logo
বুধবার ২১ আগস্ট, ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৬

  যাযাদি রিপোর্ট   ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০  

যুদ্ধাপরাধ: নেত্রকোনার আঞ্জু ও ছোরাপের ফাঁসির রায়

যুদ্ধাপরাধ: নেত্রকোনার আঞ্জু ও ছোরাপের ফাঁসির রায়
হেদায়েত উলস্নাহ সোহরাব আলী
একাত্তরে নেত্রকোনার আটপাড়ায় হত্যা, গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকার দায়ে দুই আসামির ফাঁসির রায় এসেছে যুদ্ধাপরাধ আদালতে। বিচারপতি শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনাল বুধবার এ মামলার রায় ঘোষণা করে।

দুই আসামির মধ্যে কারাগারে থাকা সোহরাব আলী ওরফে ছোরাপ রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আরেক আসামি হেদায়েত উলস্নাহ ওরফে আঞ্জু বিএসসি পলাতক।

একাত্তরে তারা পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় গঠিত শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন এবং আটপাড়ার মধুয়াখালী, মোবারকপুর ও সুখারী গ্রাম এবং মদন থানার মদন গ্রামে বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান বলে উঠে এসেছে এ মামলার বিচারে।

২১৮ পৃষ্ঠার রায়ে আদালত বলেছে, আসামিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা ছয়টি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজার রায় এসেছে। বাকি তিন অভিযোগের প্রত্যেকটিতে তাদের দশ বছর করে কারাদন্ড দেয়া হয়েছে।

এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে আঞ্জুর ভাই এনায়েত উলস্নাহ ওরফে মঞ্জুকেও আসামি করা হয়েছিল। ২০১৭ সালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে তার নাম মামলা থেকে বাদ দেয়া হয়।

পরে ওই বছরই কারাগারে থাকা ছোরাপ ও পলাতক আঞ্জুর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করে আদালত। বিচার কাজ শেষে আদালত বুধবার তাদের দোষী সাব্যস্ত করে সাজার রায় দিল। এই রায়ের এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পাবেন আসামিরা। তবে সে সুযোগ নিতে হলে পলাতক হেদায়েত উলস্নাহ ওরফে আঞ্জুকে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রসিকিউটর মোখলেছুর রহমান বাদল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, 'বিশ্বের মানুষ এখন গণহত্যার বিরুদ্ধে সক্রিয় ও সচেতন। ট্রাইবু্যনাল আগেও উচ্চারণ করেছেন, এবারও উচ্চারণ করলেন- গণহত্যা আর নয়।'

অন্যদিকে আসমিদের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আব্দুস শকুর খান সাংবাদিকদের বলেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে। 'আর পলাতক যিনি আছেন তিনি যদি আদালত, রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে আত্মসমর্পণ করে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন, তাহলে আশা করি দুজনেই খালাস পাবেন।'

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনালে এ পর্যন্ত রায় আসা ৩৭টি মামলার ৯৫ আসামির মধ্যে ছয়জন বিচারাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। মোট ৮৭ জনের সাজা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৬০ যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ সাজার রায় এসেছে।

মামলা বৃত্তান্ত

প্রসিকিউশনের তদন্ত দল এ মামলার অনুসন্ধান শুরু করে ২০১৫ সালের ৫ মে। আঞ্জু, মঞ্জু ও ছোরাপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অভিযোগের বিষয়ে ৪০ জনের জবানবন্দি শোনেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

তিন জনেরই গ্রামের বাড়ি নেত্রকোণার আটপাড়া থানার কুলশ্রীতে। একাত্তরে তারা ওই এলাকাতেই থাকতেন। পরে আঞ্জু রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানার হেতেম খাঁ মেথর পাড়ায় থাকতে শুরু করে। আর ছোরাপ বসবাস করতেন নেত্রোকোনার মদন থানার জাহাঙ্গীরপুরে।

ছোরাপকে ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রম্নয়ারি গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০১৬ সালের ১১ ফেব্‌রুয়ারি তাকে ট্রাইবু্যনালের এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আর এনায়েত উলস্নাহ ওরফে মঞ্জুকে গ্রেপ্তার করা হয় ওই বছরের ৩০ মার্চ। তার ভাই আঞ্জুকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

প্রায় দেড় বছর তদন্তের পর ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ওই তিনজনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনালের তদন্ত সংস্থা।

মামলার বিচার শুরুর আগেই ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এনায়েত উলস্নাহ ওরফে মঞ্জু।

এরপর ২০১৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আসামি হেদায়েতুলস্নাহ আঞ্জু ও ছোরাপ আলীর বিচার শুরু করে ট্রাইবু্যনাল। তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৩ জন এ মামলায় সাক্ষ্য দেন।

উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে ট্রাইবু্যনাল গত ৭ মার্চ মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে।

৬ যুদ্ধাপরাধ

অভিযোগ ১: একাত্তরের ২৯ মে নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া থানার মধুয়াখালী গ্রামে ২০-৩০টি ঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, হিন্দুদের দেশত্যাগে বাধ্য করা এবং গণহত্যার সমতুল্য অপরাধ। এ অভিযোগে দুই আসামির ১০ বছরের সাজার রায় হয়েছে।

অভিযোগ ২: একাত্তরের ২৩ অগাস্ট নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া থানার মোবারকপুর গ্রামের শহীদ মালেক তালকুদার ও কালা চান মুন্সীকে অপহরণ, হত্যা এবং লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ। এ অভিযোগে আসামি আঞ্জুর ফাঁসির রায় হয়েছে।

অভিযোগ ৩: একাত্তরের ৩০ আগস্ট নেত্রকোনা জেলার মদন থানার মদন গ্রামের শহীদ হেলিম তালুকদারকে অপহরণ ও হত্যা এবং লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ। এ অভিযোগে দুই আসামির ফাঁসির রায় হয়েছে।

অভিযোগ ৪: একাত্তরের ৩ সেপ্টেম্বর নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া থানার সুখারী গ্রামের দীনেশ চন্দ্র, শৈলেশ চন্দ্র, প্রফুলস্ন বালা, মনোরঞ্জণ বিশ্বাস, দুর্গা শংকর ভট্টাচার্য্য, পলু দে, তারেশ চন্দ্র সরকারকে অপহরণ, হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ এবং বেশকিছু হিন্দু পরিবারকে দেশত্যাগে বাধ্য করা। এ অভিযোগে দুই আসামির ফাঁসির রায় হয়েছে।

অভিযোগ ৫ : একাত্তরের ২ সেপ্টেম্বর নেত্রকোনা জেলার মদন থানার মাঝপাড়া গ্রামের হামিদ হোসেনকে অপরাহরণ, নির্যাতন। এ অভিযোগে দুই আসামির ১০ বছরের সাজার রায় হয়েছে।

অভিযোগ ৬ : একাত্তরের ৬ সেপ্টেম্বর নেত্রকোনা জেলার মদন থানার মদন গ্রামের ১৫০-২০০টি ঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ এবং হিন্দুদের দেশত্যাগে বাধ্য করা। এ অভিযোগে দুই আসামির ১০ বছরের সাজার রায় হয়েছে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে