logo
শনিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২০, ৫ মাঘ ১৪২৭

  অনলাইন ডেস্ক    ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

ভ্যালোরি অ্যান টেইলর

১৫ মাসের জন্য বাংলাদেশে এসে কাটিয়ে দিলেন ৫০ বছর

১৫ মাসের জন্য বাংলাদেশে এসে কাটিয়ে দিলেন ৫০ বছর
ভ্যালেরি অ্যান টেইলর
যাযাদি ডেস্ক

'বিমান থেকে নেমেই আমি চন্দ্রঘোনার দারুণ সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে যাই। একদিন নদীতে ঘন কুয়াশা ছিল। আশপাশে আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ একটি সাম্পান আমার চোখে পড়ে, মাঝি দাঁড় বাইছে আর মনে হচ্ছে সাম্পানটি পানির দুই তিন ফুট উপরে ভেসে চলছে। কারণ চারপাশে কুয়াশার মধ্যে শুধু সাম্পানটি দেখা যাচ্ছিল। সে দৃশ্য এখনো পরিষ্কারভাবে আমার মনে ভাসে।'

১৯৬৯ সালে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) আসার পরের সময়ের কথা এভাবেই বর্ণনা করেন ৭৫ বছর বয়সি ভ্যালেরি অ্যান টেইলর।

পক্ষাঘাতগ্রস্ত কিংবা নানা আঘাতপ্রাপ্ত মানুষজন যারা ঢাকার কাছে সিআরপি নামের দাতব্য প্রতিষ্ঠানটিতে পুনর্বাসনের জন্য যান, তাদের অনেকের কাছেই পরিচিত এবং প্রিয়মুখ মিজ টেইলর।

তার নিজের হাতে গড়া সেই সিআরপি প্রতিষ্ঠার ৪০ বছর হয়ে গেল। আর মিজ টেইলরের বাংলাদেশে আগমনের হলো আধা শতাব্দী। অথচ তিনি মোটে ১৫ মাসের জন্য স্রেফ অভিজ্ঞতা আহরণে এসেছিলেন চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোনায়।

১৯৬৭ সাল, লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতাল থেকে ফিজিওথেরাপির ওপর পড়াশোনা করে সদ্য পাস করেছেন মিজ টেইলর। ইচ্ছা মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার।

ব্রিটিশ সরকারের ভলান্টারি সার্ভিস ওভারসিজে (ভিএসও) আবেদনও করে ফেলেন তিনি। কিন্তু নূ্যনতম দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতা না থাকলে কাউকে ভিএসও-তে নেওয়া হয় না।

সুতরাং তিনি আবার ফিরে যান সেন্ট থমাসে দুই বছরের কাজের অভিজ্ঞতা নিতে। এরই মাঝে চেন্নাইয়ের ক্রিশ্চান মেডিকেল কলেজের (সিএমসি) দুই ডাক্তারের কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে বই পড়ে ফেলেন তিনি এবং সিদ্ধান্ত নেন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করলে দক্ষিণ এশিয়াতেই করবেন।

আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় কাজের সুযোগ থাকলেও অটল থাকেন ভারতীয় উপমহাদেশের কোথাও কাজ করবেন।

১৯৬৯ সালের মাঝামাঝি সুযোগ এসে যায়, চন্দ্রঘোনার খ্রিষ্টান হাসপাতালের জন্য একজন ফিজিওথেরাপিস্টের দরকার হলে ডাক পড়ে মিজ টেইলরের।

তবে শর্ত ছিল কমপক্ষে ১৫ মাস অথবা দুই বছর চন্দ্রঘোনায় কাজ করতে হবে। টেইলর বলেন, 'আমি ভাবছিলাম- মনে হয় পূর্ব পাকিস্তান আমার ভালো লাগবে না। ভাবলাম যখন আমি ১৫ মাসের জন্য যেতে পারব তাহলে কেন দুই বছরের জন্য চুক্তি করব? সুতরাং আমি ১৫ মাসের জন্যই চুক্তি করেছিলাম। ৫০ বছর পর এসে এখন মনে হচ্ছে আমি মনে হয় পরিকল্পনায় খুব একটা ভালো না।'

আসলে বাংলাদেশের প্রেমে পড়ে ৫০ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি। এত বছর পরে এসেও তিনি প্রথম দিন বাংলাদেশে আসার মুহূর্তটি মনে করতে পারেন।

চন্দ্রঘোনার সৌন্দর্য অবাক করলেও মিজ টেইলর কষ্ট পেতে থাকেন, যখন দেখেন ওই হাসপাতালে একটি হুইলচেয়ারও নেই। অথচ তাকে পঙ্গুদেরই চিকিৎসা করতে হয়। ভ্যালেরি বড় হয়েছেন ইংল্যান্ডের আলসবেরিতে, যেখানে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনজুরি সেন্টারটি অবস্থিত।

তিনি বলেন, 'ছোটবেলায় আমি দেখেছি, লোকজন ওখানকার স্পোর্টস সেন্টারে খেলাধুলা করছে। হুইলচেয়ারে করে আশপাশের দোকানে লোকজন ঘুরছে। কিন্তু চন্দ্রঘোনায় আমি কোনো হুইলচেয়ার দেখিনি। ওখানে কোনো কারিগরি শিক্ষা ছিল না। সেখানে কোনো অকুপেশনাল থেরাপির ব্যবস্থা ছিল না। সুতরাং আমি বুঝতে পেরেছি কী পরিমাণ পিছিয়ে আছে এখানে।'

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

একই বছর সেপ্টেম্বর মাসে তিনি পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তখনো যুদ্ধ শেষ হতে দুই মাস বাকি।

এ সময় তার কাজ আরও বেড়ে যায়। কারণ যুদ্ধের কারণে পঙ্গুত্বের হার বেড়ে গিয়েছিল কয়েকগুণ। তিনি সফলভাবেই সেই কাজ করতে সমর্থ হন।

বাংলাদেশে একটি সার্থক পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য উপযুক্ত অর্থ ও অন্যান্য সাহায্যের ব্যবস্থা করার উদ্দেশে ১৯৭৩ সালে তিনি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে যান। ১৯৭৫ সালে তিনি পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

এই সময় তিনি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৯ সালে এই হাসপাতালের দুটি পরিত্যক্ত গুদামঘরে ৩-৪ জন রোগী নিয়ে শুরু করেন সিআরপি।

টেইলর বলেন, 'আমরা একটা বাস্কেটবল কোর্টের জন্য কিছু টাকা তুলতে পেরেছিলাম। যখন প্রতিবন্ধী লোকজন বাস্কেটবল খেলত, উলস্নাস করত তখন লোকজন থেমে উঁকি দিয়ে দেখত। আমরা যেটা চেয়েছি, লোকজন দুর্ঘটনার আগে যেভাবে স্বাভাবিক কাজকর্ম করত হুইলচেয়ারে বসেও যেন তারা সেটি চালিয়ে যেতে পারে এবং মানুষও যেন তাতে অভ্যস্ত হয়। আমার মনে হয় এটাই সবচেয়ে বড় বিষয় যে, এখন সবার মানসিকতা পালটেছে।'

১৯৯০ সালে ঢাকার কাছে সাভারে পাঁচ একর জায়গা কিনে সিআরপির স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তোলেন টেইলর। যেটি এখন ১০০ বেডের হাসপাতাল।

এই ১০০ জন স্পাইনাল ইনজুরি রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। এ ছাড়া দেশের ৫টি বিভাগে ১৩টি শাখা রয়েছে সিআরপির। যেখানে বছরে প্রায় ৮০ হাজার রোগী সেবা নিতে পারে।

এই প্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়ে বাধাও পেতে হয়েছে, বলেন মিজ টেইলর। নামে বেনামে তার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থার কাছেও নালিশ করা হয়েছিল বিভিন্ন সময়ে।

তিনি বলেন, 'আমি বুঝতে পেরেছি, বাংলাদেশের লোকজন যে কাজ করতে পছন্দ করে না অন্য কেউ যদি সে কাজ করে তবে তাকেও তারা পছন্দ করে না'।

'শিশু পাচারের মতো অভিযোগও আনা হয়েছে। আমাকে এনএসআই ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, এক অফিসার আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো পড়ে শোনাচ্ছিল এবং জিজ্ঞেস করেছে আপনি কর্মচারীদের বাচ্চাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন? এটা ছিল আমার বিরুদ্ধে পাঁচ নাম্বার অভিযোগ'।

তিনি বলেন, 'আমার মনে পড়ে, তখন আমি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম এবং বলেছিলাম, হ্যাঁ করি প্রতি বুধবার! তখন এনএসআই অফিসার হেসে উঠে বলেছিলেন চিন্তা করবেন না, এসব অভিযোগের সব আমরা বিশ্বাস করি না।'

এত কিছুর পরেও পঙ্গু মানুষদের সেবা চালিয়ে গেছেন মিজ টেইলর। তিনি বলছেন, 'আসলে এটা কোনো ব্যাপার না তোমার সঙ্গে কী আচরণ করা হচ্ছে। আমার মা বলতেন, যত বাধা তুমি পাবে তত বেশি শক্ত হতে পারবে তুমি।'

বর্তমানে সিআরপিতে এক হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছে। তাদের অনেকে এখানে চিকিৎসা নিতে এসে পুনর্বাসিত হয়েছেন।

সিআরপির নিজস্ব উদ্ভাবনী প্রযুক্তিতে দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে তৈরি হয় হুইলচেয়ার।

ভ্যালেরি টেইলর বলেন, 'এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যখন কেউ গ্রামে ফিরে যাবে তখন হুইলচেয়ারটা নষ্ট হলে সেখানে কেউ যেন সেটা সারাতে পারে। এটির যন্ত্রাংশগুলোও স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য হতে হবে। এজন্য আমরা হুইলচেয়ারগুলোতে সাইকেল এবং রিকশার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ব্যবহার করি।'

সিআরপির শুরু থেকে বাংলাদেশিদের ফিজিওথেরাপি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে, বর্তমানে বছরে ৪০০ জনকে ডিপেস্নামা, অনার্স মাস্টার্সসহ নানামেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

পঙ্গু মানুষদের পুনর্বাসনে অবদানের জন্য ২০০৪ সালে স্বাধীনতা পদক পান মিজ টেইলর। তার আগে ১৯৯৮ সালে তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।

বিভিন্ন দেশের দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার অনুদানে পরিচালনা করা হয় সিআরপির কার্যক্রম।

মূলত যারা সিআরপিতে বিভিন্ন সময়ে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে এসেছিলেন পরবর্তীতে তারাই এটিকে পরিচালনার জন্য অর্থের জোগান দিতে থাকেন।

ভ্যালেরি টেইলর চান প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্পৃক্তরা এটিকে এগিয়ে নিবেন। এজন্য চালু করেছেন নতুন স্স্নোগান, 'আমরাই সিআরপি'।

'আমার স্বপ্ন এটা- আমরা যেন এই বার্তাটি ছড়িয়ে দিতে পারি যে- এটা শুধু ফিজিওথেরাপি বা ভালো সার্জারি বা নার্সিং কেয়ার করে না। আমরা আমাদের এসব রোগীকে সম্মান দিচ্ছি কি না? আমরা কি যেখানে আছি সেখানেই থেমে থাকব নাকি আরও অগ্রসর হবো? এসব মূল্যবোধের কারণে যে কেউ যেন বলে এই জায়গাটি অন্যদের তুলনায় ভিন্ন'।

'আমার মনে হয় ৪০ বছর, এটা দারুণ সময় নিজেকে এখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার এবং যারা বলে আমিই সিআরপি, তারা এটির মূল্যবোধকে সামনে এগিয়ে নিবে'। বিবিসি বাংলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে