logo
শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  জাহিদ হাসান   ১৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

গুণিতক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাব

ডেঙ্গু জ্বরের ধারণা আছে ছোটবড় প্রায় সবারই। জানাশোনা থাকলেও প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতন নন কেউই। ফলে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে গুণিতক হারে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার প্রকোপ মোকাবেলায় কাজ করলেও রোগটির প্রাদুর্ভাব কমাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের পরিসংখ্যান জানতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১ জানুয়ারি থেকে বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) পর্যন্ত ডেঙ্গু ফিভার, ডেঙ্গু হেমারজিক ফিভার ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৩৭৩ জন রোগীর মধ্যে বর্তমানে ১৮০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। একইভাবে মিটফোর্ডে ভর্তি হওয়া ১৩০ জনের মধ্যে ৪৭, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৯৮ জনের মধ্যে ২০ জন, সোহরাওয়ার্দীতে ১৮৮ জনের মধ্যে ৫৩, হলি-ফ্যামিলি রেডক্রিসেন্টে ২৭৪ জনের মধ্যে ৪৪, বারডেমে ৫১ জনের মধ্যে ১১, পিলখানার বিজিবি হাসপাতালে ১২২ জনের মধ্যে ১৮ জন ছাড়াও রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ৯৬, মুগদা মেডিকেলে ১০৭, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ১৪১, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ১৬ জন ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়েছেন। পাশাপাশি কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে ডেঙ্গু জ্বরের সেবা নিতে আসা ২ হাজার ১৮ জনের মধ্যে ৩১৬ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি সেন্টার ও কনট্রোল রুমের তথ্যমতে ১ জানুয়ারি থেকে এখন (১১ জুলাই) পর্যন্ত ঢাকা শহরের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে ভর্তি হওয়া ৩ হাজার ৬১৪ রোগীর মধ্যে ৬৮৯ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। সর্বমোট ৪৭টি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হতে পাওয়া তথ্যমতে সেখানে মোট ৩ হাজার ৬২১ জনের ৬৮৯ জন ভর্তি আছেন।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্যানুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে (এপ্রিল-জুলাই) ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল, ১ হাজার ৩২২ জন। অথচ এ বছরের এপ্রিল থেকে গত ১১ জুলাই পর্যন্তই আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৫৪৮ জনে দাঁড়িয়েছে।

বিগত বছরগুলোর তুলনায় চলতি বছর রোগটির প্রকোপ বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও আক্রান্তের ভয়াবহতা সম্পর্কে ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে অসচেতনতায় অনেকেই এই জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে রাজধানীতে গড়ে

প্রতিদিন কমপক্ষে সাতজন (চার ঘণ্টায় একজন) ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

বিষযটি স্বীকার করে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে বিভিন্ন কারণে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এ বছর রোগটির প্রকোপ বেশি দেখা দিয়েছে। কারণ যেসব কারণে ডেঙ্গু জ্বর হয় তা জেনেও অধিকাংশ পরিবারের সদস্যরা তা থেকে বাঁচতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না। অভ্যস্ত (অসচেতন) জীবনযাপনের ফলে কেউ আকস্মিকভাবে আক্রান্ত হলে নিজের দায় স্বীকার না করে ঢালাওভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সংশ্লিষ্টদের দোষারেপ করছেন। অন্যদিকে আক্রান্তদের এমন অভিযোগ পুরোপুরি মানতে নারাজ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। সংস্থা দুইটির দাবি ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী দেশে জুন-জুলাই মাসে এডিস মশার প্রকোপ বেশি দেখা যায়, যা আগস্ট মাস পর্যন্ত চলতে থাকে। কারণ এ সময় ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার প্রজনন মৌসুম। তাই বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে এডিস মশার লার্ভা ও ডিম উৎপাদন সহজ হয়। বিশেষ করে দিনের বেলায় ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা কামড়ালে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার যায়যায়দিনকে বলেন, মূলত বর্ষা মৌসুমে মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ হওয়ায় এবার এডিস প্রকোপ বেশি। গত বছর চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে এমন সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। মশার বংশ বিস্তার ধ্বংস করতে ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে ওষুধের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এ সমস্যা প্রকট হয়েছে। এখন সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের মানুষের সচেতনতা দরকার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা যায়যায়দিনকে বলেন, ডেঙ্গু জ্বর এড়াতে সতর্ক হয়ে দৈনিন্দন জীবনযাত্রা পরিবর্তন আনলে রক্ষা পাওযা সম্ভব। যেমন, দিনে বা রাতে ঘুমানোর আগে মশারি টাঙিয়ে নেয়া, সন্ধ্যার দিকে ঘরের দরজা-জানালা সাময়িক সময় বন্ধ রাখা। বাগান, ঝোপঝাড় ও জঙ্গলপূর্ণ জায়গায় বাচ্চাদের খালি গায়ে খেলার বিষয়ে সতর্ক হওয়া। নির্মাণাধীন ভবন এলাকা, বাড়ির আঙিনা ও সহজে পানি জমতে পারে এমন সব পাত্র পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে সতর্ক হলেই ডেঙ্গু জ্বর থেকে রক্ষা পাওযা সম্ভব। আর চিকিৎসার ক্ষেত্রে অবশ্যই গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। রোগীদের মধ্যে যাদের কো-মরবিডিটি (শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী, ডায়াবেটিস) আছে তাদের দ্রম্নত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। ডেঙ্গু শনাক্তকরণ, ভেক্টর ও ভাইরাস সম্পর্কিত সার্ভিলেন্স জোরদার করতে হবে। এ জন্য কমিউনিটি, প্রাতিষ্ঠানিক ও জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় কাজ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে