logo
শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  অনলাইন ডেস্ক    ২০ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

বাস বন্ধের পর ট্রাকেও ধর্মঘট

জেলায় জেলায় জনদুর্ভোগ চরমে রাজধানীতেও গণপরিবহণ কম

বাস বন্ধের পর ট্রাকেও ধর্মঘট
ধর্মঘটের কারণে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা টার্মিনালে সারিবদ্ধ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান। ছবিটি মঙ্গলবার তোলা -যাযাদি
যাযাদি রিপোর্ট

নতুন সড়ক পরিবহণ আইন কার্যকরের পর দেশের বিভিন্ন জেলায় বাস চলাচল বন্ধের পর এবার সারাদেশে ট্রাক ধর্মঘটের ডাক এসেছে।

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহণ মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন আইন স্থগিত রাখাসহ নয় দফা দাবিতে বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ডেকেছে।

শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে নতুন সড়ক পরিবহণ আইন প্রণয়নের শুরু থেকে তার বিরোধিতা করে আসছিলেন পরিবহণ মালিক-শ্রমিকরা।

সোমবার থেকে আইনটি কার্যকর শুরুর পর কোনো চাপে পিছু হটবেন না বলে সড়ক পরিবহণমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দেওয়ার পর পরিবহণ মালিক-শ্রমিকরা দৃশ্যত চাপ বাড়িয়ে দিয়েছেন।

মঙ্গলবার ঢাকার তেজগাঁওয়ে সংবাদ সম্মেলনে ট্রাক মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহবায়ক মো. রুস্তম আলী খান বলেন, সড়ক পরিবহণ আইন স্থগিত করে মালিক শ্রমিকদের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জরিমানার বিধান ও দন্ড উলেস্নখ করে একটি 'যুগোপযোগী বাস্তবসম্মত ও বিজ্ঞানভিত্তিক' সঠিক আইন প্রণয়ন করতে হবে। ট্রাক ধর্মঘট শুরু হলে পণ্য পরিবহণ বাধাগ্রস্ত হয়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।

ট্রাক মালিক-শ্রমিকরা সড়ক পরিবহণ আইন প্রত্যাখ্যান করছে কি না- এ প্রশ্নে রুস্তম বলেন, তারা পুরো আইন প্রত্যাখ্যান করছেন না। কিছু ধারার সংশোধন চান।

তিনি বলেন, 'আইনের সব ধারা নিয়ে আমাদের আপত্তি নেই। কিছু বিষয় নিয়ে আমরা বিভিন্ন সময় দাবি জানিয়েছি। কিন্তু সরকার আশ্বস্ত করলেও পরে সেগুলো বাস্তবায়ন করেনি। এ কারণেই কর্মসূচি।'

সংবাদ সম্মেলনে দাবিগুলো পড়ে শোনান রুস্তম আলী।

তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় চালককে এককভাবে দায়ী করা যাবে না। সড়ক দুর্ঘটনাজনিত কোনো মামলায় চালককে আসামি করলে তা অবশ্যই জামিনযোগ্য ধারায় হতে হবে।

'তদন্ত সাপেক্ষে প্রকৃত দোষী চিহ্নিত করার কাজে মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের যুক্ত করতে হবে। এ কমিটির মাধ্যমে সঠিক তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় কোনো গাড়ির মালিককে গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা যাবে না।'

এছাড়া 'সড়ক পরিবহণ উপদেষ্টা কমিটি', 'সড়ক পরিবহণ আইনশৃঙ্খলা কমিটি' এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয় গঠিত পণ্য পরিবহণ সংশ্লিষ্ট যে কোনো কমিটিতে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রতিনিধি রাখার দাবি জানান নেতারা।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সদস্য সচিব তাজুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্‌বায়ক মকবুল আহমদ এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. মনিরসহ পরিবহণ মালিক-শ্রমিকরা উপস্থিত ছিলেন।

জেলায় জেলায় জনদুর্ভোগ

এদিকে নতুন আইনে শাস্তি ও জরিমানার ভয়ে বিভিন্ন স্থানে বাস চালাচ্ছেন না চালকরা। সড়কে গাড়ি চলাচল কম থাকায় ব্যাপক জনদুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে পিইসি পরীক্ষার্থীদের। মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত ছাড়াই শ্রমিকরা নিজ উদ্যোগে এ কর্মবিরতি পালন করছেন বলে জানা গেছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:

সাতক্ষীরা : নতুন সড়ক পরিবহণ আইন বাস্তবায়নের প্রতিবাদে সাতক্ষীরার সকল রুটে দ্বিতীয় দিনের মতো পরিবহণ ধর্মঘট চলেছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে কোনো রুটে যাত্রিবাহী পরিবহণ চলাচল করেনি। তবে সকালে ঢাকা থেকে কিছু পরিবহণ সাতক্ষীরায় এসে পৌছায়। বিআরটিসির খুলনাগামী থেমে থেমে কিছু বাস চলাচল করছে। সাতক্ষীরার প্রায় সব রুটে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করছে। তবে তার পরিমাণ বেশ কম। পরিবহণ ধর্মঘটের কারণে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সোমবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই ধর্মঘটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। তারা অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে নছিমন, করিমন ও ইজিবাইক যোগে গন্তব্যস্থলে পৌছানোর চেষ্টা করছেন। এদিকে হঠ্যাৎ করেই সাতক্ষীরার সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় হাজার হাজার যাত্রী দুর্ভোগে পড়েছেন।

পাবনা : মঙ্গলবার সকাল থেকে পাবনায় বাস চালক-শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হয়েছে। এতে করে পাবনা থেকে অভ্যন্তরীণ ও দূরপালস্না রুটে বাস চলাচল আংশিক বন্ধ রয়েছে। মঙ্গলবার বেলা ১০টায় পাবনা কবি বন্দে আলী মিয়া কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কর্মবিরতি উপেক্ষা করে চালক-শ্রমিকদের একটি অংশ বাস চালাচ্ছেন। কিছু বাস ঢাকাসহ বিভিন্ন রুটে ছেড়ে যেতে দেখা যায়। এদিকে, আংশিক বাস চলাচল বন্ধ থাকায় ঢাকাসহ দূরপালস্নার যাত্রীরা কিছুটা দুর্ভোগে পড়েছেন। জরুরি প্রয়োজনে কর্মস্থলে ফিরছেন অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে।

চুয়াডাঙ্গা: নতুন সড়ক আইন সংশোধনের দাবিতে চুয়াডাঙ্গায় দ্বিতীয় দিনের মতো বাস ধর্মঘট চলেছে। মঙ্গলবার চুয়াডাঙ্গা থেকে দূরপালস্না ও আন্তঃজেলা রুটে সব ধরনের যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। গন্তব্যস্থলে যেতে হচ্ছে ইজিবাইক ও শ্যালোচালিত যানবাহনে। এই সুযোগে এসব যানবাহনে ভাড়া দ্বিগুণ নিচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। এদিকে, নতুন সড়ক আইনকে অযৌক্তিক বলে দাবি করছেন গাড়ির চালকরা। দ্রম্নত আইন সংশোধনের দাবিও তাদের।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ : নতুন সড়ক পরিবহণ আইনের বিরোধিতা করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন শ্রমিকরা। এর ফলে মঙ্গলবার সকাল থেকে আন্তঃজেলা ও উপজেলা রুটে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। তবে ট্রাক চলাচল করছে স্বাভাবিকভাবেই। সোমবার কোনো কোনো রুটে চলাচল করলেও, মঙ্গলবার পুরোপুরি বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। শ্রমিকদের অঘোষিত কর্মবিরতির কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-নওগাঁসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের অভ্যন্তরীণ সব রুটেই বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে দূরপালস্নার বাস।

ঝিনাইদহ: ঝিনাইদহে দ্বিতীয় দিনের মতো বাস ধর্মঘট হয়েছে। মঙ্গলবার জেলার অভ্যন্তরীনণ ও দূরপালস্নার সকল রুটে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। সোমবার ধর্মঘটের প্রথম দিন জেলা থেকে দূরপালস্নার বাস চললেও মঙ্গলবার সকাল থেকে তা বন্ধ করে দেয় শ্রমিকরা। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। অনেকেই তাদের গন্তব্যে যাওয়ার জন্য ঝিনাইদহ জেলা উপজেলা বিভিন্ন টার্মিনালে আসলেও বাস না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ছেন, অনেককে মালপত্র নিয়ে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। নতুন সড়ক পরিবহণ আইন কার্যকরের প্রতিবাদে সোমবার সকাল থেকে তারা এ ধর্মঘট শুরু করেন।

মেহেরপুর: নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়ন হওয়ায় আইন সংশোধনের দাবিতে মেহেরপুর দ্বিতীয় দিনের মতো সকল রুটে বাস চলাচল বন্ধ অব্যাহত আছে। সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কোনো ধরনের ঘোষণা ছাড়া চালকরা গাড়ি চালনা বন্ধ করে দেন। হঠাৎ করে বাস বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। সকালে যাত্রীরা বাস টার্মিনালগুলোতে এসে বাস না পেয়ে বিভিন্ন অবৈধ যানবাহনে করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের গন্তব্যে যাচ্ছেন। মেহেরপুর জেলা বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান জানান, বর্তমানে যে নতুন আইন তৈরি হয়েছে তাতে করে চালকরা আর গাড়ি চালাতে চাচ্ছেন না।

নওগাঁ: নওগাঁয় অভ্যন্তরীণ সকল রুটে গত দুই ধরে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিকল্প হিসেবে জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীরা সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। নতুন সড়ক পরিবহণ আইন সংশোধনের দাবিতে জেলার বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে জেলার ১১টি উপজেলার সকল রুটের বাস চলাচল বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। ভোগান্তি নিরসনে দ্রম্নত প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেছেন সচেতনরা। ধর্মঘটের কারণে অভ্যন্তরীণ সকল রুটসহ নওগাঁ-রাজশাহী ও নওগাঁ-বগুড়া রুটে গত দুই দিন ধরে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে অফিস, অদালত, ব্যাংক, স্কুল, কলেজসহ বিভিন্ন স্থানে আসা-যাওয়া মানুষদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। এদিকে নওগাঁর ধামইরহাটে নতুন সড়ক পরিবহণ আইনের প্রতিবাদে বাস শ্রমিকরা সকল রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই পরিবহণ ধর্মঘটের কারণে যাত্রীরা বেকায়দায় পড়েছেন। বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে পিইসি পরীক্ষার্থীদের। মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত ছাড়াই শ্রমিকরা নিজ উদ্যোগে এ কর্মবিরতি পালন করছেন।

খুলনায় আজ থেকে

বাস চলবে

এদিকে খুলনা নগরের সোনাডাঙ্গার আন্তজেলা বাস টার্মিনাল থেকে আজ সব সড়কপথে বাস ছাড়বে। প্রশাসনের অনুরোধে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাসচালকরা।

খুলনা সার্কিট হাউস মিলনায়তনে মঙ্গলবার সকাল থেকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে জেলা প্রশাসন। বৈঠকে ২১ ও ২২ নভেম্বর নতুন নীতিমালা কিছুটা শিথিল করার আশ্বাস দিলে চালক ও মালিকরা বাস চালু করার সিদ্ধান্ত নেন।

কয়েকজন শ্রমিকনেতা জানান, ২১ ও ২২ নভেম্বর ঢাকায় জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের বৈঠক হবে। ওই বৈঠক পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ সড়কপথে গাড়ি চালানোর অনুরোধ করেছেন জেলা প্রশাসক। এর পরিপ্রেক্ষিতে গাড়ি চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শ্রমিকেরা।

খুলনা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, নতুন সড়ক আইনের কিছু ধারায় মালিক ও চালকদের কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এ কারণে চালক ও মালিকেরা ভয়ে গাড়ি বের করছেন না। বৈঠকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগামী কয়েক দিন নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়নে কিছুটা শিথিল করার আশ্বাস দেওয়া হয়। এ কারণে ইউনিয়নের পক্ষ থেকে চালক ও মালিকদের গাড়ি চালানোর অনুরোধ করা হচ্ছে। যেহেতু সিদ্ধান্ত নিতে নিতে দুপুর হয়ে গেছে, তাই মঙ্গলবার আর নয়, বুধবার থেকে চালকরা গাড়ি চালাবেন বলে জানিয়েছেন।

জাকির হোসেন বলেন, খুলনায় গাড়ি চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সমস্যা হলো অন্যান্য জেলার শ্রমিকদের নিয়ে। খুলনা থেকে অন্যান্য রুটে বাস গেলেই সেখানকার শ্রমিকেরা তা আটকে দেন। এরপরও আগামীকাল থেকে অন্তত অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চলবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেলা পুলিশ সুপার এস এম শফিউলস্নাহ, খুলনা আঞ্চলিক শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন, খুলনা মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. নুরুল ইসলাম প্রমুখ।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে