logo
বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  অনলাইন ডেস্ক    ২০ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

পরিবহণ ফাঁদে চরম বিপাকে সরকার

গণপরিবহণ মালিক-শ্রমিকরা যেভাবে কঠোর আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এতে সারাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে, জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছবে

সাখাওয়াত হোসেন

নতুন সড়ক আইন তারা সবাই মেনে নিয়েছে- গণপরিবহণ মালিক-শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের এমন ভুয়া আশ্বাসে আস্থা রেখে কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই তা বাস্তবায়নে মাঠে নেমে চরম বিপাকে পড়েছে সরকার। সোমবার দক্ষিণ-পশ্চিমের ১০ জেলায় বাস চলাচল বন্ধ রাখার মাত্র একদিনের মাথায় এবার সারাদেশে ট্রাক ও কভার্ডভ্যান চলাচল বন্ধের ঘোষণা এসেছে। এতে পণ্য পরিবহণ ব্যবস্থায় অচলাবস্থা সৃষ্টির পাশাপাশি সাধারণ জীবনযাত্রায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে।

প্রশাসনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, পরিবহণ মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে সরকার এখন উভয় সংকটে পড়েছে। সড়ক আইন বাস্তবায়নে সরকার কঠোর অবস্থানের কথা জানান দিয়ে সেখান থেকে পিছু হটলে পরবর্তীতে তা কার্যকরে নতুন করে মাঠে নামা প্রশাসনের পক্ষে ভীষণ কঠিন হবে। অথচ এ ব্যাপারে সরকার কঠোর ভূমিকা পালন করলে পণ্য পরিবহণ সংকটে নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন লাগবে। যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে নানা প্রতিকূল পথ পাড়ি দিতে হবে। অন্যদিকে গণপরিবহণ মালিক-শ্রমিকরা যেভাবে কঠোর আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এতে সারাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়বে; জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছবে। আর এসব সংকটের নেতিবাচক প্রভাব সরকারের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতেও পড়বে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর নিজেদের গা বাঁচাতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা তাদের নিজ নিজ এলাকার সড়কের ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করেছেন। এতে কয়েক লাখ হকার বেকার জীবনযাপন করছে। এর ওপর নতুন সড়ক আইন কার্যকর করা হলে লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ হাজার হাজার পরিবহণ শ্রমিককে বাধ্য হয়ে এই পেশা থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। সব মিলিয়ে ঢাকার রাস্তায় নিম্নবিত্তের বেকারের সংখ্যা দেড় থেকে দুই লাখ ছাড়িয়ে যাবে। যারা নানাভাবে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করার ফন্দি আঁটবে। এ সময় পরিবহণ ধর্মঘট শুরু হলে নানা ধরনের নৈরাজ্যে ওই বেকারগোষ্ঠীর অনেকেই স্বেচ্ছায় যোগ দেবে। যা সারাদেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে বলে মনে করেন তারা।

তাদের এই আশঙ্কা যে একেবারে অমূলক নয়, তা নিম্ন আয়ের বেকার একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। মালিবাগ-সিদ্ধেশ্বরী সড়কের ফুটপাতের হকার কাশেম মিয়া, জুলহাশ, এনামুল ও নাদের আলী জানান, চাল-পেঁয়াজ-সবজি ও মাছ-মাংসসহ অধিকাংশ খাদ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বমূল্যের বাজারে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকায় টিকে থাকা এমনিতেই কষ্টকর। এর ওপর প্রায় মাসখানেক ধরে তারা ফুটপাতে ঠিকমতো দোকান বসাতে পারছেন না। এতে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এ সময় ট্রাকসহ সব ধরনের পণ্য পরিবহণব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলে জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হবে। এতে তাদের না খেয়ে মরতে হবে। তাই তারা এখনি বড় ধরনের কোনো 'ধাক্কা' মনে-প্রাণে কামনা করছে। গণপরিবহণ নিয়ে দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাদের মতো আকস্মিক বেকার হয়ে পড়া লাখ লাখ মানুষ এতে অংশ নেবে বলে মনে করেন তারা।

এদিকে ট্রাক ও কভার্ডভ্যান শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি অভিসন্ধির বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তারা জানান, নগর সার্ভিস ও দূরপালস্নার বাস-মিনিবাসসহ সড়কপথের অন্যান্য যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও গণপরিবহণের যাত্রীরা বিকল্প হিসেবে রেলপথ কিংবা নৌপথ বেছে নেবে। এতে দুর্ভোগ কিছুটা বাড়লেও যোগাযোগব্যবস্থা টিকে থাকবে। ফলে নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়নে সরকারের কঠোর অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়বে। তবে পণ্য পরিবহণ বন্ধ হয়ে গেলে বাজারে নিত্যপণ্যের দর স্বাভাবিক রাখা সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। তাই পরিবহণ আন্দোলনে তড়িঘড়ি করে ট্রাক ও কভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিকদের যুক্ত করা হয়েছে।

তবে ট্রাক মালিকদের একাধিক সূত্র জানায়, এ বিষয়ে তাদের আন্দোলন পরিকল্পনা আগেই চূড়ান্ত করে রাখলেও এতদিন তারা সরকারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। তবে সোমবার আইনটি কার্যকর শুরুর পর সড়ক পরিবহণমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কোনো চাপে এর থেকে পিছু না হটার ঘোষণা দেয়ায় তারা তাদের ছক বাস্তবায়নে ট্রাক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। যদিও ট্রাক ও কভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিকদের একটি অংশ মঙ্গলবার ৮ দফা দাবি তুলে তা মেনে নেয়ার আশ্বাসের ভিত্তিতে এই আন্দোলনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

পরিবহণ খাতের পর্যবেক্ষকরা জানান, বিশেষ ফন্দি এঁটেই বাস ও ট্রাক মালিক-শ্রমিকদের ভিন্ন সংগঠন ভিন্ন কর্মসূচি দিচ্ছে। তবে তাদের লক্ষ্য অভিন্ন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একপক্ষ গাড়ি চালানোর সিদ্ধান্ত দিলেও অপরপক্ষ তা মেনে না নিলে প্রকারান্তে আরও জটিল অবস্থার সৃষ্টি হবে। এতে সরকার পরিবহণ খাতের নৈরাজ্যে আরও গভীরভাবে আটকে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন পরিবহণ খাত পর্যবেক্ষকরা।

তাদের এই আশঙ্কা যে অনেকাংশে বাস্তবে রূপ নেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তা রাজধানীর গণপরিবহণ চলাচলের চিত্র খোলা চোখে পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট ধরা পড়ে। সোমবারের মতো মঙ্গলবারও রাজধানীতে বাস-মিনিবাসসহ অন্যান্য গণপরিবহণ চলাচল বেশ কম। বিভিন্ন রাস্তার পাশে ভোর থেকে বিপুলসংখ্যক গণপরিবহণ অচল অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ বাস না পেয়ে গণপরিবহণ যাত্রীরা দিনভর নানা দুর্ভোগ পোহায়।

মোহাম্মদপুর থেকে উত্তরাগামী আর্ক পরিবহনের শ্রমিক এবাদুল হক জানান, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে জনদুর্ভোগ বাড়ানোর জন্যই তারা বেশকিছু বাস রাস্তায় নামাননি। এ ছাড়া চালকরাও অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়ি চালানো বন্ধ রেখেছে।

এদিকে ট্রাক মালিক-শ্রমিকরা বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ায় মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকেই বিভিন্ন পণ্যের দরে এর প্রভাব পড়েছে। কাওরানবাজারের একাধিক নিত্যপণ্যের আড়তদার তা স্বীকার করেছেন।

আলী হোসেন নামের এক আড়তদার জানান, ট্রাক মালিকদের ধর্মঘটে নামার খবর কাওরানবাজারে ছড়িয়ে পড়ার পর কাঁচামালের পাইকাররা অনেকেই তাদের পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দেন। বিশেষ করে যেসব পণ্য আরও এক-দুইদিনে পচন ধরবে না; এ ধরনের মালামাল প্রায় বেশিরভাগ পাইকারই বিক্রি করেননি। তাদের আশা, বুধবার থেকে ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকলে তা অনেক চড়া মূল্যে বিক্রি করা যাবে। এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার দুপুরের পর বেশকিছু কাঁচামালের দাম বেড়েছে বলে জানান আলী হোসেন।

এদিকে গণপরিবহণে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকার বড় ধরনের ফাঁদে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তাদের ধারণা, এ নিয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তা উসকে দিয়ে বিশেষ ফায়দা লুটার চেষ্টা করবে। বিশেষ করে পণ্য পরিবহণ সংকটে নিত্যপণ্যের মূল্য আরও চড়া হলে তারা এ ঘটনাকে পুঁজি করে আন্দোলনে মাঠ উত্তপ্ত করার সুযোগ পাবে। ষড়যন্ত্রকারী চক্রও এই ইসু্যতে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালাবে বলে মনে করেন তারা।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে