logo
রোববার ১৬ জুন, ২০১৯, ২ আষাঢ় ১৪২৬

  যাযাদি রিপোর্ট   ১২ জুন ২০১৯, ০০:০০  

বিএনপি কার্যালয়ে তালা দিয়ে ছাত্রদলের বিক্ষোভ

# কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন # রিজভীকে বেরিয়ে যাওয়ার আলটিমেটাম # রিজভীপন্থি নেতাদের মারধর # কর্মসূচি একদিনের জন্য স্থগিত

বিএনপি কার্যালয়ে তালা দিয়ে ছাত্রদলের বিক্ষোভ
ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে বিক্ষোভ করে। পরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা কার্যালয়ে প্রবেশ করতে চাইলে তাদেরও বাধা দেয়া হয় -ফোকাস বাংলা

 



 





বয়সের সীমারেখা না রাখাসহ তিন প্রস্তাবের ভিত্তিতে কমিটি গঠনের দাবিতে মঙ্গলবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে বিক্ষোভ করেছেন ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। বিক্ষোভের একপর্যায়ে তারা কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে কার্যালয় থেকে বের হয়ে যাওয়ার আলটিমেটাম দেন। এ ছাড়া দুপুরের পরে ভেতরে ঢুকে রিজভীপন্থি হিসেবে পরিচিতদের বেধড়ক মারধর করার পাশাপাশি ১০ জনকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে থেকে বের করে দেন তারা। অবস্থা বেগতিক দেখে ছাত্রদলের সাবেক নেতারা বিক্ষুব্ধ নেতাদের নিয়ে গুলশান কার্যালয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে কেন্দ্রীয় নেতারা তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে যৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আশ্বাস দিলে একদিনের জন্য অবস্থান কর্মসূচি স্থগিত করেন বিক্ষুব্ধরা। 

ছাত্রদলের কমিটি ভেঙে দেয়ার ঘোষণা প্রত্যাহার করে তাদের দেয়া তিনটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে নতুন কমিটি করার দাবিতে গতকাল  বেলা সোয়া ১১টার দিকে ছাত্রদলের শ’খানেক নেতাকর্মী ফটকে তালা দিয়ে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন কার্যালয়ের নিচতলায় অনশনেও বসেন। তাদের দাবি, বয়সের সীমারেখা না রাখা, স্বল্পমেয়াদি কমিটি গঠন এবং কেন্দ্রীয়, বিশ্ববিদ্যালয়, মহানগর ও কলেজের সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের জন্য তিনটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে কমিটি গঠন করতে হবে। 

ছাত্রদলের সর্বশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর। রাজীব আহসানকে সভাপতি ও আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত ওই আংশিক কমিটিতে তখন ১৫৩ সদস্য ছিলেন। দীর্ঘদিন পর সেই কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হলে তাতে ৭৩৬ জনকে পদ দেয়া হয়। তবে ওই কমিটি নিয়েও সংগঠনে ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখা গিয়েছিল।

সর্বশেষ ঈদের আগের দিন ছাত্রদলের ওই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে দেয় বিএনপি। সে সময় দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন কাউন্সিলে প্রার্থী হওয়ার জন্য তিনটি যোগ্যতা নির্ধারণী শর্তও ঠিক করে দেয়া হয়। সেখানে বলা হয়, প্রার্থীকে ছাত্রদলের প্রাথমিক সদস্য হতে হবে, তাকে অবশ্যই বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হতে হবে এবং ২০০০ সালের পরে এসএসসি/সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। নতুন কাউন্সিল অনুষ্ঠানে সংগঠনটির সাবেক নেতাদের নিয়ে সোমবার তিনটি কমিটি করে দেয়া হয় বিএনপির পক্ষ থেকে। 

কিন্তু কমিটি ভেঙে দেয়ার ঘোষণা এবং প্রার্থিতার ক্ষেত্রে বয়সের শর্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়ে গতকাল সকাল থেকে বিএনপি অফিসের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা ‘সরকারের দালালেরা হুঁশিয়ার, সাবধান’, ‘আমাদের অধিকার দিতে হবে দিতে হবে’- ইত্যাদি স্লোগান দিতে শুরু করলে উত্তেজনা তৈরি হয়।

রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কমিটি ভেঙে দেয়ার বিষয়টি জানানো হয়েছিল বলে তার বিরুদ্ধেও স্লোগান দেন ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধরা। তারা ২০০০ সাল থেকে পরবর্তী যে কোনো বছরে এসএসসি/সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের প্রার্থী করার বাধ্যবাধকতা বাতিলের দাবি জানান। বিলুপ্ত কমিটির এক নম্বর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি এজমল হোসেন পাইলট ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে বিক্ষোভ হয়। তারা দুপুর ১২টার দিকে কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার পাশাপাশি বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে কার্যালয় থেকে বের করে দেয়ার দাবি জানান। বিকাল ৪টার মধ্যে রিজভীকে কার্যালয় থেকে বের হয়ে যাওয়ারও আলটিমেটাম দেয়া হয়। একাধিক নেতা চিৎকার করে বলতে থাকেন, একা দুটি পদ নিয়ে কার্যালয় দখল করে বসে আছেন রিজভী। তিনি কার্যালয়কে বাড়ি বানিয়ে বসে আছেন।

ছাত্রদলের সাবেক নেতা শামসুজ্জামান দুদু, আমানউল্লাহ আমান, আসদুজ্জামান রিপন, ফজলুল হক মিলন, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, এবিএম মোশাররফ হোসেন, মীর সরাফত আলী সপু, শফিউল বারী বাবু, আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, হাবিবুর রশিদ হাবিব দুপুর ১১টার দিকে কার্যালয়ের সামনে এলেও বিক্ষোভের মধ্যে তারা ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। সাবেক নেতাদের মধ্যে খায়রুল কবির খোকন ও আজিজুল বারী হেলাল সকালে বিক্ষোভ শুরুর আগেই কার্যালয়ে ঢুকে পড়েছিলেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তারা অফিস থেকে বেরিয়ে এলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ‘ভুয়া’ ‘ভুয়া’ বলে স্লেøাগান দিতে থাকেন। এ সময় কেন্দ্রীয় এক নেতা জানান, কার্যালয়ের বিদ্যুতের লাইন ছাত্রদলের কর্মীরা কেটে দেয়ায় কার্যালয়ে থাকা অসুস্থ রুহুল কবির রিজভীকে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়ার কথা ভাবছেন। তখন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অ্যাম্বুলেন্সও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।  

এর আগে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান বরকত উল্লা বুলু, বিশেষ সম্পাদক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস আদালতে হাজিরা দিয়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কার্যালয়ের সামনে এলে বিক্ষুব্ধদের সামনে পড়েন। তাদের দাবির কথা শুনে সেখান থেকে চলে যান তারা।

পরে বিকাল ৩টা ৫৫ মিনিটে কার্যালয়ের তালা খুলে বিলুপ্ত কমিটির আজমল হোসেন পাইলট, আসাদুজ্জামান, ওমর ফারুক মুন্না, মফিজুর রহমান আশিক, আবুল হাসান, মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাকের নেতৃতে বিক্ষুব্ধরা কার্যালয়ের ভেতরে ঢোকেন। তালা খোলার পর বিক্ষুব্ধরা ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করেন। এ সময় ভেতরে থাকা রিজভীপন্থি হিসেবে পরিচিত ছাত্রদল পূর্ব শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়নকে তারা বেধড়ক মারধর করে তৃতীয় তলা থেকে নামিয়ে সিএনজিতে উঠিয়ে দেয়। এ ছাড়া আরও ১০ জনকে বের করে দেয় তারা। একই সময়ে বিএনপির দপ্তরের দলিল উদ্দিনকেও কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। এদেরকে বের করে দেয়ার পরে বিক্ষুব্ধরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ফের তালা দিয়ে দেন। বিকাল ৫টার দিকে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস এবং সাড়ে ৫টার পর গয়েশ্বর চন্দ্র রায় নয়াপল্টনের কার্যালয়ে গেলে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদেরকে তালা খুলে দিয়ে প্রবেশ করতে দেন। দুই নেতাই তৃতীয় তলায় অসুস্থ দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে দেখতে যান এবং চিকিৎসকের সঙ্গে তার স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নেন।

কার্যালয়ে থেকে বেরিয়ে স্থায়ী কমিটির দুই নেতা সাংবাদিকদের বলেন, ছাত্রদলের এই প্রতিবাদ শুধুই মান-অভিমান, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

রিজভী কেমন আছেন জানতে চাইলে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, রিজভী অসুস্থ। তাকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে। ডাক্তার সেখানে আছেন।

রিজভী হাসপাতালে যাবেন কি না প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটা চিকিৎসকরা ঠিক করবেন। কিন্তু কোনো পরিস্থিতি বা এই ঘটনার জন্য তাকে বাইরে যেতে হবেÑ এটা যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন না।

দলের স্থায়ী কমিটির দুই নেতা অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও বিক্ষুব্ধরা অফিসের সামনেই অবস্থান নিয়েছিলেন। কার্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা লাগানো ছিল।

পরে বিকালে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র নেতারা গুলশান কার্যালয়ে বৈঠক করেন। তারা লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। বিকালে এই বৈঠক থেকে সিনিয়র নেতারা ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধ নেতাদের ডেকে পাঠান। তাদের সঙ্গে সিনিয়র নেতারা বৈঠক করে তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে যৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার আশ্বাস দেন। এ আশ্বাস পেয়ে রাত ১০টায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা খ্ুেল দেয় বিক্ষোভকারীরা। এপরপর বিক্ষুব্ধদের নেতৃত্বদানকারী অন্যতম নেতা আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, তারা অবস্থান কর্মসূচি একদিনের জন্য স্থগিত করছেন। এর মধ্যে তাদের দাবিসমূহ বিবেচনায় নিয়ে দল যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে