logo
শনিবার ২০ জুলাই, ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬

  যাযাদি রিপোর্ট   ১১ মে ২০১৯, ০০:০০  

এসিআইয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ডিএসই

এসিআইয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ডিএসই
এসিআইয়ের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। সহযোগী প্রতিষ্ঠান এসিআই লজিস্টিক লিমিটেডের (স্বপ্ন) 'কথিত' লোকসানের আড়ালে এসিআই লিমিটেড থেকে টাকা সরিয়ে নেয়ার অভিযোগের প্রেক্ষিতে ডিএসই এ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি এসিআই লিমিটেডের গত কয়েক বছরের আর্থিক বিবরণীর তথ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে গত ফেব্রম্নয়ারিতে ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

ডিএসইর পরিচালক ও সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি ছিদ্দিকুর রহমান মিয়াকে প্রধান করে গঠিত ওই কমিটি আগামী রোববার বৈঠক করে তাদের সুপারিশ তুলে ধরবেন। তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন ডিএসইর পরিচালক ও সাবেক সভাপতি মো. রকিবুর রহমান, পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন, স্বতন্ত্র পরিচালক মনোয়ারা হাকিম আলী, প্রফেসর ড. মো. মাসুদুর রহমান এবং ডিএসইর প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) আবদুল মতিন পাটোয়ারী।

তদন্ত কমিটির একাধিক সদস্য বলেন, তাদের কাছে মনে হয়েছে এসিআইয়ের সাম্প্রতিক বছরগুলোর আর্থিক বিবরণী মনগড়া ও কারসাজি পূর্ণ। এটি মারাত্মক অনৈতিক কাজ। ভবিষ্যতে যাতে কোনো কোম্পানি এ ধরনের অনৈতিক কাজ করতে না পারে সেজন্য এসিআইয়ের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করা হবে।

কমিটির সদস্যরা বলেন, এসিআই লিমিডেট তালিকাভুক্ত একটি কোম্পানি। এর পরিচালকরা যা খুশি তাই করতে পারেন না। বছরের পর বছর ধরে রিজার্ভ থেকে সাবসিডিয়ারি (সহযোগী) কোম্পানির লোকসান বহন করবে তা হতে পারে না। তদন্ত কমিটির এসিআই লিমিডেট থেকে 'স্বপ্ন'কে বাদ দেয়াসহ কোম্পানিটির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করবে, যা বাস্তবায়নের জন্য ডিএসইর মাধ্যমে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে পাঠানো হবে।

তদন্ত কমিটির এক সদস্য বলেন, এসিআইয়ের সাম্প্রতিক গতিবিধি সন্দেহজনক। ৩৬ কোটি টাকা মূলধনের কোম্পানিটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের লোকসানের নামে ৯০০ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। বিষয়টা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়, গ্রহণযোগ্য তো নয়ই। আমাদের সন্দেহ, এসিআইয়ের মালিকরা স্বপ্নের লোকসান দেখিয়ে কোম্পানি থেকে টাকা সরিয়ে নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, এসিআই ১০ বছর ধরে তার রিজার্ভ থেকে লোকসানের বিপরীতে ভর্তুকি দিচ্ছে। এটা মেনে নেয়ার মতো নয়। স্বপ্ন যদি সত্যিই এত লোকসান দিয়ে থাকে, তাহলে এসিআই কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল সেটি বন্ধ করে দেয়া। এটি ব্যক্তিমালিকানার কোম্পানি নয় যে, মালিকরা যা খুশি তা করবেন। এটি একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি। শেয়ারহোল্ডাররাও এ কোম্পানির একাংশের মালিক। তাদের অর্থ নিয়ে নয়-ছয় করার অধিকার কারও নেই।

গত জানুয়ারিতে এসিআই চলতি হিসাব বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (২০১৮ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে কোম্পানিটি পাঁচ কোটি ৪৪ লাখ টাকা লোকসান দেখায়। আর শেয়ারপ্রতি লোকসান দেখানো হয় ৭৮ পয়সা। অথচ আগের বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটি ৩০ কোটি ১৩ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল। সে বছর ইপিএস দেখানো হয়েছিল পাঁচ টাকা ৪৪ পয়সা।

আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর এসিআইয়ের মতো বস্নুচিপ কোম্পানির এ লোকসানের বিষয়টি পুঁজিবাজারে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিএসইসি ও ডিএসইতে আবেদন জানানো হয়। এ প্রেক্ষিতেই ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসিআইয়ের আর্থিক বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখার সিদ্ধান্ত হয়।

ডিএসইর এই তদন্তের উদ্যোগ নেয়ার পর গত ৪ এপ্রিল ডিএসইর মাধ্যমে চলতি হিসাব বছরের ৯ মাসের (২০১৮ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত) আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে এসিআই।

ওই প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এসিআইয়ের এককভাবে চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে নিট মুনাফা হয়েছে ৬৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এতে প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে মুনাফা দাঁড়ায় ১৩ টাকা ৭১ পয়সা। তবে ১৪টি সাবসিডিয়ারি কোম্পানিসহ সমন্বিত হিসাবে নিট লোকসান হয়েছে ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এতে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে পাঁচ টাকা ৮১ পয়সা। প্রতিষ্ঠানটিকে এ লোকসানে নামাতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে রিটেইল সুপারশপ স্বপ্ন ব্র্যান্ডের এসিআই লজিস্টিকস।

এদিকে আগের অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই ১৭- মার্চ ১৮) এসিআইয়ের সমন্বিতভাবে নিট মুনাফা হয়েছিল ৪০ কোটি ছয় লাখ টাকা। এ হিসাবে চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে ব্যবসায় পতন হয়েছে ৭৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। যার পেছনে প্রধান কারণ হিসাবে রয়েছে সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোর সুদজনিত ব্যয় বৃদ্ধি।

দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে ঋণের বিপরীতে এসিআইয়ের সমন্বিতভাবে সুদজনিত ব্যয় হয়েছে ২২৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা। যার পরিমাণ আগের অর্থবছরের একই সময়ে হয়েছিল ১৫৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এ হিসাবে কোম্পানিটির সুদজনিত ব্যয় বেড়েছে ৭১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা বা ৪৭ শতাংশ। আর সুদজনিত ব্যয়ের এই বৃদ্ধি কোম্পানিটির মুনাফায় ধস নামিয়েছে। অথচ ২২৬ কোটি ৩২ লাখ টাকার মধ্যে এসিআইয়ের এককভাবে সুদজনিত ব্যয় ৫০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

এসিআইয়ের সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোসহ ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে চার হাজার ১৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। যার পরিমাণ আগের বছরের ৩০ জুন ছিল তিন হাজার ৪০৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এ হিসাবে চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৬০৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বা ১৮ শতাংশ। মোটা অঙ্কের এই ঋণের মধ্যে এসিআইয়ের এককভাবে এক হাজার ৭২৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকার ঋত রয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসইর পরিচালক ও তদন্ত কমিটির সদস্য মো. রকিবুর রহমান বলেন, এসআইয়ের কাছে আমরা ব্যাখ্যা চেয়েছিলাম, তারা উত্তর দিয়েছি। আগামী রোববার তদন্ত কমিটির বৈঠক। ওই বৈঠকে সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে সুপারিশ করা হবে। সেখানে এসিআইয়ের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যায় তা উলেস্নখ করা হবে।

এসিআইয়ের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী ডিএসইর যে ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ আছে, সেই ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে। এ জন্য আইনি বিষয়গুলো ক্ষতিয়ে দেখা হবে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে