প্রণোদনার কিস্তি আদায়ে উভয় সংকটে ব্যাংক খাত

ঋণ পরিশোধে বাড়তি সময় চাচ্ছেন ঋণগ্রহীতারা ষ ব্যবসা-বাণিজ্য সচল না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না ষ কিস্তি পরিশোধের সময় আরও এক বছর বাড়াতে পারে ব্যাংক
প্রণোদনার কিস্তি আদায়ে উভয় সংকটে ব্যাংক খাত

করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ২০২০-২১ অর্থবছরে এক লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করে সরকার। এর মধ্যে গত ১৪ মাসে ৯৬ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। যার বেশিরভাগই নিয়েছেন বড় গ্রাহকরা। তবে এসব ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সিংহভাগ গ্রাহক তা পরিশোধ করেননি। তারা এখন ব্যাংকের কাছে বাড়তি সময় চাচ্ছেন। এতে ঋণদাতা ব্যাংকগুলো ও ঋণ গ্রহীতা ব্যবসায়ীরা উভয় সংকটে পড়েছে। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় প্রদত্ত ঋণ যথাযথ খাতে ব্যবহার না হয়ে কিছু কিছু ঋণ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ঋণ নিয়ে গ্রহীতারা তাদের অন্য ঋণ পরিশোধ করেছে। যে কারণে তারা ঋণের কিস্তি দিতে পারছে না। এসব টাকা আদায় করাও কঠিন হয়ে যাবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে ১ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, মহামারির ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ব্যাংকগুলো প্রণোদনার যে ঋণ বিতরণ করেছে, সেই ঋণ কোথায় গেছে, কারা নিয়েছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে। যদি এই প্রণোদনার টাকা যাদের প্রয়োজন তারা না পেয়ে থাকেন, অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্তরা না পেয়ে অন্য কেউ পেয়ে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই'র সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, প্রথমত, টাকাটা সরকার প্রণোদনা হিসেবে দেয়নি। দিয়েছে ঋণ হিসেবে। এছাড়া ব্যবসা করার মতো পরিস্থিতি এখনো আসেনি। কিস্তি আদায় না করে আগে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করার সুযোগ দিতে হবে। ঋণ শোধের জন্য অতিরিক্ত চাপাচাপি না করে কীভাবে ব্যাংক ও গ্রাহক ভালো থাকবে, কীভাবে ব্যবসা সচল হবে, সেদিকে নজর দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, 'বিনিয়োগ না করে শুধু ব্যাংকে টাকা জমা করে লাভ নেই। আগে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ব্যবসায়ীদের টাকা ফেরত দেওয়ার মতো সুযোগ দিতে হবে। সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ব্যাংক বাঁচাতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের মেরে ব্যাংক উল্টো আরও ক্ষতির মুখে পড়বে। ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধের জন্য আরও তিন বছর সময় চান তিনি। এ বিষয়ে এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, কিছু কিছু বড় গ্রাহকের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ঋণ পরিশোধে তাদের অনেকেই দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় বাড়ানোর আবেদন করেছেন। তাদের বক্তব্য হলো, ব্যবসা সচল না হওয়ায় তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। যদিও নীতিমালা অনুযায়ী এক বছরের বেশি সময় দেওয়া যাবে না। কোভিড পরিস্থিতি ভালো হলে এ সমস্যা থাকবে না। তবে কোভিড পরিস্থিতি খারাপ হলে এ ক্ষেত্রে চাপ বাড়বে। তিনি বলেন, এক বছরের বেশি সময় বাড়াতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এমএ বাকী খলিলি মনে করেন, করোনার কারণে প্রণোদনার দিক থেকে ব্যাংক সহায়তা দিয়েছে। কিস্তির টাকা না পাওয়ায় ব্যাংকগুলোতে চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রায় সব খাতই লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন ঋণ পরিশোধ করাটা অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে। সরকারের উচিত হবে উদ্যোক্তাদের কিস্তি পরিশোধে আহ্বান জানানো। কারণ, ব্যাংকিং খাতে একটা চাপ আছে। জানা গেছে, গত পুরোবছর এবং চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ মার্চ পর্যন্ত ঋণ পরিশোধে শিথিলতা ছিল। করোনার কারণে ব্যবসা মন্দায় সব শ্রেণির ঋণে এ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। কেউ ঋণ পরিশোধ না করলেও তাদেরকে খেলাপি করা হয়নি। এ সুযোগ পরবর্তীতে জুন মাস পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর পরেও অনেকে ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, বকেয়া কিস্তির ওপর ২০ শতাংশ এককালীন কেউ পরিশোধ করলে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ওই গ্রাহককে খেলাপি করা হবে না। এদিকে, প্রণোদনার প্যাকেজের নীতিমালা অনুযায়ী চলতি মূলধন জোগান দেওয়া হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এ ঋণ এক বছরের জন্য গ্রাহক নিতে পারবেন। আবার এক বছরের মধ্যেই তাকে ফেরত দিতে হবে। এতে গ্রাহক যেমন সুদহারের ওপর ছাড় পাবেন, তেমনি ব্যাংক ছাড়ের অংশটুকু সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি পাবে। যেমন, বৃহৎ ও সেবা খাতে গ্রাহক এক বছরের জন্য ঋণ নিলে সুদ হারের ওপর সাড়ে ৪ শতাংশ ছাড় পাবেন। অর্থাৎ ৯ শতাংশ সুদের মধ্যে গ্রাহককে পরিশোধ করতে হবে সাড়ে ৪ শতাংশ এবং গ্রাহকের পক্ষে সরকার পরিশোধ করবে সাড়ে ৪ শতাংশ। তেমনি ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র, কুটির শিল্প ও মাঝারি ঋণের জন্য গ্রাহককে ৯ শতাংশ সুদের মধ্যে ৪ শতাংশ পরিশোধ করতে হবে, বাকি ৫ শতাংশ সরকার পরিশোধ করবে। এ সুযোগ এক বছরের জন্য। এক বছরের মধ্যে গ্রাহক ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে আর এক বছর সময় বাড়িয়ে দিতে পারবে ব্যাংক। কিন্তু গ্রাহক সুদের হারের ওপর কোনো ভর্তুকি পাবেন না। এসব বাধ্যবাধকতায় ব্যাংক এক বছরের বেশি সময় বাড়াতে পারবে না। এদিকে, প্রণোদনা প্যাকেজের বাইরে করোনা মোকাবিলায় ঋণ পরিশোধে ঋণগ্রহীতাদের নতুন করে আবারও বড় ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনো ঋণগ্রহীতা তার চলতি বছরের ঋণের কিস্তির ২৫ শতাংশ পরিশোধ করলেই ওই ঋণকে খেলাপি করা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের ফলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আর কোনো ঋণ খেলাপি হবে না। এর আগে ৩০ জুন পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে ঋণ পরিশোধের সীমা বেঁধে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছিল, ঋণ বা ঋণের যেসব কিস্তি ৩০ জুনের মধ্যে বকেয়া হবে, সেসব ঋণ বা ঋণের কিস্তির কমপক্ষে ২০ শতাংশ ৩১ আগস্টের মধ্যে পরিশোধ করলে ওই ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হবে না। তবে ৩০ জুন পর্যন্ত ঋণ বা ঋণের কিস্তির বকেয়া অংশ সর্বশেষ কিস্তির সঙ্গে পরিশোধ করতে হবে। তার আগে গত ১ জানুয়ারি পর্যন্ত নিয়মিত যেসব ঋণের কিস্তি মার্চ পর্যন্ত বকেয়া ছিল, সেগুলো ৩০ জুনের মধ্যে ব্যাংক গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিশোধ করলে ওইসব ঋণখেলাপি করা যেত না। অন্যদিকে ঋণখেলাপি না করতে নানা ছাড় দেওয়ার পরও সম্প্রতি খেলাপি ঋণ বাড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৪ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। গত জুনে তা বেড়ে হয়েছে ৯৮ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা। তাতে তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। করোনা সংক্রমণে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ২০২০ সালের পুরোসময় ঋণ পরিশোধে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ কারণে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করেও কেউ খেলাপি হননি ওই সময়ে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

আরও খবর

Copyright JaiJaiDin ©2021

Design and developed by Orangebd


উপরে