logo
শনিবার ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৬ আশ্বিন ১৪২৬

  যাযাদি রিপোর্ট   ২৫ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০  

অধ্যাপক মোজাফফরকে ফুলেল শ্রদ্ধায় শেষ বিদায়

অধ্যাপক মোজাফফরকে  ফুলেল শ্রদ্ধায় শেষ বিদায়
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় পতাকায় মোড়ানো মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের উপদেষ্টা ও ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মরদেহে পু®পস্তবক অর্পণ করে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নীরবতা পালন করেন Ñফোকাস বাংলা
 


বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ছেড়ে রাজনীতিতে নেমেছিলেন গণমানুষের পাশে থাকতে, বন্ধুর সেই পথে নিজের আদর্শে অটুট থাকা বরেণ্য সেই রাজনীতিক অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে শেষ বিদায় জানাল সবাই।


সবার শ্রদ্ধা জানানোর জন্য শনিবার দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়া হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফরকে।


৯৭ বছর বয়সে শুক্রবার মৃত্যু হয়েছিল প্রবীণ এই রাজনীতিকের, যে মৃত্যুকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারায় ‘একটি যুগের অবসান’ বলছেন অনেক রাজনীতিক। শনিবার সকালে প্রথমে সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে জানাজা হয় সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোজাফফরের; সেখানে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়। 


জানাজায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলাম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, মাহবুব-উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুস সোবহান গোলাপ, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মরহুমের জীবনী পাঠ করেন ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন।


জানাজা পরিচালনা করেন সংসদ ভবন মসজিদের ইমাম মওলানা মো. সাইফুল্লাহ। জানাজা শেষে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মোজাফফর আহমদকে গার্ড অব অনার ও রাষ্ট্রীয় সালাম প্রদান করা হয়। এ সময় এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।


জানাজার পর রাষ্ট্রপতি মো.আবদুল হামিদের পক্ষে তার সহকারী সামরিক সচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী ইফতেখার-উল-আলম প্রয়াত মোজাফফর আহমদের মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা 


নিবেদন করেন।


এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পৃথকভাবে এই বাম নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।


পরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলীয় সভানেত্রী হিসেবে দলীয় নেতাদের দিয়ে ১৪-দলীয় জোট শরিক ন্যাপের সভাপতির কফিনে শ্রদ্ধা জানান শেখ হাসিনা। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবীর নানক, সাংস্কৃতিক-বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল এবং সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও এনামুল হক শামীম।


পরে মরদেহ নেয়া হয় ধানম-িতে ন্যাপের কেন্দ্রীয় কার্যালয়।


সেখান থেকে দুপুরে কফিন নেয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে; রাজনৈতিক সহকর্মী, অনুসারিদের ফুলে ফুলে ঢেকে যায় এই রাজনীতিকের কফিন।


বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভেদের রেখা থাকলেও পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব পাকিস্তানের আইনসভায় প্রথম উত্থাপনকারী মোজাফফরের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর ক্ষেত্রে মুছে গিয়েছিলে সেই রেখা।


এ সময় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, কেন্দ্রীয় খেলাঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাম গণতান্ত্রিক জোট, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি), জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ কবিতা পরিষদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী পরিষদ, আমরা মুক্তিযোদ্ধা সন্তানসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য এবং সাধারণ মানুষ।


এ সময় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মরদেহ ফুলে ফুলে ভরে যায়।


কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মোজাফফর আহমদের মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় তার মেয়ে আইভী আহমদ বলেন, আমার বাবা সারাজীবন গরিব মানুষের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। বাংলাদেশের সংবিধানের চারটি স্তম্ভ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের সব মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হলেই বাবার স্বপ্ন পূরণ হবে।


জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু শ্রদ্ধা জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন একজন জাতীয় নেতা। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছিলেন।


বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের আন্দোলন এবং প্রগতিশীল রাজনীতিতে তার অবদান অনেক। তিনি সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে আপসহীন ছিলেন। এ জন্যই তিনি জাতীয় নেতা।’


আওয়ামী লীগের পক্ষে ফুলেল শ্রদ্ধা জানিয়ে দলের আইন-বিষয়ক সম্পাদক ও পূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘রাজনীতিতে কীভাবে আত্মোৎসর্গ করতে হয়, কীভাবে সততার দৃষ্টান্ত রাখতে হয়, লোভ-লালসা পরিহার করতে হয়, অনন্তকাল তার অনুপ্রেরণা জোগাবেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ।’


শ্রদ্ধা জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেন, ‘অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ জীবনে কোনো সম্মাননার পেছনে ছোটেননি। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, শুধু পদ-পদবির পেছনে ছোটাই রাজনীতি না। আদর্শের রাজনীতিই হলো প্রকৃত রাজনীতি।’


ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থনের ক্ষেত্রে অধ্যাপক মোজাফফর অনন্য অবদান রেখেছেন। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে থাকবে।’


আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য আবদুল মতিন খসরু বলেন, ‘উপমহাদেশের বাম রাজনীতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মৃত্যুতে জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হলো।’


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের শিক্ষক মোজাফফরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন কিংবদন্তি ছিলেন তিনি।


বাংলাদেশের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তার অবদান কোনো না কোনোভাবে আছে। তার লোভ-লালসাহীন রাজনীতি আগামী দিনের রাজনীতিবিদদের কাছে শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে।’


কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বের পর বায়তুল মোকাররমে জানাজার নামাজ হয় অধ্যাপক মোজাফফরের।


ন্যাপ নেতারা জানিয়েছেন, আজ কুমিল্লার দেবিদ্বারে পারিবারিক কবরস্থানে শেষ শয্যা নেবেন এই রাজনীতিক। 


 


মোজাফফর আহমদের ত্যাগের 


দৃষ্টান্ত অনুসরণীয় : কাদের


আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, রাজনীতিতে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের ত্যাগের দৃষ্টান্ত সবার জন্য অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।


শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের জানাজার নামাজ  শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।


ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদের প্রতিটি সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। বামপন্থিদের মধ্যে প্রথম যিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছয় দফায় বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন জানিয়েছিলেন, তিনি মোজাফফর আহমদ।


তিনি বলেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের রাজনৈতিক সহযোগিতা পেয়েছেন।


আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, দেশের সুযোগ্য সন্তান, কিংবদন্তি নেতা আমাদের মধ্য থেকে হারিয়ে গেলেন। তার প্রজন্মের কেউ আর রাজনীতিতে থাকলেন না। মোজাফফর আহমদ একটি বিশাল বটবৃক্ষের মতো, যে বটবৃক্ষের আজ পতন হলো।


 


বাঙালির ইতিহাসের অংশ


মোজাফফর আহমদ : সেলিম


বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বাঙালি জাতির ইতিহাসের একটি অংশ। এমন নেতাদের মাধ্যমে আমরা দেশের ইতিহাস রচনা করতে সক্ষম হয়েছিলাম। তিনি শৈশব থেকেই সমাজতন্ত্রের সৈনিক ছিলেন, গরিব ও মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করেছেন।


জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের জানাজা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।


সিপিবি সভাপতি বলেন, বাঙালির স্বাধিকার, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতার জন্য সংগ্রাম করেছেন মোজাফফর আহমদ। সে সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানি শাসকদের অত্যাচারকে উপেক্ষা করে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও আমাদের সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধে তার ছিল অনন্য অবদান।


তিনি বলেন, বর্তমানে যারা ন্যাপ, কমিউনিস্ট, প্রগতিশীল বামপন্থি রাজনীতি করেন, অনন্য নেতা হিসেবে মোজাফফর আহমদ তাদের পথ দেখিয়েছেন।


মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনীকে সংগঠিত করার জন্য তিনি অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমস্ত প্রগতিশীল দুনিয়াকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আনার জন্য তার অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।


তিনি বলেন, পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় অনেকে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ভেতর কাজ করত। মোজাফফর আহমদও এক সময় কমরেড মান্নান নামে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। পরে, আশির দশকে পার্টির দ্বৈত সদস্য ধারাটি বিলুপ্ত করা হয়। সে কারণে আমাদের পার্টির সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক কোনো সর্ম্পক না থাকলেও অন্তরের সম্পর্ক কোনো দিন ছিন্ন হয়নি। 


সিপিবি নেতা বলেন, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আমাদের মধ্যে না থাকলেও তার আদর্শ সমুন্নত রেখে বাস্তবায়ন করার যে লড়াই, সেই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তাকে জীবন্ত রাখব সবসময়।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে