logo
রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬

  আহমেদ তোফায়েল   ০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

পুরানো গাড়ি আমদানি ও বিক্রিতে ব্যাপক ধস

বাজেটের পর বিক্রি কমেছে ৫০ শতাংশ বড় ধরনের শুল্ক বৈষম্য, অবচয় সুবিধার সমস্যা, জাপানি মুদ্রা ইয়েনের দামের তারতম্য ও ব্যাংক ঋণের অভাব ক্যাসিনোসহ চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রভাব কালো টাকার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কম দামে গাড়ি বিক্রির অভিযোগ দুদক আতঙ্কে আছেন অনেক গ্রাহক

পুরানো গাড়ি আমদানি ও বিক্রিতে ব্যাপক ধস
ছবিটি মোংলা বন্দর থেকে তোলা -ফাইল ছবি
দেশে রিকন্ডিশন্ড বা পুরনো গাড়ি বিক্রি ও আমদানিতে ব্যাপক ধস নেমেছে। ক্যাসিনোসহ চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, বড় ধরনের শুল্ক বৈষম্য, পুরনো গাড়ির অবচয় হার কমানো, নিম্নমানের গাড়ি আমদানি, ব্যাংক ঋণের অভাব, দুদক আতঙ্ক ও কালো টাকার অবাধ বিনিয়োগের কারণে অসম প্রতিযোগিতার মুখে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসা সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ চলিস্নশ বছরে গড়ে ওঠা এ ব্যবসা এখন অলাভজনক বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ছিটকে পড়ছেন অনেক আমদানিকারক ও উদ্যোক্তা। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গাড়ি আমদানি কমে যাওয়ায় ব্যাপক প্রভাব পড়ছে সরকারের রাজস্ব আদায়ের ওপর।

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) তথ্যানুযায়ী, আগে যেখানে মাসে গড়ে প্রায় ২ হাজার গাড়ি বিক্রি হতো সেখানে এখন নেমে এসেছে এক হাজার থেকে ১২শ গাড়িতে। আর গাড়ি আমদানি এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ৪৬ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশব্যাপী ক্যাসিনো ব্যবসায়ী ও কালো টাকার মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর রিকন্ডিশন্ড বা পুরনো গাড়ি বিক্রিতে ব্যাপক ধস নেমেছে। আবার কারও মতে, গাড়ি ব্যবসায় কালো টাকা সাদা করতে এসে কোনো কোনো বিনিয়োগকারী বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছেন। কালো টাকা সাদা করার জন্যও এ ব্যবসায় কেউ কেউ বিনিয়োগ করেছেন। তারা বেশি গাড়ি আমদানি করে বাজার অস্থিতিশীল করে তুলেছেন। এসব ব্যবসায়ী কম দামে গাড়ি বিক্রি করছেন। তবে লোকসানের কারণে সে পথে হাঁটতে পারছেন না নিয়মিত ব্যবসায়ীরা। ফলে তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ব্যবসা থেকে ছিটকে পড়ছেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, জাপানে গাড়ির দাম সামান্য কমলেও ডলারের বিপরীতে টাকা দুর্বল ও ইয়েন শক্তিশালী হওয়ায় সে সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। আবার ৫ বছরের পুরনো গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরে অবচয়ের হার ৪৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে। এ কারণে গাড়িপ্রতি ১ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত শুল্ক বেশি দিতে হচ্ছে। এ দুই কারণে গাড়ির দাম বেশি পড়ছে। যার প্রভাব পড়ছে বিক্রিতেও।

জানতে চাইলে বারভিডা প্রেসিডেন্ট আবদুল হক যায়যায়দিনকে বলেন, রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হলে সুনির্দিষ্ট শুল্ক হার নির্ধারণ করতে হবে। ইয়েলো বুকে প্রদর্শিত বর্তমান বাজার মূল্যের ভিত্তিতে শুল্কায়ন, অথবা নতুন গাড়ির অনুরূপ আমদানিকারকের ইনভয়েসে ঘোষিত মূল্যের ভিত্তিতে শুল্কায়ন করতে হবে। এছাড়া আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণের জন্য আমদানিকারকদের চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশের ব্যবস্থা করা এবং বন্দরে মজুদকৃত গাড়িগুলো রাখার জন্য আধুনিক অফ ডক প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের মফস্বলের স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে উন্নতমানের জাপানি গাড়ি আমদানিতে ১০০০ সিসি এবং তার নিচের ইঞ্জিন বিশিষ্ট গাড়ির জন্য শুল্কের হার কমাতে হবে।

চট্টগ্রামের গাড়ির আমদানিকারক মোহাম্মদ নবীর হোসেন বলেন, বাজারে গাড়ির দাম আগের মতোই আছে। ডলার শক্তিশালী হওয়ার কারণে গাড়ির আমদানি মূল্য বেশি গুনতে হচ্ছে তাদের। প্রতিযোগিতামূলক বাজারের কারণে অল্প লাভেই গাড়ি বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। এরপরও গাড়ি বিক্রি কমে গেছে আগের তুলনায়। তাই তাদের আমদানিও কমে গেছে।

বারভিডা সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দিয়ে গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছে ২৩ হাজার ২৮৯টি। এর আগের অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ৩২ হাজার ৮২০টি গাড়ি। অর্থাৎ এক বছরেই রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি কমেছে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার, যা মোট রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানির প্রায় ২৯ শতাংশ।

আবদুল হক বলেন, রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ব্যবসা থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রতিবছর প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করছে। দেশের চট্টগ্রাম বন্দর ও মোংলা বন্দর ব্যবহার হচ্ছে গাড়ি আমদানিতে। অব্যবহৃত মোংলা বন্দর চালুকরণে ভূমিকা রেখেছেন রিকন্ডিশন্ড গাড়ির আমদানিকারক-উদ্যোক্তারা। এ খাতের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বড় ধরনের শুল্ক বৈষম্য, পুরনো গাড়ির অবচয় হার কমানো, ব্যাংক ঋণ না পাওয়াসহ নিম্নমানের গাড়ি আমদানি ও অসম প্রতিযোগিতার মুখে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসা দিন দিন সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। শুল্ক বৈষম্যসহ বিভিন্ন কারণে গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি কমে গেছে।

ব্যাংকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারল্য সঙ্কটের কারণে ব্যাংকগুলো সীমিত আকারে গাড়ি ঋণ দিচ্ছে। আবার কোনো কোনো ব্যাংক একেবারে বন্ধ রেখেছে। গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে সুদের হার তিন বছর আগেও ছিল দশ শতাংশেরও কম। এখন চাকরিজীবীদের জন্য ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ আর ব্যবসায়ীদের জন্য ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে গাড়ি ঋণ দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে, গ্রাহকরা গাড়ির দামের প্রায় ৫০ শতাংশ ঋণ নিতে পারেন। তবে এটি ৮০ শতাংশ হওয়া উচিত বলে মনে করেন গাড়ি ব্যবসায়ীরা।

এদিকে, চলতি অর্থবছরের বাজেটে আগের তুলনায় পরে ৫ মাসে গাড়ি বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশে নেমেছে। বারভিডার সাবেক মহাসচিব হাবিবুর রহমান বলেন, দুর্নীতির অভিযানের কারণে বিলাসবহুল গাড়ি কেনা থেকে পিছিয়ে গেছেন অনেকে। এটা হয়েছে বিশেষ গত ৫ মাস। ৫ মাসে গাড়ি বিক্রির ব্যবসা খুবই খারাপ।

বারভিডার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম আনোয়ার সাদাত বলেন, কিছু নতুন ব্যবসায়ী বুঝে না বুঝে এই ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে। রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ব্যবসায় একটা অসম প্রতিযোগিতা বিরাজ করায় তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসে গাড়ি আমদানির কাজে নিয়োজিত সিএন্ডএফ এজেন্ট শাহরিয়ার শিপিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ বাহার উদ্দিন বলেন, বিগত বছরে তারা প্রায় অর্ধসহস্রাধিক গাড়ি ছাড় করানোর কাজ করেছেন। কিন্তু পর্যায়ক্রমে তা কমে গেছে। এখন গাড়ির কাজ তেমন নেই বললেই চলে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গাড়ি আমদানি কমেছে, তাই রাজস্ব আদায়ের হারও কমেছে। অনেক ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম দিয়ে গাড়ি আমদানি করছেন না। তারা মোংলা বা অন্য বন্দর দিয়ে গাড়ি রিলিজ করাচ্ছেন। এটিও রাজস্ব আদায় কমার আরেকটি কারণ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশব্যাপী ক্যাসিনো ব্যবসায়ী ও কালো টাকার মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর রিকন্ডিশন্ড বা পুরনো গাড়ি বিক্রিতে ব্যাপক ধস নেমেছে। আগে মাসে গড়ে প্রায় ২ হাজার গাড়ি বিক্রি হতো। বর্তমানে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে ক্যাসিনোসহ চলমান দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের ফলে বিলাসবহুল গাড়ি কেনা থেকে পিছিয়ে গেছেন বিত্তশালীরা। অন্যদিকে কালো টাকা সাদা করতে কোনো কোনো বিনিয়োগকারী গাড়ি আমদানিতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ করেছেন। দুইয়ে মিলে এই ব্যবসায় এখন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

জানা গেছে, চলতি বছর জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বন্দর হয়ে দেশে প্রায় ২৬শ রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি হয়েছিল। কিন্তু নভেম্বরে মাসে তা ৫শ'তে নেমে এসেছে। ব্যবসায়ীদের মতে, যারা দামি গাড়ি কেনেন তাদের অনেকেই কালো টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তাই গাড়ি কেনার মতো সৌখিন কাজে মনোনিবেশ করছেন না। অনেকেই আবার দুদকের নজর এড়াতেও গাড়ি কেনা থেকে বিরত থাকছেন।

রাজধানীর একজন গাড়ি আমদানিকারক জানান, হঠাৎ করেই কিছু লোক, না বুঝে এই ব্যবসায় বিনিয়োগ শুরু করেছে। ফলে গাড়ির ব্যবসায় একটা অসম প্রতিযোগিতা বিরাজ করছে।

এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গাড়ি আমদানি কমে যাওয়ায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে সরকারের রাজস্ব আদায়ের ওপর। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গাড়ি আমদানির বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে এক হাজার ৮১৫ দশমিক ৬৫ কোটি টাকা। এর আগের বছর ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে গাড়ি আমদানির বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছিল এক হাজার ৯৫৭ দশমিক ৬৪ কোটি টাকা। এদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরের শুরুতে গাড়ি আমদানির বিপরীতে রাজস্ব আদায় নিম্নমুখী।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের তথ্য মতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট ১২ হাজার ৬২টি গাড়ি আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ব্রান্ড নিউ হাইব্রিড দুই হাজার ৯১০, রিকন্ডিশন্ড হাইব্রিড ৮৪, ব্রান্ড নিউ নন হাইব্রিড এক হাজার ৮৯৯, রিকন্ডিশন্ড নন হাইব্রিড সাত হাজার ১৬৯টি। এসব গাড়ি আমদানির বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে এক হাজার ৮১৫ দশমিক ৬৫ কোটি টাকা।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে