logo
মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৬ ফাল্গুন ১৪২৬

  যাযাদি ডেস্ক   ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০  

এক দিনে ২৪২ জনের মৃতু্য

এমন প্রাণঘাতী দিন চীন আগে দেখেনি

এমন প্রাণঘাতী দিন আগে দেখিনি চীন। নতুন করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল চীনের হুবেই প্রদেশে এক দিনেই মৃতু্য হলো রেকর্ড ২৪২ জনের।

কেবল মৃতু্য নয়, রোগ নির্ণয় পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার পর বুধবার কেবল হুবেই প্রদেশেই ১৪ হাজার ৮৪০ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

রয়টার্স লিখেছে, গত ডিসেম্বরের শেষ দিন প্রথমবারের মতো নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর এক দিনে এত মৃতু্য এবং এত নতুন সংক্রমণের তথ্য আর আসেনি।

সব মিলিয়ে বুধবার চীনে মোট ২৫৪ জনের মৃতু্য হয়েছে। তাতে নতুন এ করোনাভাইরাসে মৃতু্যর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৬৯ জনে। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৬০ হাজার।

গত কয়েক দিন হুবেই প্রদেশে নতুন রোগীর সংখ্যা কমতে থাকায় আশাবাদী হয়ে উঠতে শুরু করেছিলেন চীনা চিকিৎসকরা। চীনে নতুন করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকা সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ জয় নানশান বলেছিলেন, এ করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চলতি মাসেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে এবং এপ্রিলের দিকে বিপদ পুরোপুরি কেটে যাবে বলে তিনি আশা করছেন।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, নতুন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শেষ হয়ে আসছে- এমন কথা বলার সময় এখনো আসেনি। এখনো পরিস্থিতি যে কোনো দিকে যেতে পারে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রাথমিক উপসর্গ হয় ফ্লু বা নিউমোনিয়ার মতো। কিন্তু বয়স্ক এবং অন্য অসুস্থতা থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ সংক্রামক রোগ হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী। এর কোনো প্রতিষেধকও মানুষের জানা নেই।

আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে যেসব উপসর্গ দেখা দেয়, সাধারণভাবে সেগুলো সারানোর জন্যই চিকিৎসা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। অবস্থা গুরুতর হলে নেওয়া হচ্ছে বিশেষ ব্যবস্থা।

বিভিন্ন দেশে মানুষ থেকে মানুষে নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার খবর আসতে

থাকায় গত ৩০ জানুয়ারি এ ভাইরাস নিয়ে বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা জারি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এ করোনাভাইরাসকে এত দিন নভেল বা নতুন করোনাভাইরাস বা সংক্ষেপে ২০১৯-এনসিওভি বলা হচ্ছিল। এ ভাইরাস যে রোগ সৃষ্টি করছে তার নতুন নাম দেওয়া হয়েছে কভিড-১৯ (করোনাভাইরাস ডিজিজ)।

উহানফেরত ৩১২ জন বাড়ি ফিরবেন কাল: এদিকে নতুন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর চীনের অবরুদ্ধ নগরী উহান থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা ৩১২ বাংলাদেশি দুই সপ্তাহের পর্যবেক্ষণ শেষে শনিবার বাড়ি ফিরতে পারবেন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. জাহিদ মালেক।

বৃহস্পতিবার ঢাকার বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, 'আগামীকাল চীন থেকে ফেরা এই বাংলাদেশিরা "কোয়ারেন্টিনের শেষ পর্যায়ে" আছেন। আজ ১৪ ফেব্রম্নয়ারি তাদের পর্যবেক্ষণের ১৪ দিন পূর্ণ হবে। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ১৫ তারিখ আমরা তাদের ছেড়ে দেব। এখানে আর কোনো সমস্যা নেই। তারা সবাই ভালো আছেন।'

গত বছরের শেষ দিন চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে নতুন ধরনের করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে। সংক্রমণের সংখ্যা এবং প্রাণহানি বাড়তে থাকায় একপর্যায়ে উহানসহ হুবেই প্রদেশের একটি বড় অংশে চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে চীন সরকার। ফলে উহানের ১ কোটি ১০ লাখ বাসিন্দার সঙ্গে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া ও গবেষণায় থাকা কয়েকশ বাংলাদেশিও কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে পড়েন।

চীন থেকে বিভিন্ন দেশে ভাইরাস ছড়াতে থাকায় এ ভাইরাস নিয়ে বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা জারি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের উহান থেকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেয়।

এরপর ১ ফেব্রম্নয়ারি একটি বিশেষ বিমানে করে দেশে ফেরেন ৩১২ জন বাংলাদেশির প্রথম দলটি। আটজনের শরীরে জ্বর থাকায় তাদের ঢাকার দুটি হাসপাতালে রেখে বাকিদের আশকোনা হজক্যাম্পে ১৪ দিনের পর্যবেক্ষণে পাঠানো হয়।

তাদের মধ্যে ৩০১ জন এখন আশকোনা হজক্যাম্পে আছেন, বাকি ১১ জন আছেন ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। কারও মধ্যেই করোনাভাইরাসের কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি বলে জানিয়ে আসছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট- আইইডিসিআর।

করোনাভাইরাস নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে জানিয়ে তা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রমাণ হওয়ার আগে এ ধরনের কথা ছড়ানো ঠিক নয়।

গুজব প্রতিরোধে গণমাধ্যমকর্মীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, 'আমরা দু-একটি ঘটনা শুনছি। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি। রংপুরে একজন ভর্তি হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় নানা অসুখবিসুখ নিয়ে লোকজন ভর্তি হয়। আমাদের কখনোই মনে করা উচিত না তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। যে পর্যন্ত প্রমাণ না হয় তার আগ পর্যন্ত তাকে যেন এটা আমরা না বলি। এ ধরনের কথা বললে আতঙ্ক ছড়ায়।'

ফুলবাড়ীতে একজন হাসপাতালে: আমাদের ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে দেখা দিয়েছে করোনা ভাইরাস আতঙ্ক। গত দুই সপ্তাহে চীন থেকে আসা তিন জন শিক্ষার্থীর মধ্যে তৌকির হোসেন (২৪) নামে একজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

গত বুধবার তাকে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে ভর্তি তৌকির ইসলাম ফুলবাড়ী পৌর এলাকার উত্তর সুজাপুর গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে। তৌকির ইসলাম ৮ ফেব্রম্নয়ারি চিন থেকে এসেছে।

তৌকিরের মা আক্তারী বেগম পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের একজন কর্মী। তিনি যায়যায়দিনকে বলেন, তৌকির ইসলাম ৮ ফেব্রম্নয়ারি চিন থেকে দেশে আসার পর ১১ ফেব্রম্নয়ারি তার স্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তবে এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের জীবাণু তার শরীরে দেখা যায়নি। তৌকিরের মা আক্তারী বেগম দাবি করেন, তার ছেলে তৌকির অনেক আগে থেকে শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছে। প্রতি বছর শীতকালে তার এই শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।

সীতাকুন্ডে নতুন ইউনিট: সীতাকুন্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেস্নক্সে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে সাত শয্যার একটি আলাদা নতুন ইউনিট খোলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. নুর উদ্দিন। এর আগে সীতাকুন্ডের বিশেষায়িত হাসপাতাল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রফিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিজেজ (বিআইটিআইডি)-এ করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য ১০ শয্যার একটি আলাদা ইউনিট খোলা হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. নুর উদ্দিন বলেন, গত সপ্তাহে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে একটি ইউনিট খোলার নির্দেশনা পান তিনি। সেই নির্দেশনা অনুসারে তিনি আলাদা (আইসোলেটেড) একটি কক্ষকে প্রস্তুত করে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ইউনিট খোলেন। সেখানে সাতটি ?শয্যা তৈরি করে রাখা হয়েছে। এটি তদারক করছেন জেলা সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বী।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে