logo
সোমবার ২৬ আগস্ট, ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৬

  যাযাদি ডেস্ক   ২২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

‘ছেলেধরা’ সন্দেহে ৫ জেলায় ১৯ জনকে গণপিটুনি আহত ২ জনের মৃত্যু



 



ছেলেধরা গুজবে দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেই চলছে।

ঢাকার সাভার ও কেরানীগঞ্জে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন দুজন। লালমনিরহাটে মানসিক প্রতিবন্ধী তিনজন হয়েছেন গণপিটুনির শিকার। পাবনায় আহত হয়েছেন তিনজন। কুমিল্লায় এক নারীসহ চারজন হয়েছেন গণপিটুনির শিকার।

নওগাঁর মান্দায় ছেলেধরা সন্দেহে ছয় জেলেকে পিটিয়েছে স্থানীয়রা। রাজশাহী নগরীতে একটি স্কুলের সামনে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন একটি চিপস কোম্পানির তিন কর্মী।

পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে ‘মানুষের মাথা লাগবে’ বলে সম্প্রতি ফেসবুকে গুজব ছড়ানো হয়, যাতে বিভ্রান্ত না হতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল সরকার। গুজব ছড়ানোর অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়।

এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার নেত্রকোনা শহরে এক যুবকের ব্যাগ তল্লাশি করে ‘শিশুর মাথা’ পাওয়ার পর তাকে পিটিয়ে হত্যা করে এলাকাবাসী।

তারপর দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে দলবেঁধে আক্রমণের ঘটনা ঘটতে থাকে।

শনিবার ঢাকার বাড্ডাসহ বিভিন্ন জেলায় অন্তত তিনজনকে পিটিয়ে হত্যার পর রোববার দুজনের মৃত্যু এবং আরও ১৯ জন আহত হয়েছেন।

আমাদের জেলা প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর-

কেরানীগঞ্জ (ঢাকা): কেরানীগঞ্জ মডেল থানার খোলামুড়া এলাকায় দুদিন আগে গণপিটুনির শিকার অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি  (৩৫)  রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি সাকের মোহাম্মদ জুবায়ের একথা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার বিকালে ছেলেধরা সন্দেহে স্থানীয় লোকজন তাকে গণপিটুনি দেয়। পুলিশ খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে।’

ওই ব্যক্তিকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার রাত সাড়ে ৮টায় তার মৃত্যু হয়।

ওসি বলেন, ‘নিহত ব্যক্তির কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি। তার ব্যাপারে কেউ খোঁজখবরও নেয়নি। আমরা তার পরিচয়ের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিচ্ছি।’

সাভার (ঢাকা): তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নে ‘ছেলেধরা সন্দেহে’ একদিন আগে গণপিটুনিতে আহত এক নারী রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।  ২৫-৩০ বছর বয়সি ওই নারীর পরিচয়ও পাওয়া যায়নি।

সাভার মডেল থানার ওসি এএফএম সায়েদ বলেন, ‘ছেলেধরা সন্দেহে ওই নারীকে পিটুনি দেয় তেঁতুলঝোড়া এলাকার লোকজন। তবে কোন বাড়ির কার ছেলেকে সে ধরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, তা কেউ বলতে পারেনি।’

পুলিশ গিয়ে ওই নারীকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

লালমনিরহাট: আদিতমারী উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে দুই মানসিক প্রতিবন্ধীকে স্থানীয়রা আটক করে। একজনকে গণপিটুনির পর পুলিশ তাদের হেফাজতে নিয়েছে। অন্যজনকে প্রাথমিক যাচাই বাছাই করে ছেড়ে দেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, রোববার সকালে আদিতমারীর সাপ্টীবাড়ী বাজারে ৩৫ বছরের এক মানসিক প্রতিবন্ধীকে বস্তা হাতে ঘুরতে দেখে ছেলেধরা সন্দেহে পিটুনি দেয় স্থানীয়রা।

খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে বলে জানিয়েছেন আদিতমারী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাইফুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘সে কথাবার্তা ঠিকমতো বলতে পারে না। সে মূলত মানসিক প্রতিবন্ধী। গুজবে স্থানীয়রা এই কাজ করেছে।’

একই উপজেলার পলাশী ইউনিয়নে ২৫ বছর বয়সি এক নারীকে সন্দেহ করে স্থানীয়রা আটক করেছিল। পরে চৌকিদার দেলোয়ার ওই নারীকে আটক করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যান।

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী বলেন, ‘ওই মহিলা পাগল। ঠিকমতো কথাবার্তা বলতে পারে না। মুখে যখন যেটা আসে তখন সেটাই বলতে থাকে। সে ছেলেধরা নয়। এজন্য তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।’

এদিকে লালমনিরহাট শহরের কলাবাগান কলোনিতে ছেলেধরা সন্দেহে মানসিক প্রতিবন্ধী এক নারীকে (৫২) শনিবার রাতে গণপিটুনি দেয়া হয়। তাকে বাঁচাতে গিয়ে জিল্লুর রহমান নামে পুলিশের এক এসআই আহত হন বলে লালমনিরহাট সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এরশাদুল আলম জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘মানসিক ভারসাম্যহীন ওই বৃদ্ধা শহরের কলাবাগান কলোনি এলাকায় পরিত্যক্ত রেললাইনে বসেছিলেন। স্থানীয়রা ছেলেধরা সন্দেহে তাকে পেটাতে শুরু করে। খবর পেয়ে সদর থানা পুলিশ ওই নারীকে উদ্ধার করতে গেলে স্থানীয়দের ছুড়ে মারা পাথরের আঘাতে আহত হন এসআই জিল্লুর।’

ওই নারীকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি করেছে পুলিশ।

লালমনিরহাট পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সন্দেহ হলেই কেউ অপরাধী নয়। মাথা কাটা বা ছেলেধরা এটা একটি গুজব মাত্র।”

কুমিল্লা: সদর উপজেলার আমড়াতলী ইউনিয়নের ধুতিয়া দিঘীর পাড় ও পাশের মাঝিগাছা এলাকায় রোববার সকালে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নারীসহ চারজন আহত হয়েছেন।

আহতদের তিনজন জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের বেজোড়া গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন রতœা বেগম (৪৫), তার স্বামী আবদুস সালাম (৬৫) এবং আরেক যুবক আনোয়ার হোসেন (২৮)।

আমড়াতলী ইউপি চেয়ারম্যান মো. মোজাম্মেল হোসেন বলেন, সকালে ওই তিনজন আমড়াতলী স্কুলের সামনে আসেন। তারা পাশের একটি বাড়ির সামনে গিয়ে পঞ্চম শ্রেণির এক শিশুকে ডাক দিয়ে রতœা বেগমকে বাথরুমে নিয়ে যেতে বলেন। তখন ছেলেধরা সন্দেহে তাদের আটক করে স্থানীয়রা। পরে পুলিশ এসে আহত অবস্থায় তাদেরকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ছত্রখিল পুলিশ ফাঁড়ির এসআই তপন কুমার বাগচী জানান, ওই তিনজনকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে রোববার দুপুর ২টায় কুমিল্লা সদর উপজেলার মাঝিগাছা এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে আরিফ হোসেন (২৮) নামে এক যুবক গণপিটুনির শিকার হন বলে পুলিশ জানায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কসবা উপজেলার কোনাকাটা স্বর্ণকার বাড়ি আবদুল রেনু সরকারের ছেলে আরিফ।

পাবনায় ছেলেধরা সন্দেহে জনতার হাত থেকে নারীসহ ৩ জনকে উদ্ধার করে পুলিশ

পাবনা:  পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রোববার বিকালে ছেলেধরা সন্দেহে পিটুনির শিকার দুজনকে জনতার হাত থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।  তারা হলেন জহুরুল ইসলাম (৩০) ও জিয়া উদ্দিন (৩৫)।

এ ছাড়া সদর উপজেলার ভাড়ারা ইউনিয়নের দড়িভাউডাঙ্গা গ্রামে সোনিয়া খাতুন (২২) নামে এক নারীকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর গ্রামের মঞ্জুর হোসেনের মেয়ে সোনিয়া ভিক্ষা করতেন।

পাবনা সদর থানার ওসি ওবাইদুল হক বলেন, ‘এরা তিনজনেই কেউই ছেলেধরা নয়। জহুরুল ও জিয়া উদ্দিন মানসিক ভারসাম্যহীন ও ভবঘুরে। তাদের ভাষা পরিষ্কার বোঝা যায় না। তারা রোহিঙ্গা বলে মনে করা হচ্ছে। আর সোনিয়া ভিক্ষুক।’

গুজবে কান না দিয়ে কাউকে সন্দেহ হলে পুলিশে খবর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম।

রাজশাহী: নগরীর বিনোদপুর মিজানের মোড় এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে তিনজনকে পিটুনি দেয়ার পর জানা গেছে তারা একটি চিপসের প্রচারে গিয়েছিলেন।

রোববার দুপুরে এ ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে বলে জানিয়েছেন মতিহার থানার ওসি হাফিজুল রহামন।

তারা হলেন, দেওয়ান বাছার (৪৫), ইউসুফ আলী (৩৮) ও শামীম রেজা (১৯)। তারা তিনজন রাজশাহী এগ্রো ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারী।

ওসি বলেন, ‘এই তিন ব্যক্তি কোম্পানির প্রচারের জন্য শিশুদের চিপস খাওয়াচ্ছিল। এ সময় স্থানীয় লোকজনের মধ্যে সন্দেহ জাগে। এলাকাবাসী পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে তারা দেখাতে পারেনি। তখন ছেলেধরা সন্দেহে তাদের পিটুনি দেয় এলাকাবাসী। তাদের প্রাইভেটকারও ভাংচুর করে।”

ওই তিনজনকে থানায় নেওয়ার পর সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাদের ৫০ হাজার টাকা জমিমানা করা হয়।

ওসি বলেন, “ভোক্তা অধিকার আইন অনুযায়ী বিএসটিআইর অনুমোদন ছাড়া চিপস তৈরির অপরাধে তাদের জরিমানা করা হয়েছে।”

নওগাঁ: মান্দা উপজেলার কুসম্বা ইউনিয়নের বুড়িদহ এলাকায় রোববার সকালে ছেলেধরা সন্দেহে ৬ জেলেকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয়রা।

মান্দা থানার ওসি মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, ‘পুকুরে ছোট মাছ ধরার জন্য পুকুর মালিক সনজিত ৬ জেলেকে মাছ ধরতে বলেন। মাছ ধরার সময় জেলেরা তিনটি বড় মাছ গোপনে জালের মধ্যে লুকিয়ে রাখেন। পুকুর মালিক বিষয়টি বুঝতে পারেন।

‘তিনি বস্তা দেখতে চাইলে জেলেরা দেখাতে রাজি হচ্ছিল না। এক সময় তারা দৌড় দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এতেই ঘটে বিপত্তি। পাড়ার লোকজন ছেলেধরা সন্দেহে চিৎকার দিয়ে তাদের ধরে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।’

ওসি বলেন, ‘তারা প্রকৃতপক্ষে জেলে। ভুল বোঝাবুঝি হওয়ায় এলাকাবাসী তাদের ছেলেধরা সন্দেহে পিটুনি দেয়।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে