logo
মঙ্গলবার ২৫ জুন, ২০১৯, ১১ আষাঢ় ১৪২৬

  অনলাইন ডেস্ক    ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০  

মঙ্গল শোভাযাত্রা

সূতিকাগার যশোর ব্যাপ্তি বিশ্বময়

সূতিকাগার যশোর ব্যাপ্তি বিশ্বময়
নববর্ষ উদযাপনে বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা -ফাইল ছবি
মিলন রহমান, যশোর

মঙ্গল শোভাযাত্রা ছাড়া বাংলা নববর্ষ উৎসব কল্পনা করা যায় না। প্রথম প্রহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। সারাদেশের এই মঙ্গল শোভাযাত্রার সূতিকাগার সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত ঐতিহ্যের শহর যশোরে। আর আজ এই মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিচিতি ছড়িয়ে গেছে বিশ্বময়। ইউনেস্কোও দিয়েছে একে ঐতিহ্যের স্বীকৃতি। প্রতিবছরের মতো এবারও রোববার সকালে মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে নববর্ষকে বরণ করে নেবে যশোর তথা গোটা দেশবাসী।

১৯৮৫ সালে চারুপীঠের উদ্যোগে প্রথম নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়। সময়ের বিবর্তনে যশোর থেকে শুরু হওয়া নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা আজ সারাদেশের মানুষের প্রাণের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। যশোরের এই মঙ্গল শোভাযাত্রা তিন দশক পেরিয়ে এবার ৩৪ বছরে পা রাখছে।

যশোরের আঁকিয়েদের সংগঠন চারুপীঠের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মাহবুব জামাল শামীম পরিকল্পনা করেন নতুন একটি উৎসব আয়োজনের। নববর্ষের প্রথম প্রহরের সে উৎসব হবে লোকজ ঐতিহ্যের সম্মিলনে, যে উৎসব হবে সবার। সে অনুষ্ঠানে যিনি দর্শক, তিনিই শিল্পী। সব মিলিয়ে সে অনুষ্ঠান হবে সব বয়সের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রাণের উৎসব। এমন লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে শামীম উদ্যোগ নেন কিছু করার। সামনে থেকে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করেন হিরন্ময় চন্দ।

মাহাবুব জামিল শামীম জানান, পরিকল্পনামাফিক চারুপীঠের ৩০০ শিক্ষার্থীকে এক মাস প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। যশোর সাহিত্য পরিষদের ৫০ জন সদস্যও অংশ নেন প্রশিক্ষণে। তারা মুকুট, প্রজাপতি, পাখি ও মুখোশ তৈরি করেন। অনেক দূরের গ্রাম থেকে নিয়ে আসেন ঢাক-ঢোল, কাঁসর ও সানাই। ১৩৯২ সালে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষে ইংরেজি ১৯৮৫ সালে শামীমের স্বপ্ন ডানা মেলে। যশোর শহরে উপমহাদেশে প্রথম বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। চারুপীঠের ৩০০ শিক্ষার্থী সাহিত্য পরিষদের ৫০ জন সদস্য মুখোশের পৃষ্ঠা ১৫ কলাম ৪

আড়ালে প্রজাপতি পাখি উড়িয়ে সেই শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা রাজপথে নেচে-গেয়ে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেয়। শামীম ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র। তার মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বন্ধু আর শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও এ ব্যাপারে কথা হয়। যশোর শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন শামীমকে অভিনন্দন জানায়। পরের বছর ১৯৮৬ সালে শহরের সব সামাজিক সংগঠনের কর্মীরা মঙ্গল শোভাযাত্রায় শামীমের মুখোশের পেছনে এসে দাঁড়ায়। এরপর থেকে মুখোশযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। ১৯৮৯ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র সাখাওয়াত, মাহবুব, শিপুসহ আরও কয়েকজন শামীমের পাশে এসে দাঁড়ায়। এ বছর প্রথম ঢাকা শহরে বের হয় মুখোশ নিয়ে বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা। এরপর ১৯৯০ সালে মুখোশ মঙ্গল শোভাযাত্রায় আনন্দে ভেসেছে বরিশাল ও ময়মনসিংহ। এরপর মুখোশ পাসপোর্ট ছাড়াই সীমানা পেরিয়ে ভারতের চব্বিশ পরগণা জেলার বনগাঁও এবং শান্তিনিকেতনে ১৯৯৪ সালে মঙ্গল শোভাযাত্রা করে বাংলা নববর্ষকে বরণ করেছে। এখন বাংলাদেশসহ পহেলা বৈশাখে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাঙালি অধু্যষিত এলাকায় মুখোশের মিছিল দেখা যায়। এবারতো মুখোশ গেছে সুদূর অস্ট্রেলিয়াতেও।

১৩৯২ বঙ্গাব্দের সেই প্রথম প্রহরে যখন থেকে ঢোলে বারি পড়ে, তখন এক নতুন বিনোদন অনুষঙ্গের সূচনা হয়। সেই ঢাকের তরঙ্গায়িত শব্দের মাধ্যমে যেন প্রবাহিত হতে থাকে আনন্দের ফল্গুধারা। ফুল, পাখি, হাতি-ঘোড়া, প্রজাপতিসহ লোকজ ঐতিহ্যের বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে নেচে-গেয়ে শুরু হয় সেই মঙ্গল শোভাযাত্রা। আজও সেটা বহমান। ইতোমধ্যে বাঙালির ঐতিহ্য মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। এই স্বীকৃতিতে মঙ্গল শোভাযাত্রা বিশ্বমঞ্চে নতুন মহিমায় উদ্ভাসিত হলো।

নববর্ষের বর্ণিল অনুষ্ঠান উদ্বোধন মঙ্গল শোভাযাত্রায় হয়ে থাকে। এরপর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঘিরে চলে বিভিন্ন ঐতিহ্যের সম্মিলন। বর্ণিল বর্ষবরণ উৎসব আয়োজনে যশোরবাসীর মন জয় করেছে উদীচী। বৈশাখের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান ৪৪ বছরে পদার্পন করছে এবার। প্রতিবছর প্রথম প্রহরে হাজার হাজার মানুষের স্রোত গিয়ে মেলে পৌর পার্কে। বর্ণিল অনুষ্ঠানমালা প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়। যশোরবাসীর স্বতস্ফূর্ত উপস্থিতি আরও বেশি বর্ণিল করে তোলে সমগ্র আয়োজন। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় উদীচীর মতো যশোরের ২০টির বেশি সাংস্কৃতিক সংগঠনের বর্ণিল বর্ষবরণ আয়োজন ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রতিবছর বাঙালি প্রাণের উৎসবে মিলিত হয়।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে