logo
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

  যাযাদি ডেস্ক   ০৪ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০  

৬ জনের মৃতু্য, বিভিন্ন এলাকা লকডাউন

৬ জনের মৃতু্য, বিভিন্ন এলাকা লকডাউন
নারায়ণগঞ্জ বন্দর উপজেলার নবীগঞ্জ রসূলবাগ এলাকায় এক নারী করোনাভাইরাসে মারা যাওবার পর বৃহস্পতিবার রাতে এলাকা লকডাউন করে উপজেলা প্রশাসন -স্টার মেইল
দেশের বিভিন্ন জেলায় বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত জ্বর, সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে পাঁচজনের মৃতু্য হয়েছে। করোনাভাইরাসে তাদের মৃতু্য হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত হতে তাদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) পাঠানো হয়েছে। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বাড়ি ও এলাকা লকডাউন করে পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের হোম কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:

নারায়ণগঞ্জ : করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় এক নারীর মৃতু্য হয়েছে। পরে এ ঘটনায় উপজেলার ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের রসুলবাগ এলাকা লকডাউন করা হয়েছে।

বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, 'সম্প্রতি ৪৫ বছর বয়সি এক নারী অসুস্থ হন। পরে তাকে রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে গত ৩০ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। সেদিনই তাকে দাফন করা হয়। পরে তার শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। বৃহস্পতিবার রিপোর্ট আসে তিনি করোনা পজিটিভ ছিলেন।'

বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শুক্লা সরকারও ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, 'ঘটনা জানার পর রাতেই প্রশাসন ও পুলিশ সেখানে উপস্থিত হন। রাতেই বন্দরের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের রসুলবাগ এলাকার জামাল সোপ কারখানা থেকে রসুলবাগ মোড় পর্যন্ত সড়কটি লক ডাউন করে দেওয়া হয়েছে। ফলে এ সড়কের দুই পাশে সবকিছু বন্ধ থাকবে। কোনো লোকজন বাড়ি থেকে বের হতে পারবে না। সেখানে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।'

শুক্রবার ওই নারীর পরিবার ও আশপাশের লোকজনের নমুনা সংগ্রহ করা হবে বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ইমতিয়াজ আহমেদ।

মেহেরপুর: শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে শ্বাসকষ্টে এক ব্যক্তির (৩৫) মৃতু্য হয়েছে। এ ঘটনায় মেহেরপুর সদর উপজেলার কোলা গ্রামে ওই বাড়িটি লকডাউন করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসন।

বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃতু্য হয় ওই ব্যক্তির। পরে তার শ্বশুরবাড়ি লকডাউন করে স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসন।

মেহেরপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অলোক কুমার দাস বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, 'শ্বাসকষ্টে ওই ব্যক্তির মৃতু্য হয়। তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন কিনা সন্দেহে তার শ্বশুরবাড়ি লকডাউন করা হয়েছে।'

মৃতের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে বলেও জানান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা।

পুলিশ জানিয়েছে, শ্বাসকষ্টে মৃত ব্যক্তি নৌবাহিনীতে চাকরি করতেন। বগুড়া থেকে পরিবারসহ ছুটি কাটাতে কয়েক দিন আগে মেহেরপুরের কোলা গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে এসেছিলেন। সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে বুধবার তাকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তার মৃতু্য হয়।

সাতক্ষীরা :সাতক্ষীরায় জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে মারা যাওয়া কলেজছাত্র হোসেন আলীর বাড়িসহ আশপাশের পাঁচটি বাড়ি লকডাউন করেছে প্রশাসন। শুক্রবার দুপুরে সেখানে এই নির্দেশ প্রদান করা হয়।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দেবাশীষ চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, কলেজছাত্র হোসেন আলীর বাড়িসহ পাঁচটি বাড়ি লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ওই পাঁচটি বাড়ির ১৮ জন কেউ বাড়ির বাইরে আসতে পারবেন না। এলাকাবাসীকেও সতর্ক করা হয়েছে বিনা প্রয়োজনে ঘরের বাইরে না আসার জন্য। তিনি সবাইকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নজরদারি বৃদ্ধি করেছেন।

প্রসঙ্গত, সাতক্ষীরার ঝাউডাঙ্গা ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র হোসেন আলী ভোরে নিজ বাড়িতে মৃতু্যবরণ করেন। সে সপ্তাহ ধরে জ্বর ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিল। হোসেনের বাড়ি সদর উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামে।

এদিকে, সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, মৃত হোসেনের নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরে পরীক্ষা করার জন্য প্রেরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রিপোর্ট আসার পর বলা যাবে তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন কিনা।

ভোলা :জ্বর, সর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত হয়ে সাধনা নামের এক শিশুর মৃতু্য হয়েছে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায়। চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার নজরুল নগর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে মারা যাওয়া শিশুর বাড়ির আশপাশে আটটি বাড়ি লকডাউন করা হয়েছে।

শুক্রবার সকাল ৮টায় শিশুটি মারা যায়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ৮ বাড়ি লকডাউন করার নির্দেশ দিয়ে মৃত শিশুর নমুনা পরীক্ষার জন্য সকালে বরিশাল প্রেরণ করার কথা জানান।

দক্ষিণ আইচা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুন অর রশিদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বরাত দিয়ে লকডাউনের নির্দেশের বিষয়টি জানান।

মাগুরা : মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেস্নক্সে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে আইসোলেশনে থাকা এক রোগীর মৃতু্য হয়েছে। শুক্রবার সকাল ৭টায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৮ বছর বয়সি ওই ব্যক্তি মারা যান। এ ঘটনায় মৃতের বাড়িসহ নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীদের বাড়ি লকডাউন ঘোষণা করেছে প্রশাসন।

মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোকসেদুল মোমিন জানান, জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্টসহ নানা উপসর্গ নিয়ে বৃহস্পতিবার ওই ব্যক্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেস্নক্সে ভর্তি হন। তার শারীরিক অবস্থা সন্দেহজনক মনে হলে তাকে স্বাস্থ্য কমপেস্নক্সের আইসলোশনে রাখা হয়। পরে শুক্রবার সকালে তার অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তার মৃতু্য হয়।

মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান বলেন, 'খবরটি জানার পরেই মৃতের বাড়িসহ নিকটআত্মীয় ও প্রতিবেশীদের বাড়ি লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া মৃত ওই ব্যক্তির বাড়িতে লাল পতাকা টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে।'

এ বিষয়ে মাগুরার সিভিল সার্জন প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, 'জ্বর ও শ্বাসকষ্টে ভোগা ওই রোগী মহম্মদপুরে আইসোলেশনে ছিলেন। তিনি করোনায় আক্রান্ত কিনা তা জানার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। রিপোর্ট পেলে বিষয়টি জানা যাবে। '

মাগুরার জেলা প্রশাসক আশরাফুল আলম বলেন, 'মরদেহ এলাকায় এলে সচেতনতার সঙ্গে দাফন সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার বাড়িসহ আশপাশের বাড়ি লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট এলাকা নজরদারিতে আছে। পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ এলে পুরো এলাকা লকডাউনের আওতায় আনা হবে।'

বরিশাল: শ্বাসকষ্টে এক দিনমজুরের মৃতু্য হয়েছে বৃহস্পতিবার রাতে। ফলের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে শুক্রবার সকালে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া ইউনিয়নের উত্তর বিল্বগ্রাম গ্রামের কাগজী কান্দি ও সালেহবাগ নামের দুটি মহলস্নাকে লকডাউন করা হয়েছে।

মাহিলাড়া ইউপি চেয়ারম্যান সৈকত গুহ পিকলু শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে মহলস্না দুটিকে লকডাউন ঘোষণা করেন।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ওই গ্রামের সালেহবাগ মহলস্নার মৃত মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে দিনমজুর মো. হাসান ফকির (৫০) বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় মারা যান। তিনি এক ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। এ মৃতু্যর খবর জানাজানি হলে এলাকায় করোনাভাইরাস আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কিত লোকজন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেস্নক্সে গিয়ে ওই ব্যক্তির মৃতু্যর সঠিক কারণ শনাক্তের দাবি জানায় ও মহলস্নাটিকে লকডাউন করার জন্য মাহিলাড়া ইউপি চেয়ারম্যানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মাহিলাড়া ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, 'স্থানীয় আতঙ্কিত লোকজনের চাপের মুখে শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে আমি ওই গ্রামের দুটি মহলস্নাকে লকডাউন ঘোষণা করেছি। তবে যতটুকু জেনেছি তাতে আমার মনে হচ্ছে ওই ব্যক্তি করোনা সংক্রমণে মারা যায়নি। শুনেছি ছোট বেলা থেকেই সে অ্যাজমাজনিত শ্বাসকষ্টে ভুগছিল। পাশাপাশি সে যক্ষ্ণা রোগেও আক্রান্ত ছিল।'

তিনি আরও বলেন, 'বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহয়তায় সে যক্ষ্ণার চিকিৎসাও করিয়েছে। তার পরও এলাকাবাসী বলে আসছে সম্প্রতি ঢাকা থেকে ওই বাড়িতে বেশ কয়েকজন কর্মজীবী লোক এসেছে। তাদের দ্বারা সে করোনা সংক্রমিত হয়ে মারা যেতে পারে। এ কারণে তার বাড়ি সংলগ্ন কাগজী কান্দি ও সালেহবাগ মহলস্না দুইটিকে লকডাউন করা হয়েছে।'

গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেস্নক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাজেদুল হক কাওছার জানান, করোনার ঘটনাটি স্রেফ গুজব। ওই ব্যক্তি ছোট বেলা থেকেই অ্যাজমাজনিত শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন।

তিনি আরও বলেন, 'আমাদের ধারণা করোনা নয়, অ্যাজমাজনিত শ্বাসকষ্টে তার মৃতু্য হয়েছে। এরপরও এলাকাবাসীর দাবির মুখে আমরা তার মৃতদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে এনেছি। টেস্টের জন্য এখন তা ঢাকায় পাঠানো হবে। ঢাকা থেকে রিপোর্ট পেলে তার মৃতু্যর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।'
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে