার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও চিকিৎসকদের নিয়ে নিরাপত্তা সেল তৈরি করা হচ্ছে। আগামী ২ মাসের মধ্যে কয়েক হাজার চিকিৎসক নিয়োগ ও লজিস্টিক সাপোর্টের চেষ্টা করা হবে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে