logo
শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

  ক্রীড়া ডেস্ক   ১৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

২২ গজে এক 'সন্ন্যাসী' উইলিয়ামসন

বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল, প্রতিপক্ষ ভারত নিরঙ্কুশ ফেবারিট। বন্দে মাতরমের স্স্নোগানে ম্স্নান গড ডিফেন্ড নিউজিল্যান্ড। ম্যাচটা বের করে নিয়ে যাচ্ছেন জাদেজা আর সুপারকুল ধোনি। প্রথমে জাদেজা আউট, এরপর গাপটিলের রুলার মাপা মিসাইল থ্রোতে রান আউট ধোনি, ম্যাচ শেষ। দলকে নিয়ে গেলেন বিশ্বকাপ ফাইনালে, অথচ লোকটার মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই। চুইংগাম চাবাতে চাবাতে একটু হাসি ফুটেছে কি ফোটেনি, ব্যস স্রেফ ওই পর্যন্তই।

কেন উইলিয়ামসন, আজকের ক্রিকেটে তাই ভীষণরকম বেমানান একটা চরিত্র। আমাদের চারপাশের অন্য আরও অনেক কিছুর মতো যখন বদলে যাচ্ছে ক্রিকেট, পারফরম্যান্সের সঙ্গে 'এক্স ফ্যাক্টর' যখন হয়ে যাচ্ছে খ্যাতি আর সাফল্যের অনুষঙ্গ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন চলছে তুমুল খোঁচাখুঁচি, টুইট-রিটুইট আর সেলফি বিনিময়- এসবকিছু থেকে দূরে থেকে উইলিয়ামসন জেগে আছেন বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপের মতো। এসব তুমুল কোলাহলের কিছুই স্পর্শ করে না তাকে, ২২ গজে যেন ঠিক একজন সন্ন্যাসী। এই যুগেও যার ফেসবুক-টুইটারে অ্যাকাউন্ট নেই!

উইলিয়ামসন অনেকের চেয়ে আলাদা। ব্যাট হাতে তিনি কী করতে পারেন, ক্রিকেটের সামান্যতম খোঁজ রাখলেও সেটা জেনে যাওয়ার কথা। একদিন কিউই ব্যাটিংয়ের সব রেকর্ড নিজের করে নেবেন, সেটাও স্রেফ সময়ের ব্যাপার।

উইলিয়ামসনকে দেখে আপনি আসলে ধন্দেই পড়ে যেতে পারেন অনেক সময়। এই ধরুন, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের ম্যাচের সময় যখন ক্যারি আর খাজা বের করে নিয়ে যাচ্ছেন ম্যাচটা-উইলিয়ামসনের মধ্যে যেন দৃশ্যত কোনো টেনশন নেই। বোলারদের সঙ্গে সেভাবে কথাও বলছেন না খুব একটা, যেন ঠিক করেছেন সবকিছু যেভাবে চলছে চলুক। বলতে পারেন, অধিনায়ককে তো আরেকটু আগ্রাসী হতে হবে এ সময়, আরেকটু বেশি সরব হতে হবে। কিন্তু উইলিয়ামসনের ভাবনা অন্যরকম। জেন সন্ন্যাসীর মতো পুরো দলে শান্ত থাকার যে বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন, সেটাই এই বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড।

ক্রিকেট অনেকদিন থেকে দেখেন, উইলিয়ামসনের বাঁধভাঙা আনন্দের কোনো ছবি কি মনে করতে পারেন? গুগল করে খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন না। খুব একটা লাভ হবে না, উইলিয়ামসনের উদযাপন মানে হেলমেট খুলে সেই স্মিত হাসি। মাঝে মাঝে হয়তো সেটা আরেকটু চওড়া হয়। ব্যস ওটুকুই, এর বাইরে আর বাড়তি কিছুই নেই।

তাউরাঙ্গা শহরে তার বেড়ে ওঠা, প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে তার মিতালি ছোট্ট থেকেই। ক্রিকেটের ফাঁকে সার্ফিং করা তার সবচেয়ে পছন্দের কাজ, সময় পেলেই বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে বেরিয়ে পড়েন সার্ফ বোর্ড হাতে। ঢেউয়ের প্রতিটা উত্তাল তরঙ্গে নিজেকে সমর্পণ করেন অসীমের আশ্রয়ে, প্রশান্ত মহাসাগরের অনেকটুকু বিশালতা নিয়ে নেন নিজের মধ্যে। উইলিয়ামসন নিজেই যেমন বলেছেন, 'সার্ফিং করার ওই সময়ে কোনো মোবাইল নেই, অন্য কোনো কিছু বিরক্ত করার সুযোগ নেই। শুধুই নিজের মতো কিছু সময় কাটানো।'

উইলিয়ামসন সারাজীবন ছোট ছোট আনন্দেই বাঁচতে চেয়েছেন। অত তাড়াতাড়ি যেতে চাননি কোথাও, ভক্তদের বরমাল্য থেকেও থাকতে চেয়েছেন দূরে। নিউজল্যান্ডে সেটা অবশ্য কঠিন নয়, ক্রিকেট খেলেন বলে এমনিতেই আলাদা করে মাতামাতি নেই তাদের। তারপরও ভারতে বা বাংলাদেশে এলে সেই উন্মাদনা টের পান ঠিকই। মুনিঋষিদের মতো সেটাও প্রশান্তচিত্তে উপভোগ করেছেন। তবে এসবে তার খুব মাথাব্যথা নেই। একবার জানতে চাওয়া হয়েছিল, নিজের পাওয়া সবচেয়ে প্রিয় উপহার কোনটা? উইলিয়ামসন অনেকক্ষণ ভেবে বলেছিলেন, প্রেমিকার কাছ থেকে পাওয়া একটা হেডফোন!

উইলিয়ামসন আসলে এমনই। সাফল্য বা ব্যর্থতাকে এখনকার ক্রিকেটে তার মতো 'পার্ট অব গেম' করে খুব কম ক্রিকেটারই নিতে পারেন। ব্যর্থতায় তাই নুয়ে পড়েন না হতাশায়, আবার হতাশায়ও উদ্বেল হন না; পাখির পালক থেকে পানি ঝেরে ফেলার মতো করে সব একপাশে রেখে দেন। কোহলিদের ভারতকে হারানোর পর তাই বলেন, এত এত মানুষের স্বপ্নভঙ্গ ঘটিয়ে তার খারাপই লাগছে। আবার অকপটে স্বীকার করে নেন, বিশ্বকাপ জিতে গেলেও নিউজিল্যান্ডে রাতারাতি তারকা হয়ে যাবেন না।

কেন উইলিয়ামসন এরকমই। প্রশান্ত মহাসাগরের বিশালতা ধারণ করে ২২ গজে তাই তিনি সন্ন্যাসী।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে